Sunday, July 3, 2022
বাড়িSliderহয়তো কাকতালীয়

হয়তো কাকতালীয়

সাত দিন। মাত্র সাত দিন কাজের সুযোগ পেল সে। অষ্টম দিন সকালে, যখন ছেলে এসে মায়ের অসাড় হাতটা ধরে বসে আছেন পুরো নিশ্চল হয়ে, যেন তিনিও শ্বাস নিচ্ছেন না। মা কখন চলে গেছে টেরও পাননি। বেশ কিছুক্ষণ পরে নিশাত রুটিন চেকআপে টের পায় ব্যাপারটা। সে রোগীর চোয়ালটা গজ দিয়ে বেঁধে দিলে খুব বড় করে একটা শ্বাস ফেলেন ভদ্রলোক।

মিলা মাহফুজা: কা­কতালীয় ঘটনাটা সেদিন না ঘটলে কী হতো? কাকতালীয় বলে একটা শব্দ আছে, নিশাতের জানা ছিল; কিন্তু শব্দটা তার জীবনে কখনও ব্যবহৃত হয়নি। তার জীবনে যা কিছু হয় তা অনেক দিনের অনেক পরিকল্পনা, অনেক খাটাখাটনির পরই হয়। তাই কাকতালীয়ভাবে এটার সাথে ওটা জুড়ে গিয়ে একটা ভালো বা মন্দ কোনো ঘটনাই ঘটেনি তার ক্ষেত্রে। এমনকি তার জীবনে ভাগ্যের দরুন কিছু পাওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। সবই পরিশ্রমের ফসল। যদি কিছু মাত্র ফসল সে ফলিয়ে থাকে। তবে খুব খারাপ ফসলও ফলায়নি সে। চলে যাচ্ছিল, আর সুখী ছিল বেশ ভালোই। এবং সে জানত আগামী দিনগুলোতে সে আরও বেশি ভালো থাকবে। খুব শক্তভাবেই সে এটা বিশ্বাস করত। না ভাগ্যের জোরে কিছু ঘটবে, তা সে কখনোই ভাবেনি। সে জীবনকে যে-রকম চালাতে চায় সেটা করতে পারছে বলেই, বিশ্বাসটা প্রগাঢ় ছিল।
সেটা বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত একইরকম ছিল, যখন তার বয়স চব্বিশ পার হয়ে পঁচিশে পা রেখেছে। ছয় বছর ধরে ঢাকা শহরে বসবাসের দরুন গ্রামের মাটির ঘর, পুকুরে স্নান, চাটাইয়ের বেড়া ঘেরা রিংয়ের ওপর সø্যাব বসানো পায়খানা, মায়ের পুরনো শাড়ির টুকরোয় মাসিক সামলানো, হাঁস-মুরগি, ছাগল লালন-পালনের জীবনস্মৃতি ধূসর হয়ে এসেছে। বৈশাখ মাসে ঢিল মেরে গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে পোড়া শুকনো মরিচ দিয়ে মেখে খাওয়ার মধ্যে আনন্দ খোঁজে না। জ্যৈষ্ঠ মাসে কাঁঠাল বিচি পুড়িয়ে খাওয়া কিংবা পাকা কাঁঠাল দিয়ে লবণমাখা পান্তা খাওয়ার ইচ্ছে উঁকি মারে না মনে, কিংবা রসনায়।
আসলে পেছন টান নামের অদ্ভুত আর অকারণ আবেগটা সে আমলেই নেয় না।
টিউশন করতে ভালো লাগে না বলে ইন্টার পড়তে পড়তেই একটা বেসরকারি সেন্টার থেকে বছর দুয়েকের একটা নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছিল। তা দিয়ে একটা অস্থায়ী রোজগারের পথ করে নিয়েছিল সে। কাজটা ছিল, কোনো ক্লিনিকে নার্সের সংকট বা রোগীর চাপ বেশি হলে, তখন সাধারণ রোগী সামলানোর জন্যে তাকে ডাকা হতো। প্রথম প্রথম জ্বর মাপা, প্রেশার মাপা, রোগীর অভিযোগ শোনা, প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়ানো এ-ধরনের কাজগুলো করত। পরে ইনজেকশন