Friday, February 23, 2024
বাড়িকৃষিসুদিনে ফিরছে বাংলাদেশের ‘হোয়াইট গোল্ড’

সুদিনে ফিরছে বাংলাদেশের ‘হোয়াইট গোল্ড’

রাজিয়া সুলতানা: ‘হোয়াইট গোল্ড’ শুনলেই নারীদের চোখ চকচক করে ওঠে। তবে এই গোল্ড দিয়ে গহনা হয় না। কী সেই গোল্ড! এই গোল্ড বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। চিংড়িই (চৎধহি) হচ্ছে বাংলাদেশের সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড। চলতি অর্থবছরে দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় এবার বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। এই অঞ্চল এবার রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন চিংড়ি মাছ রপ্তানি করা হয়েছে, যা থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পর হতেই প্রতি বছর এই চিংড়ি রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রথম ১৯২৯-৩০ সালে সুন্দরবন অঞ্চলে চিংড়ি চাষের সূচনা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী আশির দশক পর্যন্ত চিংড়ি রপ্তানি ছিল বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। গার্মেন্ট শিল্পের ব্যাপকতায় এখন চিংড়ি বর্তমানে দ্বিতীয়।
১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ ১২২৩.৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এ-সময় জাতীয় রপ্তানি আয়ের মধ্যে চিংড়ির অবদান ছিল ৮.২ শতাংশ। এরপর হতে বাড়ছে রপ্তানি। ২০০১-০২ অর্থবছরে চিংড়ি থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। তবে নানা সংকটের কারণে সেই ধারা বজায় থাকেনি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩২০ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৬৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯০ হাজার ৪০০ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমেছে ১৫০ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নানা কারণে এই আয়ের পরিমাণ কমেছে। কারণগুলো হচ্ছে-
১. বিদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে একর প্রতি চিংড়ি উৎপাদিত হয় ৫-৬ হাজার কেজি। সেখানে বাংলাদেশে সাধারণত ধানক্ষেতে বেড়িবাঁধ দিয়ে সনাতন পদ্ধতির চাষে উৎপাদিত হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি। আধানিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব; কিন্তু তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া ভাইরাসমুক্ত পোনার সংকট, অতিবৃষ্টিতে চিংড়ির ঘের ভেসে যাওয়াও উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।
২. বহির্বিশ্বে বর্তমানে বাজার দখল করে আছে ‘ভেনামি’ নামের একটি হাইব্রিড চিংড়ি। ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় এর ব্যাপক চাষ শুরু হয়েছে। একর প্রতি এর উৎপাদন ৮-১০ হাজার কেজি। ততটা সুস্বাদু না হলেও পর্যাপ্ত উৎপাদন ও সরবরাহের কারণে সহজেই তা বাজার দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন এই প্রজাতির চিংড়ি চাষের অনুমতি দাবি করলেও অনুমতি না পাওয়ায়; তা এখনও পরীক্ষামূলকভাবেই চাষ হচ্ছে। এর প্রধানতম কারণ ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন অনেক বেশি হলেও এতে ভাইরাসজনিত ঝুঁকি অনেক বেশি।
৩. ইউরোপের বাজারগুলোতে ভারত চিংড়ি রপ্তানিতে ‘ট্যাক্স’ ফ্যাসিলিটি পায় না। এরপরও প্রতিযোগিতায় আমরা তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। এর কারণ আমাদের চেয়ে তাদের চিংড়ি উৎপাদন অনেক গুণ বেশি ও উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। বাংলাদেশে চাষের ক্ষেত্রে ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার, যা বিশ্বের আর কোথাও নেই। ব্যাংকগুলো চিংড়ি চাষে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে চাষিদের পক্ষে ভালো মানের পোনা সংগ্রহ করা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় চিংড়ি চাষ করা সম্ভব হবে।
