Monday, April 15, 2024
বাড়িউত্তরণ-২০২১একাদশ বর্ষ,পঞ্চম সংখ্যা,এপ্রিল-২০২১স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Care-UHC)

স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Care-UHC)

অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান

গত সংখ্যার পর

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (Primary Health Care) : প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্যসেবা এ দুটো UHC-এর মূল ভিত্তি। ১৯৭৮ সালে কাজাখাস্তানের আলমা-আতা শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য গৃহীত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF) সম্মিলিতভাবে এই সম্মেলন আয়োজন করে।
তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীদের দ্বারা সবার জন্য অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, যা সেদেশের সরকার ব্যবস্থা করতে পারেÑ অনেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বলতে এটাই মনে করেন। কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উপাদানগুলো আরও বিস্তৃত। যে সমস্ত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত তা হলো : (১) সমাজের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন (২) প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব কমানো (৩) শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো (৪) বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীতে সেবার প্রসার (৫) পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি (৬) প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রযুক্তির প্রাপ্যতা (৭) সমতার নিশ্চয়তা : লিঙ্গ, বয়স, বর্ণ, ধর্ম, সার্বিক সংগতি নির্বিশেষে সবাইকে সেবা দেওয়া (৮) স্বাস্থ্য ছাড়া সমাজের অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখা (৯) সঠিক অনুপাতে স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা (১০) সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি (১১) পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি (১২) পানি ও খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান।
WHO কয়েকটি নীতিমালা নির্ধারণ করে : (১) সামাজিক অসাম্য কমানো (২) জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা (৩) নিয়মনীতি পরিবর্তন করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের প্রয়োজনকে স্থান দেওয়া (৪) সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নীতি-নির্ধারণ করা (৫) অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কার্যক্রম চালান।
নীতিমালা ও কার্যক্রমের লক্ষ্য যথেষ্ট বিস্তৃত। অনেক দেশ কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এগিয়েছে ও তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত সেবাগুলো সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অসমতা দূর করা সবারই লক্ষ্য ছিল। সেবাগুলোর মধ্যে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ ও টিকাদান, মা ও শিশুর সেবা, শিশুদের মাতৃদুগ্ধপানে উৎসাহ দেওয়া সব দেশেই অগ্রাধিকার পেয়েছে। পরবর্তীতে মেয়েদের শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যগুলো সঠিক ছিল ও বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্য সূচকের উন্নতির জন্য সমতা নিয়ে আসা ও অন্যান্য খাতের (যেমন- শিক্ষা, পরিবেশ, অর্থনীতি ইত্যাদি) উন্নতি অপরিহার্য। UHC অর্জন করার জন্য প্রয়োজন সমাজের নিম্ন পর্যায় থেকে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা UHC কীভাবে চলছে
