Saturday, July 13, 2024

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু

সৈয়দ হাসান ইমাম : বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা। একটি রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে। আমার নানা আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৭৪) ছিলেন যুক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছাত্রনেতা, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়েন। আমি তখন বর্ধমানে আমার নানাবাড়িতে থাকতাম। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় বন্ধু-দল ছিল। তারা ‘মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ’ করতেন। তার মধ্যে বরিশালের নুরুদ্দীন ভাই, বর্ধমানের নূর আলম ভাই, ঢাকার শামসুদ্দীন সাহেব, মোয়াজ্জেম আলী ভাই, শামসুল হকসহ (পরে যিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন) অনেকেই ছিলেন। শামসুল হক সাহেব তো থাকতেনই আমার নানাবাড়িতে। তখন তারা সবাই বর্ধমানে নানার এখানে আসতেন। কাজেও আসতেন আবার এমনি ছুটিতেও আসতেন। আমাকে লজেন্স দিতেন। তখন আমার বয়স অনেক কমÑ ওই লজেন্স খাওয়ার বয়স আর কী! সেই সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে চেনেন। ১৯৫৭ সালে বর্ধমান থেকে প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে আমি ঢাকা চলে আসি। যদিও আমার পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট; কিন্তু আমি ঢাকাতেই বসবাস শুরু করলাম। কদিনের মধ্যেই দর্শনা সুগার মিলে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে আমার চাকরি হয়ে গেল।
বর্ধমানে থাকতেই আমি গান গাইতাম। সেই অভ্যেস দেশে আসার পরেও ছিল। একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার গান শুনেছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে আমার পরবর্তী কর্মজীবনেরও একটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
বরিশালের নুরুদ্দীন ভাইয়ের বিশাল ব্যবসা ছিল ঢাকায়। তিনি বলাকা সিনেমা হলের মালিক। এছাড়াও গুলিস্তানে যেটা এখন সোনালী ব্যাংকের অফিস, সেই বাড়িরও মালিক তিনি। আবার তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগেরও এমপি। মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে করাচির পার্লামেন্টে তিনি বেশ জোরালো এক বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেটার জন্য পরে তার ওপর সামরিক শাসক আইয়ুব খান বেশ অত্যাচার করে। তার সমস্ত সম্পত্তি আইয়ুব খান ক্রোক করে নিয়ে যায়।
আমি যখন দর্শনা সুগার মিলে চাকরি করি নুরুদ্দীন ভাই তখন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নিং বডির সদস্য। আর জোনাল হেড ছিলেন রশিদ সাহেব। তিনি পরে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গর্ভনর হয়েছিলেন। টাকায় তার সই থাকত। তিনি পয দিয়ে ‘রশ্চিদ’ লিখতেন স্বাক্ষরে। তো একবার এক অনুষ্ঠানের কথা মনে আছে। দিন-তারিখ মনে নেই, তবে সেটি ছিল নুরুদ্দীন ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান। সেখানে সবাই আছেন। নুরুদ্দীন ভাইয়ের মেয়েকে গান শেখাতেন আবদুল লতিফ (১৯২৭-২০০৫)। আমরা ডাকতাম লতিফ ভাই। তিনি এক সময় কলকাতা গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। কংগ্রেস সাহিত্য সংঘে ১৬ বছর বয়স থেকে তিনি গান গাইতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানে সবাই আমাকে গান গাইতে বলেছে আর আমিও গান গেয়েছি। বঙ্গবন্ধু আমার গান শুনলেন। গান শেষ হওয়ার পর নুরুদ্দীন ভাই জিজ্ঞেস করলেনÑ ‘তুই কী করছিস?’
আমি দর্শনা সুগার মিলের চাকরির কথা বলতেই বঙ্গবন্ধু বললেনÑ ‘না, তোকে গান শিখতে হবে, তুই ঢাকায় থাকবি। এত সুন্দর গলা তুই গান শিখবি না?’
আমি জিজ্ঞেস করলামÑ ‘ঢাকায় থাকব! কিন্তু আমি চলব কীভাবে?’
