Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderমুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা

মুক্তিযোদ্ধারা অসম সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। পাক-সরকার ও সেনাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও পিচ কমিটির সদস্যরা গা-ঢাকা দেয়। তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যাদের পাওয়া যাচ্ছিল তাদের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ধরে সমুচিত শাস্তি দিয়েছিল।

মো. আশরাফুল ইসলাম: আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। যেসব ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমিত সূর্য ছিনিয়ে এনেছে, সেসবের কিয়দংশ সরাসরি সম্পৃক্ত করতে পেরে নিজেকে মহাভাগ্যবান বলে বিধাতার কাছে চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
আমি ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার মিনাপাড়া প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে হাটবোয়ালিয়া হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমরা হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ৬-দফা ও ১১-দফা আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে মিছিলে যোগদান করেছি। ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ স্কুলে এসে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে ডেকে নিয়ে যেতেন। সারা বাংলাদেশে এই আন্দোলনের ঝংকার উঠেছিল।
১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়। সে-সময় আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে নির্বাচন কেন্দ্র ছিল। ঐ কেন্দ্রে গিয়ে দেখি গ্রামবাসী ও এলাকাবাসী সবাই নৌকার ভোটার।
১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আসন গ্রহণ করার কথা, কিন্তু ভুট্টো সাহেবের চক্রান্তে তা বাস্তবায়িত হয়নি; বরং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী না করে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের বিশাল জনসভায় বাঙালির আবেগঘন অনুভূতি ও চির জাগ্রত আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে মেঘ-নিনাদ বজ্রকণ্ঠে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যসহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
২০ মার্চ ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকবাহিনীর গণহত্যার সূচনা হয়। ২৬ মার্চের পর থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র পাকবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সেখান থেকে সামরিক আইন জারির আদেশ বারবার ঘোষিত হতে থাকে। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের জনগণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
পাকবাহিনী ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, মহকুমা শহরে তাদের আক্রমণ পালাক্রমে চলতে থাকে। তারা বাঙালিদের শেষ প্রতিরোধ ব্যূহ কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন্স দখল নিলে স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ চুয়াডাঙ্গায় চলে আসেন। সে-সময় আমরা হাজার হাজার এলাকাবাসী লাঠিসোটা, ঢাল-তলোয়ার নিয়ে খলিসাকুণ্ডি বাজারে এসে জমায়েত হই এবং কুষ্টিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সে-সময় একজন ইপিআর ও কয়েকজন পুলিশ এসে বলেন, তারা পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে না পেরে চলে এসেছেন। আমাদের অগ্রসর না হয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে বলেন। তারপর আমরা সবাই বাড়ি ফিরে গেলাম। চুয়াডাঙ্গাতে তখন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করা হয়। পাকসেনাদের দ্রুতগতিসম্পন্ন যুদ্ধবিমান বিকট আওয়াজ করে চুয়াডাঙ্গার আকাশে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। পাকবাহিনী চুয়াডাঙ্গার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ীভাবে সংগঠিত হতে থাকে। মেহেরপুরের মুজিবনগরে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে যখন যোগদান করেছি তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। জুন মাসের শেষে বা জুলাই মাসের প্রথম দিকে ভারতে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম। চতুর্থ দফায় রাত ১২টার পর আমি ও মকবুল ভাই মিনাপাড়া থেকে রওনা হই। ছাতিয়ান ব্রিকফিল্ডের পাশ দিয়ে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর পাকা সড়ক চলে গেছে। ছাতিয়ান ব্রিকফিল্ড থেকে বামুন্দি বাজার আধাকিলো দূরে। বামুন্দিতে পাকসেনাদের বিরাট সেনা ছাউনি ছিল। ঐ সেনা ছাউনি বিশাল বাংকার দিয়ে পরিবেষ্টিত ও সুরক্ষিত ছিল। ঐ পাকা রাস্তা পার হওয়ার সময় দুরুদুরু বুকে আল্লাহ্-রসুলের নাম নিয়ে পার হই। পাকা রাস্তা পার হয়ে বামুন্দি গ্রামের পাশ দিয়ে সোজা ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে যেতে থাকি। পথে নিশিপুর, দেবীপুর, কল্যাণপুর, শহড়াতলা, সাহেবনগর পার হয়ে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাই। এভাবে যেতে যেতে আমরা বিকালে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা তেঁতুলবাড়িয়া অতিক্রম করে ভারত সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করে মথুরাপুর থেকে ১০/১২ কিলোমিটার গিয়ে মহিষবাথানে পাকা রাস্তায় উঠি। ওখান থেকে বাসে করে করিমপুর হয়ে বেতাই, তেহট্ট হয়ে চাপড়ায় পৌঁছাই। চাপড়ায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গেলে ওখানকার কর্তৃপক্ষ জানান মেহেরপুরের এমপি সহিউদ্দিন সাহেব তেহট্ট আছেন। আমাদের উনার সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। তারপর আমরা ওখান থেকে বাসে চড়ে তেহট্ট এসে এমপি সাহেবের সাথে দেখা করলে তিনি আমাদের বেতাই ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বলেন। আমরা আবার ওখান থেকে বাসে রওনা হয়ে রাত ১২টায় বেতাই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছাই। ওখানে গিয়ে কুষ্টিয়া জেলার আওয়ামী লীগের দুজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জিকু সাহেব এবং বারী সাহেব (ক্যাম্প ইনচার্জ)-এর সাথে দেখা করি। উনারা আমাদের থাকার জন্য বলেন। একটি গোডাউনের মধ্যে আমাদের থাকার জায়গা করে দেন।
এখানে একজন সুবেদার সাহেব প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। উনি পরিবার নিয়ে একটি ঘরে থাকতেন। আর বেশ কয়েকজন ইপিআর প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। আমরা উনাদের ওস্তাদ বলে ডাকতাম। ওস্তাদগণ রাফ ও টাফ ছিলেন। আমরা ওখানে সেকশন, কোম্পানি ও ব্যাটালিয়নে বিভক্ত ছিলাম। এখানে এসে আমরা আলফা, ব্রাভো, চার্লি, ডেলটা ইত্যাদি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিলাম। যদিও এসব কোম্পানির নাম আমাদের কাছে নতুন ছিল। এখানে আমরা প্রতিদিন সকালে বেতাই থেকে করিমপুর পাকা রাস্তায় ৮-১০ কিলোমিটার দৌড়াতাম। তারপর নাস্তা করে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতাম। দুপুরে খাবার খেয়ে আবার বিকালে প্রশিক্ষণ নিতাম।
বেতাই ক্যাম্পে ১০-১২ দিন থাকার পর আমি মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হই। এখান থেকে আরও ১১ জনকে নির্বাচিত করে। সর্বমোট ১৩ জনকে বাসযোগে কলকাতা ব্যারাকপুরে নিয়ে যায়। ওখানে ভারতের বিভিন্ন রিক্রুটিং ক্যাম্প থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে একত্রিত করা হতো। ওখানে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) চারজন সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান উপস্থিত ছিলেন। এখানে সংঘটিত একটি ক্ষুদ্র ঘটনার অবতারণা করছি। উক্ত চার শীর্ষনেতার মধ্যে তোফায়েল আহমেদ আমাকে দেখে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন- ‘তুমি কীসের জন্য এসেছ?’ জবাবে আমি বলি, ‘পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এসেছি।’ তিনি বলেন, ‘তুমি তো যুদ্ধ করতে পারবে না। তোমার বয়স হয়নি।’ আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘আমার বয়স না হলেও যুদ্ধ করার জন্য এসেছি।’ তিনি আবার বললেন, ‘তুমি যেহেতু যুদ্ধ করতে পারবে না, কাজেই দেশে ফিরে যাও।’ আমি তখন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললাম, ‘আমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে না নিলেও আমি দেশে ফিরে যাব না। আমি এখানেই থাকব।’ এ-কথা শুনে তিনি খুশি হয়ে উপস্থিত সবাইকে লক্ষ করে বলেছিলেন, ‘এদেশ স্বাধীন হবেই হবে। কারণ কিশোর বয়সের এই ছেলের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য যে তেজোদীপ্ততা, সাহস ও উদ্যম লক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে তাই মনে হয়।’
