Sunday, July 3, 2022
বাড়িউত্তরণ-২০২২দ্বাদশ বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ­­মে-২০২২মে, শ্রমিক এবং ঘামে ভেজা চলচ্চিত্র

মে, শ্রমিক এবং ঘামে ভেজা চলচ্চিত্র

মাসুদ পথিক

শ্রমিক। অর্থাৎ শ্রমজীবী, মজুর, যে শরীর খাটিয়ে খায় বা জীবিকা নির্বাহ করে। পৃথিবীর আদিম ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায় শ্রম এবং শ্রমিকই পৃথিবী বিকাশের চালিকাশক্তি। সভ্যতা বিনির্মাণ ও বিকাশের ভিত্তি। তো, শতাব্দীতে শতাব্দীতে, যুগে যুগে শ্রমের চিহ্ন পাওয়া যায় মানুষ সভ্যতার বিভিন্ন স্তরে। জনপদ বা নগর নির্মাণ থেকে শুরু, পরবর্তীতে শিল্প ও সাহিত্যে শ্রম এবং শ্রমিকের অবদান প্রধান। শ্রমকে বাদ দিয়ে কল্পনাই করা যায় না কিছু। আর শ্রম মূলত শ্রমিকের তৎপরতা। আক্ষরিক অর্থে শ্রমিকের আলোচনায় না-গিয়ে শ্রমিকের জীবন ও দর্শন নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের পাশ কাটিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আলোকপাত করব।
শ্রমিক দিবস সারাবিশ্বে পালিত হয়। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগোতে মে মাসের প্রথম দিনে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, সেই ইতিহাস আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের কাছে অনুপ্রেরণার। অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সাহসের উৎস।
আর যুগে যুগে এসব সাহসী গল্প উঠে এসেছে চলচ্চিত্রের রঙিন পর্দায়। কখনও আবার সাহসী কাল্পনিক গল্পের চলচ্চিত্রগুলো উঠে এসেছে শ্রমিকের অনুপ্রেরণা ও সচেতনতায়। দেশে দেশে নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। যেখানে শ্রমিকের কথা বলা হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এই রিলেটেড কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে বিশ্ব শ্রমিক দিবসে আলোকপাত।
চলচ্চিত্র একটি আধুনিক মিডিয়া। তার বয়স ১২৬ বছর। এই ১২৬ বছরে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, নির্মাণে যেমন শ্রমিকের অবদান আছে, পাশাপাশি শ্রম ও শ্রমিকের জীবন ও সংগ্রামকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আমরা চলচ্চিত্রের জনক লুমিয়ের ব্রাদার্সের কালপর্বের পরপরই জগৎ বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চার্লি চ্যাপলিনের নির্মাণ তৎপরতায় শ্রমিকের জীবন ও দর্শনের উপস্থিতি পাই।
পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের বিকাশের পথ ধরে যখন জীবনঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে, তার প্রভাবে চলচ্চিত্র একটি মুভমেন্টে রূপ নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে চলচ্চিত্রে নতুন ধারা আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কিছু নির্মাতা। যা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যুদ্ধের পরপর ইতালিতে নিউ রিয়ালিজম মুভমেন্ট শুরু হয়। ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিপস’ তারই উজ্জ্বল নজির। শ্রমজীবী মানুষের মানবিক ক্রাইসিস ও মনস্তত্ত্বকে সুন্দর ভিজ্যুয়ালে তুলে আনেন চলচ্চিত্রে, যা সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্রে প্রভাব বিস্তার করে। যেমন ‘হাউ গ্রিন ওয়াজ মাই ভ্যালি’ ১৯৪১ সালে হলিউডে মুক্তি পায় এই চলচ্চিত্র। এখানে একজন ভালো শ্রমিক ভালো বেতনের অধিকার রাখে, সে তার অধিকার নিয়েই ছাড়বেÑ চিরকাল ধরে পুঁজিপতিদের শোষণ এবং বঞ্চনার বিপরীতে নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যে চেতনা শ্রমিকদের সাহস জুগিয়ে এসেছে, সেই চেতনাকে নতুনভাবে চিনিয়েছিলেন জন ফোর্ড। চারবার অস্কারজয়ী এই নির্মাতা এর আগেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের সংগ্রাম এবং বিশ্বমন্দার প্রভাব নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘দ্য গ্রেইপস অব আর্থ’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা। কিন্তু সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, পার্শ্ব-চরিত্রে সেরা অভিনেতাসহ ৫টি অস্কার জয় করা এই সিনেমার আবেদন বরাবরই ব্যতিক্রম শ্রমজীবী মানুষের কাছে।
