Sunday, February 5, 2023
spot_img
বাড়িSliderরাসেলের সাদা পায়রা

রাসেলের সাদা পায়রা

কাঁদতে কাঁদতে রাসেল তার ঝুঁটিওয়ালা সাদা বাকুমের রক্তাক্ত শরীর হাতে তুলে নিয়ে বলে, ‘তোমরা কেন এই পায়রাটাকে মারলে। তোমরা জানো না ও শান্তির প্রতীক?’

আনিসুল হক: রাসেলের প্রিয় ঝুঁটিওয়ালা সাদা কবুতরটা। সে তাকে ডাকে, সাদা বাকুম বলে। ৩২ নম্বরের বাড়ির উঠোনের এক কোণে পায়রার বাসা। সেখানে অনেক ধরনের পায়রার বাস। সারাদিন এরা বাক বাকুম বাক বাকুম বলে ডাকে। আব্বা এদের দিনে দুবার আধার খেতে দেন। পায়রাগুলো আব্বাকে খুব পছন্দ করে। আব্বা উঠোনে বেরোলেই এরা একে একে উড়ে আসে। উঠোনে নামে। কেউ কেউ আব্বার কাঁধে বসে। কেউ উড়ে এসে বসে আব্বার হাতের তালুতে। আব্বা এদের ধান, গম, চাল, ভুট্টার দানা খেতে দেন। আব্বার পেছন পেছন আসে রাসেল। তার বয়স ১১ বছর হবে আর দুই মাস পরেই। সে সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। সে-ও আব্বার হাতের বাটি থেকে খাদ্যদানা নিয়ে আকাশে ছুড়ে দেয়। ঝুঁটিওয়ালা সাদা কবুতরটা পতপত করে পাখা নাড়তে নাড়তে তার সামনে আসে, স্থির হয়ে ওড়ে। হাত থেকে খাবার তুলে খায়। সে আর কোথাও যাবে না। রাসেলের সামনেই একটা হেলিকপ্টারের মতো ওড়ে। রাসেল হাত বাড়িয়ে দেয়। পায়রাটা তার বাহুতে এসে বসে। হাতের তালু থেকে যবের দানা তুলে খায়। রাসেল খুব খুশি। ‘আব্বা, এই সাদা বাকুমটাই সবচেয়ে ভালো, তাই না আব্বা?’
আব্বা বলেন, ‘নিশ্চয়ই। সাদা কবুতর মানে কী, জানো?’
‘সাদা কবুতরের আবার মানে আছে না-কি?’ রাসেল গোল গোল চোখে আব্বার দিকে তাকায়।
‘সাদা কবুতর মানে শান্তি’ আব্বা বলেন। তার পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি।
‘শান্তি মানে তুমি বোঝ?’ আব্বা আবার জিজ্ঞেস করেন।
‘জি আব্বা। শান্তি মানে হলো যুদ্ধ না করা। মারামারি না করা। গ-গোল না করা। আপনি জুলিও কুরি পুরস্কার পেয়েছেন, সেটাও জানি। সেটা পেয়েছেন শান্তির জন্য।’
আব্বা তার পিঠে চাপড় দেন। ‘এই তো আমার ছেলে বড় হয়ে গেছে। সে তো দেখছি সব বোঝে। বলো তো, যুদ্ধ ভালো না শান্তি ভালো?’
‘শান্তি ভালো আব্বা। যুদ্ধের সময় আমাদের মিলিটারিরা বাড়ি থেকে বের হতে দিত না। তারা আমাদের বন্দুক দিয়ে ভয় দেখাত। তারা অনেক বাঙালিকে মেরে ফেলেছে। আমি জানি, আব্বা।’
আব্বা বলেন, ‘হ্যাঁ। আমরা যুদ্ধ চাই না। শান্তি চাই। সাদা পায়রা হলো শান্তির প্রতীক।’
‘সেই কারণে আমরা কবুতরের মাংস খাই না। তাই না আব্বা?’
‘ঠিক। শান্তির প্রতীক কেমন করে খাই?’ আব্বা হেসে বলেন।
সকালবেলা। আজ ভোররাতে বৃষ্টি হয়েছে। উঠোনটা ভেজা ভেজা। বাড়ির গাছপালাগুলোর পাতা এখনও বৃষ্টিভেজা।
‘হাসুর আব্বা। আসো। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে’ আম্মার গলা।
‘আব্বা, আম্মা ডাকেন।’
‘চলো যাই’ আব্বা বলেন।
রাসেল বলে, ‘আব্বা, আপনি যান। আমি আসছি।’
আব্বা বাড়ির ভেতরে যান। রাসেলের পায়ে একজোড়া রাবারের স্যান্ডেল। পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে একটা টি-শার্ট। সে আব্বার পায়রাদের খাওয়ানোর বাটিটা নিজের হাতে তুলে নেয়। সে একা একা এদের খাওয়াবে। পায়রার সঙ্গে সঙ্গে চড়ুই, শালিক এমনকি কাকও চলে আসে। সে কাকদের দিকেও যবের দানা ছুড়ে মারে। কাকেরা এলে পায়রার দল চলে যায়। তখন সে কাকদের আরও একমুঠ দানা ছড়িয়ে দেয়। এদের খাওয়া হলে সে একটা কাঠি দিয়ে এদের তাড়ায়। তারপর হাঁক ছাড়ে, ‘বাক বাকুম বাক বাকুম, তোমরা চলে এসো।’
