Friday, February 23, 2024
বাড়িউত্তরণ ডেস্কসামুদ্রিক মাছের পুষ্টিগুণ ও উপযোগিতা

সামুদ্রিক মাছের পুষ্টিগুণ ও উপযোগিতা

রাজিয়া সুলতানা: আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। প্রকৃতির ছায়াঘেরা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী ও খাল-বিল। আর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র। যা প্রকৃতির এক অপার দান। এই সুবিস্তৃত সমুদ্রের সম্পদ ভা-ার বর্ণনা অল্প ভাষায় লিপিবদ্ধ করা কঠিন। তারপরও সামুদ্রিক সম্পদের একটি অংশ সামুদ্রিক মাছের সামান্য নিয়ে গল্প-বিন্যাসের প্রচেষ্টা।
প্রাথমিকভাবে মাছ হলো দেহের উপরিভাগে আঁশযুক্ত, ফুলকা ও পাখনা বিশিষ্ট জলচর মেরুদ-ী প্রাণী। যেসব মাছ সমুদ্রে থাকে তা-ই সামুদ্রিক মাছ। পৃথিবীতে মাছের গোত্র প্রায় ৪৫০টি। প্রজাতি প্রায় ৩০-৪০ হাজার। এদের মধ্যে বাংলাদেশে এদের বসবাস আনুমানিক প্রায় ৪৭৫টি প্রজাতির। বাণিজ্যিকভাবে পরিচিত এবং ধৃত সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ; মাত্র ২০ প্রজাতির। সামুদ্রিক মাছ ধরার একমাত্র উৎস দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর।
বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকতও বটে। বিস্তৃতি প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। আর সমুদ্রসীমা সুবিশাল। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের সীমায়িত সমুদ্র ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই সমুদ্র অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। দেশ ও জনগণবান্ধব শেখ হাসিনার সরকারের উদ্যোগেই এটি সম্ভব হয়েছে। সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশের জয় তা নিশ্চিত করেছে। ২০১২-তে মিয়ানমারের সাথে আর ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় বাংলাদেশ এখন মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা নিজেদের করে নিয়েছে। সাথে আছে ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশ পর্যন্ত সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার।
দক্ষিণের এই বিশাল বঙ্গোপসাগর শাশ্বতকাল হতে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের বিপুল আধার। যা মিটিয়ে আসছে আমাদের আমিষের চাহিদা। শুধু তাই নয়, আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় রপ্তানি আয়ের খাতও মৎস সম্পদ। তাই ষাটের দশকে ফাও (এফএও) বঙ্গোপসাগরকে সমুদ্র খনি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ফাও (এফএও)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক উৎস হতে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ২৫তম এবং সামগ্রিক মৎস্যে পঞ্চম। বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে ২০২২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের দখলে চলে আসবে মৎস্য আহরণের শীর্ষস্থান। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২.২০ লাখ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪২.৭৭ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ৫৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ আবদ্ধ পানি থেকে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত পানি থেকে ২৮ শতাংশ এবং সমুদ্র থেকে ১৬ শতাংশ।
বিশ্বের ৬৭টি বৃহৎ সামুদ্রিক পরিবেশের (লার্জ মেরিন ইকোসিস্টেম) মধ্যে বঙ্গোপসাগরেই সবচেয়ে বেশি নদীবিধৌত পানি ও পলি প্রবেশ করে। তাই বঙ্গোপসাগর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই সুবিশাল জলসীমার জীববৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রকম নাম জানা-অজানা কতই না মাছ। যেমনÑ ইলিশ, ভেটকি বা কোরাল, চিংড়ি, পোয়া, রূপচাঁদা, ছুরিমাছ, লইট্টা, তুলার ডান্ডি, টুনা ফিস, তপসী, বাটার ফিশ, ভারতীয় স্যামন, মুলেট, অয়েল সারডিন, উপরিভাগের হাঙর, করাত মাছ, পাইক, বোনিটো, স্কিপজ্যাক, স্মেল্ট, ভারতীয় অ্যানকোভি, ডোরাব হেরিং, ভারতীয় স্ক্যাড, ডগফিশ (ছোট জাতের হাঙর), ক্রোকার, ক্যাটফিশ, ফ্ল্যাটফিশ, পাইক, সী-ব্রিম্স, স্ন্যাপার, স্ক্যাভেঞ্জার, বাইম, গোটফিশ, কাঁকড়াভুক, রকফিশ, সীবাস, গ্রাউপার, সিলভার ব্রিম, ছুরিমাছ ও তলবাসী হাঙর ইত্যাদি। এই মাছ সাধারণ বা যন্ত্রচালিত নৌকায় স্থায়ী ভাসমান ফাঁসজাল, স্থায়ী থলেজাল ও লম্বা সুতার বড়শিতেই অধিকাংশ ধরা পড়ে।
