Monday, April 15, 2024
বাড়িক্রীড়াযুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

যুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

মুজিববর্ষে জাতির জন্য ক্রিকেটের উপহার

আরিফ সোহেল: উনিশের তেজোদীপ্ত টকবগে যুবাদের হাত ধরে বিশ্ব জয় করেছে বাংলাদেশ। ক্রিকেট বিশ্বে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। ভাষার মাসে মুজিব শতবর্ষে এই বিজয় বাঙালির ইতিহাসে নতুন নয় মাইলফলক। ক্রিকেট আপ্লুত প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন- যুব বিশ্বকাপ জয় মুজিববর্ষে জাতির জন্য উপহার।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ১৩তম আসরের রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ৩ উইকেটের ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। যদিও ফাইনাল জয়ে ভাগিদার বৃষ্টি আইনও। সেসঙ্গে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে- আমরাও পারি। উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অব্যাহত ছুটে চলা বাংলাদেশের মধুসময়কালে এ এক নতুন দিগন্তের সূচনা। এর আগে ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে যুব বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। শিরোপা জয়ের হট ফেভারিট হয়েও সেবার দূর থেকেই দেখতে হয়েছিল অন্যদের জয়োৎসব। এবার দক্ষিণ আফ্রিকায় অধরা সেই স্বপ্ন ছুঁয়েছে বাংলাদেশ।
ফাইনালে বিরল ধৈর্য আর সাহসের পরিচয় দিয়েছেন আকবর আলী। খেলেছেন দায়িত্বশীল ৭৭ বলে ৪৩ রানের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো এক বীরোচিত ইনিংস। পাক্কা ২৩৫ মিনিট ব্যাটিং করেছেন এই জাতীয় বীর। রীতিমতো ধ্বংসস্ত‚পের ওপর দাঁড়িয়ে আকবর-ইমন-রকিবুলরা ভারতের পর ফাইনালে উঠেই বাজিমাত করেছে বাংলাদেশ!
যে স্বপ্ন-প্রত্যাশা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে গেছে বাংলাদেশ যুব ক্রিকেট দল, তা পূরণ হয়েছে। স্বপ্নকে ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে অবলীলায় ছুঁয়ে দেখেছেন আকবর আলী, মাহমুদুল হাসান জয়, তৌহিদ হৃদয়, পারভেজ হোসেন ইমন, তানজিদ হাসান তামিম, শাহাদাত হোসেন, শামিম হোসেন, রকিবুল হাসান, শরিফুল ইসলাম, অভিষেক দাস, তানজিম হাসান সাকিব, হাসান মুরাদরা। বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার আগে ঘন ঘন বিদেশ সফর আর আমেরিকান। সর্বশেষ ২০১৮ সালের যুব বিশ্বকাপের পর থেকে যে বাংলাদেশ যুবদল দেশে-বিদেশে ম্যাচ খেলেছে, জয়ের ধারায় থাকার ভিত তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বকাপেও কাজে লেগেছে। আর তাই তো অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়তে পেরেছে বাংলাদেশ যুবদল।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ জয়কে মুজিববর্ষে জাতির জন্য বড় উপহার বলেছেন ক্রিকেটবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, ‘এটা অত্যন্ত আনন্দের বিজয়। খেলাধুলায় এত বড় বিজয় আগে কখনও পাইনি। যুবদলের এ বিজয় মুজিববর্ষের সেরা উপহার। প্রথমবারের মতো আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী যুবা টাইগারদের দেশে ফেরার পর বড় ধরনের সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’

