Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderরাসুমণির শৈশব

রাসুমণির শৈশব

এম আবদুল হাকিম আহমেদ: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদরের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে রাত দেড়টায়। ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে আদর করে ডাকতেন রাসুমণি বলে। বঙ্গবন্ধু বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাসেলের বই পড়ে এবং বেগম মুজিব রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, তারা তাদের ছোট সন্তানের নাম বার্ট্রান্ড রাসেলের নামে রাখেন। অনেক বছর পর মা ফজিলাতুন্নেছার কোল আলো করে রাসেলের জন্মে বঙ্গবন্ধু পরিবারে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। শেখ রাসেলের জন্মের সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। রাতেই টেলিফোনে রাসেলের জন্মের খবর বঙ্গবন্ধু যেন পান সে-ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শেখ রাসেলের জন্মক্ষণ সম্পর্কে তার বড় বোন আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা ‘স্মৃতি বড় মধুর স্মৃতি বড় বেদনার’ নামক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে লিখেছেন, “১৯৬৪ সালের অক্টোবরে রাসেলের জন্ম। তখনও বাড়ির দোতলা হয়নি, নিচতলাটি হয়েছে। উত্তর-পূর্ব কোণে আমার ঘরেই রাসেলের জন্ম হয়। মনে আছে আমাদের সে কী উত্তেজনা! আমি, কামাল, জামাল, রেহানা, খোকা কাকাÑ অপেক্ষা করে আছি। বড় ফুফু, মেজ ফুফু তখন আমাদের বাসায়। আব্বা তখন ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচার কাজে। আইয়ুবের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করা হয়েছে সর্বদলীয়ভাবে। বাসায় আমাদের একা ফেলে মা হাসপাতালে যেতে রাজি না। তাছাড়া এখনকার মতো এত ক্লিনিকের ব্যবস্থা তখন ছিল না। এসব ক্ষেত্রে ঘরে থাকারই রেওয়াজ ছিল। ডাক্তার-নার্স সব এসেছে। রেহানা ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট মানুষটি আর কত জাগবে। জামালের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু, তবুও জেগে আছে কষ্ট করে নতুন মানুষের আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। এদিকে ভাই না বোন! ভাইদের চিন্তা আর একটি ভাই হলে তাদের খেলার সাথী বাড়বে, বোন হলে আমাদের লাভ। আমার কথা শুনবে, সুন্দর সুন্দর ফ্রক পরানো যাবে, চুল বাঁধা যাবে, সাজাবো, ফটো তুলব, অনেক রকম করে ফটো তুলব। অনেক কল্পনা মাঝে মাঝে তর্ক, সে-সঙ্গে গভীর উদ্বেগ নিয়ে আমরা প্রতি মূহূর্ত কাটাচ্ছি। এর মধ্যে মেঝ ফুফু এসে খবর দিলেন ভাই হয়েছে। সব তর্ক ভুলে গিয়ে আমরা খুশিতে লাফাতে শুরু করলাম। ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম। বড় ফুফু রাসেলকে আমার কোলে তুলে দিলেন। কি নরম তুলতুলে। চুমু খেতে গেলাম, ফুফু বকা দিলেন। মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল, ঘাড় পর্যন্ত একদম ভিজা। আমি ওড়না নিয়ে ওর চুল মুছতে শুরু করলাম। কামাল, জামাল সবাই ওকে ঘিরে দারুণ হইচই।”
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে রাসেল সবার ছোট। পরিবারের সব আনন্দ রাসেলকে ঘিরে। বড় ভাইবোনদের আদর সোহাগে রাসেল সোনা বড় হতে থাকে। জন্মের প্রথম দিন থেকে রাসেলের ছবি তোলা শুরু হয়। সব ভাইবোন মিলে ওর জন্য আলাদা একটা অ্যালবাম করেছিলেন। রাসেলের জন্মের দিন, প্রতি মাস, প্রতি তিন মাস, ছয় মাস অন্তর ছবি অ্যালবামে সাজানো হতো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু ভবন থেকে অন্যসব জিনিসপত্রের সাথে অ্যালবামটা লুট করে নিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অতি যতেœ তোলা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার আদরের ছোট্ট রাসেলের অনেক দুর্লভ ছবি। রাসেল তার বড় বোনকে ‘হাসুপা’ বলে ডাকতেন। বড় দুই ভাই কামাল ও জামালকে ‘ভাই’ বলতেন আর ছোট বোন রেহানাকে ‘আপু’ বলতেন। রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছেন, আধো আধো কথা বলতে শিখেছেন, বঙ্গবন্ধু তখন ৬-দফা দিলেন, তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল তার পিতা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজতেন।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে অনেক কবুতরের ঘর ছিল। সেখানে অনেক কবুতর থাকত। রাসেল খুব ভোরে মায়ের সাথে ঘুম থেকে উঠে নিচে যেতেন, মায়ের সাথে নিজের হাতে কবুতরের খাবার দিতেন, কবুতরের পিছন পিছন ছুটতেন। কবুতরের প্রতি রাসেলের ছিল আলাদা রকম মায়া-মমতা। রাসেলকে কবুতর দিলে কখনও খেতেন না। ছোট্ট বাচ্চা রাসেল কীভাবে যে টের পেতেন তা কে জানে। শত চেষ্টা করেও কেউ কোনোদিন রাসেলকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে প্রতি ১৫ দিন পরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বেগম মুজিব সন্তানদের সবাইকে নিয়ে দেখতে যেতেন। রাসেলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইতেন না। খুব কান্নাকাটি করতেন। রাসেলকে বোঝানো হতো, “তার আব্বার বাসা জেলখানা তারা সেখানে আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছে।” বেশ কষ্ট করেই তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। বাসায় ফিরে রাসেল তার আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা বেগম মুজিব তাকে বোঝাতেন এবং তাকে (মাকে) আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। রাসেল মাকে আব্বা বলে ডাকতেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও শেখ রাসেলের প্রতি ছিল অপরিসীম পিতৃস্নেহ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কারাগারের দিনপঞ্জি ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামক গ্রন্থে অনেক জায়গায় তার কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন। উল্লিখিত গ্রন্থে ২৪৯ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “৮ই ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো।’ কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।” ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে অন্যত্র (পৃষ্ঠা-২৩৪) বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন, “রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের উপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই এদিক ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বলল, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কি করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, ‘তুমি রেহানাকে মার?’ রাসেল বলল, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিল, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।”
ছোট রাসেল পিঁড়িতে বসে বাসায় কাজের লোকদের সাথে ভাত খেতে খুব পছন্দ করতেন। বঙ্গবন্ধু ভবনে একটা পোষা কুকুর ছিল, নাম ছিল টমি। শেখ রাসেলের সাথে টমির খুব বন্ধুত্ব ছিল। রাসেল টমিকে নিয়ে খেলতেন। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যান। কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপু শেখ রেহানার কাছে এসে বলেন, ‘টমি বকা দিচ্ছে।’ টমি তাকে বকা দিয়েছে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। কারণ রাসেল টমিকে খুব ভালোবাসতেন। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে তার কষ্ট তো লাগবেই। ছোট্ট রাসেলের ছিল পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, কাছে পাওয়া, কাছে থাকার সান্নিধ্যের টান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় টানা তিন বছর কারাভোগের পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তি পান, তখন ছোট্ট রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তখন তার বাসায় নিচতলায় অফিস করতেন, শেখ রাসেল সারাদিন নিচে খেলা করতেন; আর একটু পরপর তার আব্বাকে দেখতে যেতেন। রাসেল মনে মনে বোধহয় ভয় পেতেন যে, “তাঁর আব্বাকে বুঝি আবারও হারিয়ে ফেলে।” ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাকহানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করলে বেগম মুজিব শেখ রাসেল ও শেখ জামালকে নিয়ে পাশের বাড়ি আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকহানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটা একতলা বাড়িতে আটক থাকেন। বন্দি অবস্থায় ছোট্ট রাসেল তার আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করতেন। যুদ্ধের মধ্যে বন্দি অবস্থায় বড় বোন হাসুপার ছেলে জয়ের জন্ম হলে রাসেল যেন একটু আনন্দ পান। সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকতেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় ভারতীয় যুদ্ধবিমান উড়তে শুরু করলে বিমানের আওয়াজ শুনে রাসেল জয়ের কানে তুলা গুঁজে দিতেন। আবার নিজের কানেও নিতেন। সব সময় তার পকেটে তুলা থাকত।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বন্দি বেগম মুজিবসহ পরিবারের অন্যরা সবাই ভারতীয় মিত্রবাহিনীর মেজর তারার সহযোগিতায় মুক্ত হন ১৭ ডিসেম্বর। সেদিন রাসেলই তাদের পতাকা হাতে সাদর অভ্যর্থনা জানান। মুক্ত হওয়ার পরপরই রাসেল মাথায় একটি হেলমেট পরে নিলেন। সাথে সমবয়সী টিটো নামে তাদের এক নিকটাত্মীয়ের ছেলেও পরলেন একটা। দুজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করলেন।
ছোট্ট রাসেলের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যেদিন বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলেন। সে ক্ষণিকের জন্যও তার আব্বাকে হাতছাড়া করতে চাইতেন না। সব সময় রাসেল তার আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াতেন। বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন সকালে গণভবনে আসতেন, অফিস করতেন। দুপুরে গণভবনেই খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম নিতেন। বিকালে হাঁটতেন। রাসেল প্রতিদিন বিকালে গণভবনে যেতেন, তার প্রিয় সাইকেলও সঙ্গে নিতেন। সাইকেল চালানো তার খুব প্রিয় ছিল। রাসেলের মাছ ধরা খুব পছন্দ ছিল। রাসেল মাছ ধরার পর আবার ছেড়ে দিতেন।
