Sunday, July 3, 2022
বাড়িSlider৩০ বছরের গবেষণায় প্রাপ্ত ম্যালেরিয়া রোগের টিকা মানব দেহে প্রয়োগের অনুমোদন

৩০ বছরের গবেষণায় প্রাপ্ত ম্যালেরিয়া রোগের টিকা মানব দেহে প্রয়োগের অনুমোদন

ডা. মোহাম্মদ হোসেন: গত ৬ অক্টোবর এই প্রথমবারের মতো মানব দেহে সত্যিকারভাবে কার্যকরি ও নিরাপদ ম্যালেরিয়া রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের ঘোষণা ও তা মানব দেহে প্রয়োগের অনুমোদন দিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এটাকে তারা বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ও অর্জন। প্রতি বছর ম্যালেরিয়া রোগে পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায়, যার অর্ধেকই হলো শিশু। আফ্রিকা মহাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। তাই ম্যালেরিয়ার কারণে মৃত্যুর হারও এই মহাদেশে সর্বাধিক। প্রথমবারের মতো এ-রকম একটি ভ্যাক্সিন হাতে পাওয়ায় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন ম্যালারিয়া রোগকে নির্মূল করার কার্যকর একটি অস্ত্র ভা-ারে যোগ করার সুযোগ পেলেন।
মস্কিউরিক্স (Mosquirix; বৈজ্ঞানিক নাম RTS,S/AS01 সংক্ষেপে RTS,S) নামের এই ভ্যাক্সিন শুধু ম্যালেরিয়া প্যারাসাইটই নয়, যে কোনো প্যারাসাইট বা পরজীবী গ্রুপের জীবাণুর বিরুদ্ধে মানব তৈরি প্রথম কার্যকর ভ্যাক্সিন, অর্থাৎ প্যারাসাইট গ্রুপের জীবাণুর বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন তৈরির প্রচেষ্টা কোনোভাবে সফল হচ্ছিল না। নতুন এই আবিষ্কার অন্যান্য প্যারাসাইটিক রোগের বিরুদ্ধেও নতুন নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দিগন্তও উন্মোচিত করে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনুমোদনপ্রাপ্ত এই ভ্যাক্সিন শুধু ‘প্লাসমোডিয়াম ফেলসিপেরাম’ ধরনের ম্যালেরিয়ার ওপর কার্যকরি। অন্য আরও যে চার ধরনের (প্লাসমোডিয়াম ম্যালেরি, প্লাসমোডিয়াম ওভ্যালি, প্লাসমোডিয়াম ভিভ্যাক্স ও প্লাসমোডিয়াম নোলেসি) ম্যালেরিয়া আছে এই ভ্যাক্সিন তার ওপর কাজ করে না। তবে এই পাঁচ ধরনের ম্যালেরিয়ার মধ্যে প্লাসমোডিয়াম ফেলসিপেরাম সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ম্যালেরিয়ার কারণে মৃত্যুর ৫০ শতাংশ ঘটে ফেলসিপেরাম ম্যালারিয়ার সংক্রমণের কারণে। আবিষ্কৃত ভ্যাক্সিন এই মৃত্যুহার নিশ্চিতভাবে কমিয়ে দিতে পারবে, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে কী পরিমাণে রোগ প্রতিরোধ ও মৃত্যুহার এই ভ্যাক্সিন কমাতে পারবে- সেটি পূর্ণাঙ্গরূপে জানতে আমাদের আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
আবিষ্কৃত ভ্যাক্সিনটি ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার ৩টি দেশÑ ঘানা, কেনিয়া ও মালাভি’তে ফেজ-৩ ট্রায়াল গবেষণার অংশ হিসেবে প্রায় ৮ লাখ মানুষের ওপর প্রয়োগ করে মানব দেহের ওপর ভ্যাক্সিনটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভ্যাক্সিনটিকে ব্যবহারের অনুমোদন দিল। প্রাথমিকভাবে ভ্যাক্সিটি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪টি ডোজে প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেই সাথে তারা এই বলে হুঁশিয়ার করেছেন যে ভ্যাক্সিনটি ম্যালেরিয়ায় রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্য যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হয়, তার পরিপূর্ণ বিকল্প নয়; বরং সেগুলোর সাথে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতি যেমনÑ মশা নিধন, মশারি ব্যবহার, প্রতিষেধক ওষুধ গ্রহণ ও দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা, সেগুলো আগের মতোই কার্যকর রাখতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে এই ভ্যাক্সিন আবিষ্কারে যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ ইউনিসেফ (UNICEF), পাথ (PATH), গ্ল্যক্সো-স্মিথ-ক্লাইন (GSK) ও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill & Melinda Gates Foundation)।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য