মাছ তথা সামুদ্রিক মাছ শুধু বাংলাদেশের মানুষের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলেনি, প্রভাব ফেলেছে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ওপর। আমরা দেখতে পাই শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিন যে যে উপাদানের প্রয়োজন হয়, তার বেশির ভাগই আসে মাছ থেকে। আমাদের দেহের চালিকাশক্তির প্রধান উপাদান যে প্রোটিন তার প্রধান আধারই মাছ। প্রায় ২৩ শতাংশ। যা সহজে হজমযোগ্য। বিশ্বের প্রায় ৪৩০ কোটি মানুষের প্রোটিনের আনুমানিক ১৫ শতাংশই আসে সামুদ্রিক মাছ ও উদ্ভিদ হতে। এতে ক্ষতিকারক ফ্যাট নেই বললেই চলে। রয়েছে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ডি। এসব কটি উপাদানই একাধিক জটিল রোগকে দূরে রাখে। ফলে মানুষের গড় আয়ু যায় বেড়ে। সে-সঙ্গে সার্বিকভাবে শরীরের গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তো শরীরে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের ঘাটতি হওয়া একেবারেই ভালো না। শুধুমাত্র সামুদ্রিক মাছ এবং বিশেষ কিছু সবজিতে এই উপাদান পাওয়া যায়। সাধারণত ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড দু-ধরনের হয়, ইপিএ (ইকোস্পেনটোনিক অ্যাসিড) এবং ডিএইচএ (ডোকোসেহেস্কেনিক অ্যাসিড)। ইপিএ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। সে-সঙ্গে প্রদাহ বা জ্বালা-যন্ত্রণাও কমায়। অন্যদিকে, ডিএইচএ ফ্যাটি অ্যাসিড দৃষ্টিশক্তি ভালো করার পাশপাশি ব্রেন পাওয়ার বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয়রোধে সাহায্য করে। খনিজ তেল, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, সেলেনিয়াম ও জিংকের অন্যতম উৎস সামুদ্রিক মাছ। সেলেনিয়াম এক ধরনের এনজাইম তৈরি করে, যা আমাদের ক্যানসারের হাত হতে রক্ষা করে ও বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ করে। আছে আয়োডিন, যা থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য খুব উপকারী। ভিটামিন বি-এর উৎকৃষ্ট উৎসও মাছ। তাছাড়া সামুদ্রিক মাছের আমিষ ও তেল দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে। মোদ্দাকথা হৃদরোগে আক্রান্ত ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও সামুদ্রিক মাছ খুবই উপকারী। সামুদ্রিক মাছ ত্বকেরও যতœ নেয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষা করে যেমন ক্ষতি হতে দেয় না, তেমনই অ্যাকনের সমস্যাও কাটিয়ে দেয়। সামুদ্রিক মাছের গুণের কথা আসলে বলে শেষ করা যাবে না। তবুও বলতে হয় সামুদ্রিক মাছ হার্ট-অ্যাটাক, স্ট্রোক, স্থূলতা ও উচ্চ-রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া হৃদরোগ প্রতিরোধ, কোলেস্টেরল কমানো, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি, ব্রেন পাওয়ার, জয়েন্ট পেইন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সামুদ্রিক মাছের জুড়ি নেই। শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক গঠনে সামুদ্রিক মাছ দারুণ ভূমিকা পালন করে। সর্বোপরি দূষণযুক্ত এদেশে যেখানে মানসিক অবসাদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার সেখানে সামুদ্রিক মাছের মধ্যে রয়েছে মন ভালো রাখার সবগুলো উপাদান। সামুদ্রিক মাছের গল্পের সাতকাহনের শুরুতেই আসবেÑ

রূপচাঁদা