দেওয়া, ব্যান্ডেজ খোলা, ক্ষত পরিষ্কার করার কাজও করত। সাধারণত রাতে কাজ করতে হতো, তাই কলেজ কামাই দিতে হতো না। শুধু রাতে ঘুম কম হওয়ায় কলেজে ঝিমুনির জন্যে শিক্ষকদের বকাবকি শুনতে হতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা শিক্ষকের কান বাঁচিয়ে তাদের বাজে সন্দেহ তাকে শোনাতেও ছাড়ত না। ফলে ক্লাসে তার কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। এমনিতে মফস্বল থেকে আসায় তাকে মাঝে মাঝেই নানারকম টিজিংয়ের শিকার হতে হতো ঢাকার স্মার্ট মেয়েদের কাছে। তবু তার এটেনডেন্স ভালো থাকত। খুব ভালো না হলেও মাঝারি রেজাল্ট নিশ্চিত ছিল।
হাসপাতালে কাজ করার সময় থেকে সে বুঝেছে নার্সরা কী অমানুষিক পরিশ্রম করে। কী ধৈর্য আর মমতা দিয়ে রোগীর সেবা করতে হয় তাদের। অথচ মূল্যায়ন হয় কম, সমাজে নার্সদের সম্মানটাও যথেষ্ট নয়। মানুষ উল্টে তাদের প্রতি নির্দয়। সামান্য বিচ্যুতি হলেই তাদের অপমান করে কথা বলে। সোজা কথায় একটু হেয় চোখেই দেখা হয় এই পেশাকে। নিশাতের খুব খারাপ লাগে বিষয়টা।
হয়তো এ-কারণেই নার্স রাবেয়ার সাথেই শেষ পর্যন্ত তার বন্ধুত্বটা গড়ে ওঠে। রাবেয়া খুব মায়াবতী মেয়ে। রোগীর কষ্টে ওর চোখ ভেজে বারবার। মমতার মায়াবী চাদর জড়িয়ে সে ঘোরে আপন বিভোরতায়। আর কোনো কাজে তার আগ্রহ কম। যেন নার্স না হলে ওকে আর কোনো কাজে মানাবে না।
রাবেয়া নিশাতকে বলে, সমাজ আমাদের কেমন ভাবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যখন রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, তখন আমার যে আনন্দ হয়, তা-ই আমার কাছে অনেক পাওয়া।
সেটা অবশ্য নিশাতেরও হয়, একজন রোগী যখন ওষুধ খাওয়ার পর বা কোনো ইনজেকশন নেওয়ার পর ব্যথা কমে গেলে ধীরে ধীরে চোখ বুজে ঘুমের রাজ্যে ডুব দেয়, সেটা দেখে নিশাতের আরাম লাগে। যেন সে নিজেই ঘুমিয়ে যাচ্ছে। যেন নিজেরই খুব শান্তি লাগছে।
তারপরও সে পুরোপুরি নার্স হওয়ার ইচ্ছে করে না। গ্রাজুয়েশন করার পর সে কাজ পায় একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ফ্রন্ট ডেক্স কর্মী হিসেবে।
কাজটায় ব্যস্ততা খুব, তবে কাজে ভিন্নমুখিনতা থাকায় নিশাতের ভালোই লাগছিল। ভালোলাগার আর একটা কারণ বেতনটা বেশ ভালো অংকের ছিল তার পক্ষে। নিজের খরচ, মা-বাবার জন্যে ছোট বোনের কাছে টাকা পাঠানোর পরও সে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে কিছু জমাতে পারছিল। টাকাটা সে জমাচ্ছিল রাত্রিকালীন অফিস ম্যানেজমেন্ট কোর্স করার জন্যে। কোর্সের ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করেন অফিসের ম্যানেজার শ্যামল দত্ত। শুধু গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি দিয়ে খুব বেশি দূর ওঠা যাবে না। কয়েকটা ট্রেনিং পকেটে রাখতে হবে। যেনতেন নয়; পয়সা খরচ করে ভালো ট্রেনিং নিতে হবে। মনে ধরে তার এই পরামর্শ। কোর্স ফিয়ের দুই-তৃতীয়াংশ অংশ জমা হলেই সে পরের কোনো এক সেশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
