Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderলন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিনঃ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠদিনের ঘটনাপঞ্জি

লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিনঃ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠদিনের ঘটনাপঞ্জি

মনি হায়দার: বাঙালির ইতিহাস ভাঙাগড়ার ইতিহাস। হয়তো পৃথিবীর সব জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ভাঙা এবং গড়ার সম্পর্ক। কিন্তু বাঙালির, বাংলাদেশের এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস পৃথিবীর অন্যদেশের সঙ্গে মিলবে না। এই ইতিহাস মাটি আর মানুষের করতল থেকে জীবন বিসর্জনের যে মহাক্ষেত্রফল, সেটা পৃথিবীর অন্য জাতির নেই। কেননা, আমাদের আছে পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাস, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার জন্য লড়াই মিছিল এবং জীবন উৎসর্গ, ৬-দফার ইতিহাস, সত্তরের নির্বাচনের ঘটনা, অদম্য নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন; কিন্তু পাকিস্তানের রক্তলোলুপ সামরিক জান্তারা বাঙালির দ্বারা শাসিত হতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাঙালির ওপর বর্বর পাকিস্তানিদের রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ হত্যার উৎসবে মেতে ওঠা, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বাঙালি জাতির জনগণমন নায়ক শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে দিনের পর দিন বন্দি করে রাখা।
আমরা যখন বলি, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন-দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন, তখন অজান্তেই ইতিহাসের অজস্র শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলোকে মুছে ফেলি। জাতির পিতার আরাদ্ধ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে আসার গোটা ঘটনা একটি লাইনে বা দুটি লাইনে লিখে দিতেই পারি; কিন্তু ইতিহাসের সমগ্র ঘটনাপঞ্জি হারিয়ে যায় বা মুছে যায়। ইতিহাসের সেই হারিয়ে ফেলা ঘটনাপঞ্জির আদিঅন্ত বিবরণ সমৃদ্ধ একমাত্র পুস্তক- ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’।
বাংলাদেশের পার্লামেন্টেরি গণতন্ত্রের বিশিষ্ট গবেষক ড. জালাল ফিরোজ বাঙালির ও বঙ্গবন্ধুর সেই অসমান্য দিনটির প্রতিটি মুহূর্ত ব্রিটিশ পত্রিকা ঘেটে তুলে এনেছেন, প্রতœ গবেষণার গভীর আগ্রহে। আগেই লিখেছি, সেই দিনের ঘটনাবলি আমরা কয়েকটা লাইনে জানি। কিন্তু সেই কয়েকটা লাইন অতিক্রম করে ২০০ পৃষ্ঠার অধিক একটা বই হতে পারে, প্রমাণ ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’। বইটি পাঠের মধ্য দিয়ে আজ থেকে ৫০ বছরের পরে ৮ জানুয়ারির কাছে ফিরে বঙ্গবন্ধুর সেই দিনকে যেমন উপলদ্ধি করা যায় তেমনি অনুভব করা যায় ইতিহাসের রোমাঞ্চকর যাত্রার এক মহালগ্ন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় কর্মদিবস ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। এদিন তিনি যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে ছিলেন। লন্ডনের সাড়ে ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, বিরোধী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন, ব্রিটিশ এমপি পিটার শোর, কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেল আর্নল্ড স্মিথ, ভারতের হাইকমিশনার আপা পান্থের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ব মিডিয়ার মুখোমুখি হন। প্রবাসী বাঙালিদের সাক্ষাৎ দেন। শত্রুর কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সৃষ্ট রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বন্ধু-রাষ্ট্রের রাজধানীতে এভাবে কর্মব্যস্ত দিন কাটানোর ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