গৌরবের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের গল্প
যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে এবারই প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে দেশের মাটিতে আয়োজিত যুব বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষেই সর্বশেষ এশিয়া কাপের ফাইনালে ৫ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সেই যুবদলই এখন বাংলাদেশের অহংকার। সোনানী তরুণ প্রজন্ম এনে দিয়েছে উৎসব-আমেজের গৌরব। কেমন ছিল বিশ্বকাপ যুদ্ধে লড়াই করা বাংলাদেশের ১১ যুবার ক্রিকেটে আসার গল্প। তাদের নিয়ে আলাদা গল্প হতেই পারে!
আকবর আলী : বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ঠাণ্ডা মাথার ক্রিকেটার আকবর আলী, সেটা ফাইনালে প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর রংপুরে জন্ম তার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আকবর। ২০১২ সালে দিনাজপুর বিকেএসপি’র আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন আকবর। ২০১৫ সালে চলে আসেন সাভারের বিকেএসপি’তে, এরপর ক্রমেই এগিয়ে চলা।
পারভেজ হোসেন ইমন : যুবদলের বাঁহাতি এই ওপেনারের জন্ম ২০০২ সালে ৬ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামে। ক্রিকেটের হাতেখড়িও সেখানে। ২০১৩ সালে ইমনকে দিনাজপুরের আঞ্চলিক বিকেএসপি’তে ভর্তি করান তার বড় ভাই। সেখান থেকে ২০১৬ সালে চলে আসেন সাভারের বিকেএসপি’তে।
তানজিদ হাসান তামিম : মারকুটে মেজাজের যুবদলের এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ২০০০ সালের ১ ডিসেম্বর বগুড়ায় জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের এই যুবার ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সাথে বন্ধুত্ব। তামিম ২০১৭ সালে রাজশাহীর বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। ব্যাটিং প্রতিভা দিয়ে যুবদলে জায়গা করে নেওয়া তামিম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৩ রানের ইনিংস খেলে দলে জায়গাটা পোক্ত করে নেন।
মাহমুদুল হাসান জয় : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে জন্ম নেওয়া মাহমুদুল হাসান জয়ের গল্পটা তার অনেক সতীর্থের সঙ্গেই মিলে যায়। যুব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০০ রানের ইনিংস খেলে দলকে ফাইনালে তোলা ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। ২০১৪ সালে বিকেএসপি’তে ভর্তি হন মাহমুদুল।
তৌহিদ হৃদয় : যুবদলের টপঅর্ডার এই ব্যাটসম্যানের গল্পটা একটু ভিন্ন। মায়ের অনুপ্রেরণায় ছুটে চলা হৃদয় জায়গা করে নেন যুবদলে। শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে অংশ নেওয়া ডানহাতি এই অলরাউন্ডার ২০১৮ যুব বিশ্বকাপ খেলেন। বাংলাদেশের নবম ক্রিকেটার হিসেবে যুব ক্রিকেটে ১ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন হৃদয়।
শাহাদাত হোসাইন : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাড়িচালক শাহাদাতের বাবা আবদুস সবুর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১০ সালে মারা যান। তারপরও শাহাদাত ক্রিকেটের পেছনে ছুটেছেন। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা দলে সুযোগ হয় শাহাদাতের। এখান থেকেই বদলাতে থাকে তার গল্প। অভাবকে হার মানিয়ে ক্রিকেট খেলা যাওয়া শাহাদাত জায়গা পেয়ে যান যুব বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে।
শামীম হোসেন : চাচাতো ভাইদের ক্রিকেট খেলা দেখে আগ্রহ তৈরি হয় ছোট্ট শামীম হোসেনের। ২০০০ সালে ২ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া শামীমের। শামীম ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি হয়ে পরবর্তীতে বিকেএসপি’তে ঠিকানা গাড়েন। ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে পশ্চিমবঙ্গ অনূর্ধ্ব-১৭ দলের বিপক্ষে ২২৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তিনি। যা তাকে ২০১৮ যুব বিশ্বকাপের সুযোগ করে দেয়।
অভিষেক দাস : ক্রিকেটার নয়, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল অভিষেক দাসের। ২০০১ সালে ৫ সেপ্টেম্বর নড়াইলে জন্ম নেওয়া অভিষেক ব্যাডমিন্টনে তিনবারের জেলা চ্যাম্পিয়ন। সেখানেই ৬ ফুট উচ্চতার অভিষেক চোখে পড়েন বাবার বন্ধু ক্রিকেট কোচ তৌহিদ তুহিনের। ব্যাডমিন্টন তুলে রেখে শুরু হয় অভিষেকের ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়। বিশ্বকাপে হিরে বনে গেছেন।
রকিবুল হাসান : ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের কুড়িপাড়ায় জন্ম নেওয়া রকিবুল হয়ে গেছেন বাঁহাতি স্পিনার। রকিবুল গৃহশিক্ষকের এক মাসের টাকা মেরে ভর্তি হয়ে যান একটি ক্রিকেট একাডেমিতে। কিছুদিন পর তিনি ভর্তি হন মোহাম্মদ আশরাফুলকে পথ দেখানো প্রবীণ ক্রিকেট কোচ ওয়াহিদুল গনির অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমিতে। এরপর শুধু ক্রিকেটেই বসবাস করেছেন তিনি। যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে জয়সূচক রানটি করেছেন এই রকিবুলই।
তানজিম হাসান সাকিব : নতুন সাকিব একজন পেসার, সেটাও ডানহাতি। ২০০২ সালে ২০ অক্টোবর সিলেটের তিলকচানপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া যুবদলের এই ডানহাতি মিডিয়াম পেসার বিকেএসপি’তে ভর্তি হওয়ার অনুপ্রেরণাও নেন আরেক উইকেটরক্ষক জাকির হাসানের কাছ থেকে। ২০১৭ সালে বিকেএসপি’তে ভর্তির সুযোগ করে পান সাকিব। এরপর যুবদলে সুযোগ পেয়ে দারুণ বোলিংয়ে জায়গা শক্ত করেন সাকিব।
শরিফুল ইসলাম : যুব দলের বাঁহাতি এই পেসার জেএসসি’র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ঢুকে পড়েন স্বপ্নের ক্রিকেট রাজ্যে। শরিফুলকে দিনাজপুরের একটি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন তার মামা। সেখানে চলতে থাকে তার ক্রিকেট অধ্যায়। রাজশাহী ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে সুযোগ পান তিনি। এরপর ধীরে ধীরে দলের প্রধান বোলার হয়ে ওঠেন দক্ষিণ আফ্রিকায় বল হাতে বাংলাদেশকে পথ দেখানো বাঁহাতি এই পেসার।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য