পায়রার দল আবার উড়ে আসে। তাকে ঘিরে ধরে। সে পায়রাদের খাবার দেয়। চড়ুই পাখিগুলোকেও খাবার দেয়। খাবার দেওয়া হয়ে গেলে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়।
বিকেলবেলা। রাসেল স্কুল থেকে ফিরে গোসল সেরে ভাত খেয়ে অপেক্ষা করছে, কখন বিকেল হবে। বিকেল আর কিছুতেই হয় না। আম্মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। রাসেল তার ছোট্ট সাইকেলটা নিয়ে বাড়ির বাইরের রাস্তায় চালাতে শুরু করে। কিছুদূর গেলে সুফিয়া খালাম্মার বাড়ি অতিক্রম করে যায়। তারপর সে ডানে বাঁক নেয়। তারপর আবার ডানে। তারপর বাঁয়ে। তারপর তার হুঁশ হয়। সে তো পথ হারিয়ে ফেলেছে। এবার সে কোন দিক দিয়ে ফিরবে।
আকাশে মেঘ। এখনই বৃষ্টি শুরু হবে। চারদিক কালো হয়ে আসছে। রাসেলের ভারি কান্না পায়। তার একা একা বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষেধ। কিন্তু সে নিষেধ শোনেনি। তাকে বলা হয়েছে, সাইকেল নিয়ে যেন সে বাড়ি থেকে বেশি দূর না যায়। সে তো অজানা রাস্তায় চলে এসেছে। এখন কী হবে! সে এদিক-ওদিক তাকায়। কোন দিক দিয়ে সে এসেছে, বুঝতে পারে না। সে সাইকেল ঘুরিয়ে চলতে শুরু করে। এই রাস্তা, তার দুধারের বিল্ডিং সে চেনে না। মনে হয়, সে বাড়ি থেকে আরও অনেক দূরে চলে এসেছে। সে এখন কী করবে? গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করবে? এখন যদি বৃষ্টি শুরু হয়?
হঠাৎ তার সামনে সে দেখতে পায় সাদা বাকুমটাকে। পাখিটা তার সামনে এসে বাতাসে পাখা মেলে ভেসে আছে। তাকে দেখে রাসেল বলে, ‘সাদা বাকুম। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।’ সাদা বাকুম বলে, বাক বাকুম বাক বাকুম বাক বাকুম। তার মানে হলো, রাসেল বোঝে, আমি এখন বাড়ি যাব। তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে চলো।
সাদা বাকুম আগে আগে ওড়ে। সাইকেল চালিয়ে রাসেল এর পেছন পেছন যায়। একটু পরেই রাসেল বুঝতে পারে, সে তার পরিচিত পথে এসে পড়েছে। এরপর আর তার ভয় নাই। সে বলে, ‘সাদা বাকুম, আমি এর পরের রাস্তা চিনি। তুমি আমার সাইকেলে এসে বসো।’ সাদা বাকুম ঠিক এসে তার সাইকেলের হ্যান্ডেলে বসে। সুফিয়া খালাম্মার বাড়ি পেরিয়ে রাসেল তাদের বাড়ির সামনে আসে। বাড়ির ভেতরে যায়। আম্মা এখনও ঘুমাচ্ছেন। সে আম্মার পাশে চুপটি করে শুয়ে পড়ে।
ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই কয়েকজন অন্ধকার পোশাক পরা মানুষ গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাসেলদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। রাসেল বলে, ‘ওরা গুলি ছুড়ছে কেন? ওরা জানে না, যুদ্ধ ভালো নয়, শান্তি ভালো?’ রাসেল দৌড়ে নিচে যায়। তার খুব ভয় লাগছে। গুলির শব্দ হচ্ছে। তার কানে তালা লাগার উপক্রম। সে আব্বা-আম্মা বলে কাঁদছে। তখন একঝাঁক পায়রা এসে রাসেলকে ঘিরে ধরে।
আমরা ওদের কিছুতেই তোমাকে মারতে দেব না।
অন্ধকার পোশাক পরা লোকগুলো পায়রাগুলোকে গুলি ছুড়তে থাকে। একটার পর একটা মরে পড়ে থাকে উঠোনজুড়ে। পায়রাগুলোর সাদা শরীর রক্তে লাল হয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রাসেল তার ঝুঁটিওয়ালা সাদা বাকুমের রক্তাক্ত শরীর হাতে তুলে নিয়ে বলে, ‘তোমরা কেন এই পায়রাটাকে মারলে। তোমরা জানো না ও শান্তির প্রতীক?’
সেনারা ততক্ষণে ওয়ারলেসে আরও একবার ব্রাশফায়ার করার অনুমতি পেয়ে গেছে।
[কল্পকাহিনি]

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য