কিছুদিন পরেই তার পরিকল্পনায় প্রথম বাধাটা এলো।
কোভিড-১৯ ঝাঁপিয়ে পড়েছে যখন, হাসপাতালে রোগী আসার বিরাম নেই, কিন্তু হাসপাতালে সিট নেই। হাসপাতালের সামনে ভর্তি করতে না পারা মৃত বাবার লাশ ভ্যানে পড়ে থাকে ছেলের সামনে। লকডাউন পুরোদেশ। নিশাতের অফিস শুরুতে চৌদ্দ দিন, তারপর এক মাস, তারপর তিন মাস বন্ধ থাকল। পরে খুলল; কিন্তু অফিস যেন ঝিমায়। কাজ কর্ম নেই বললেই চলে। সারাদিন কোনো ক্লায়েন্ট আসে না। মালিক জানিয়ে দিল, অফিস হবে তিন/চার ঘণ্টার। বেতন অর্ধেক। যদি কারও না পোষায় এক মাস আগে জানিয়ে চলে যেতে পারে।
যাবে কোথায়? অর্ধেকে তবু খরচের অনেকটাই মিটবে। আপাতত ট্রেনিং কোর্স চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই টাকা না জমালেও চলবে। তবে জমানো টাকায় সে হাত দিতে চায় না। তাই বাস-কারবিহীন ফাঁকা রাজপথের প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে পাড়ি দিয়ে অফিসে যোগ দেয়। অফিসের দূরত্ব আরও আধা কিলোমিটার বেশি। ওই আধা কিলোমিটার পথ সে রিকশা নেয়। রিকশায় বসে মুখের ঘাম মুছে, চুলে ব্রাশ চালিয়ে পরিপাট্য ফিরিয়ে আনে। আরাম করে বসে ক্লান্তি দূর করে নেয়। ফেরার সময় পুরোটাই হেঁটে সারে। আরও কিছু কিছু খরচ কমিয়ে ফেলে, যার মধ্যে প্রসাধন অন্যতম। কিন্তু খরচ বেড়েছে একটা। সেটা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সেটা হচ্ছে ডিটারজেন্ট। অফিস শেষে ঘরে ফিরেই প্রতিদিন পরনের কাপড় সাবান কাচা করে ধুয়ে নেয়। নিজেও ভালো করে সাবান মেখে গোসল করে।
কোভিড-১৯ বড়ই ছোঁয়াচে। বড় তাড়াতাড়ি গলা টিপে ধরে।
ডিসেম্বরে কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়লে অফিস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
নিশাতের জীবনে প্রথম কাকতালীয় ঘটনাটি ঘটার সূচনা বলা যেতে পারে একে। ছোট বোন তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলে বারবার। কিন্তু মা কিংবা বাবা কেউই সে-রকম কিছু বলে না। বলে না কারণ সমস্যা অনেক। প্রধানত বড় হলেও নিশাতের এখনও বিয়ে হয়নি। অবিবাহিত বড় বোন ছোট বোনের বাড়িতে গেলে নানাজনে নানা প্রশ্ন করে। উপদেশের নামে কথা শোনাতে ছাড়ে না। দ্বিতীয়ত; মেয়ের বাড়িতে শেষ জীবন কাটাতে হচ্ছে সে বড়ই শরমের ব্যাপার। জামাই বাবাজি মাঝে মাঝে যেন তাদের মনে করিয়ে দিতেই যাকে-তাকে বলেÑ ছোট চাকরি করি আর যাই করি, আজীবন বাপের ভিটায় হাঁটব, থাকব, খাব। এটা কম না-কি?