১৮৮৩ সালে জার্মানিতে Sickness Insurance Law খধি ছিল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রথম প্রচেষ্টা। শ্রমিকদের বেতনের একাংশ ও কারখানার মালিকদের অনুদান নিয়ে তহবিল তৈরি করার বিধান হলো। অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসাও এই তহবিল থেকে করা হতো। অন্যান্য দেশও এটা অনুসরণ করল। ১৯১১ সালে যুক্তরাজ্য National Insurance Act-এর মাধ্যমে বেতনভোগী কর্মচারীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করে; কিন্তু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বা হাসপাতালে চিকিৎসা করার অর্থ দেওয়া হতো না। ১৯১২ সালে রাশিয়ান সাম্রাজ্যেও এ ধরনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩০-এর দশক নাগাদ পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এবং জাপানে একই ধরনের ব্যবস্থার প্রচলন হয়। ১৯১৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়; কিন্তু প্রথম দিকে এটা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উন্নত দেশগুলোতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত হলো। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্যে National Health Service চালু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে সুইডেন (১৯৫৫), আইসল্যান্ড (১৯৫৬), নরওয়ে (১৯৫৬), ডেনমার্ক (১৯৬১), ফিনল্যান্ড (১৯৬৪), হল্যান্ড (১৯৬১), কানাডা (১৯৬২-৭২) সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৭৫ সালে শুরু হয়। পূর্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত করে দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের সব দেশেই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়। এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৮৯), তাইওয়ান (১৯৯৫), ইসরায়েল (১৯৯৫) ও থাইল্যান্ড (২০০১) UHC সালে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে রাশিয়া ও অন্যান্য সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চলতে থাকে। ২০১১ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার দেশ গণচীনে UHC চালু করা হয়।
যুক্তরাজ্য : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্যের ৪টি অঙ্গরাজ্যে (ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড) ঘধঃরড়হধষ ঐবধষঃয ঝবৎারপব-ঘঐঝ চালু করা হয়। এটা National Health Service-NHS সব খরচ সরকার দেয়। সামান্য কয়েকটা বিষয় ছাড়া (কিছু চক্ষু ও দন্ত চিকিৎসা) প্রাথমিক চিকিৎসার কেন্দ্রে, হাসপাতালে কাউকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। ওষুধের জন্য সামান্য অর্থ দিতে হয়। সরকার করের টাকা থেকে এই অর্থ ব্যয় করে। আলাদা কোনো কর দিতে হয় না। ২০১৩-১৪ সালে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল ১১০ বিলিয়ন পাউন্ড, যার বেশিরভাগই NHS-এর জন্য খরচ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ঘঐঝ-এর খরচ মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি’র এউচ) ৯.৮ শতাংশ ছিল। এটা ডলারের হিসাবে মাথাপিছু ৪,০৬৯ ডলার।
NHS-এর নীতিমালা হলো- (১) প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন মেটাতে হবে (২) এ জন্য সেবা নেওয়ার সময় কোনো অর্থ দিতে হবে না (৩) সেবা নির্ভর করবে রোগীর প্রয়োজনের ওপর, তার আর্থিক সক্ষমতার ওপর নয়। ২০০০ সালে কিছু নতুন নীতিমালা যোগ করা হয় : (১) সমন্বিত সেবা দিতে হবে (২) রোগীর ও তার পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হবে (৩) স্বাস্থ্য কর্মীদের মূল্যায়ন ও সমর্থন দিতে হবে (৪) মান উন্নয়নে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে (৫) অসমতা দূর করার চেষ্টা করতে হবে (৬) গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