‘দ্য গ্রেইপস অব আর্থ’-এর মতো এই সিনেমাও জন ফোর্ড তৈরি করেছিলেন একটি উপন্যাস থেকে। রিচার্ড লিউলিনের সেই গল্পে উঠে আসে দক্ষিণ ওয়েলসের এক খনি শ্রমিক পরিবারের কাহিনি। খনির মালিকদের পরিবেশের ওপর অত্যাচারে কীভাবে নিজেদের জীবিকা ও জীবন দুটোই খোয়াতে বসে মরগ্যান পরিবার, সিনেমাটি সেসব ঘটনারই আখ্যান। একই সঙ্গে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংঘবদ্ধ হওয়াটা কত জরুরি, সে-কারণে শ্রমিক ইউনিয়নের গুরুত্ব কতখানি, তার ওপর জোর দেয় সিনেমাটি।
১৯৪২ সালে ‘নেটিভ ল্যান্ড’ মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি চল্লিশ দশকে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ থাকার গল্প বলেছে। চলচ্চিত্রে বার্তা দেওয়া হয়েছে সব মার্কিন, সে যে জাতের কিংবা যে বর্ণেরই হোক না কেন, তাদের সবারই অধিকার রয়েছে জীবিকার, বাসস্থানের, পর্যাপ্ত খাদ্যের, চিকিৎসার, সংঘবদ্ধভাবে কোনো কিছুর দাবি তোলার, সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ভালো করার, শান্তিতে থাকার, হুমকির সম্মুখিন না হওয়ার এবং হুমকিতে না পড়ার।
‘লিও হারউটজ’ এবং প্রখ্যাত আলোকচিত্রী পল স্ট্র্যান্ডের এই প্রামাণ্যচিত্রটির শেষে ভেসে আসে এ কথাটি। পল রবসনের জাদুকরি কণ্ঠে এ ঘোষণাই যেন মনে করিয়ে দেয় মৌলিক অধিকারের দাবি তুলতে পারে সমাজের যে কোনো স্তরের মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষও যার ব্যতিক্রম নয়।
সারাবিশ্বে পালিত হয় শ্রমিক দিবস। মে দিবস। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগোতে মে মাসের প্রথম দিনটিতে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল সেই ইতিহাস আজ পৃথিবীজুড়ে শ্রমিকের কাছে অনুপ্রেরণার। অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সাহসের ভিত্তি।
আর যুগে যুগে এসব সাহসী গল্প উঠে এসেছে চলচ্চিত্রের রঙিন পর্দায়। কখনও আবার সাহসী কাল্পনিক গল্পের চলচ্চিত্রগুলো উঠে এসেছে শ্রমিকের অনুপ্রেরণা ও সচেতনতায়। দেশে দেশে নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। যেখানে শ্রমিকের কথা বলা হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছে।
অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট নিউ জার্সিতে বন্দর শ্রমিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল লংশোরমেন্স অ্যাসোসিয়েশন কীভাবে মালিক পক্ষের চক্রান্তে একটি সন্ত্রাসী দলে রূপান্তরিত হয়, সেই সত্য ঘটনা নিয়ে সিনেমাটি তৈরি করেছিলেন হলিউডের কিংবদন্তি নির্মাতা এলিয়া কাজান। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তার প্রিয় শিষ্য মার্লোন ব্র্যান্ডো। এই সিনেমার মাধ্যমে অভিষেক ঘটে অভিনেত্রী ইভা মারিয়া সেন্টের। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বাড শুলৎজ।
১২টি মনোনয়নের মধ্যে সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা এবং পার্শ্ব-চরিত্রে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারসহ ৮টি অস্কার জিতে নিয়ে ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ পরিণত হয় কাজানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সফল সিনেমায়। সমালোচকদের পাশাপাশি দর্শকমহলেও দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সিনেমাটি।