৪. খুলনার রূপসা, ডুমুরিয়া উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বিগত কয়েক বছর। অসাধু ব্যবসায়ীরা মাছের ওজন বাড়াতে সিরিঞ্জের মাধ্যমে সাগু ও জেলি জাতীয় পদার্থ পুশ করে থাকে, যা বহির্বিশ্বের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কড়া নজরদারিতে এনেছে।
৫. চিংড়ি রপ্তানিতে ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেছে রপ্তানিকারকরা। ভিশনের মূল উদ্দেশ্য পাঁচ বছরের মধ্যে সারাদেশের বর্তমান রপ্তানির প্রায় দ্বিগুণ ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ১৩ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি রপ্তানি টার্গেট নির্ধারণ করেছে। এর জন্য উপক‚লীয় এলাকায় চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধিতে চিংড়ি চাষের অবকাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে হ্যাচারির মাধ্যমে পোনার সরবরাহ বৃদ্ধি, আধুনিক পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান ও ঝুঁকি কমাতে ‘চিংড়ি বীমা’ চালু করার প্রস্তাবনা করেছে।

গত অর্থবছর সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি করে সরকার ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। যার মধ্যে চিংড়ি হতে এসেছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। কৃষিবান্ধব সরকার চিংড়ি চাষে নজরদারি করায় এটা সম্ভব হয়েছে। হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত এই চিংড়ির রমরমা অবস্থা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।
প্রায় সব ধরনের জলাশয়েই চিংড়ি জন্মে। তবে কিছু প্রজাতি সমুদ্র উপকূলে কাদা বা বালির মধ্যে অথবা পাথরের ফাটলে লুকিয়ে বাস করে। অন্যরা দলে দলে গভীর সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানিতে সাঁতার কাটে। সমুদ্রের চিংড়ি ধূসর, বাদামি, সাদা বা গোলাপি রঙের। কোনোটির গায়ে ডোরা, কোনোটিতে নানা ধরনের ফুটকি থাকে। কিছু চিংড়ি লাল, হলুদ, সবুজ ও নীল রঙেরও হয়। কোনো কোনো প্রজাতি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনে রং বদলায়। গভীর সমুদ্রের অনেক চিংড়ি দীপ্যমান (আলোদায়ী)। চিংড়ির আকার সাধারণত ২.৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। চিংড়ি সর্বভুক এবং বর্জ্যজীবী। কোনোটি আবার প্লাঙ্কটন ভোজী। কিছু প্রজাতির স্ত্রী চিংড়ি উদরের নিচে সন্তরণ উপাঙ্গে নিষিক্ত ডিম না ফোটা পর্যন্ত বহন করে। অন্য চিংড়ি পানিতেই নিষিক্ত ডিম পাড়ে। অধিকাংশ প্রজাতিতে ডিম থেকে নপ্লিয়াস লার্ভা বের হয় এবং এটি পরিণত অবস্থায় পৌঁছা পর্যন্ত কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে। বঙ্গোপসাগর, মোহনা ও স্বাদু পানিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ চিংড়ি থাকায় বাংলাদেশকে চিংড়িসমৃদ্ধ দেশ বলা হয়। এদেশে মোট ৫৬টি প্রজাতির চিংড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি লবণাক্ত পানির, ১২টি কম লবণাক্ত পানির ও ৭টি স্বাদু পানির বাসিন্দা। বঙ্গোপসাগর, সুন্দরবন ও নদীমুখে সারাবছর চিংড়ি পাওয়া যায়। পৃথিবীর মানুষের কাছে চিংড়ি একটি জনপ্রিয় খাদ্য।
পানির লবণাক্ততার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের চিংড়ি চাষকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যেমনÑ অল্প লোনা পানির চিংড়ি চাষ ও স্বাদু পানির চিংড়ি চাষ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলায় দেশের প্রায় সব চিংড়ি খামার অবস্থিত। এ দুটি অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশই বাগদা চিংড়ি। এর পরে রয়েছে হরিণা চিংড়ি।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রক্রিয়ায় চিংড়ি চাষ করা হয়-
১. এককভাবে চিংড়ি চাষ;
২. পর্যায়ক্রমে চিংড়ি ও ধান চাষ;
৩. পর্যায়ক্রমে লবণ উৎপাদন ও চিংড়ি চাষ।

