Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderস্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী বাংলাদেশের অর্জন

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী বাংলাদেশের অর্জন

জাতীয় মুক্তির জন্য সংগ্রাম কেটে জাতীয় ‘স্বাধীনতার’ জন্য যুদ্ধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিস্থাপন করেছিল

নূহ-উল-আলম লেনিন

বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর অর্ধশতাব্দী পেরুতে চলল। অর্ধশতাব্দীর ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়ে দেশটির এখন বিশ্বপরিসরে হতদরিদ্র স্বল্পোন্নত দেশের তকমা ছুড়ে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটতে চলেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রসহ গত ৫০ বছরের অর্জন নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। অবশ্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা না হলে, এসব অর্জন আরও দুই দশক আগেই সম্ভব ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ফলে, সর্বোপরি ১৯৭৫-১৯৯৬ এই ২১ বছর এবং ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আট বছর, সাকুল্যে ২৯টি বছর বাঙালির জীবন থেকে অপচয় হয়ে গেছে। সামরিক ও বেসামরিক দুঃশাসনের ফলে এই ২৯ বছর বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা সূচিত উন্নয়নের ধারা প্রবলভাবে ব্যাহত হয়। দেশ ঠাঁয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল না বটে, কিছুই অর্জন হয়নি এমনটিও নয়, তবে প্রত্যাশিত ও সম্ভাব্য উন্নয়ন হয়নি। সে-জন্যই ‘অপচয়ের’ কথা বলেছি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে পড়েছে এবং পশ্চাদগামী হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অর্ধশতাব্দীর কিছু অর্জনের কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা চিত্র তুলে ধরছি।
রাজনৈতিক অর্জন ও বিসর্জন
জনগণের বীরোচিত সশস্ত্র যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিংশ শতকের বৈশ্বিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে একাধিক ফ্রন্টে পুনর্গঠন এবং নবনির্মাণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাষ্ট্র কোনো বায়বীয় ধারণামাত্র নয়। নবজাত বাংলাদেশের একটি টেকসই রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক আইন প্রণয়ন যেমন জরুরি ছিল, তেমনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পুনর্বাসন, পুনর্গঠন এবং নবনির্মাণের কাজটিও জরুরি ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব প্রথম দুটি কাজ অর্থাৎ নতুন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা এবং পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ মাত্র দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালের মধ্যে (ক) কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোসহ সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাঠামো গড়ে তুলতে হয়েছে। গড়তে হয়েছে রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ (অর্থাৎ সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা; যথাÑ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রভৃতি। (খ) মাত্র এক বছরের মাথায় প্রণয়ন করা হয়েছে একটি সর্বাধুনিক সংবিধান এবং পরবর্তী এক বছরের মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যথা জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং স্বাধীন তথ্যপ্রবাহের (সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম) নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের বড় অর্জন হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই আমাদের দেশকে বৃহৎ শক্তি (একমাত্র চীন ছাড়া)-সমূহ স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। দ্বিতীয়ত; জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন, ওআইসি এবং কমনওয়েলথ স্বীকৃতি অর্জন করে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকেরও সদস্যপদ লাভ করে। পরবর্তীকালে চীন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ অবশিষ্ট দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং চীন ও সৌদি প্রভৃতি দেশ বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে অবস্থান নেয়। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার শাসনামলে সম্ভব না হলেও শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সাথে বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হয়।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ভারতের সাথে ছিটমহল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন সমস্যার সমাধান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যারও সমাধান হয়।