ব্যারাকপুর ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে আমাদের কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে নিয়ে আসে। ট্রেনযোগে আমাদের শিলিগুড়ি নিয়ে যায়। শিলিগুড়ি থেকে ট্রাকযোগে জলপাইগুড়ি সেনাব্যারাকে নিয়ে যায়। একটি খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর কোলঘেঁষে এই সেনাব্যারাক। এখান থেকে প্রথমে আমাদের বারহি বিমানবন্দরে এবং পরে কারগো বিমানে সাহারানপুর বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। সাহারানপুর বিমানবন্দর থেকে সেনা ট্রাকযোগে আমাদের উত্তর প্রদেশের দেরাদুন জেলার টেন্ডুয়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
কয়েক ঘণ্টা ট্রাকযোগে যাওয়ার পর আমরা টেন্ডুয়া সেনানিবাসে পৌঁছাই। এখানে আসার পর প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেনারেল ওবান বক্তব্য রাখেন। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন সেনানিবাস। শুনেছি এখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মো. আইয়ুব খান প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
সেখানে ষষ্ঠ ব্যাচে আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রশিক্ষণের সময় মেজর মালহুত্রা, ক্যাপ্টেন তাওয়ারি (ভারতীয়), আমাদের দেশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা যেমন হাসানুল হক ইনু, গোলাম আম্বিয়া প্রশিক্ষক ছিলেন। অন্যদের নাম মনে নেই। এখানে গ্রেনেড, রাইফেল, এসএলআর (সেলফ লোডিং রাইফেল), এসএমজি (সাব-মেশিন গান), এলএমজি (লাইট মেশিন গান) এবং এইচএমজি (হেভি মেশিন গান) প্রশিক্ষণ ও ফায়ারিং টেস্ট হয়েছে। ট্যাংক বিধ্বংসী ইনার্গা গ্রেনেডের ব্যবহার শিখিয়েছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্রিজ, কালভার্ট ও স্থাপনা ধ্বংসের জন্য বিস্ফোরক দ্রব্যের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুতনয় শহিদ শেখ জামাল টেন্ডুয়া ক্যাম্পে আমাদের পরে আসেন। আমরা সন্ধ্যার পর দেখা করতে গিয়েছিলাম। দেখি উনার পা দুটো ফুলে গেছে। পায়ে হেঁটে ভারতে এসেছেন। সেনা ছাউনির বারান্দায় পা দুটি ঝুলিয়ে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম বাংলাদেশের কথা- তিনি বললেন, পাকসেনাদের অত্যাচার-নির্যাতন বেড়ে গেছে। মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। সবাই তাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়ে উঠেছে।
এখানে ৪০ দিন ট্রেনিং শেষে ক্যাম্প থেকে বিদায় নেই। ফেরার পথে কলকাতায় দু-একদিন অবস্থানের পর কুরিয়ারের মাধ্যমে আমাদের কয়েকজনকে বাংলাদেশের মেহেরপুর সীমান্তে পৌঁছায় দেয়। আমরা তেঁতুলবাড়ী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দাদ্দীর মাঠে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ওখানে শরণার্থী শিবির ছিল। আমরা তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে একসাথে বসবাস করতাম। দাদ্দীর মাঠে থাকা অবস্থায় শরণার্থীসহ অন্যান্য লোকজনও মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে।