এককভাবে চিংড়ি চাষ : একক চিংড়ি চাষ বলতে প্রধানত উপক‚লীয় এলাকায় বাগদা চিংড়ির চাষকেই বোঝায়। যেখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে সেই এলাকা একক চিংড়ি চাষের জন্য উপযোগী। পুকুরে খাদ্য ঘাটতি রোধের জন্য হেক্টর প্রতি ২৫০ কেজি জৈব সার এবং ৫০ কেজি অজৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। সার প্রয়োগের পরে পানির গভীরতা ৪০-৫০ সেন্টিমিটার রেখে এক সপ্তাহ পর পোনা ছাড়তে হয়।
পর্যায়ক্রমে চিংড়ি ও ধান চাষ : এ পদ্ধতিতে ঘেরের ভেতরে পুকুরে পালাক্রমে চিংড়ি ও ধান চাষ করা হয়। শীতকালে ঘেরের ভিতর জোয়ারের পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ এবং বর্ষার আগে চিংড়ি আহরণ করে একই ঘেরে ধান ও অন্য মাছ চাষ করা হয়। জোয়ারের পানির সঙ্গে চিংড়ির লার্ভা ও অন্যান্য লোনা পানির মাছের পোনা প্রবেশ করে। বর্ষার শুরুতে জুন-জুলাই মাসে চিংড়ি ধরে নেওয়া হয়।
পর্যায়ক্রমে লবণ উৎপাদন ও চিংড়ি চাষ : এ পদ্ধতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় চালু আছে। সেখানে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত লবণ তৈরি করা হয়। মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চিংড়ি চাষ করা হয়।
এছাড়া রয়েছে স্বাদু পানির চিংড়ি চাষ। স্বাদু পানিতে এখনও ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়নি। দেশে স্বাদু পানিতে চাষ উপযোগী চিংড়ি হচ্ছে গলদা চিংড়ি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের সর্বত্র এই চিংড়ির বিচরণ। গলদা স্বাদু পানিতে বাস করলেও প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য ঈষৎ লবণাক্ত পানিতে চলে আসে। তাই মোহনা ও খাড়ি অঞ্চলের নদীতে যেখানে জোয়ার-ভাটা হয় সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের প্রচুর লার্ভা পাওয়া যায়।
কৃত্রিম উপায়ে এখন কক্সবাজার, চট্টগ্রামের পটিয়া, নোয়াখালীর ব্যাকইয়ার্ড হ্যাচারি এবং আরও কয়েকটি হ্যাচারিতে গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে। বাগদা চিংড়ি চাষের সাড়া জাগানো পদ্ধতিটি হলো সরকারের মডিফাইড ট্র্যাডিশনাল টেকনোলজি (এমটিটি) পদ্ধতি, যা সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মূলত সাদা স্বর্ণ খ্যাত চিংড়িকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এই প্রকার চাষে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি সম্ভব। এমটিটি অর্থাৎ উন্নত সনাতন চাষ কৌশল বা পরিবর্তিত সনাতন চাষ কৌশল।
এমটিটি চিংড়ি চাষ কৌশলটি সনাতন চাষ এবং ভালো চাষ ব্যবস্থাপনা কৌশল (বিএমপি)-এর চেয়ে উন্নত, আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক কৌশলের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত একটি ঝুঁকিহীন টেকসই চিংড়ি চাষ কৌশল। ২০০৬ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ফিস, বাংলাদেশ সফলভাবে এমটিটি চিংড়ি চাষ কৌশল বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার চাষিদের মাঝে কারিগরি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রদর্শনী পুকুরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে সফলভাবে চিংড়ি উৎপাদন করছে।
বাগদা চিংড়ি চাষের মূল সমস্যা হচ্ছে ভাইরাস- এই পদ্ধতিতে কৌশলের পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত বাগদা চিংড়ির ভাইরাসমুক্ত পোনা মজুদ করা হয়, মজুদ ঘনত্ব সীমিত রাখা হয় এবং প্রতিদিন নিয়মিত গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য প্রয়োগ করা। এমটিটি পদ্ধতি চিংড়ি চাষে প্রতিকেজি চিংড়ির উৎপাদন ব্যয় ৩৩০-৩৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিংড়ি বিক্রি ৮০০-৮৫০ টাকা। প্রতি একরে সর্বনিম্ন উৎপাদন ৪৫০ কেজি হলে বছরে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা শুধু চিংড়ি থেকে লাভ করা যায়। এমটিটি কৌশলে প্রথমবারের চিংড়ি চাষে ব্যয় হয় ৬০-৭০ হাজার টাকা। প্রথমবার চিংড়ি আহরণের পর হতে, চিংড়ি বিক্রির টাকা থেকে ব্যয় নির্বাহ করা