মাত্র তো একটা দিন, ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি! একজন মানুষ, বঙ্গবন্ধু। বাঙালি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতা। পৃথিবীর সকল মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। একটা জাতির জীবনে এমন দিন কি প্রতিদিন আসে? হাজার বছরে একদিন আসে। এসেছিল ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি, কেন্দ্রবিন্দু শালপ্রাংশু দেহের অধিকারী সুদর্শন মুজিব। যে মুজিব মাত্র ৫২ বছরে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন, ভাষাকেন্দ্রিক পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্রÑ বাংলাদেশ। সুতরাং ঘটনার বিচিত্র ঘটনা পরম্পরা সেই দিনের ব্রিটেনের সাংবাদিকরা কেমন করে আলো ফেলেছিলেন, কীভাবে অনুধাবন করেছিলেন বিশ্বের নবীনতম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে, তারই সুরুক সন্ধান করে, পত্রিকাগুলো ঘেটে ছেনে তুলে ধরেছেন ড. জালাল ফিরোজ ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইটিতে।
বইয়ের শুরুতে অনন্যসাধারণ মুখবন্ধ লিখেছেন লেখক ড. জালাল ফিরোজ। সেই মুখেবন্ধে বইটি লেখার উৎস থেকে অনুপ্রেরণার সকল দৃশ্যপর্ব বর্ণনা করেছেন পরিশীলিত চৈতন্যে। বইটির মোট পর্ব ৫টি। পর্ব ৫টি যথাক্রমে প্রথম অধ্যায়Ñ বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার : কারাগার থেকে ক্ল্যারিজেস, দ্বিতীয় অধ্যায়Ñ বঙ্গবন্ধুর লন্ডনের দিন, তৃতীয় অধ্যায়Ñ ব্রিটিশ সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, চতুর্থ অধ্যায়Ñ দেশ-গঠনে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ : ব্রিটিশ পত্রিকার ভাষ্য, পঞ্চম অধ্যায়Ñ বঙ্গবন্ধুর লন্ডন গমন : প্রভাব। এবং ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ের শেষে রয়েছে প্রতিবেদন/মন্তব্য/সম্পাদকীয়? চিঠি।
মুখবন্ধে ড. জালাল লেখেনÑ “বঙ্গবন্ধুর লন্ডন অবস্থান এবং ৮ই জানুয়ারির ব্যস্ত দিনের খবর ৯ই জানুয়ারির ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোতে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। কেবল ৮ই জানয়ারির খবর নয়, দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তথা ঢাকায় পৌঁছানোর এবং দেশবাসী কর্তৃক তাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা প্রদানের খবরও ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রধান সংবাদ হিসেবে পরিবেশিত হয়েছে। শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়, বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে অবস্থান এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ওপর পত্রিকাগুলোতে নানা ধরনের মন্তব্য, কলাম, চিঠি, সম্পাদকীয় ও সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়। পত্রিকাগুলোর এসব প্রকাশনায় ব্রিটিশ জনমনের প্রতিফলন ঘটে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেন সেসবের সংবাদ এবং সেসব নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক ও ভিন্নমত ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো বিতর্কে ব্রিটেনের নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরাও অংশ নেন। বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি নিয়ে সেই সময় প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডব্লিউ. এইচ. মরিস-জোনস প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দি টাইমস’-এর সঙ্গে বিতর্ক করেন।”
এতদিন লন্ডনের পত্রিকাগুলোর পাতায় লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই স্বর্ণোজ্জ্বল দিনটির গাঁথা। সেই গাঁথা গভীর যতেœ ও ইতিহাসের অনিবার্য উপাদান হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন ড. জালাল ফিরোজ, ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ে। এত বিচিত্র, কৌতূহলময় ঘটনার সমাবেশ বইটিতে আছে, পাঠ শুরু করলে শেষ না করে নিস্তার নেই পাঠকের। ইতিহাসের প্রতিটি মুহূর্তের একটা শুরু আছে, বইটির কেবল লন্ডন অধ্যায় নয়, শুরুর যাত্রাÑ যা শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে। পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনী যেভাবে গ্রেফতার করে বাঙালির জনগণমনও নেতাকে, সেই অভিযানে পাকিস্তান বাহিনীর কে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সবই তুলে ধরা হয়েছে গবেষণার মানদ-ের নিরিখে। ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইটি কেবলমাত্র ইতিহাস উল্লেখ্য নয়, একই সঙ্গে বাঙালির জীবন তৃষ্ণার গভীর সংবেদও। সেই সংবেদ চেতনার রঙে রঙিন করে তুলেছেন বইটির পাতায় পাতায় অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী ড. জালাল ফিরোজ। আমরা জানি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা গ্রেফতার করে লায়ালপুর আর মিয়ানওয়ালি কারাগারে আটকে রেখেছিল। কিন্তু আমরা ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ে আরও একটি কারাগারের সন্ধান পাই। আত্তক দুর্গ, যে দুর্গ মুগল সম্রাট আকবরের সময়ে ১৫৮১-৮৩ সালে নির্মিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে যে আত্তক দুর্গে রাখা হয়েছিল, তার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায়, ইসলামাবাদের ব্রিটিশ হাইকমিশনের বার্তা থেকে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু-সম্পর্কিত কোনো গ্রন্থে আত্তক দুর্গের নাম পাওয়া যায়নি। প্রথম পাওয়া গেল ড. জালাল ফিরোজের ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ে। এই উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়, গবেষণার দৃষ্টি প্রসারিত করলে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকা তথ্য কণিকা তুলে আনা সম্ভব।
‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইটির অনন্য বৈশিষ্ট্য, প্রতিটি অধ্যায়ের ভেতরের ঘটনাবলি ছোট ছোট পর্বে তুলে ধরা। যেমন ধরা যাকÑ প্রথম অধ্যায়ের নামÑ বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার : কারাগার থেকে ক্ল্যারিজেসÑ ৫টি পর্বে ভাগ করে লিখেছেন, উতুঙ্গ ইতিহাসকে হাতের মুঠোয় রেখে নিজের মনন প্রজ্ঞায় এমনভাবে সাজিয়েছেন গবেষক ড. জালালÑ পড়ার সময়ে মনে হয় কেবল পড়ছি না, দেখছিও দৃশ্যের পর দৃশ্য। ৫টি পর্বÑ গ্রেফতার, ঢাকায় তিন দিন? আত্তক দুর্গ-লায়লপুর ও মিয়ানওয়ালি, কারাগারের বাইরে : অনুনয় বিনয় চাপ মুক্তি, বিশেষ ফ্লাইট : ট্র্যাটেজিক কার্গো, গ্রন্থবিন্যাস।
বিশেষ ফ্লাইট : ট্র্যাটেজিক কার্গোÑ পাকিস্তান থেকে যে বিমানে করে ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বহন করে লন্ডন যাচ্ছিল, সেই বিমানের নাম। বিশেষ সেই বিবরণে আমরা জানতে পারিÑ “পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এই বিশেষ ফ্লাইটের নাম দেওয়া হয় ট্র্যাটেজিক কার্গো। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ইসলামাবাদস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে অবহিত করে যে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইট লন্ডন যাচ্ছে। বিমান হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছার দুই ঘণ্টা পূর্বে ব্রিটিশ ফরেন অফিসকে এই খবর জানানোর জন্য হাইকমিশনারকে অনুরোধ করা হয়। এই ফ্লাইটে বঙ্গবন্ধু, ড. কামাল ও তাঁর পরিবারের অন্য তিনজন সদস্য এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা ছিলেন। ফ্লাইটটিকে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অন্য একটি বিমান অনুসরণ করছিল। ৯ই জানুয়ারি ‘সি সানডে টাইমস’-এর খবরে বলা হয়, এই বিমানের আরোহীদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা।” [পৃষ্ঠা : ২৪]
ছোট ছোট পর্বের মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদমন্দিরে খোদিত করে দেওয়া হয় ইতিহাসের ধারাপাত, যে ধারাপাত কখনও মুছে যাবে না। বাঙালি জাতিসত্তার জনমনোনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতিটি দিনÑ বাঙালির দিন, ইতিহাসের দিন, সৃজনের দিন, ভাঙা-গড়ার দিন, মিছিলের দিন, জেল খাটার দিন, সেøাগানের দিন, জীবন উৎসর্গের দিন, জেলে যাবার দিন, জেলের তালা ভাঙার দিন, যুদ্ধের দিন, জয় বাংলার দিন, ৩২ নম্বর বাড়ির দিন… সুতরাং তিনি যেখানে পা রেখেছেন, বক্তৃতা করেছেন, হয়ে উঠেছে অসামান্য গৌরব আর ইতিহাসের পৃষ্ঠা গড়ার দিন।