গত অর্ধশতাব্দীতে আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় কলঙ্কময় অধ্যায় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকা-। কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকা-। এই ট্র্যাজেডি বা পরাজয় কেবল ব্যক্তি হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর খুনিচক্র ও সামরিক শাসকরা কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য ইনডেমনিটি দিয়েই ক্ষ্যান্ত থাকেনি, অথবা বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণই নিষিদ্ধ করেনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জন ও গৌরব পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। খুনি মোশতাক ও সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পাল্টে দেয়। সংবিধানে আল্লাহু আকবর সংযোজন, জাতীয় মুক্তির জন্য সংগ্রাম কেটে জাতীয় ‘স্বাধীনতার’ জন্য যুদ্ধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিস্থাপন করেছিল। এছাড়া সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা পরিবর্তন, সংবিধানে ৩৮ ও ১২ অনুচ্ছেদ যেখানে ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তা উঠিয়ে দেওয়া এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ এবং সকল যুদ্ধাপরাধী বা অভিযুক্ত রাজাকার-আলবদরদের মুক্তি দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। অপর সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংযোজন করেন। এসবের ফলে বাংলাদেশের সংবিধানের যেমন তেমনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্থান দখল করেছিল ধর্ম-সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবধারা।
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বকীয়তা হারিয়েছিল ও দলীয় প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিরাজনীতিকরণ ও দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত দলীয়করণ বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। হিংসাশ্রয়ী মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে উঠেছিল; যার জন্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কালো তালিকাভুক্ত হতে হয়েছিল। হত্যা, সন্ত্রাস, গুম, অস্ত্র চোরাচালানী নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায়Ñ মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অর্থহীন করে তুলেছিল। সাম্প্রদায়িক হিংসাশ্রয়ী ঘটনা ও জননিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছিল। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ উপর্যুপরী সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ছিল। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। সৌভাগ্যের বিষয় এই প্রপঞ্চগুলোর হয় অবসান অথবা দুর্বল করা সম্ভব হয়েছে। প্রথমত; আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য ফিরে পেয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে ন্যস্ত হওয়ার পর একে একে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার পুরনো চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ফিরে পেতে শুরু করেছে। ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর পর আমাদের সংবিধান ’৭২-এর ধারায় পুনস্থাপিত হয়েছে। যদিও কয়েকটি জায়গায় আপস ও সমঝোতা করতে হয়েছে। যেমনÑ সংবিধানে আল্লাহু আকবর ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল আছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বৈধতা বহাল আছে। তবুও সামগ্রিক বিচারে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে ’৭২-এর সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং অপরাধীদের কয়েকজনের প্রাণদ- কার্যকর হয়েছে। ইনডেমনিটি আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন ও তাদের দ- কার্যকর করা হয়েছে। রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়েছে। সেনাবাহিনীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী পেশাদারিত্ব।
গণমাধ্যম স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তবে দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চাকে বিঘিœত ও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও এখতিয়ার সংবিধান দ্বারা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। দেশে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে জাতীয় সংসদের নির্বাচন নিয়মিত হচ্ছে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে হালনাগাদ ভোটার সংখ্যা পুরুষ ৫,২৫,৪৭,৩২৯ জন, নারী ৪,১৬,৪৩,১৫১ জন, মোট ১০,৪১,৯০,৪৮০ জন ছিল। নির্বাচন কমিশনের দাবি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৩৯টি। বিভিন্ন দলের প্রার্থী সংখ্যা ১,৮৪৮, আর স্বতন্ত্র ১২৮, বাংলাদেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নামÑ
কাগজে কলমে ৪১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকলেও ২৮টি রাজনৈতিক দল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টিতে। ৪৯২টি উপজেলা, ৬৪টি জেলা ও ৩২৮টি পৌরসভায় নির্বাচিত স্থানীয় সরকার রয়েছে। এছাড়া তৃণমূলে ৪ হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কালো তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সরকারের জিরো টলারেন্সের ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে না। তবে এই আশঙ্কা একটি স্থায়ী প্রপঞ্চ হিসেবে বিদ্যমান আছে।
ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। বিশেষত জামাত প্রভৃতি মৌলবাদী দল ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম প্রভৃতি দৃশ্যত রাজনৈতিক দল বহির্ভূত মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো অধিকতর বিপজ্জনক শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামনে অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে সর্বব্যাপী দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন।
একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে। সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র-বিরোধী শক্তি যদি জাতীয় জীবনের ২১টি বছর নস্যাৎ না করত, তাহলে এসব ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়ভাবে এগিয়ে যেত। গত দুই দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে এদেশে শিক্ষার বিস্তার দ্রুত হয়েছে। আমরা কয়েকটি সারণিতে এই অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছি-