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই নুরুদ্দীন ভাই তখন রশিদ সাহেবকে বললেনÑ ‘ওকে একটা চাকরি দিয়ে দেন তো।’
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের প্রাদেশিক হেড অফিস তখন সদরঘাটে। সেখানে গেলাম পরদিন। রশিদ সাহেব আমাকে একটা চাকরি দিলেন। নিয়োগপত্রে দেখি পোস্টিংয়ের জায়গায় লেখা রয়েছে ‘খুলনা’।
আমি আবার নুরুদ্দীন ভাইয়ের কাছে গেলাম। উনি আবার ফোন করে কথা বললেন রশিদ সাহেবের সঙ্গে। আমাকে আবার পাঠালেন। আমি গেলাম। রশিদ সাহেব আমার নিয়োগপত্রটি হাতে নিয়ে কলম দিয়ে ‘খুলনা’ কেটে ‘রমনা’ করে দিলেন।

দুই
পাকিস্তান আমলেই বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারার প্রেক্ষিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলন করার জন্য আমরা একটি সংগঠন করেছিলাম, যার নাম ছিল ‘মুক্তধারা’। সেই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন সিএসপি এহসান সাহেব। এহসান সাহেব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বন্ধু। বঙ্গবন্ধুর আরেক বন্ধু বর্ধমানের নুরুল আলম ছিলেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু ‘মুক্তধারা’ প্রতিষ্ঠার ক’দিন পরেই আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ জারি হওয়ায়, সংগঠনটির কার্যক্রম আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধুও জেলে চলে গেলেন, ফলে সেই কার্যক্রমও স্থগিত হয়ে যায়।
এর ক’বছর পরেই পাকিস্তানি সরকারের জুলুম-নিপীড়ন উপেক্ষা করে বাংলার মানুষ পালন করেন প্রতিবাদী রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং পরবর্তীতে ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন একটি স্বাধীনতার রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুগামী হয়। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে নানাভাবে দমন-পীড়নের চেষ্টা করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মদদে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিকামী মানুষ তখন শুরু করেন সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনটি আমাদের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে হলে এই আন্দোলনটির সার্বিক গুরুত্ব বোঝা খুব জরুরি।
তখন ঢাকার মিরপুর ছিল অবাঙালিদের ঘাঁটি। মোহাম্মদপুরে যেমন বাঙালি-অবাঙালি মিশে ছিল, মিরপুরে তেমন ছিল না। সেখানে অবাঙালিদের সংখ্যাধিক্য ছিল, দু-চারটে বাঙালি পরিবার থাকত। ফলে মিরপুরে পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের প্রকাশ ফুটে উঠত তাড়াতাড়ি। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময়েও মিরপুরের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে বাঙালিরা সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল অবাঙালিদের ভয়ে। তবে এখানে একটি কথা বলে রাখি, তখন সব অবাঙালিদেরই ‘বিহারি’ বলা হতো। এমনকি মাদ্রাজ থেকে যারা এসেছিল বা পাঞ্জাব থেকে যারা এসেছিলÑ তাদেরও বলা হতো বিহারি। অবাঙালি বলতেই মনে করা হতো বিহারি।
তখন বঙ্গবন্ধু শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সভা করছেন। আমিও তার সঙ্গে প্রতিটি সভায় যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছেন। একদিন গুলিস্তানে ট্রাকে করে একটি সমাবেশ করলেন। তখনও তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি দেওয়া হয়নি। গুলিস্তানের সেই সভা থেকেই বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মিরপুর যাবেনÑ কারণ মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে নানা খবর আসছিল। আমরাও তার সঙ্গে যাব।
বঙ্গবন্ধু সবাইকে নিয়ে মিরপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বেশ কিছু ট্রাক জোগাড় করা হলো। সামনের ট্রাকে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমিও তার সঙ্গেই ছিলাম। মিরপুরে পৌঁছে পরিস্থিতি সব সরেজমিনে দেখে সেখানেই একটি সমাবেশ করলেন বঙ্গবন্ধু।
এই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু যে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন, সেটা আমার মতে আমাদের ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য। মনে রাখতে হবে, এটা ১৯৬৪ সাল; তখনও ৬-দফা উত্থাপন করেননি বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্র-চরিত্রটি কেমন হবে, সেটি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেদিনের বক্তব্যে স্পষ্ট উঠে এসেছিল।
তিনি সমাবেশ থেকে ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ “আজ থেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিষিদ্ধ করা হলো। যে বা যারা এই দাঙ্গায় উসকানি দিবে বা অংশগ্রহণ করবে, তাদের কারও জায়গা হবে না বাংলাদেশে। তাদের চির বিতাড়িত করা হবে।”
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলোÑ বঙ্গবন্ধু যতদিন বেঁচে ছিলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়টুকু ছাড়া, আর কোনোদিন বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। ভোলাতে একটি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল পঁচাত্তরের পর।