শেখ মুজির এই ভূখ-ের নাম রেখেছেনÑ বাংলাদেশ। জীবনের মুহূর্তকালও নিঃশব্দ থাকেননি, বাঙালির অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের মহাসংগ্রামের নিমিত্ত। জেল খেটেছেন বছরের পর বছর। সত্তরের নির্বাচনে, ৭ মার্চের ভাষণে, দেশের সীমানা অতিক্রম করে তিনি ছড়িয়ে পড়েছেন, বিদেশের জনতার কাছে বাঙালির একমাত্র বৈধ ও সাংবিধানিক নেতা হিসেবে। যখন ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে বাংলার মটিতে আগ্রাসী পাকিস্তানি পৈচাশিক বাহিনীর বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধু যদিও বন্দি পাকিস্তানের কারাগারে কিন্তু বাঙালিরা যুদ্ধ করেছে হাজার হাজার মাইল দূরের নির্জন কারাগারের নেতা বঙ্গবন্ধুর নামেই। বাঙালির প্রথম সরকার গঠিত হয়েছেÑ ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে। মুজিব কোথায় না ছিলেন? তিনি ছিলেন বাঙালির মাটিতে, বাঙালির সেøাগানে, বাঙালির যুদ্ধাস্ত্রের নলে, অন্তরীক্ষের চেতনায়Ñ সেই মুজিব যেখানে যাবেন, বাঙালির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে, স্বাভাবিক স্রোতে সংবাদপত্র, মিডিয়া, জনগণ মুজিবের দিকে ছুটে আসবেন। জানতে চাইবেনÑ পাকিস্তানের কারাগারে যাপন দিনরাত্রির যন্ত্রণাময় ঘটনা, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মি. ভুট্টোর সঙ্গে কি বিনিময় হলোÑ আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নযাত্রা কেমন, জানতে তো চাইবেই। বিস্ময়কর ঘটনা মুজিবের জনগণঅন্তপ্রাণের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু বিমান থেকে নেমে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত স্যুইটে নেওয়া হলো। চলে আসেন দক্ষিণ এশীয় ডেক্সের প্রধান ব্রিটিশ কূটনীতিক মি. সাদারল্যান্ড। তিনি এসে বঙ্গবন্ধুকে জানান, আপনার জন্য লন্ডনের বিখ্যাত ক্ল্যারিজেস হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু ধন্যবাদ জানিয়ে অনুরোধ করেন, রাসেল স্কোয়ারের একটু স্বল্প খরচের হোটেলের ব্যবস্থা করা যায় কি না, কারণ অনেক বাঙালি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন। যখন তিনি সকল সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে তখনও তার চেতনার শীর্ষবিন্দুতে আমার জনগণ! সুতরাং তিনিও জণগণের নায়ক, ইতিহাসের স্বাভাবিক প্রবাহে সেটিই অনিবার্য সত্য, পরম সত্য।
বিশাল বইয়ের বর্ণনা দিতে গেলে আর একটি বই লিখতে হবে। সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ড. জালাল ফিরোজের ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ের পর্বগুলোর সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলে, সূত্র পাওয়া যাবে ইতিহাসের মহার্ঘ পানপাত্রের। এবং বুঝে নিতে পারবেন স্মৃতিময় সোনালি সোপানের যাত্রাকালে মহানায়কের সেই রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটির আবহসংগীতের পরম মূর্ছনা। বঙ্গবন্ধুর লন্ডনের দিন দ্বিতীয় অধ্যায়ের পর্বগুলো : হিথরোতে অবতরণÑ ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তার কান্নাÑ রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, হিথরো থেকে ক্ল্যারিজেস, প্রথম দর্শনার্থী, ভারতীয় হাইকমিশনার, টেলিফোন : কলকাতা দিল্লি ঢাকা ডাউর্নি স্ট্রিট, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব : তাড়াতাড়ি দেশে চলে এসো, ব্রিটিশ এমপি, সংবাদ সম্মেলন, বঙ্গবন্ধুর প্যালেস্টাইন নীতি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক, কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেল, প্রবাসী বাঙালি, ব্রিটিশ কমেট না-কি ভারতীয় বোয়িং ৭০৭, সাইপ্রাসে আড়াই ঘণ্টা, নয়াদিল্লি- বৈঠক : উৎফুল্ল বঙ্গবন্ধু, ব্রিটিশ সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধুর লন্ডনের একদিন, কেন লন্ডন, সাহায্যের আহ্বান ও ব্রিটিশদের শতাব্দীব্যাপী শোষণ, বিচারের প্রহসন, পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নিরাপত্তা শঙ্কা, ১১২ নম্বর স্যুইট : অস্থায়ী রাজধানী। এসব পর্বে দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম অংশ শেষ হলেও দ্বিতীয় অংশ শুরু করেন ড. জালাল ফিরোজ সাংবাদিকদের ভাষ্য দিয়ে। এই ভাষ্যে তিনি তুলে আনেন- শেষ পর্যন্ত মুজিব কীভাবে ফাঁসি থেকে বেঁচেছিলেনÑ এন্থনি মাসকারেনহাস, দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২; ভোরের