যায়। বর্তমানে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বছরে ১৫০-১৮০ কেজি প্রতি একরে। অন্যদিকে এমটিটি চাষে উৎপাদন ৪৫০-৬৫০ কেজি প্রতি একরে। পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত পোনা, গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করা হয়, তবে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বর্তমান উৎপাদনের দ্বিগুণ করা সম্ভব খুব সহজেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাগদা চিংড়ি চাষে হোয়াইট স্পট বা চায়না ভাইরাস রোগ মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বছরের শুরুতে চিংড়িঘেরে ভাইরাসজনিত রোগের কারণে চিংড়ি উৎপাদন কমছে। ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদনকারীরা খুব বেশি লাভবান হতে পারে না। উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কম হওয়ায় মাঠপর্যায়ে চাষে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাপারে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের চিংড়ি চাষিরা ঠিকঠাক রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার করেন না। চিংড়ি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করার সময়ও পালনীয় বিধিবিধান নিয়ে মনোযোগী না হওয়ায় এই শিল্প যথাযথভাবে আগাচ্ছে না।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরু থেকেই ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে রয়েছে মৎস্য খাত শিল্প। বাড়ছে রপ্তানি আয়ও। বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী। এবং চিংড়ি রপ্তানিতে ১৭ম স্থান অধিকারী দেশ। বাংলাদেশি মাছের বিশাল বাজার রয়েছে- ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীংলকা, মালদ্বীপ, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বহু দেশের সাথে নিয়মিত প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের কমপক্ষে ৮০টি দেশ মাছ রপ্তানির সাথে জড়িত।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে কমছে চিংড়ি রপ্তানি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যেখানে ৫০ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১৬৮ মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ২৭৮ মেট্রিক টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৭২৬ মেট্রিক টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৭০৬ মেট্রিক টন চিংড়ি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি চিংড়ি চাষ অনেকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ চিংড়ির পোনা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। সারা বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ চিংড়ি চাষ, ব্যবসা, রপ্তানি ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
আমিষ সমৃদ্ধ চিংড়ি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্রই উৎপাদিত হতো। এক সময় বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল, উপক‚লীয় অগভীর এলাকা ও গভীর সাগর থেকে চিংড়ি সংগ্রহ করে তা বাজারজাত করা হতো। বর্তমানে চিংড়ি চাষ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান পেশা। লাভজনক শিল্প হিসেবেই হোয়াইট গোল্ডের কদর আরও বাড়চ্ছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে এবং খামারের সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে নদীসংলগ্ন এলাকায় মাটির ঘের দিয়ে বা পাড় বেঁধে তৈরি পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে চিংড়ি উৎপাদন করা হতো। পোনা ছাড়ার কয়েক মাসের মধ্যে বড় হলে তা সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হতো। এখন সেখানে চিংড়ির আধুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়া নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।
লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য