তো নিশাত তাই ফাঁকা প্রায় নীলক্ষেতের কর্মজীবী হোস্টেলের নিঃসঙ্গ বারান্দায় হেঁটে হেঁটে সময় পার করে। ছাদে অযতেœর গাছগুলোতে যতেœর ছোঁয়া দেয়। হোস্টেলের একঘেয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে একদিন অতিষ্ঠ লাগলে অদ্ভুতভাবে তার রাবেয়ার কথা মনে পড়ে। ওর হাসপাতালে কোভিড ইউনিটে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। ডাক্তার-নার্সরা রয়েছে বিশ্রামহীন। রাবেয়া কি এখনও তেমনি ধৈর্য আর মমতা নিয়ে রোগীর সেবা করে? এই প্রশ্নটা কেন যে মনে আসে তা জানে না নিশাত। তার খুব রাবেয়াকে দেখতে ইচ্ছে করে। এবং প্রায় তখনই বেরিয়ে পড়ে।
হাসপাতালে ঢোকায় কড়াকড়ি করা হচ্ছে। সে রাবেয়ার পরিচয় দিতে পার পেল। চারতলার নার্সিং স্টেশনে রাবেয়া তখন নেই। কতক্ষণে ফিরবে তাও কেউ বলতে পারে না। নিশাত সেখানে একটা চেয়ারে বসল। বন্ধ হোস্টেলের চেয়ে এই হাসপাতালও তার ভালো লাগছে। সে বসে বসে নার্সদের ব্যস্ত চলাচল দেখতে দেখতে ঘণ্টা তিনেক পার করে ফেলে। তারপর সে যখন চলে আসার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে তখনই সে রাবেয়াকে দেখতে পায়। মাস্ক, মাথার ক্যাপ, চোখ ঢাকা চশমায় প্রায় আড়াল পড়েছে তার চেহারা, তবু নিশাত দেখতে পায় রাবেয়ার মুখটা মলিন। হয়তো তার কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটেছে কিছুক্ষণ আগে। অথবা কোনো রোগীর কষ্ট তাকেও কষ্ট দিচ্ছে। তাই নিশাত তখনই তার সামনে না গিয়ে একটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাবেয়া ধাতস্থ হোক আগে।
কিছু পরে নিশাত যখন পা বাড়িয়েছে রাবেয়ার দিকে তখনই এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো রাবেয়ার কাছে। চোখ থেকে অবিরল পানি পড়ে মেরুন টি-শার্ট বুকের কাছে ভিজে গেছে। ফর্সা মুখ টকটকে লাল। শ্বাস পড়ছে দ্রুতগতিতে। রাবেয়ার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে হাত দুটো বুকের কাছে ধরে খুব বিনয়ের সাথে বলল, সিস্টার প্লিজ, আমার মায়ের জন্য একটা নার্সের ব্যবস্থা করে দিন, নইলে মাকেও বাঁচাতে পারব না।
বেশ নিচুগলায় বললেও ভদ্রলোকের বায়নাটা স্টেশনের অন্যরাও শুনে বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে নিজের কাজে মন দিয়েছে। রোগীর ব্যাপারে রাবেয়ার অতি সেনসেটিভনেস অন্যান্য নার্সরা ভালো চোখে দেখে না। কেউ কেউ ভড়ং বলতেও ছাড়ে না। তাই রাবেয়ার এই ঝামেলায় তারা কোনোই আগ্রহ দেখায় না।
পূর্বাপর জানে না নিশাত, তবে সে অনুমান করছে, সম্ভবত ভদ্রলোকের বাবা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে, মায়ের অবস্থাও হয়তো খারাপ। টাকা-পয়সাওয়ালা লোক, আলাদা নার্স দিয়ে মায়ের ভালো সেবা চান।