টুঙ্গিপাড়ায় রাসেলের ক্ষুদে বাহিনী ছিল। রাসেলের ক্ষুদে বাহিনীর জন্য ঢাকা থেকে জামাকাপড় কিনে দিতে হতো। রাসেল ক্ষুদে বাহিনীর সদস্যদের বাড়ির উঠানে প্যারেড করাতেন। তার একমাত্র চাচা শেখ নাসের রাসেলকে এক টাকার নোটের বান্ডিল দিলেন, রাসেল ক্ষুদে বাহিনীর সদস্যদের লজেন্স বিস্কুট কিনে খেতে দিতেন এই টাকা থেকে। রাসেলের খুব ইচ্ছে ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই এ ইচ্ছে। রাসেল তার পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। সে তার আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতেন না। বঙ্গবন্ধু রাসেলকে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব সঙ্গে নিতেন। বেগম মুজিব ছোট ছেলে শেখ রাসেলের জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ যেদিন বঙ্গবন্ধু প্রিন্স স্যুট পরতেন রাসেলও সেদিন পরতেন।
দেশ স্বাধীনের পর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থনকারী জাপান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানায়, বিশেষ করে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেল ও রেহানাকে নিয়ে জাপান যান। ছোট্ট সোনা রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার।
প্রতিবেশী আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং ফুফাতো ভাই আরিফ সেরনিয়াবাত ছিল রাসেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাইকেল চালানো তার প্রিয় ছিল। তবে রাসেল ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা পছন্দ করতেন। বাড়ির প্রাঙ্গণ, বাড়ির সামনের রাস্তা, লেকের ধার ও ফুফুদের বাসা ছিল তার বিচরণ ভূমি। রাসেল গল্প শুনতেন বড়দের কাছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মিত্র মাতা ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বেড়াতে এলে মা-বাবার সঙ্গে বিমান বন্দরে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন শেখ রাসেল। বাইসাইকেলের পাশাপাশি রাসেলের একটা ছোট ‘মপেট’ মোটরসাইকেল ছিল। একদিন ‘মপেট’ চালানোর সময় পড়ে গিয়ে তার পা সাইকেলের পাইপে আটকে যায় এবং পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য রাশিয়া গেলে রাসেলকেও সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানে রাসেলের পায়ের চিকিৎসা করানো হয়। রাসেল পিতার সঙ্গে যুক্তরাজ্যও সফর করেন।
রাসেল ১৯৭৫ সালে বড় ভাই কামাল, মেজ ভাই জামালের বিয়েতে অনেক মজা করেন। বিশেষ করে গায়ে হলুদের দিন তার সমবয়সীদের সাথে মিলে রং খেলেন। বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের পাশে পাশেই থাকেন। সব সময় ভাবীদের খেয়াল রাখতেন কার কি লাগবে। রাসেল জয় ও পুতুলকে নিয়ে খুব মজা করে খেলতেন। ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই যখন বড় বোন শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে জার্মানিতে যান তখন রাসেল খুব মন খারাপ করেছিলেন। বড় বোন শেখ হাসিনা রাসেলকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু হঠাৎ রাসেলের জন্ডিস হয়ে শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে-কারণে মা বেগম মুজিব বড় বোনের সাথে রাসেলকে জার্মানিতে যেতে দেননি। রাসেল যদি সেদিন বোনদের সাথে জার্মানিতে যেতেন তাহলে তাকে আর ঘাতকের বুলেটের নির্মম আঘাতে হারাতে হতো না।
আদরের ছোট ভাই শেখ রাসেলের প্রতি বোন শেখ রেহানার ছিল অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা। ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই বড় বোন শেখ হাসিনার সাথে জার্মানিতে যাওয়ার সময় বিমান বন্দরে বিমানে ওঠার আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত শেখ রাসেল শেখ রেহানাকে জড়িয়ে ধরে রাখেন। শেখ রেহানার প্রিয় আদরের ছোট ভাই রাসেল, যার সাথে সারাদিন খুনসুটি চলত, একটা সাইকেল নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকত, সেই রাসেলের মুখ শেখ রেহানাকে বারবার টানে। জার্মানিতে গিয়ে শেখ রেহানা তার অতি আদরের রাসেলকে চিঠি লিখেন।
০৩.০৮.১৯৭৫
ট্রিবার্গ
“রাসুমণি
আজকে আমরা ঞৎরনবৎম গিয়েছিলাম। এটা জার্মানির সবচেয়ে বড় ঝরনা। অনেক উপরে উঠেছিলাম। এদের ভাষায় বলে ডধংংবৎভধষষব। আজকে ব্লাক ফরেস্ট গিয়েছিলাম।… পড়াশুনা করো। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করবে। মা’র কথা শুনবে। তোমার জন্য খেলনা কিনব। লন্ডনের চেয়ে এখানে অনেক দাম। ছোট্ট ছোট্ট গাড়িগুলো প্রায় দুই পাউন্ড দাম। তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া ও পড়াশুনা করো।
ইতি রেহানা আপা।”

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য