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চে বঙ্গবন্ধু যখন ঘোষণা দিলেন অসহযোগ আন্দোলনের, তখনই ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’র পক্ষ থেকে আমরা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। কোনো শিল্পী টেলিভিশন রেডিওতে যান না। সংবাদপাঠকও যান না। পাকিস্তান সরকার রেডিও-টেলিভিশন আর চালাতে পারছিল না। রেডিও তবুও কিছু কিছু চলছিল, কেননা রেকর্ডিং সুবিধা ছিল; কিন্তু টেলিভিশনে কোনো রেকর্ডিং সুবিধা ছিল না।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালিদের অসহযোগিতার কারণে পাকিস্তানিদের পক্ষে টেলিভিশন আর চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। সিংহভাগ কলাকুশলী কাজে যোগ দেন না। তখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আধা বাংলা আর আধা উর্দু মিশানো লোকজন নিয়ে এসে তাদের দিয়ে ঘোষণা দেয়াচ্ছিল পাকিস্তান সরকার। তাদের এই চেষ্টা আরও হাস্যকর হয়েছিল। এই কাজের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ বুঝতে পারছিল, বাঙালিরা তাদের সঙ্গে আর নেই। আর বাঙালিরা না থাকলে টেলিভিশন ঘোষণাও হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়। এই অবস্থায় পাকিস্তান সরকার খুব বিপদে পড়ল।
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বললেনÑ ‘বেতার চলবে, টেলিভিশন চলবে’।
ওইদিনই বিকেলে আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম তার ৩২ নম্বরের বাড়িতে। আমি, ওয়াহিদুল হক, আতিকুল ইসলাম এবং গোলাম মুস্তাফা। আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম করণীয় সম্বন্ধে। জানালাম যে, ‘আপনি তো বললেন বেতার-টেলিভিশন সবকিছু চলবে। এখন আমরা কি সেখানে যোগ দেবো?’ তখন সবকিছুই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলছিল। তিনি যা বলেছেন বাঙালি তাই করেছে। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ কেউ শুনে না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চূড়ান্ত। আমাদের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘যদি তোদের কথামতো চলে তাহলে যোগ দিবি, না হলে যোগ দিবি না।’
এই কথা বলে তিনি জহুরুল হক সাহেব বলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক সচিব ছিলেন, তাকে ফোন করে বললেনÑ ‘আমার ছেলেরা যাচ্ছে, তাঁদের কথামতো যদি বেতার টেলিভিশন চালাতে সম্মত হন, তাহলে এগুলো অসহযোগের আওতামুক্ত থাকবে, না হলে অসহযোগ চলবে।’ আমরা বঙ্গবন্ধুর কথামতো ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে ২০ নম্বরে (যেখানে জহুরুল হক সাহেব থাকতেন) গেলাম। তিনি আমাদের কথা শুনে রাওয়ালপিন্ডির সঙ্গে কথা বললেন ঘরের ভিতরে গিয়ে। ফিরে এসে আমাদের বললেন, ‘ঠিক আছে আপনাদের হাতে বেতার টেলিভিশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারি, যদি আপনারা দুটো শর্ত মানেন।’
আমরা জানতে চাইলাম শর্ত দুটো। তিনি জানালেনÑ ‘এক. পাকিস্তানের অখ-তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না। দুই. পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না।’ আমরা তখন ওখান থেকে উনার টেলিফোন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে জানালাম শর্তগুলোর কথা। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেনÑ শর্ত দুটো মেনে যেন আমরা টেলিভিশন আর বেতার দখল করি।
এ ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। তবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কেননা ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে তার বেতার-টেলিভিশন আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনতার আন্দোলনের জোরে।
এরপর আমরা ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’-এর পক্ষ থেকে টেলিভিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেই মুস্তাফা মনোয়ারকে প্রধান করে। অন্যদিকে রেডিওতে আশরাফুজ্জামান সাহেবকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি করে দেওয়া হয়।
এই দুই কমিটি ৮ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসাধারণ সব অনুষ্ঠান করেছে। সেই অনুষ্ঠানগুলোর কথা সে-সময়ের মানুষদের হয়তো মনে আছে।

তিন
মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আমি আর অভিনয়ই করিনি। তখন আমাদের মূল কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন দেশটাকে গড়ে তোলার। মুক্তিযুদ্ধের সময়েই জহির রায়হান, আমি ও আলমগীর কবীরÑ আমরা তিনজন বসে একটি খসড়া করেছিলাম চলচ্চিত্র শিল্পকে সরকারিকরণের প্রসঙ্গে। এমনটি ভেবেছিলাম কেননা আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠিত হবে। চলচ্চিত্রশিল্পকে আমরা সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যবহার করেছিল ১৯২০-এর দশক থেকে। সের্গেই আইজেনস্টাইন, পুদভকিন বা আন্দ্রেই তার্কভস্কির যে চলচ্চিত্র-দর্শন ছিল, আমরা সেটাকে নিয়ে নবগঠিত বাংলায় কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম।
মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘কী করতে চাস?’
