Saturday, July 13, 2024
বাড়িত্রয়োদশ বর্ষ,নবম সংখ্যা, আগস্ট-২০২৩শেখ কামাল : যুগোত্তীর্ণ এক স্বপ্নচারীর জন্মদিন

শেখ কামাল : যুগোত্তীর্ণ এক স্বপ্নচারীর জন্মদিন

রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও খেলাধুলা-সংস্কৃতি চর্চায় তার ঝোঁক ছিল অভাবিত। আবাহনীর নবযাত্রায় শেখ কামালের অবদান, আবাহনীকে গড়ে তোলার স্বপ্ন, দেশের ফুটবলে প্রথম বিদেশি কোচ নিয়ে আসা, দর্শকপ্রিয় দল হিসেবে আবাহনীকে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল স্মরণীয়।

আরিফ সোহেল: শেখ কামালের শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ২০৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- “একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু (শেখ হাসিনা) ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাসিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনেই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা’।”

সেই আদরের শেখ কামালের জন্মদিন ৫ আগস্ট। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শহিদ শেখ কামালের ৭৪তম জন্মবার্ষিকী। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্মদিন পালিত হয় অমোঘ শোকের বাতাবরণে।
১৯৪৯ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় শেখ কামালের জন্ম। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বিপথগামী একদল সেনা কর্মকর্তার নির্মম বুলেটে শাহাদাতবরণ করেন তিনি। এই দিনে নানা আয়োজন-অনুষ্ঠানের গল্প ধরাবাধা নিয়মেই চলে আসছে। তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান আবাহনী লিমিটেডের ব্যানারে, এর বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের জন্য নানা নমিত নিবেদন ছিল এবারও। আবাহনী লিমিটেড প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ কামালের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ; বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত তার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে নানা রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন। তার স্মরণে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে বিপুল সমারোহে।
শেখ কামালের নামে প্রতিবারের মতো এ বছরও ‘শেখ কামাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার-২০২৩’ প্রদান করা হয়। ৮টি ক্যাটাগরিতে মোট ১০ জন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও ২টি প্রতিষ্ঠানকে ৫ আগস্ট ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেন। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হয়। পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে আজীবন সম্মাননা পান আবদুস সাদেক। খেলোয়াড় হিসেবে পুরস্কার পান নারী ফুটবলার সাবিনা খাতুন, ক্রিকেটার তাসকিন আহমেদ ও ভারোত্তোলক জিয়ারুল ইসলাম। উদীয়মান খেলোয়াড় ক্যাটাগরিতে মুহতাসিন আহমেদ হৃদয় ও আমিরুল ইসলামকে পুরস্কৃত করা হয়। ক্রীড়া সাংবাদিক ক্যাটাগরিতে খন্দকার তারেক মো. নুরুল্লাহ ও ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার হিসেবে পুরস্কার পান আতাহার আলী খান। এ ছাড়া ক্রীড়াসংগঠক হিসেবে পুরস্কার পান মালা রানী সরকার ও ফজলুল ইসলাম। কর্মচঞ্চল ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন এবং পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) পুরস্কার পায়।
ক্রিকেট, ফুটবল, হকিসহ ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের দেশ গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করছে। কিন্তু ১৯৭১-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঠিক সময়ে ধূমকেতুর মতো ক্রীড়াঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছিল একজন স্বপ্নচারী শেখ কামালের। বহুমাত্রিক অনন্য সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী তারুণ্যের দীপ্ত কামালের শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেট বলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। শেখ কামাল আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুপরিচিত। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও খেলাধুলা-সংস্কৃতি চর্চায় তার ঝোঁক ছিল অভাবিত। আবাহনীর নবযাত্রায় শেখ কামালের অবদান, আবাহনীকে গড়ে তোলার স্বপ্ন, দেশের ফুটবলে প্রথম বিদেশি কোচ নিয়ে আসা, দর্শকপ্রিয় দল হিসেবে আবাহনীকে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল স্মরণীয়।
প্রতীক শহিদ শেখ কামাল শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ অনার্স পাস করেন। ‘ছায়ানট’ ছিল তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান; ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতায়ও তার অনন্য ভূমিকা ছিল। অভিনেতা হিসেবে শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে সুপরিচিত ছিলেন। শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশনন্ড লাভ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানির এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্লু’ দেশবরেণ্য অ্যাথলেট সুলতানার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিত, সংগ্রামী ও আদর্শবাদী কর্মী হিসেবে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
মাত্র ২৬ বছরের জীবনে একটা মানুষ কত কিছু করতে পারেন ভাবা যায় না। ক্রীড়াঙ্গন তো বটেই; ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের অনেকের সঙ্গে কথা বলে শেখ কামালকে চেনাজানা যায় অন্যভাবে। সত্তরের দশকে দেশীয় ফুটবলে শৈল্পিক ছোঁয়া এনে দিয়েছেন শেখ কামালই। অল্প বয়সেই ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বেশ কিছু ভূমিকা কামাল রেখেছেন। তিনি ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন ধূমকেতুর মতো। ক্ষণকালের জন্য এসেছিলেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনে তার জাদুকরি উদ্যোগে হয়েছে সমৃদ্ধ। আর শেখ কামাল করেছে ইতিহাস রচনা। এরপর ১৯৭৫ এসে সেই শেখ কামাল এক আফসোসের নাম। প্রয়াত শেখ কামাল এক আফসোস হয়ে জ্বলজ্বল করছেন দেশের সংস্কৃতি আর ক্রীড়াঙ্গনের আকাশে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্যে শেখ কামালের অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য তাকে মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।

 

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য