ইংল্যান্ডে প্রাথমিক পর্যায়ে ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক Clinical Commissioning Group আছে। সাধারণ বা প্রাথমিক চিকিৎসকেরা (GP)-এর আওতায় কাজ করে। রোগীরা চিকিৎসার জন্য প্রথমে তার এলাকার জিপি’র কাছে যায়। যেসব রোগের চিকিৎসা জিপি’রা করতে পারে, তা তারা দিয়ে দেন। অন্যান্য রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠান হয়। বিশেষজ্ঞরা হাসপাতালে কাজ করেন। হাসপাতালগুলো চালায় NHS Trust  বা  NHS Foundation Trust এগুলোর অনেকটা স্বায়ত্তশাসন আছে; কিন্তু অর্থায়ন করে সরকার। এক একটা ট্রাস্ট কয়েকটা হাসপাতাল চালায়।
মার্চ ২০১৭ নাগাদ ইংল্যান্ডের NHS-এর স্বাস্থ্যকর্মীর মোট সংখ্যা ছিল ১১,৮৭,০০০, চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ১,১৩,০০০ ও নার্সের সংখ্যা ছিল ৩,১৯,০০০। প্রায় ৩৪ হাজার নার্স ও ধাত্রীর পদ খালি ছিল। ২০১৬-১৭ সালে ৫৬ হাজার ৪৩৫ জন স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর আক্রমণ রেকর্ড করা হয়। স্বাস্থ্যকর্মী স্বল্পতার জন্য রোগী সেবা দিতে দেরি হওয়া এর মূল কারণ। প্রায় সব চিকিৎসক ও নার্স NHS হাসপাতালগুলোতে কাজ করেন ও সরকারি বেতনভোগী। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়, সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল, রয়েল কলেজসমূহ। মান নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা Quality Commission করে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে তুলনামূলক একটা জরিপ ২০১০ সালে করা হয়। এতে জার্মানি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে যুক্তরাজ্য স্থান পায়। ২০০৪ সালে জনমত জরিপে ৮৫ শতাংশের ওপরে সাধারণ মানুষ হাসপাতাল ও প্রাথমিক সেবার মান সন্তোষজনক বলে।
জার্মানি : জার্মানির স্বাস্থ্যসেবা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও পৃথিবীর গুণগত মানসম্পন্ন ভালো স্বাস্থ্যসেবাগুলোর অন্যতম। জার্মানিতে বসবাসরত সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা বাধ্যতামূলক। যারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তাদের বেতনের ৭.৩ শতাংশ বীমার জন্য দিতে হয়। সমান অংশ অর্থাৎ আরও ৭.৩ শতাংশ দেন তার চাকরিদাতা। মোট তার বেতনের ১৪.৬ শতাংশ স্বাস্থ্য বীমায় যায়। বীমা করার জন্য ১০০-এরও অধিক Gesetzliche Krankenversicherung বা তহবিল আছে। এগুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও সরকার নিয়ন্ত্রিত। এগুলোর নিয়মকানুন প্রায় একই। বেশিরভাগ মানুষ কোনো একটা তহবিলে বীমা করে। যারা চাকরি করে না (Self Employed) অর্থাৎ ব্যবসা করে বা পেশায় যুক্ত তাদের ১৪.৬ শতাংশ পুরোটাই দিতে হয়। তবে যারা শিল্পী, সাহিত্যিক তাদের অর্ধেকটা সরকার দেয়। যারা উচ্চ আয়ের মানুষ (বার্ষিক আয় ৬০ হাজার ইউরোর বেশি) তারা বেসরকারি বীমা করতে পারেন। বেসরকারি বীমা করেন ১০ শতাংশের মতো মানুষ। বীমায় তার পরিবার অন্তর্ভুক্ত। বীমার পরিমাণ যা-ই হোক না কেন চিকিৎসা একই, তবে বেসরকারি বীমাকারীরা কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পায়। ২০১৮ সালে মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ১১.২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় খরচ হয়, মাথাপিছু বছরে ৫,৯৮৬ ডলার। ফেডারেল জয়েন্ট কমিশন নামে একটা সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণ করে ও নীতিমালা নির্ধারণ করে। এই কমিশন সরকার, বীমা তহবিল, হাসপাতাল, চিকিৎসক ও রোগীদের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত। সাধারণ রোগের চিকিৎসা জিপি’রা (GP) করেন। তারা বীমা তহবিল থেকে অর্থ পান। বেশিরভাগ হাসপাতালই স্বায়ত্তশাসিত ও অলাভজনক। তারাও সেবার জন্য সরকারের কাছ থেকে অর্থ পায়।