আবহমানকাল হতেই রূপচাঁদা আমাদের খাদ্য তালিকায় ছিল। তবে বর্তমানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বারবিকিউ ও ফ্রাই। যার ফলে ইহা শোভা পাচ্ছে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট হতে পাঁচ তারকা হোটেল পর্যন্ত। পূর্বে শুধু সমুদ্রেই পাওয়া যেত মাছটি। বর্তমানে চিংড়ির ঘেরের সাথে চাষের চেষ্টা চলছে। ভারত আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশের মতো স্বার্থক হয়নি বাংলাদেশ। তবে চেষ্টা চলছে। সার্বিকভাবে বলতে পারি রূপচাঁদা মাছটি দেখতে খুবই সুন্দর। স্বাদ আর পুষ্টিগুণের কথা লিখেও শেষ করা যাবে কি না ভাবছি।

রূপচাঁদার পুষ্টিগুণ
১. রূপচাঁদা মাছে আছে ডেকোসেহেক্সনইয়িক ও আইকোসেপেনটেনয়িক, যা দুটি অ্যাসিড। এই উপাদান দুটি শিশুর মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। স্নায়ুর বিকাশ ঘটায়। স্নায়ুর প্রদাহ কমায়।
২. অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভ ডিজঅর্ডার শিশুদের একটি মারাত্মক রোগ, যা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। এর থেকে সুরক্ষা দিতে পারে রূপচাঁদা। বড়দের ডিমেনশিয়া অর্থাৎ স্মৃতিভ্রষ্ট ঝুঁকি কমায় মাছটি। পাশাপাশি মগজের কোষের উন্নতি ঘটায় এবং হতাশা দূর করে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
৩. রূপচাঁদা শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে এবং শরীর সুগঠিত করে।
৪. রূপচাঁদায় রয়েছে ওমেগা-থ্রি, যা রক্তচাপের সমস্যা সমাধানসহ হার্টের যে কোনো ধরনের রোগের ঝুঁকি কমায়। রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা ঠিক রাখে। খারাপ কোলেস্টেরলের প্রভাব থেকেও শরীরকে রক্ষা করে।
৫. নিম্ন রক্তচাপে ভোগা রোগীদের জন্য রূপচাঁদা উপকারী।
৬. কোনো কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালরি না থাকায় মাছটি ডায়েটে রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ এটি ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
৭. এতে থাকা আয়োডিন থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের উন্নতি ঘটায়।
৮. ইহার আমিষ পেশির ক্ষয়রোধ করে। শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের ফলে পেশিতে অস্বস্তিবোধও দূর করে রূপচাঁদা।
৯. অস্টিওম্যালাসিইয়া টিস্যুর একটি রোগ। এই রোগে হাড়ে খনিজ সরবরাহের সময় আশপাশের টিস্যুগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করে এবং অস্থি এতটাই নরম হয়ে যায় যে অল্প আঘাতেই ভেঙে যায়। রূপচাঁদায় থাকা ভিটামিন ডি দূরে রাখে এই রোগ। হাড়ের আরেকটি অসুখ রেচিটিক, যাতে হাড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। এই রোগও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে রূপচাঁদা।
১০. এই মাছের আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধির মাধ্যমে অ্যানেমিয়া হতে মুক্তি দেয়।
১১. এমন কী সর্দি-কাশি ও মাথাব্যথার পথ্য হিসেবেও কাজ করে মাছটি। সুস্থ ফুসফুসের নিশ্চয়তা দেয়। অ্যাজমাও সারায়।
১২. এই মাছে আছে সেলেনিয়াম। এটি এক ধরনের এনজাইম উৎপন্ন করে, যা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ে। মূলত ব্রেস্ট ক্যানসার রোধে এর ভূমিকা অতুলনীয়। কিছু ক্ষেত্রে কোলোরেক্টাল, পেনক্রিয়েটিক ও প্রোস্টেট ক্যানসারও প্রতিরোধ করে। এই রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে ক্রনিক ইনফেকশন। রূপচাঁদা খেলে তা থেকে নিরাপদ থাকা যায়। ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতেও বাধা দেয় রূপচাঁদা।
১৩. পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে মাছটি। বিশেষত শুক্রাণু সবল করে।
১৪. মেনোপজকালীন রোগ ‘হট ফ্ল্যাশ’ কমাতে পারে রূপচাঁদা। বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি নামে নারীদের এক ধরনের রোগ হতেও মুক্ত করতে পারেÑ এই মাছ।
১৫. গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস এবং প্রসব-পরবর্তী মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুবই প্রয়োজন এই মাছ। কারণ গর্ভে থাকাকালীন সময়ে শিশুর মগজ ও চোখের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে এই মাছ।
১৬. দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে রূপচাঁদা। গ্লুকোমা থেকেও রেহাই দেয়।