আমি বললাম, ‘এখানে ‘পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিল’-এর যে মাঠটি আছে, সেখানে যদি কোনো কিছু করা যায়।’
তিনি তখন আমাকে ইউসুফ আলী সাহেবের কাছে যেতে বললেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও তাকে টেলিফোন করে সব বলে দিলেন। ইউসুফ আলী সাহেব তখন সংস্কৃতি ও শিক্ষামন্ত্রী। আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো ইউসুফ আলী সাহেবের কাছে গেলাম। তাকে আমার পরিকল্পনাটি জানালাম। আমরা এমন একটি সংগঠন গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, যেটির শাখা থাকবে সারাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে বাঙালিকে অবহিত করা এবং পাকিস্তানের যে অপপ্রচার সেগুলো থেকে বাঙালির মনন ও বোধকে পরিশীলিত করা। যে আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তাকে মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার শৈল্পিক ও রাজনৈতিক প্রয়াসে তৈরি হবে সংগঠনটি। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলাম আমরা। তখন রাতের পর রাত জেগে থেকে শিল্পকলা একাডেমির সমস্ত কাগজপত্রগুলো তৈরি করেছিলাম আমি নিজ হাতে। সে-সময়ে আমাদের নুরুল্লাহ ভাই (পুরো নাম : এসএম নুরুল্লাহ) যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। ওয়াটার বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি খুব নাটক দেখতেন। তার ইচ্ছে ছিল প্রকৌশল পেশা ছেড়ে দিয়ে শিল্পকলায় যুক্ত হবেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেটা আর সম্ভব হয়নি। তিনি অকালে প্রয়াত হন।
সংস্কৃতির মাধ্যমে যে রাজনৈতিক মনন গঠন করা যায়, তা স্পষ্টভাবে বুঝতেন আমাদের জাতির পিতা। এ-কারণেই তিনি সব সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রেখেছিলেন। শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর যে দর্শন কাজ করেছিল, তা আজকের দিনে নতুন প্রজন্মের জন্য অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। তার নির্দেশমতোই আমরা শিল্পকলা একাডেমি গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল নরঘাতকরা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলো ঠিকই; কিন্তু জিয়াউর রহমান একে পাকিস্তানি কায়দায় পাকিস্তানি শাসকদের মতোই ব্যবহার করেছেন।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট ষড়যন্ত্রমূলক যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সে-সময়কার একটি ঘটনা আমার মনে আছে। পরম্পরা বিবেচনা করলে ঘটনাটির একটি গুরুত্ব আছে। বঙ্গবন্ধুর তহবিলে দেওয়ার জন্য আমরা টাকা তুলেছিলাম ‘চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলাকুশলী সমিতি’র পক্ষ থেকে। প্রায় ৫ লাখ টাকা। সেই টাকা আমরা বঙ্গবন্ধুর হাতে দিতে গিয়েছিলাম। রহিমা খালা বঙ্গবন্ধুর হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। সে-সময় খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে। কারণ সে তখন বাণিজ্যমন্ত্রী। হঠাৎ বঙ্গবন্ধু মোশতাকের টুপিটা খুলে বলেছিলেন, “এই আমার বাণিজ্যমন্ত্রী। তার মাথায় অনেক বদ বুদ্ধি আছে।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রেক্ষাপটটি যখন চিন্তা করি, তখন এই দৃশ্যটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর যে প্রজ্ঞা, যে বিচক্ষণতা তা আজকের প্রজন্মের জন্য পাঠ্যসূচি হওয়া উচিত।

লেখক : সংস্কৃতিকর্মী, অভিনেতা ও আবৃত্তিকার

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য