 

শিক্ষার বিস্তার ও মানোন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের বই দেওয়ার প্রচলন করেন। অতীতে বই কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। সর্বশেষ ২০২১ শিক্ষাবর্ষে ৩৫ কোটি ৩১ লাখ বই বিভিন্ন স্তরের প্রায় সোয়া ৪ কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে দরিদ্র-মেধাবী বিশেষত মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে অর্জন
স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই দুর্বল। ১৯৭২ সালে সব জেলায় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ছিল না, এমনকি দেশে সর্বসাকুল্যে হাসপাতাল ছিল মাত্র ৬৭টির মতো। সেখানে যেমন ডাক্তার-নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব ছিল, তেমন সার্বিক অবকাঠামো ছিল খুবই নড়বড়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন প্রতি জেলায় একটি করে জেলা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। থানা হেলথ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রায় প্রতিটি থানায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করেন।
১৯৭২ সালে প্রণীত দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭২-১৯৭৮) প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭৬ সালে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (যা বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নামে পরিচিত) বিদ্যমান শয্যা সংখ্যা ৩১-এ উন্নীত করা হয় এবং প্রতি থানায় একটি করে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্য স্থির করা।
একই সময়ে চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতালকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পরিণত করেন এবং প্রথম ব্যাচেই ১৫০ শিক্ষার্থীর ভর্তি নিশ্চিত করেন। তখন সদ্য স্বাধীন দেশের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহ থাকলেও পাস করার পর তাদের চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না। নবীন চিকিৎসকদের জন্য এমবিবিএস পাসের পরপরই তিনি সর্বপ্রথম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং বা ইন্টার্নশিপ নামক বৈতনিক প্রশিক্ষণ চালু করেন।
তৎকালে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের এমবিবিএস-পরবর্তী উচ্চশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন বা বিদেশের অন্য কোনো দেশে যেতে হতো। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সে-সুযোগও বন্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধু দেশেই উচ্চ প্রশিক্ষিত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তৎকালীন শাহবাগ হোটেলকে ‘আইপিজিএম অ্যান্ড আর’-এ রূপান্তর করেন। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে পূর্ণাঙ্গ এবং দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে।
বিগত ৫০ বছরে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং মাতৃমৃত্যু হার, নবজাতক মৃত্যুর হার এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমানোসহ আরও অনেক স্বাস্থ্য সূচক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪২ বছর, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৭৩ বছর। ১৯৯০ সালে প্রতি হাজারে ১৪৬ জন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারা যেত, যা কমে বর্তমানে (২০১৭) ৩২ দশমিক ৪০ জন হয়েছে। ইনফান্ট মরটালিটি রেট ১৯৯০ সালে ছিল ৯২, যা কমে ২০১৭ সালে হয়েছে ২৬ দশমিক ৯০। আর নবজাতক মৃত্যুর হার ছিল ৬৪ দশমিক ১০, যা কমে ২০১৭ সালে হয়েছে ১৮ দশমিক ১০। অন্যদিকে ১৯৯০ সালে প্রতি লাখে যেখানে ৫৭৪ জন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেত, সেখানে ২০১৫ সালে মাতৃমৃত্যুর হার কমে ১৭৬ হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, কালাজ্বর দূরীকরণে অসামান্য অগ্রগতি সাধন করেছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেক সফলতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে গঠিত কিশোর-কিশোরী ক্লাব, উঠান বৈঠক আমাদের গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এছাড়া বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। ১৯৯০ সালের দিকে ৫৪ শতাংশ শিশু টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছিল, যা বেড়ে ২০১৪ সালে ৮০ জন হয়েছে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সফলতার জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করেছেন। তাছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার কমাতে অসামান্য অবদান রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘টঘ গউএ অধিৎফং ২০১০’ লাভ করেছেন। এছাড়া এমডিজি-৪ (শিশুমৃত্যুর হার কমানো) এবং এমডিজি-৫ (মাতৃ স্বাস্থ্যের উন্নয়ন) অর্জন করায় বাংলাদেশ `South-South Award ‘Digital Health For Digital Development’ লাভ করেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এসব অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আমাদের সুসংগঠিত গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।

গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে অগ্রগতি
১৮৯১ সালের ১১ মার্চ কলকাতায় ইমপেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ইমপেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্টই ন্যাশনাল আরকাইভস অব ইন্ডিয়া নামে পরিচিতি পায়। ১৯৫১ সালের নভেম্বরে করাচিতে ডাইরেক্টরেট অব আরকাইভস অ্যান্ড লাইব্রেরিস-এর অধীনে ন্যাশনাল আরকাইভস অব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পূর্বকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে উক্ত অফিসের শাখা অফিস হিসেবে ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের ভাড়া বাড়িতে ‘ডেলিভারী অব বুকস অ্যান্ড নিউজ পেপার শাখা’ নামে একটি অফিস চালু ছিল। জাতীয় আরকাইভসের কোনো শাখা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ সময়ে উক্ত অফিসের দায়িত্বে ছিলেন মো. আবুল হাশেম। যুদ্ধ চলাকালে সহকারী পরিচালক সাহাবুদ্দিন খান করাচি থেকে চলে এসে সেখানে যোগদান করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে তারা ১০৩ পুরাতন এলিফ্যান্ট রোডে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির দোতলায় শাখাটি স্থানান্তর করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিলসমূহসহ সরকারের স্থায়ী রেকর্ডস ও আরকাইভসসমূহ সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় সদ্য স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিভাগের অধীনে জাতীয় আরকাইভস ও জাতীয় গ্রন্থাগারের সমন্বয়ে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৪ সালের ৩ জানুয়ারি সরকার জাতীয় আরকাইভস ও জাতীয় গ্রন্থাগারের জন্য ৩২, বিচারপতি এসএম মোর্শেদ সরণি, আগারগাঁও, শেরেবাংলা নগরের বর্তমান জায়গায় ২ একর করে মোট ৪ একর জমি বরাদ্দ করে। প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনার আওতায় জাতীয় আরকাইভস ও জাতীয় গ্রন্থাগারের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব দাখিল করা হয়।
২০০১ সালের ১৪ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৬ সালে জাতীয় আরকাইভস তার নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম শুরু করে। ১৬ আগস্ট ২০১৬, সর্বশেষ ৪১টি নতুন পদ সৃষ্টির জিও জারির মাধ্যমে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করার আদেশ জারি হয়।
বাংলাদেশে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির জন্য সর্বশেষ (২০২১) ৩৫ কোটি ৩১ লাখ পাঠ্যপুস্তক ছাপা হয়েছে। কিন্তু উচ্চতর শ্রেণির জন্য কত বই ছাপা হয় তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। এছাড়া সৃজনশীল প্রকাশনা (উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনি, নাটক ও প্রবন্ধ প্রকাশেরও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে একুশের বইমেলা ও অন্যান্য বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছে। প্রতি বছরই সৃজনশীল প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ছে।

সংবাদপত্র ও সাময়িকী ক্ষেত্রে অগ্রগতি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল ১০। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি পত্রিকা মুক্ত এলাকা এবং ভারত থেকে প্রকাশিত হতো। এগুলো ছিল সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা। এর মধ্যে জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, শাশ^ত বাংলা, সোনার বাংলা, বিপ্লবী বাংলা, দ্য নেশান, মুক্ত বাংলা, দ্য পিপলস, দুর্জয় বাংলা, মুক্তি, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি। স্বাধীনতার পর প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি নতুন পত্রিকা। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে সংবাদপত্রের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্র্ধ্ব থেকে ইন্টারনেট অনলাইনে সংবাদপত্র ও সাময়িকীর প্রকাশ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সংবাদপত্র ও সাময়িকীর দেশব্যাপী সার্কুলেশন-সংক্রান্ত কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব না থাকলেও, দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইয়ার বুক ১৯৯৮-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে সারাদেশে দৈনিক সংবাদপত্রে সার্কুলেশন ছিল ২২,৩৭,৯৬০ এবং সাময়িকীর সার্কুলেশন ছিল ৯,৮৭,৮১০। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০৮ সালে সারাদেশে ৪১২টি দৈনিকসহ মোট ৭১২টি সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। পত্র-পত্রিকার ৯০ শতাংশেরও অধিক বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনা রয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি অনেক পাঠক এসব সংবাদপত্র এবং সাময়িকী পড়তে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

টেলিভিশন ও রেডিও ক্ষেত্রে অগ্রগতি
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিভিশন বিটিভি সম্প্রচার করে ১৯৬৪ সালে, যা সূচনালগ্নে পাকিস্তান টেলিভিশন (পিটিভি) নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিটিভি একচেটিয়াভাবে দেশের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচার করে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন অনুমোদন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সংখ্যা ৪৪টির মধ্যে সম্প্রচারে রয়েছে ৩৫টি। বাংলাদেশে রেডিও’র সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টি এবং ১৩টি এফএম চ্যানেল রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কমিউনিটি রেডিও।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন
১. বাংলাদেশ টেলিভিশন
২. বিটিভি ওয়ার্ল্ড
৩. সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন
৪. বিটিভি চট্টগ্রাম

বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের তালিকা
ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র নামে এদেশে সর্বপ্রথম স্বল্প পরিসরে বেতারের কার্যক্রম শুরু হয়। মূলত ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর নাজিমুদ্দীন রোডের ভাড়া করা বাড়িতে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ নামে বেতারের সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে শাহবাগস্থ কেন্দ্রে বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে এই কেন্দ্র আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ৩০ জুলাই ১৯৮৩ সালে শাহবাগস্থ সম্প্রচার কেন্দ্রটি জাতীয় বেতার ভবন, শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরিত হয়।

বাংলাদেশ বেতারের ১৪টি কেন্দ্র ও ৬টি বিশেষায়িত ইউনিট থেকে দৈনিক সময়োপযোগী অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রচারিত হয়। এছাড়া বেসরকারি মালিকানাধীন রেডিও-র সংখ্যা ২২টি এবং কমিউনিটি রেডিও ১৫টি।

শিল্পকলা একাডেমি : অগ্রগতি
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাংলাদেশে সংস্কৃতিচর্চার একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। জাতীয় সংস্কৃতির গৌরবময় বিকাশকে অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলার চর্চা ও বিকাশের উদ্দেশে ১৯৭৪ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ আইন দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ৬টি বিভাগ নিয়ে গঠিত। বিভাগগুলো হলো : চারুকলা বিভাগ, নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগ, গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ, প্রশিক্ষণ বিভাগ, প্রযোজনা বিভাগ। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলা সদর ছাড়াও প্রত্যেক উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা কার্যকর হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ : অগ্রগতি
স্বাধীনতার পর ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রধান স্তম্ভ টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ভিত্তি রচিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ উদ্বোধনের মাধ্যমে। আজ তার পথ ধরেই বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’, ‘রূপকল্প-২০২১’-এর প্রধান সেøাগান ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ২০০৮-এর নির্বাচনে বিজয় লাভ করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ শুধু কথার কথা নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। বাংলাদেশে আজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল বিপ্লব ঘটেছে। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত হয়েছে।
ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ১৮ হাজার ৯৭৫ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, ২ হাজার ৪টি ইউনিয়নে ওয়াইফাই রাউটার স্থাপন এবং ১ হাজার ৪৮৩টি ইউনিয়ন নেটওয়ার্ক মনিটরিং সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়েছে। ৫ হাজার ৮৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো থেকে মানুষ ১৫০টি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা পাচ্ছে। ৮ হাজার ৫০০টি ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সারাদেশে ৪ হাজার ১৮৪টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৮টি হাই-টেক পার্ক/সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি; যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, জনতা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চালু হওয়া হাই-টেক পার্ক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কসমূহে ১৪ হাজার জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ খাতের গবেষণার সুযোগ তৈরির জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৩টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ২৩ হাজার ৩৩১টি মাধ্যমিক ও ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপিত হয়েছে। ৯৯৯-ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালু করে নাগরিকের জরুরি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া হচ্ছে। এখন মোবাইল সিমকার্ডের সংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৯ কোটি ৬০ লাখের বেশি। আইটি খাতে রপ্তানির পরিমাণ ১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। যা ১০ বছর আগে ছিল মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ চলছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কাজ শুরু করা হয়েছে। মহাকাশ বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Aviation and Aerospace University (BSMRAAU) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টার স্থাপিত হচ্ছে।
সরকারের আইসিটি বিভাগ নাগরিক সেবা সহজলভ্য করতে ৬০০টি মোবাইল অ্যাপস নির্মাণ করেছে। নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিকরণ, সরকারি অফিসের কাজে গতি ও স্বচ্ছতা আনয়ন এবং আইটি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল মন্ত্রণালয়, সকল অধিদপ্তর এবং ৮টি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়সহ সকল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে ই-ফাইলিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্কুল পর্যায় থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত কম্পিউটার ও কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষামূলক মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যারে রূপান্তর এবং সকল স্তরের শিক্ষা পদ্ধতিকে ডিজিটাল করা হচ্ছে। প্রাথমিক স্কুলের ৩০ শতাংশে এবং সকল মাধ্যমিক স্কুলের ১০০ শতাংশে আইসিটি ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হচ্ছে। কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোতে নগরাঞ্চলের বিশেষজ্ঞদের সাথে টেলিপরামর্শ গ্রহণ সুবিধা ২৫ শতাংশ হারে গড়ে তোলা হচ্ছে। ২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি চালুর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, ব্লক চেইন, আইটি-সহ ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো, ই-পাসপোর্ট এবং ই-ভিসা চালু করা হচ্ছে।