১৭. অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ দূর করতে এই মাছের জুড়ি নেই। আলসারেটিভ কোলাইটিসের পথ্য হিসেবে কাজ করে।
১৮. শরীরে সার্জারি হলে সেই ক্ষত দ্রুত সারাবে রূপচাঁদা।
১৯. ত্বকের সুস্থতা নিশ্চিত করে রূপচাঁদা। এছাড়া চামড়ায় আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতি নির্মূল করতে পারে রূপচাঁদা।
ভেটকি
ভেটকি মাছ এশিয়া অঞ্চলে Sea bass বাংলাদেশে কোরাল এবং ভেটকি এই দুই নামে পরিচিত। ভেটকি মাছ শুধু সমুদ্র হতেই আহরণ করা হয় না। চাষ হয় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীর মোহনায় এবং চিংড়ির ঘেরে। মাছটি অত্যন্ত সুস্বাদু। পুষ্টিগুণে ভরপুর। ভোক্তা চাহিদা বেশি এবং মূল্যও বেশি। তাই মাছ চাষিদের আগ্রহও বেশি। মাছটির কদর দেশ-বিদেশের কোথাও কোনো কমতি নেই। কারণÑ
১. এই মাছে আছে উন্নতমানের আমিষ, ওমেগা-থ্রি এবং ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি এসিড। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
২. ভিটামিন এ, বি এবং ডি, খনিজ পদার্থ ক্যালসিয়াম, জিংক, লৌহ, পটাসিয়াম, ম্যাগনিসিয়াম এবং সিলেনিয়াম যথেষ্ট পরিমাণে আছে ভেটকি মাছে। এসব উপাদানই শরীর গঠন ও বৃদ্ধির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. এই মাছ মানসিকভাবে আমাদের খুশি রাখে এবং আবেগও নিয়ন্ত্রণ করে৷

চিংড়ি
চিংড়ি যা মাছ নয়, বইয়ের ভাষায় সামুদ্রিক পোকা। ইহাই বাংলাদেশের হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা হিসেবে খ্যাত। ভোজনরসিক তথা আবাল বৃদ্ধ বনিতার প্রথম পছন্দ যদি এলার্জির সমস্যা না থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি সমুদ্র হতে ধরা হয়। যেমনÑ বাগদা, গলদা, বাধাতারা, ডোরাকাটা, চাগা, বাঘ চামা, হরিণা, ললিয়া এবং রুড়া ইত্যাদি। উল্লিখিত চিংড়ি প্রজাতির মধ্যে বাগদা চিংড়ির মূল্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি থাকায় এর বাণিজ্যিক আহরণ বেশি। তবে মোট চিংড়ি উৎপাদনের সর্বাধিক অবদান রাখে হরিণা চিংড়ি। আর গলদা চিংড়ি মোটা মাথাবিশিষ্ট ও কঠিন খোলসে মোড়ানো। ইহা লবস্টার নামেও খ্যাত। চিংড়ি আহরণের জন্য চিংড়ি চাষিরা শুধু সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, তারা সমুদ্রের পাশে বাঁধ দিয়ে লবণ পানি আটকিয়ে ঘের তৈরি করে চিংড়ি চাষ করে থাকেন। স্বাদে অতুলনীয় এই মাছ সম্পর্কে আর একটু আলোকপাত করলে কেমন হয়Ñ
চিংড়িতে আছে জিঙ্ক। এছাড়াও আছে সেলেনিয়াম ও ভিটামিন এ। এই প্রত্যেকটা উপাদানই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হার্ট সুস্থ রাখে। ফলে চিংড়ি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়।

লইট্টা
ইড়সনধু উঁপশ নাম শুনে ইহা হাঁস মনে হলেও কিন্তু এটি হাঁস নয়। ইহা আমাদের সামুদ্রিক মাছ লইট্টা। ব্রিটিশদের দেওয়া এই নাম। ইহা খুবই স্বস্তা। তবে পুষ্টিতে ভরপুর। তাহলে পুষ্টির দিকে একটু দৃষ্টি দেইÑ
১. লইট্টা মাছ প্রোটিনে ভরপুর। আর প্রোটিন আমাদের শরীরের টিস্যু গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
২. লইট্টা মাছে রয়েছে অতি উপকারী ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড। এটি মানুষের শরীরের রক্তনালীগুলোকে পরিষ্কার রেখে হার্ট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া অতিরিক্ত রক্তজমাট বাঁধা প্রতিহত করে, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের লেভেল কমায় এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
৩. লইট্টা মাছ আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীর জন্য খুবই উপকারি। এই মাছের তেল দারুণ এক ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে কাজ করে। শক্ত হাঁড় ও দাঁত তৈরি করতে সাহায্য করে লইট্টা মাছ।
৪. লইট্টা মাছ কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।