নাটকীয় অবতরণ- নিকোলাস ক্যারল, দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২; ইয়াহিয়া খান গ্রেফতারÑ দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২; বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হিথের প্রতি মুজিবের আহ্বানÑ দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৯ই জানুযারি ১৯৭২; মুক্ত মুজিবের প্রথম দিন শুরু হয় অশ্রু নিয়েÑ এন্থনি মাসকারেনহাস, দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২, মুজিব-রহস্য : কেন লন্ডনেÑ কিথ রেনশা ও পিটার ভেন, সানডে এক্সপ্রেস, লন্ডন, ৯ই জানুযারি ১৯৭২; বাংলাদেশের জন্য ব্রিটিশ অর্থ : মুজিবকে হিথের আশ্বাসÑ এন্ড্রু উইলসন, দি অবজার্ভার, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২; শেখ মুজিব এলেন, হিথের সঙ্গে বৈঠক, চাইলেন সাহায্যÑ রোনাল্ড পেইন, কূটনৈতিক সংবাদদাতা, দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ৯ই জানুযারি ১৯৭২; ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে বিবাদ এড়িয়ে চলবেনÑ পিটার গিল, রাওয়ালপিন্ডি থেকে, দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২।
ড. জালাল ফিরোজের অনুসন্ধানে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বমিডিয়াসহ লন্ডনের প্রতিটি পত্রিকায় অনিবার্য ফোকাসবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। নানা পত্রিকার পোড় খাওয়া, অভিজ্ঞ এবং ঝানু সাংবাদিকরা নিজের দৃষ্টির ও বিশ্লেষণের আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন বাঙালির রাষ্ট্রপিতা শেখ মুজিবকে। দি ডেইলি টেলিগ্রাফের কূটনৈতিক সংবাদদাতা রোনাল্ড পেইন টুকরো টুকরো জমাট ভাষ্য থেকে ছোট একটা ভাষ্যÑ ‘নেতা বটে’ থেকেÑ “হোটেলের বিলাসবহুল কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। হঠাৎ অসংখ্য দুর্বিনীত টিভি ক্যামেরার আলোর মধ্যে ঈষৎ ক্লান্ত গোঁফওয়ালা উপমহাদেশের রিপ ভ্যান উইংকেল আবির্ভূত হন। কয়েক মাসের নির্জন সেলে কারাবাসের পর তিনি আবার একজন প্রকৃত নেতার মতোই উপস্থিত হন। কারাবাসের ফলে তাঁর গায়ের রং তামাটে ও অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিন্তু তিনি কথা বলছিলেন অভিজাত, ভিন্নমতাবলম্বী নেতাদের মতো স্পষ্ট কণ্ঠে। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া ও জাতীয় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন ও অপশক্তি পরাস্ত হওয়ায় তিনি সন্তোষের কথা জানান। এছাড়া তাঁর বলার খুব বেশি কিছু ছিল না। উপস্থিত উদ্দীপ্ত সমর্থক ও নিজের দেশে সাংবাদিকদের মুহুর্মুহু ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক’ সেøাগানের প্রতি উত্তরে তিনি নিজের সম্মতি ও সমর্থন জনাচ্ছিলেন।” [পৃষ্ঠা ৫৪]
ব্রিটিশ সাংবাদিকরা নিজস্ব ধ্যান ও ধারণার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন জনগণমননায়ক বঙ্গবন্ধুকে। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি মুহূর্ত সংবাদপত্রের পাতায় জাগ্রত রাখতে চেয়েছিলেন। কারণ, তখন তিনি কেবল বাংলাদেশের নেতা নন, তার মনোভঙ্গি প্রমাণ করেছে তিনি বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষেরও নেতা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাংবাদিকরা কেবলমাত্র লন্ডনের সময় ও কর্মকালীন মুজিবের সৃজনশীল ব্যক্তিসত্তাকে ধারণ করেই ক্ষান্ত হননি, ছুটে চলেছিলেন, বাংলাদেশেও। সেই পর্বও দারুণ অভিনিবেশের সঙ্গে ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে উপস্থাপন করেছেন ড. জালাল ফিরোজ ব্রিটিশ সংবাদপত্রের পাতা থেকে। বাংলাদেশের পত্রিকার মতো করেই ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোও ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বরণ করার প্রস্তুতির নানা দিক নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। সেসব সংবাদের টুকরো টুকরো উপভাষ্যÑ নেতা যখন এলেন : আনন্দ ও অশ্রু, এত মৃত্যু এত আত্মদান, অভিধা, পরিবারের আলিঙ্গন। ‘পরিবারের আলিঙ্গন’ প্রসঙ্গে দুটি ভাষ্য- “যাঁরা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি, তাঁদের মধ্যে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। বাড়িতে তিনি নীরবে অশ্রু ফেলছিলেন, তবে এবারেরটা ছিল আনন্দাশ্রু।” ডেইলি মিরর, [পৃষ্ঠা : ৮৭]