বাংলা একাডেমি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট
ভাষা সংগ্রামের পটভূমিতে বর্তমান বাংলা একাডেমি গড়ে ওঠে। বাংলা একাডেমি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে ইতোমধ্যে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা ভাষার উন্নয়ন, গবেষণা, প্রকাশনা এবং বইমেলার আয়োজন ছাড়াও বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দেশের প্রথিতযশা শিল্পী, সাহিত্যিক-কবিদের স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ভাষার চর্চা ও উন্নয়নকে লক্ষ্য নিয়ে বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়ন
২৬ মার্চ ২০২১ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব হবে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বলতে গেলে কিছুই ছিল না। রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে ‘যেন পারমাণবিক বোমায় আক্রান্তের পর সকাল’। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রকৃতিও ছিল না অনুকূলে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে যাত্রার শুরুতে ১৯৭২ সালে ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যভাব, বৈদেশিক ভা-ার শূন্য, বিদেশি বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের যত নেতিবাচক ধারণা তা যেন সবই ছিল বাংলাদেশের শুরুতে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। এমনই অবস্থায় হিমালয়ের মতো দৃঢ়চেতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিপীড়নমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সুখী সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা গড়তে উদ্যোগী হন।
সেই ৫০ বছরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশÑ উন্নয়নের বিস্ময়। ১৯৭৫-এর পরবর্তী সময় হতে ডিসেম্বর ১৯৯০ পর্যন্ত ১৪ বছর সামরিক শাসনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ছিল খুব মন্থর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যত স্থবির। যেমন সরকারি কারখানাগুলোর জাতীয়করণ থেকে বেসরকারিকরণ করলেও সেগুলো ছিল অসংগঠিত, পুঁজি সঞ্চয়নে ধীরগতি। বৈদেশিক বাণিজ্য উদারীকরণের পর ১৯৯০-এর পরবর্তী সময় হতে অর্থনীতির গতিধারা দ্রুত বদলাতে শুরু করে এবং ২০০৯-এর পর হতে আরও গতিশীল হয়। তার ফলেই বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের মানদ- অনুযায়ী ২০১৫ সালের নিম্নআয়ের দেশ হতে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। সে লক্ষ্যে ২০১৫ সালেই অর্জিত হয়ে যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ২০১৮ সালের জাতিসংঘের মানদ-ে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে এবং ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শর্তসমূহ পূরণ করলে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত সাফল্য অর্জন করে। বিশেষত মাতৃমৃত্যু হার, দারিদ্র্যের হার, শিশুমৃত্যুর হার কমানো, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে স্থির মূল্যের সমতায় জিডিপির আকার ৩০তম এবং চলতি ডলার মূল্যে অবস্থান ৩৯তম। সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ নামিক জিডিপি আকারে ৩০তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। আর হংকং সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশনের হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতিতে এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএস-র মতে বাংলাদেশ ২০৫০ সালে ১২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয় ২০২০ সালেই মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদনে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। অথচ এক দশক আগেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ভারতের অর্ধেক। এভাবে বাংলাদেশ এশিয়ার একটি সফলতার গল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকে বাংলাদেশকে ‘এশিয়ান টাইগার’ নামেও অভিহিত করছে। বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে চতুর্থ, স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়। আজ আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা স্বাধীনতার পর থেকে সাড়ে তিন গুণের বেশি চাল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের এই রূপান্তরের পেছনে যে চালিকাশক্তিসমূহ কাজ করেছে সেগুলো হলোÑ সরকারের উন্নয়ন নীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের বিস্তৃতি, সামাজিক পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, তৈরি পোশাক শিল্প, এবং অন্যান্য সামাজিক সূচকসমূহে (প্রত্যাশিত গড় আয়ু, শিক্ষা ও জেন্ডার সমতায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমানো) উন্নতি। এবার অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক, তাহলে গত পাঁচ দশকে রূপান্তরের গভীরতা আরও পরিষ্কার হবে।
জিডিপি উন্নয়নের আসল পরিমাপক কি না সে-বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে এর গ্রহণযোগ্য বিকল্প এখনও কেউ দেখাতে পারেনি। বিগত দশকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের যে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে বা নজর কেড়েছে সেটি হলো ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি। ২০০৯ সালের পর হতে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার সাড়ে তিন গুণের বেশি বেড়েছে। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে গত দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ছিল (৬.৭৬ শতাংশ)। তবে ২০০০-এর প্রথম দশকে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক ৬ শতাংশে আটকে ছিল। ২০১৫ সালে তা পরিবর্তন হয়ে যায়। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে প্রতি দশকে ১ শতাংশ পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে (চিত্র-১)। এটি একটি অনন্য অর্জন। যদিও প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ ধরা হয়েছিল। আশানুরূপ বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ না আসায় সে-লক্ষ্য অর্জন হয়নি। প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা অব্যাহত থাকবে এবং আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ২০৪১ সময় পর্যন্ত ১০ শতাংশ হবে বলে আশা করা যায়। প্রথমত; বিনিয়োগের জন্য দরকার ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টি। বিগত দশকে সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার খাত ছিল অবকাঠামো। এর জন্য যে মেগা প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছে, ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১-২ শতাংশ ত্বরান্বিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত; সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নতকরণে বেশ কিছু সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যার ফলে গত বছর বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে আট ধাপ উন্নীত হয়েছে। ব্যবসার জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু হওয়ায় আরও উন্নতি লাভ করবে।