৫. লইট্টা মাছে থাকা ক্যালসিয়াম উচ্চ রক্তচাপ কমায়। এছাড়াও এই ক্যালসিয়াম পিরিয়ড শুরুর প্রাক্কালে নারীদের যে মুডজনিত মানসিক সমস্যা হয়, তা কমায়।
৬. লইট্টা মাছে রয়েছে প্রচুর আয়রন, যারা রক্ত স্বল্পতায় দারুণ কার্যকরি। লইট্টা মাছ হিমোগ্লোবিন তৈরি করে।
৭. লইট্টা মাছ পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে।
৮. ব্রেইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৯. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
১০. শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
১১. ইনসমনিয়া কমায়।
১২. পরিপাকে সহায়তাসহ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি, ত্বক ও ঠোঁটের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে লইট্টা মাছ।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। সৃষ্টিকর্তা অকৃপণ হাতে দান করেছেন। তবে আমাদের এই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। যেমনÑ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বা প্যারাবন রয়েছে। প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানির পুষ্টিচক্র সমাধান করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার, স্বাদু ও লবণ পানির মিশ্রণ স্থলে প্যারাবন বিশেষ বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্যতায় সামুদ্রিক জীবদের আঁতুড় অবস্থায় খাদ্য আহরণ ও বেঁচে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করে। মনুষ্য প্রয়োজনে এই প্যারাবন ধ্বংস করা যাবে না। প্রতি বছরই লবণাক্ততার পরিমাণ ও স্থায়িত্ব বাড়ছে পানিতে। আগে সামান্য বৃষ্টি ও হিমালয়ের বরফ গলা পানির স্পর্শ পেলেই লবণ দূরীভূত হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে প্রবল বর্ষণেও লবণ দূর হয় না। লবণ পানির প্রভাবে মাটি ও ভূগর্ভে লবণাক্ততার পরিমাণ কেবল বাড়ছেই। এ-কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের জলীয় পরিবেশ ধ্বংস করার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলোÑ শিল্পের বিষাক্ত আবর্জনা, নৌযান থেকে চুইয়ে পড়া তেল, অপ্রয়োজনীয় মাছ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া, বেআইনি ও বেশি পরিমাণে মাছ শিকার, পলি জমা হওয়া এবং দীর্ঘসময় বন্যার পানি জমে থাকা, উজান থেকে বেশি পরিমাণে আবর্জনা বয়ে আসা, কৃত্রিম হ্যাচারি, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং মৎস্য খাতের নানা অব্যবস্থাপনা। তাছাড়া মাছ থেকে শুঁটকি তৈরির সময় যে কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয় সেগুলো চুইয়ে পানিতে মিশা।
সামুদ্রিক মাছের উপকারের কথা তো জানলাম। কিছু সামুদ্রিক মাছ আছে, যা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এদের মধ্যে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আয়োডিন, সিজিয়াম, পারদ মিনারেল ম্যাগনেসিয়াম, ইত্যাদি। মাছগুলো হলোÑ ম্যাকরল, ক্যাভিয়ার, ইল মাছ তথা বানমাছ, সোর্ডফিস তথা তরোয়াল মাছ, টুনা মাছ, স্যালমন মাছ এবং হাঙ্গর মাছ।
অন্য দৃষ্টিতে একটু তাকাই। যে নব সামুদ্রিক মাছ আমরা খেতে পারব না সেগুলো আমরা অন্যভাবে ব্যবহার করতে পারি।
১. ছোট ছোট টুকরো করে গৃহপালিত মাংসাশী প্রাণীদের খাওয়ানো যেতে পারে।
২. শুকিয়ে শুকিয়ে মাংসাশী প্রাণীদের খাবারের মান উৎকৃষ্ট করার জন্য মেশানো যেতে পারে।
৩. গাছের জন্য উৎকৃষ্টমানের সার তৈরিতে এগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে।
মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকার এখন ব্লু ইকোনমি (এমন সমুদ্রনীতি যাতে সমুদ্র সম্পদও আহরণ হবে এবং পরিবেশও রক্ষা হবে) অনুসরণ করছে। এমন নির্দেশনা মেনে চললে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক মাছের রপ্তানি আরও বাড়বে। তাতে স্থানীয় অর্থনীতির চাকা যেমন গতিশীল হবে, তেমনি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও আরও বড় ভূমিকা রাখবে সামুদ্রিক মাছ।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য