কিন্তু এ পরিস্থিতিতে আলাদা নার্স পাওয়ার কোনো উপায় নেই। হাসপাতালে চলছে ডাক্তার-নার্সের সংকট। নিয়মিত কাজের জন্যেই তাদের প্রায় ডবল ডিউটি করতে হচ্ছে মাঝে মাঝেই। রাবেয়ার অসহায়ত্তটা বুঝতে পারছে নিশাত। রাবেয়া নিশ্চল বসে আছে চেয়ারে আর তার সামনে তীব্র আকুতি নিয়ে অপেক্ষায় আছেন ভদ্রলোক। লোকটাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতেই পারে রাবেয়া। কিন্তু তার স্বভাব অনুযায়ী সে তা পারছে না। সে ভেতরে ভেতরে কষ্টে ভেঙেচুরে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা সহ্য হয় না নিশাতের। সে এগিয়ে গিয়ে ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বলার জন্যে মুখ খোলার আগে রাবেয়া তাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, নিশাত আয় তো আমার সাথে। আসুন আপনিও।
করিডোরের ফাঁকায় গিয়ে থামে রাবেয়া। তারপর সেই কাকতালীয় ঘটনাটা ঘটে। নিশাতকে কিছু জিজ্ঞেস না করে রাবেয়া ভদ্রলোকের মায়ের দেখভাল করার দায়িত্ব দেয় তাকে। গুলশানে নিজের বাড়িতেই আছেন তিনি। বৃদ্ধ এবং অসুস্থ, আর তার কারণেই তাকে হাসপাতালে আনতে চান না ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলার ছেলে। এখন বয়স্ক এবং অসুস্থ রোগী হাসপাতালে এলে করোনা সংক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তাই বাড়িতে রেখে চিকিৎসা চলছে। তাকে সঙ্গ দিতে হবে। নার্স অথবা নার্সিং ব্যাকগ্রাউন্ডের কাউকে দায়িত্বটা দিতে চান তিনি।
রাবেয়া আর নিশাত যতক্ষণ কথা বলছিল, ততক্ষণ ভদ্রলোক নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, শুধু চোখ দুটো ছিল প্রত্যাশাভরা এবং করুণ।
রাবেয়ার অনুরোধের সাথে একটা কথা মনে করিয়ে দেয়; নিশাতের নার্সিংয়ের প্রাথমিক ট্রেনিং আছে। দেশের মানুষের এই দুর্বিপাকে সেটা ব্যবহার করা উচিত এবং কর্তব্য।
নিশাত কিছু ভাবার আগেই ভদ্রলোক মৃদু এবং বিনীতভাবে প্রতি ঘণ্টায় যে পরিমাণ পারিশ্রমিকের কথা উচ্চারণ করেন, তাতে নিজের চমকে ওঠাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না নিশাত। এই সময় রাবেয়ার খোঁজ পড়লে সে দ্রুতপায়ে চলে যেতে যেতে মিনতিমাখা চোখে তার দিকে তাকায়। বিমূঢ় নিশাত কোনোমতে নিজেকে সামলে ভদ্রলোকের দিকে তাকাতে দেখে তার হাত দুটো আবার বুকের কাছে জড়ো করা। টি-শার্ট আরও বেশি ভিজে উঠেছে।
নিশাত রাজি হলে ভদ্রলোকের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। প্লিজ, ফলো মিÑ বলেই যেন উড়ে দৌড় দেন লিফটের দিকে। নিচে লিফটের বাইরে দুজন তার অপেক্ষাতে ছিল। তাদের কাছে গিয়ে বলে, সবুর, কুইক, ইনাকে বাসায় নিয়ে যাও মায়ের কাছে।
সবুর নামের লোকটা হাঁসফাঁস করে ওঠে, খালুজানের লাশ নিতে হইব না?
Ñ ওসব আমি দেখছি, তুমি ইনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আবার তাড়াতাড়ি চলে আসো এখানে।
খুব দ্রুত, তবে কনফিডেন্সের সাথে কথা বলছে লোকটা। তার মুখের রং এখন স্বাভাবিক। নিশাত তাকে কিছু বলার আগে নিজের অজান্তেই উঠে বসে কালো এলিয়েনে। ফাঁকা রাস্তায় এলিয়েন যেন রাজহাঁসের মতো অনায়াসে ভেসে চলে। নিশাত রাবেয়াকে দুবার রিং করে; কিন্তু রাবেয়া ফোন ধরে না। ততক্ষণে গাড়ি একটা বড় গেটের কাছে পৌঁছে গেছে। ড্রাইভার সবুর নিজেই গেট খুলে ভিতরে ঢোকায় গাড়ি।