ডি ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ লেখেনÑ “বিশাল জনসভার পর শেখ মুজিব নিজের বাড়িতে এলে সেখানে এক আবেগঘন পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনেরা পুষ্প ও পাপড়ি দিয়ে তাঁকে বরণ করেন। বাবাকে পেয়ে তাঁর দুই কন্যা পরম আনন্দে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। এরপর তিনি ৯০ বছরের পিতার কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে তাঁকে কদমবুসি করেন। এই সময়ে তাঁর ৮০ বছরের মা কক্ষে প্রবেশ করলে তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।” [পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮]
এই অধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্বের সূচি- লন্ডন মুজিবের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নÑ এইচ বি বয়েন, ডি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২; মুজিবকে মিসেস গান্ধীর অভিনন্দনÑ দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২; মুজিবকে বরণ করতে আজ ঢাকা প্রস্তুতÑ ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ, ঢাকা থেকে, দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, বাংলাদেশ পছন্দমতো দাতা থেকে সাহায্য নেবেÑ দি ডিইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২; ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে যৌনউন্মত্তার অভিযোগÑ এম এফ এইচ বেগ, দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২; বাংলাদেশের সন্ধানেÑ দি ডেইলি টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২; দিল্লি মুজিবকে নায়কোচিত সংবর্ধনা দিলÑ দি টাইমস, লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, মুজিবকে বিভিন্ন উগ্রদল-উপদল নিয়ন্ত্রণে আনতে হবেÑ পিটার হেজেলহার্স্ট, ঢাকা থেকে ৯ জানুয়ারি, লন্ডন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২;…. এভাবে অজস্র ভাষ্য, সম্পাদকীয়, সংবাদ পরিপূর্ণ ছিল ব্রিটিশ পত্রিকায়।
ড. জালাল ফিরোজের অনবদ্য বই ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ ইতিহাসের ভিন্ন আলোয় দেখা অন্য মুজিবকে তুলে ধরেছে গৌরব এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। বাঙালি জাতি যতদিন বাঁচবে, এই কৃতজ্ঞতা চিরকার বহমান থাকবে অনন্য অদ্বিতীয় অসাধারণ শেখ মুজিবের জন্য। সেই ধারাবাহিকতায় ড. জালাল ফিরোজ তুলে এনেছেন ইতিহাসের আকর, গভীর প্রজ্ঞা আর মমতায়।
বইয়ের আর একটি দিক, লন্ডনের সেসব পত্রিকার রিপোর্ট, ভাষ্য, সম্পাদকীয় শেষের দিকে যুক্ত করেছেন ড. জালাল ফিরোজ। প্রেক্ষিতে বইটি কেবল ইতিহাসের ভাষ্য সমৃদ্ধ পুস্তকই নয়, বইটি প্রামাণ্যও হয়ে উঠেছে। জার্নিম্যান বুকস আমাদের প্রকাশনা জগতের রুচিস্নিগ্ধ প্রতিষ্ঠান। খুব যতœ আর পরিপাটের সঙ্গে জার্নিম্যান বুকস প্রকাশ করেছে ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান একজন মানুষ নয়, তিনি সাড়ে সাত কোটি মানুষের কণ্ঠ আশা-আকাক্সক্ষা একা ধারণ করে হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের একক প্রতীক। দিন যত যাচ্ছে ইতিহাসের ক্যানভাস ভেঙে শেখ মুজিবের জীবন ও কর্ম প্রকাশিত হচ্ছে শতধা ধারায়। বাঙালির সমগ্র চৈতন্যেজুড়ে একক সত্তা অমৃতপুত্র শেখ মুজিব। তাকে কেন্দ্র করে অনেক বই রচনা হয়েছে। আরও হবে কিন্তু নিবিষ্ট গবেষক, অনুবাদক, ড. জালাল ফিরোজের বই ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ ইতিহাসের প্রেক্ষিতে নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠা করবে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি ও কর্ম অনুধাবনের ক্ষেত্রে। এই বই অক্ষয় জীবনের অসাধারণ মানচিত্র… যে মানচিত্র ছাড়া মানুষের কোনো ভূগোল ও মাটি থাকে না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধসেপ্টেম্বর মাসের দিবস
পরবর্তী নিবন্ধআজ থেকে মানুষ হলাম
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য