তৃতীয়ত; রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যা অর্থনীতি রূপান্তরের অন্যতম শর্ত। বিগত দশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল। এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধির গতির ধারাবাহিকতা থাকবে। চতুর্থত; সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি। সরকার ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর হতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করে। তার মধ্যে একটি হলো মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া। মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর ভূগর্ভে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, মহেশখালী মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল। সকল মেগা প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য খরচ ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা বিশের দশকের শুরু হতে সুফল পাওয়া যাবে।
এবার আসা যাক মাথাপিছু জাতীয় আয়। মাথাপিছু জাতীয় আয়কে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি ধরা হয়। বিগত দশকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে (চিত্র-২)। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাথাপিছু জাতীয় আয় খুব বেশি বাড়েনি। ১৯৯০ দশক হতে তা গতিশীল হতে শুরু করে এবং চলতি দশকে বৃদ্ধি ছিল সব থেকে বেশি। দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মূল দুটি অভীষ্ট হচ্ছে ২০৩১ সালের মধ্যে নিম্নমধ্যম আয় হতে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ২০২০-২১ সালে নিম্নমধ্যম আয় হতে উচ্চমধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়ার সীমা হলো মাথাপিছু আয় ৪,০৪৫ ইউএস ডলার (এটলাস পদ্ধতিতে)। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয়ও বাড়বে যদি জনসংখ্যা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি না পায়। সে-কারণে আমাদের উন্নয়ন নীতিতে প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি বাড়লে মানুষের চাহিদা বাড়বে। চাহিদা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকা- গতিশীল হবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও মানুষের আয় বাড়বে। আগামীতে (২০৩০-এর মধ্যে) সরকারের ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে নিশ্চিত বলা যায়, পুরো বাংলাদেশের চেহারা বদলে যাবে।

