Saturday, July 13, 2024

৩৫ কোটি পাঠ্যবইয়ের উৎসব

এবার সারাদেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৭ কপি বই। যার মধ্যে প্রাথমিকে ১০ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ কপি এবং মাধ্যমিকে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই।

উত্তরণ প্রতিবেদন: বছরের প্রথম দিন খালি হাতে স্কুলে যাওয়া আর উৎসবে শামিল হয়ে এক সেট ঝকঝকে নতুন পাঠ্যবই হাতে নিয়ে দেশের কোটি কোটি শিশুর বাড়ি ফেরা। এক বছর বা দু-বছর নয়। এটিই এখন যেন নিয়ম, যার হবে না কোনো পরিবর্তন। টানা ১১ বছর ধরে নতুন বছরের প্রথম দিন দেশের প্রতিটি স্কুলশিক্ষার্থী হাতে পাচ্ছে নতুন পাঠ্যবই। এবারও বছরের প্রথম দিনই দেশের ৪ কোটি ২৭ লাখ স্কুলশিক্ষার্থীর হাতে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ নতুন ঝকঝকে পাঠ্যবই তুলে দিয়ে ইংরেজি নববর্ষ শুরু করল দেশ। বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্কুলে স্কুলে চলেছে উৎসব। বর্ণিল সাজে সেজেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বই হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা।
যথারীতি এবারও বই উৎসবের কেন্দ্রীয় আয়োজন ছিল দুটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বই বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। রাজধানীর অদূরে সাভারের অধর চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উৎসবের আয়োজনে ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুই অনুষ্ঠানেই শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা এবং রঙিন বেলুন উড়িয়ে দেওয়া হয় নীল আকাশে। শিশুবান্ধব এ-অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, তারকা ক্রিকেটারসহ উপস্থিত ছিলেন অনেকেই। ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, শিরীন আক্তার, বিশ^সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক এএফএম মঞ্জুর কাদির, অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ প্রমুখ।
খেলার মাঠের এই অনুষ্ঠানে নতুন বই পেয়ে দারুণ উল্লসিত ছিল শিক্ষার্থীরা। ড্রাম ও বাঁশির বাদন আর শিশুদের কলকাকলিতে মুখর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ। শিশুদের বইয়ের আকর্ষণের বাইরেও আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন প্রিয় অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। শিশুদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিয়ে উৎসাহ জোগান সাকিব। শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার প্রস্তুতির সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে গল্পও জমিয়েছেন। তাদের নানা গল্প ও আনন্দ উচ্ছ্বাসে নিজেকে শামিল করে সাকিব। বই উৎসবের এই দৃশ্যে অনেকের চোখ আটকে যায়। এবার সারাদেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৭ কপি বই। যার মধ্যে প্রাথমিকে ১০ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ কপি এবং মাধ্যমিকে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরে দুই বিষয়ে ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ শিক্ষার্থীকে ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৬টি বই বিতরণ করা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ৯৭ হাজার ৫৭২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ লাখ ৩০ হাজার ১০৩টি বই। মাদ্রাসা শিক্ষায় এবতেদায়ি পর্যায়ে ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৬ বিষয়ে ২ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫টি বই বিতরণ করা হয়েছে। দাখিলে ২৬ লাখ ২৬ হাজার ৬২৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে দেওয়া হয় ৩৯ বিষয়ে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯০৫টি বই। আর কারিগরিতে ২ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৩ শিক্ষার্থীর ৬১ বিষয়ে ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩৩টি, এসএসসি ভোকেশনালে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫০ শিক্ষার্থীর ১৯ বিষয়ে ৩৫ লাখ ২ হাজার ৭৬৫ এবং দাখিল ভোকেশনালে ১২ হাজার ২৫৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ বিষয়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৫ বই বিতরণ করা হয়েছে। এবার ৭৫০ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে ১১০ বিষয়ে ৯ হাজার ৫০৪টি ব্রেইল বই দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাঝে তাদের মাতৃভাষায় লেখা বই দেওয়া হবে। তবে এবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও মাতৃভাষায় লেখা বই পাচ্ছে।
শতভাগ বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের প্রথম বছর বইয়ের সংখ্যা ছিল ২০১০ সালে ১৯ কোটি ৯০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬১ কপি, ২০১১ সালে ২৩ কোটি ২২ লাখ ২১ হাজার ২৩৪ কপি, ২০১২ সালে ২২ কোটি ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮৩ কপি, ২০১৩ সালে ২৬ কোটি ১৮ লাখ ৯ হাজার ১০৬ কপি, ২০১৪ সালে ৩১ কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার ৫২৬ কপি, ২০১৫ সালে ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩ কপি, ২০১৬ সালে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২ কপি, ২০১৭ সালে বই ছিল ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫ কপি। ২০১৮ সালে বইয়ের সংখ্যা ছিল ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২ কপি। গত বছর ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২ কপি। আর এ-বছর বই হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৭ কপি।

‘শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান যুগে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাই। এ-কথা মাথায় রেখেই তার সরকার শিক্ষা-ব্যবস্থার সার্বিক মানোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ গত ৩১ ডিসেম্বর গণভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য সারাদেশে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এ-কথা বলেন। তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক তুলে দিয়ে সারাদেশে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একই অনুষ্ঠানে এ-বছরের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ি এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ি পরীক্ষার ফল প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা শিক্ষাকে আরও আধুনিক, উন্নত এবং বিজ্ঞানসম্মত করতে চাই। শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, কারিগরি শিক্ষাকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই। যাতে একজন ছেলেমেয়ে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেরা কিছু করতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ভালো ফলাফল করতে হলে আমাদের শিশুদের আরও মনোযোগী হতে হবে।’ তার সরকার বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের বই দেওয়াসহ বৃত্তি প্রদান করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গরিব বাবা-মার ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেজন্য আমরা বছরের শুরুতেই বই দিচ্ছি। স্কুল ও কলেজ সরকারি করে দিচ্ছি। শিক্ষার্থীদের যেন নদী-নালা, খাল-বিল পার হতে না হয়, সেটা বিবেচনায় রেখে স্কুল করে দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছি। উচ্চশিক্ষাসহ সর্বস্তরে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। স্কুলে টিফিনের ব্যবস্থা করেছি। কোনো শিক্ষার্থী যেন ঝরে না পড়ে, এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই যেখানে থাকবে না কোনো দারিদ্র্য, বৈষম্য। থাকবে উন্নত সমাজ-ব্যবস্থা। পড়াশোনার পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রদান করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারাক্ষণ শুধু পড় পড় করলে ছোট ছেলেমেয়েদের ভালো লাগে না। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তাদের পড়ালেখা শেখাতে হবে। তবেই সেটা ফলপ্রসূ হবে।’

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য