Friday, February 23, 2024
বাড়িআরওস্বপ্ন উন্মোচনের অপেক্ষায় পদ্মাসেতু

স্বপ্ন উন্মোচনের অপেক্ষায় পদ্মাসেতু

ড. ইঞ্জি. মাসুদা সিদ্দিক রোজী

গত ১ মার্চ পদ্মাসেতুর মুভমেন্ট জয়েন্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে দেওয়া পদ্মাসেতু চালুর আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। প্রকল্প পরিচালক বলেছেন আগামী জুনে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। বাঙালিদের সক্ষমতার স্মারক পদ্মাসেতুর যান চলাচল উপযোগী করতে একেবারে শেষ পর্যায়ের কাজ এখন চলছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সেতুর অনেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেতুর শেষ ধাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুভমেন্ট জয়েন্টের কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে সম্পন্ন হয়। ৭টি মডিউলে বিভক্ত মূল সেতুতে ১৬টি এবং সংযোগ সেতুর ১২টিসহ মোট ২৮টি মুভমেন্ট জয়েন্ট সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় পুরো সেতু স্মুথলি যানবাহন চলাচল সম্ভব এখন। এতদিন লোহার প্লেটের উপর দিয়ে জয়েন্টগুলো পার হতো। সেতুর এই অগ্রগতিতে খুশি সবাই।
মূল সেতুর মুভমেন্ট জয়েন্ট সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল ১১ এপ্রিল। আগে সম্পন্ন হওয়ায় কার্পেটিং কাজে আরও গতি পাবে। এছাড়া ওয়াটার প্রুফিং ওয়ার্কের অগ্রগতি ৩৯ দশমিক ৮৪ এবং মূল সেতুর কার্পেটিং তথা এজফল্ট ওয়ার্ক অগ্রগতি ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আর ভায়াডাক্টে কার্পেটিং হয়েছে ৫৬ দশমিক ২২ শতাংশ। গ্যাস পাইপ লাইনের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৮১ শতাংশ, ৪০০ কেভি টিএল প্ল্যাটফর্ম ৭৬ শতাংশ। আর রেলওয়ে ভায়াডাক্টে প্যারাপেটের অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। মূূল সেতুর অগ্রগতি প্রায় ৯৭ শতাংশ। আগামী ২৩ জুন সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে এখন চলছে শেষ পর্যায়ে কাজ।
পদ্মাসেতুকে এখন আর স্বপ্নের সেতু বলা যাবে না। এই সেতু এখন শুধু ২১টি জেলার অধিবাসীই নয়, সমস্ত বাংলাদেশের জনগণ কখন পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে পারাপার হবে সেই অপেক্ষায় উৎসুখ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ঢাকা থেকে সেতুর এ-পার এবং ও-পার থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এই লিংক রোডটি করতে অর্থনৈতিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। পদ্মাসেতু অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি জায়গা অত্যন্ত নিচু (এক সময় হয়তো নদী ছিল) এই বিশাল নিচু জায়গা ভরাট করে পরিবহন চলাচলের উপযোগী করতে বিশাল একটি ব্যয়ের হিসাব অনেকেই আমরা মাথায় নেই না। তাছাড়াও নদীর পাড় বালি ও নরম মাটি হওয়ায় জনগণের সম্পদ রক্ষার্থে নদী শাসন অবশ্যই করতে হয়, সেটি পৃথিবীর অনেক দেশেই এ-ধরনের ব্যাপক ব্যয় না করলেও চলে।
আমাদের দেশের মাটির সাথে অন্যান্য দেশের মাটির মিল নেই। এখানে পিলার ৪২টি, পাইলিং ২৬৪টি, প্রতিটি পাইলিং ১২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে। প্রতিটি কলামের নিচে ৬টি পাইল, প্রতি পাইলের নিচে মাকড়সার জালের মতো স্ট্রাকচার করা হয়।
প্রতিটি পাইলের ওপর ৩০ ইঞ্চি পাইলিংয়ের সিট, ১.৫ ইঞ্চি থিকনেস, ১২০ মিটার গভীরে প্রবেশ করাতে সেই ধরনের হ্যামার বিদেশ থেকে এনে কাজ করাÑ এ ধরনের জটিল পাইল পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সাধারণত হয় না। দুই প্রান্তে ১৪ কিলোমিটার লিংক রোড এবং ১০ কিলোমিটার নদী শাসন ইত্যাদি।
শেষ প্রান্তে গিয়ে মাটির উপযুক্ত স্ট্রেন্থ না পাওয়ায় ১২০ মিটার দৈর্ঘ্য রেখেই ৬টির পরিবর্তে ৭টি পাইল করা হয় এবং পাইলের নিচে জালের মতো সংযোগ স্থাপন করে উপযুক্ত স্ট্রেন্থ আনা হয়। পানির স্তর থেকে পদ্মাসেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট। পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট বা ১২০ মিটার। পদ্মাসেতুতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার লাইন সংযোগসহ পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। এত কিছুর পরও পদ্মাসেতু এখন আর স্বপ্নের সেতু বলা যাবে না। কারণ এই সেতু এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, দিন গুনছে উদ্বোধনের জন্য। সারাদেশের কোটি কোটি মানুষ এই উদ্বোধনটি দেখার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে চলতি বছরে ২৩ জুন যানবাহন চলাচলের জন্য চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে একদিকে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রথম ডিজাইনে রেললাইন ছিল না, পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে বহুমুখী এই পদ্মাসেতু প্রকল্পে নিচতলায় রেল চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
বহুমুখী পদ্মাসেতু প্রকল্পের আরও বিস্তারিত তথ্য নিম্নরূপ :

* সেতুর দৈর্ঘ্য – ৬.১৫ কিলোমিটার বা
২০,২০০ ফুট
* প্রস্থ – ১৮.১০ মিটার বা ৫৯.৪ ফুট

চার-লেন বিশিষ্ট দোতলা বিশিষ্ট এই সেতুটির উপরে গাড়ি চলাচল এবং নিচতলায় রেললাইন থাকবে। দুই প্রান্তে লিংক সড়কের দৈর্ঘ্য ১৪ কিলোমিটার নদী শাসন।

* নদী শাসন – ১২ কিলোমিটার
* ভায়াডাক্ট – ৩.১৮ কিলোমিটার
* ভায়াডাক্ট পিলার – ৮১টি
* মূল পিলার – ৪২টি
* স্পেন – ৪১টি
* পাইলিং – ২৬৪টি
* পাইলিং গভীরতা – ৩৮৩ ফুট বা
১২০ মিটার।

পদ্মাসেতেুর নকশা করেন AECOM প্রতিষ্ঠান। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন কোম্পানি লি.। পদ্মাসেতুর সংযোগস্থল লৌহজং মুন্সিগঞ্জের সাথে শরিয়তপুর ও মাদারিপুর। পদ্মাসেতুর অফিসিয়াল নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ কাজটি করছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প।
পদ্মাসেতু রক্ষণাবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমার্চ মাসের দিবস
পরবর্তী নিবন্ধভূমিপুত্র
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য