বাংলাদেশ এক সময় কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। মোট দেশজ উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসত কৃষি থেকে আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ। জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল ১২-১৩ শতাংশের মতো। ধীরে ধীরে কৃষির অবদান কমে শিল্প ও সেবা খাতের পরিধি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নব্বই দশক হতে শিল্প খাতের অবদান বাড়তে শুরু করে প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের কারণে। এখন সেবা খাতের অবদানও কমে যাচ্ছে, তার স্থান নিচ্ছে শিল্প। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান মাত্র ১৩ শতাংশ, যদিও কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল শ্রমশক্তি ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতের অবদান ৩৫ শতাংশ। রূপকল্প ২০৪১ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে শিল্প খাতের অবদান ৪০ শতাংশ হবে যদিও ধীরে ধীরে তা কমে ২০৪১-এ আবার ৩৫ শতাংশে নেমে আসবে এবং সেবা খাত সম্প্রসারিত হবে। তখন কৃষির অবদান থাকবে মাত্র ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি বলে ধরা হয় প্রবাসী আয় ও রপ্তানিকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় ১ কোটির ওপর প্রবাসী থাকে। প্রবাসী আয় আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার অন্যতম উৎস। মূলত গত ২০ বছরে প্রবাসী আয় ৯ গুণ বেড়েছে।
করোনার কারণে বহুপাক্ষিক সংস্থা থেকে শুরু করে অনেক অর্থনীতিবিদ অনুমান করেছিল করোনার সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। সকল অনুমানকে ভুল প্রমাণিত করে চলতি প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। গত জুলাই ২০২০-এ সর্বকালের সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় (২.৫৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার) এসেছে। চলতি অর্থবছরে গড়ে মাসে ২ বিলিয়ন ডলারের ওপর আসছে প্রবাসী আয়। তৈরি পোশাক শিল্পের আগে এক সময় পাট ছিল অন্যতম রপ্তানি পণ্য। আশির দশকে সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং দেশের তুলনামূলক সুবিধা এবং সস্তা শ্রমের সুবাদে তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করে। বিশেষ করে বিগত দুই দশকে পোশাক শিল্পের প্রসারের ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানির দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশের ওপর আয় আসে তৈরি পোশাক হতে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত রয়েছে ৪ মিলিয়ন শ্রমিক যার ৮০ শতাংশই নারী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে রপ্তানি আয় ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
এক সময় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুব কম ছিল। ডলারের ওপর কড়াকড়ি ছিল। সে-সময় এখন অতীত। প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয়ের ফলে রিজার্ভ বিগত দুই দশকে খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালের পর হতে দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে যায়, যার ফলে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে ৫ গুণ এবং দ্বিতীয় দশকে ৩ গুণ রিজার্ভ বৃদ্ধি পায় চিত্র-৪।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নজর কেড়েছে, তার চেয়ে বেশি আকর্ষণ হয়েছে সামাজিক সূচকগুলোর অগ্রগতি (সারণি-১)। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয় কম হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এগিয়েছে তা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। নিচের সারণি থেকে তা পরিষ্কার বোঝা যাবে।

উপরে ৩টি দেশের তিন দশকের মাথাপিছু আয়ের সাথে সামাজিক সূচকসমূহের তুলনা করা হয়েছে। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য দুটি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে, যদিও পাকিস্তানের সাথে খুব কাছাকাছি অবস্থানে আছে। অন্যদিকে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫৩ বছর এবং অন্য দুটি দেশের তুলনায় কম। অথচ চার দশকে বাংলাদেশ তাদের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। একইভাবে, শিশুমৃত্যুর হার, নবজাতকের মৃত্যুর হার, পাঁচ বছরের নিচে মৃত্যুর হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক সময় অনেক পিছিয়ে থাকলেও এখন এগিয়ে রয়েছে। এ-কথা বলে রাখা দরকার বাংলাদেশ ২০২০ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম, অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ৯৪তম ও ৮৮তম। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সূচকে অগ্রগতির আরেকটি কারণ হলো মহিলাদের মোট সন্তান জন্ম হার কমে যাওয়া। একটা সময় ছিল সত্তর দশকে নারী প্রতি গড় সন্তান জন্ম হার ছিল ৭-এর কাছাকাছি। সেই অবস্থা থেকে আজকে এই হার মাত্র দুজন। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ জেন্ডার সমতায় সব থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাবে, গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে বিগত ৫০ বছরে পুরুষের চেয়ে নারীরা অধিক সময় শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল।
এটা সত্য যে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অতীতের গৌরব ও অর্জন ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। তবে, বেশি আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আমাদের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। আমাদের ১৫-২৯ বছর বয়সীদের এখনও ২৯.৮ শতাংশ শিক্ষা, কাজে ও প্রশিক্ষণে যুক্ত নেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে। ভবিষ্যতে উন্নত দেশ হতে হলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বিকল্প নেই। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। অনলাইন শ্রমবাজারে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ বিশ্বে জনসংখ্যায় অষ্টম বৃহত্তম। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আমাদের ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নে আরও মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। সে-কারণে রপ্তানি পণ্যের ভিতরে ও বাইরে বহুমুখীকরণে নজর দিতে হবে। মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে প্রতিযোগ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের অবকাঠামো খাতে আগামী ১০ বছরে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে মতবিভেদ ভুলে আমাদের দেশ গড়ায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

লেখক : সম্পাদক, উত্তরণ

 

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য