ফ্রান্স : ফ্রান্সের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশই সরকারের অর্থে। ২০০৮ সালে WHO ফ্রান্সের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যসেবাগুলোর অন্যতম বলে। স্বাস্থ্য বীমা বাধ্যতামূলক। বীমা তহবিল ৩টি- এর মধ্যে একটা ৮৪ শতাংশ জনসংখ্যার বীমা করে, অন্য দুটি মিলে ১২ শতাংশ। বীমার টাকা বেতন থেকে ৫.২৫ শতাংশ হারে কেটে নেওয়া হয়। বীমা তহবিলগুলো অলাভজনক। রোগী প্রায় সব সেবার জন্য ফি দেয়; কিন্তু সরকার তার ৭০ শতাংশ ফেরত দেয়। জটিল বা কঠিন রোগ ও দরিদ্র মানুষের পুরোটাই ফেরত দেওয়া হয়। অন্যেরা অলাভজনক বীমা কোম্পানিতে সম্পূরক বীমা করে, বাকিটা ফেরত পায়। সরকার ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ওষুধ সরবরাহ ও দাম নিয়ে দর কষাকষি করে চুক্তি করে। একইভাবে চিকিৎসকদের সংগঠনের সঙ্গে ফি নিয়ে চুক্তি হয়। বীমা তহবিলগুলোকেও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার ৬২ শতাংশ হাসপাতালের মালিক ও পরিচালনা করে। প্রায় ১৪ শতাংশের মালিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও আরও ২৪ শতাংশের মালিক বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয় প্রায় ২৩ হাজার জিপি (GP) (প্রতি ২৫,০০০ জনসংখ্যায় একজন)। কোনো কোনো জিপি একাই তার প্রাকটিস চালায়, আবার কিছু জিপি গ্রুপ করে চালায়। প্রয়োজনে তারা বিশেষজ্ঞের কাছে বা হাসপাতালে রেফার (Refer) করে। বিশেষজ্ঞদের নিজেদের প্রাকটিস ( Practice) আছে; কিন্তু অনেকেই শুধু হাসপাতালে কাজ করেন। একটা সরকারি সংস্থা (The National Agency for Accreditation and Health Care Evaluation) চিকিৎসার গাইডলাইন তৈরি করে দেয়। মোট জাতীয় আয়ের ১১.২ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে খরচ হয়, মাথাপিছু বার্ষিক খরচ ৪,৯৬৫ ডলার।
থাইল্যান্ড : স্বাস্থ্যসেবার ঐতিহ্য থাইল্যান্ডে অনেক দিনের। ১১৮২ সালে রাজা সপ্তম জয়বর্ধন ১০২টি হাসপাতাল স্থাপন করেন। চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্তও রাজারা স্বাস্থ্যসেবার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ সময় রাজারাই দেশের বিভিন্ন স্থানে দেশীয় ওষুধের দোকান খোলার ব্যবস্থা করেন। একই সময় থাই ফার্মাকোপিডিয়া তৈরি করা হয়; এতে প্রায় ৭০০টি ওষুধের প্রস্তুত প্রণালি ছিল। পশ্চিমা স্বাস্থ্যসেবা প্রথমে থাইল্যান্ডে নিয়ে আসে পর্তুগিজরা। রাজা তৃতীয় রাম-এর শাসনামলে আমেরিকান ডাক্তার ড্যান ব্রাডলি থাইল্যান্ডে আসেন। তিনি গুটি বসন্তের টিকাদান চালু করেন ও পশ্চিমা স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটান। রাজা চতুর্থ রাম (চুলালংকর্ন) সিরিরাজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
বিগত শতাব্দীর শেষের চার দশক ধরে পরপর ৯টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার অবকাঠামো গড়ে তোলে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সামাজিক, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসকদের নেতা ও প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সংকল্প ছিল। থাইল্যান্ডে ৭৫টি প্রদেশ আছে। প্রদেশগুলো ৮৭৮টি জেলায় বিভক্ত। জেলাগুলো আরও ছোট এককে বিভক্ত। প্রথম থেকে তৃতীয় পাঁচশালা পরিকল্পনা পর্যন্ত প্রাদেশিক হাসপাতাল তৈরি করা হয়। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ পাঁচশালা পরিকল্পনা পর্যন্ত ১০ থেকে ৬০ শয্যার জেলা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। ১৯৭০ সালে গ্রহণ করা হয় জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। ১৯৭৭ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়। ১৯৯২ সালে Health Systems Research Institute Act-এর মাধ্যমে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। এখানে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু করার ব্যাপারে তথ্যাদি নিয়ে গবেষণা করে সুপারিশ তৈরি করা হয়। ১৯৯০ সালের মধ্যেই কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেমন- বিনামূল্যে প্রসূতিসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদানÑ এগুলো প্রায় সারাদেশে শুরু করা হয়। (চলবে)

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, গ্যাস্ট্রএনটারোলজি ও উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য