সবুর নিশাতকে নিয়ে যখন একটা ঘরে এসে থামল তখন ঝটিতে নাকে যে গন্ধটা ঝাপটা মারল, তাতেই বোঝা গেল সেটা কোনো মুমূর্ষু রোগীর ঘর। কেমন মৃত্যুগন্ধমাখা নিস্তব্ধতা। তাকে সেখানে রেখে সবুর দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তেই।
সাত দিন। মাত্র সাত দিন কাজের সুযোগ পেল সে। অষ্টম দিন সকালে, যখন ছেলে এসে মায়ের অসাড় হাতটা ধরে বসে আছেন পুরো নিশ্চল হয়ে, যেন তিনিও শ্বাস নিচ্ছেন না। মা কখন চলে গেছে টেরও পাননি। বেশ কিছুক্ষণ পরে নিশাত রুটিন চেকআপে টের পায় ব্যাপারটা। সে রোগীর চোয়ালটা গজ দিয়ে বেঁধে দিলে খুব বড় করে একটা শ্বাস ফেলেন ভদ্রলোক। বিষম হাহাকার সেই শ্বাসের সাথে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে। শোকের এমন সকরুণ অথচ সংযত প্রকাশ নিশাত কখনও দেখেনি।
দৃশ্যটা তার মনে একটা ভালোলাগার অনুভব আনে। মৃত্যুর সময় সমাদরে সসম্মানে যাওয়া সকলেরই কাক্সিক্ষত। ক’জন পায়? ইনি পেলেন।
এ ক’দিন হোস্টেলে সে ফেরেনি, মানে ফেরার সুযোগ হয়নি। তার চেয়ে বলা ভালো, ফিরতে ইচ্ছেও তেমন হয়নি। অসুস্থ অসহায় মানুষটাকে ছেড়ে যেতে মন চায়নি।
সেদিন হোস্টেলে ফিরে রাবেয়াকে ফোন দিলে সে রিসিভ করে। নিশাত খবরটা দেয়। রাবেয়া খানিক চুপ করে থেকে বলে, আর একটা কাজ আছে করবে?
Ñ না। খুব ক্লান্ত, বিশ্রাম নিতে হবে আমাকে। আর উনি অবিশ্বাস্য রকমের পারিশ্রমিক দিয়েছেন। আগামী কয়েক মাস না ভাবলেও চলবে।
কিছুক্ষণ পরে তার ভেতরে কীসের এক অস্বস্তি শুরু হয়। কী যেন খোঁচাতে থাকে তার হৃদপি-। কেবলই মনে হতে থাকে, নিজের দায়িত্ব এড়াচ্ছে সে।
কয়েক ঘণ্টা পরে নিশাত রাবেয়াকে ফোন করে খোঁজ নেয় কাজটা এখনও আছে কি না?
সেদিনের পর দু-বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে কত কত নিঃসঙ্গ, অচল, রোগকাতর বৃদ্ধার পাশে দিন-রাত পার করেছে তার কোনো হিসাব নেই। কোভিড নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অফিস পুরোদমে শুরু হয়েছে। কিন্তু নিশাতের আর এক্সিকিউটিভ হওয়ার দৌড়ে যোগ দিতে ইচ্ছে করেনি।
এই শহরের ইচ্ছেকৃত বা অপারগতায় অবহেলিত মুমূর্ষু মানুষের পাশে থাকা নিয়তির মতো টানে তাকে। রাবেয়া একদিন তাকে বলে, তোমার খুব পরিবর্তন হয়েছে। তোমাকে দেখলে মাদার তেরেসার কথা মনে হয়।
নিজের পরিবর্তন নিশাত নিজেও টের পায়। মাদার তেরেসা নিশ্চয়ই নয়, তবু মমতার একটা গাছ তার বেশ ভেতর পর্যন্ত শেকড় ছড়িয়েছে। আর প্রতিদিন তার প্রসার হচ্ছে।
শুধু কখনও কখনও মনে হয়, সেই ডিসেম্বরে সে করোনার ভয় না করে রাবেয়ার সঙ্গে দেখা করতে না গেলে, কিংবা রাবেয়ার জন্যে অতটা সময় অপেক্ষা না করলে, কিংবা তখন কিছুক্ষণ আগে বাবা হারানো লোকটা অমন নাছোড়বান্দার মতো রাবেয়ার পিছু পিছু ছুটে না এলে নিশাত হয়তো কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে বড় কর্মকর্তা হতো। আসলে তাই কি হতো?
সবটাই কি কাকতালীয়? না-কি তার ভেতরেই ছিল তাড়না, তা জানে না নিশাত। নিশাত আরও জানে না তাকে দেখে কারও মনে হয় কি না মমতার মায়াবী এক চাদর তার গায়েও জড়িয়ে আছে।

লেখক : কথাশিল্পী

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য