‘দ্য অর্গানাইজার’ ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া ইতালি, ফ্রান্স আর যুগোসøাভিয়ার যৌথ প্রযোজনার এ সিনেমাটি গল্প বলে এক পালিয়ে বেড়ানো অধ্যাপকের। যিনি ঘটনাচক্রে একটি শ্রমিক সংগঠনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নেতা বনে যান। সিনেমাটি আরও তুলে ধরে শ্রমিকদের বিপজ্জনক পরিবেশে দিনে ১৪ ঘণ্টা খাটুনির অমানবিক পরিস্থিতিকেও।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রেও এসেছে শ্রমিক প্রসঙ্গ। তবে মুম্বাই অন্যতম। তারই ধারাবাহিকতায় হিন্দি ‘চিল্লার পার্টি’ চলচ্চিত্রটি ২০১১ সালে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন বলিউডের অভিনেতা সালমান খান। এটি মূলত শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করেছিল। এ-রকম অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে মুম্বাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। জহির রায়হান, হারুনুর রশীদ, আলমগীর কবির, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদের হাত ধরে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের আলেখ্য মজবুত হয়েছে, চলচ্চিত্রে, ভিজ্যুয়ালি।
তবে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে সরাসরি শ্রমিক দিবস বা শ্রমিকদের উপলক্ষ করে কোনো চলচ্চিত্র দেখা যায় না। তবে শ্রমজীবী মানুষ ও শ্রমিকদের জীবনের নানা গল্পের চিত্রায়ন দেখা গেছে। অসংখ্য ছবিতে খেটে খাওয়া মানুষের হাহাকার, অধিকার আদায়ের গল্প ফুটে উঠেছে। সেসবের ভিড়ে কিছু চলচ্চিত্র কালজয়ী হয়ে আছে।
আমজাদ হোসেন নির্মিত ‘ভাত দে’ এই ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন আলমগীর-শাবানা। এখানে দেখা গেছে অকালে বাবা হারানো জরি চরিত্রে শাবানার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বাউল স্বামীর সংসারে অভাবের তাড়নায় অন্যের বাড়িতে শ্রম বেচে জীবন ধারণ করেন তিনি। তাকে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। ১৯৮৪ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছিল।
বিখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত জনপ্রিয় উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। পরিচালনা করেন গৌতম ঘোষ। বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় এতে অভিনয় করেন আসাদ, চম্পা, রূপা ব্যানার্জী, উৎপল দত্ত প্রমুখ। ছবিটিকে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন নিয়ে অনবদ্য এক নির্মাণ বলে মনে করা হয়। এখানে শ্রমিক হিসেবে অন্যের নৌকায় মাছ ধরে বেড়ানো কুবেরসহ মাঝিদের বঞ্চিত হওয়ার গল্প ফুটে উঠেছে। এখানে আছে জোতদার নিষ্ঠুর মালিক চরিত্র। ছবিটি দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে অনায়াসে।
‘সারেং বৌ’ ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আবদুল্লাহ আল মামুন। এই চলচ্চিত্রে আবদুল জব্বারের কণ্ঠে গাওয়া ‘ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রামের গল্পে নির্মিত এ ছবিতে অভিনয় করেছেনÑ ফারুক, কবরী, আরিফুল হক, জহিরুল হক, বিলকিস, বুলবুল ইসলাম, ডলি চৌধুরী। এর ভিজ্যুয়ালে ফুটে উঠেছে খেটে খাওয়া মানুষরা দিনের পর দিন কেমন করে শোষিত হয়েছে গ্রামের প্রভাবশালী মোড়লদের দ্বারা।
এছাড়াও ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘লাট সাহেবের মেয়ে’, ‘শ্রমিক নেতা’, ‘বিদ্রোহী গার্মেন্টস কন্যা’সহ আরও অনেক ছবিতে নানাভাবে বলা হয়েছে মেহনতি মানুষের জীবন এবং লড়াই। শ্রমিকের জীবন ও সংগ্রামকে উপজীব্য এ-রকম শত শত সিনেমা নির্মিত হয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও সমানতালে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। বরং চলচ্চিত্রের বিকাশে পশ্চিমবঙ্গই অগ্রগামী। একই সঙ্গে শ্রমিক বা শ্রমজীবী মানুষের জীবনের লড়াই, টানাপোড়েন দর্শনও উপজীব্য হয়েছে।
যেমন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে শ্রমিক-শ্রেণির প্রাধান্য। ঋত্বিক ঘটক, তপন সিংহা, রাজেন তরফদার, গৌতম ঘোষ, নিমাই ঘোষ শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনে তারা পথিকৃত বলা চলে।

লেখক : সহ-সম্পাদক, উত্তরণ

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য