Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderমে মাসের দিবস

মে মাসের দিবস

১৯৮১ সালের দিনটি ছিল রবিবার। ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। সারাদেশ থেকে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়, তাদের একমাত্র আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনাকে বরণ করতে।

ফারুক শাহ : মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বিশে^র শ্রমজীবী মানুষের ঐতিহাসিক গৌরবময় দিন। বঞ্চনা, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত দিন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে।
১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক ৮ ঘণ্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদের ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ^জুড়ে ১ মে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না থাকলে বিশ^জুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশে এটি কার্যকর হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসেবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ¦ালানো হয়ে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা লাভের পরের বছর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মহান মে দিবসকে শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি এই দিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। তিনি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে মজুরি কমিশন গঠন এবং নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছিলেন। জাতির পিতার ঐকান্তিক ইচ্ছায় বাংলাদেশ আন্তজার্তিক শ্রম সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে এবং আইএলও-র ৬টি কোর কনভেনশনসহ ২৯টি কনভেনশন অনুসমর্থন করে। বাংলাদেশসহ বিশে^র প্রায় ৮০টি দেশে ১ মে জাতীয় ছুটির দিন।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন ও কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ শ্রম আইন যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক যে কোনো খাতে নিয়োজিত কোনো শ্রমিক কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনাজনিত কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে বা মৃত্যুবরণ করলে, জরুরি চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ ও দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার জন্য সহায়তা করা হয়। আহত শ্রমিকদের সন্তানের উচ্চ শিক্ষার জন্যও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের সব সেক্টরে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে।

১৭ মে : শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফেরার দিন ১৭ মে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরঘাতকরা ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকা-ের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এ সময় বিদেশে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা শেখ হাসিনা স্বামী-সন্তানসহ ছয় বছর বিভিন্ন দেশে কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরতে সক্ষম হন। তার দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ছোট বোন শেখ রেহানার কাছে রেখে গণতন্ত্র আর প্রগতিশীলতার রাজনীতি ফেরাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
রাজনীতির মতোই প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। ১৯৮১ সালের দিনটি ছিল রবিবার। ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। সারাদেশ থেকে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়, তাদের একমাত্র আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনাকে বরণ করতে। এ সময় সারাদেশ থেকে আসা লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানায়, ভালোবাসায় সিক্ত হন বঙ্গবন্ধু-কন্যা।

১৯ মে : শিলচর শহিদ দিবস
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি গৌরবময় দিন ১৯ মে। বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শাসকগোষ্ঠীর গুলির সামনে বুক পেতে বাংলা মায়ের সন্তানরা যে রক্তস্নাত মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ঠিক তেমনি মাত্র ৯ বছরের মাথায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাসৈনিক। সেই ভাষাশহিদের রক্তের বিনিময়ে আসামে বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছিল। ওই দিন কাছাড় জেলার শিলচর রেলস্টেশনে জড়ো হয়েছিল হাজারও মানুষ। শুরু করেছিল সত্যাগ্রহ আন্দোলন। দাবি ছিল রাজ্যের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই আন্দোলনকে ভালো চোখে নেয়নি আসামের তৎকালীন সরকার। আর এই আন্দোলনকে দমনের জন্য সেদিন হিংস্র হয়ে উঠেছিল আসামের আধাসামরিক বাহিনী। গুলি ছোড়ে নিরীহ মানুষের শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ওপর। সেই গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল ১১ তরুণ-তরুণী। সবারই বয়স ছিল ২৫ বছরের নিচে। প্রতি বছর ১৯ মে তাদের স্মরণে গোটা বরাক উপত্যকায় ভাষা শহিদ দিবস পালিত হয়ে আসছে। এর আগে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় কাছাড় জেলা জনসম্মেলন। দাবি তোলা হয় বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষা করার। ১৯৬১ সালের ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিনে কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পালিত হয় ‘সংকল্প দিবস’। সংকল্প করা হয় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার। এই সংকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম হিসেবে ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হয় পদযাত্রা। দুই সপ্তাহ ধরে পদযাত্রীরা ২২৫ মাইল পথ অতিক্রম করেন। গ্রামে গ্রামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে প্রচার চালান। ২ মে তারা করিমগঞ্জে এসে পৌঁছলে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৯ মে কাছাড় জেলার সর্বত্র হরতাল পালিত হয়।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য