দাদ্দীর মাঠ থেকে প্রায়ই আমরা সুযোগ-সুবিধামতো দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতাম। গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে যথা- মিনাপাড়া, মানিকদিয়া, শিমুলতলা, কুঞ্জনগর, রুয়েরকান্দি, শহড়াবাড়িয়া, কামারখালী, সিন্দুরকৌটা, হুদাপাড়াতে আমরা অবস্থান করতাম। ছাত্র ও যুব-সমাজকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতাম এবং সেইসাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিতকরণের জন্য মোটিভোশনাল প্রশিক্ষণ দিতাম। পাকবাহিনীর সাথে আমাদের অনেক স্থানে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। মুজিব বাহিনীসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা এবং বাংলাদেশের কিছুটা অভ্যন্তরে বিশেষ করে দাদ্দীর মাঠ এলাকায়। এছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমার এলাকায়ও পাকবাহিনীর সাথে সশস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি। স্থানীয় জনগণই আমাদের সাথে যুদ্ধের সময় সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করত। সমরনীতি, প্রশিক্ষণ ও কৌশল সম্পর্কে তেমন কিছু আমাদের ধারণা ছিল না। শুধু জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করে আমরা বিজয়ী হয়েছি।
বামুন্দি পাকসেনা ছাউনি থেকে মাঝে মাঝে পাকসেনারা এখানে আকস্মিকভাবে আক্রমণ করত। আমরা তাদের সমুচিত জবাব দিতাম। ১০-১২ বছরের অসম সাহসী কিশোররা বড় বড় গাছের মাথায় উঠে পাকসেনাদের গতিবিধি লক্ষ করে বৃক্ষের নিচের ছেলে-মেয়েদের জানাত। তারা দ্রুত দৌড়ে এসে আমাদের তথ্য দিত। আমরা তখনই প্রস্তুত হয়ে পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। তাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ হতো। তারা আধাকিলো দূর থেকে গুলিবর্ষণ করত। আমরা তাদের গুলির জবাব দিতাম। আমার কাছে ছিল ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেল (নং-৫৫৭২২)। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কারও ছিল এসএলআর, এলএমজি, এসএমজি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এইচএমজি ছিল না। প্রকৃতপক্ষে পাকসেনাদের কাছে আমাদের চেয়ে অনেক অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল।
একদিনের একটি ঘটনা বর্ণনা করছি। পাকসেনারা দুপুর ১০-১১টার দিকে হঠাৎ আক্রমণ করেছে। তারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অভিপ্রায়ে আক্রমণ করে। আমরা তখন মরিচবাটা দিয়ে রুটি খাচ্ছিলাম। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দ্রুত যার কাছে যা অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে, তা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে পাকসেনাদের মোকাবিলা করি। পাকসেনারা বামুন্দি ক্যাম্প থেকে বালিয়াঘাট, হাড়াভাঙ্গা, সাহেবনগর হয়ে (বামে শহড়াতলা, ডানে কাজীপুর) হয়ে দাদ্দীর মাঠের কাছাকাছি চলে আসে। আমরা অবস্থান নিই বিস্তীর্ণ আখক্ষেতের পিছনে। আখক্ষেতের অবস্থান ছিল উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে অনেকটা ইউ আকৃতির মতো। পূর্ব দিক খোলা ছিল। এই কৌশল অবলম্বন করে আমরা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। পাকসেনা ও আমাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় আধাকিলোমিটার বা তার কম। এখানে পাকসেনাদের সাথে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভীষণ গোলাগুলি হয়। মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে গুলির আওয়াজ হতে থাকে। আমি আখক্ষেতের একটি পগার (জমির আইলে অবস্থিত পরিখা)-এর মধ্যে অবস্থান নিই। আমার কাছে থাকা ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেল (ভারতীয়) দিয়ে শত্রুসেনাদের লক্ষ করে অসংখ্য গুলি করি। এতে কেউ হতাহত হয়েছিল কী না আমার জানা নেই। তবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে পাকসেনাদের অনেকে গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত হয়েছিল। উল্লেখ্য, পাকসেনাদের গোলাগুলিতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বা জনগণ কেউ হতাহত হয়নি। একটি গরু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এই যুদ্ধ আধাঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল।
পাকসেনারা পরাজিত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারা সাহেবনগর থেকে নওদাপাড়া গিয়ে কলস কলস পানি খেয়ে অন্য পথে অর্থাৎ ব্রজোপুর হয়ে দাঁড়েরমাঠ দিয়ে বামুন্দি ক্যাম্পে ফিরে যায়। এই যুদ্ধে আমরা মুজিব বাহিনীর আমি, মকবুল ভাই (মিনাপাড়া), আশরাফ মাস্টার (কাজীপুর), মোখলেছ (করমদী), কাদের (করমদী), মোসাব (শহড়াবাড়িয়া) সশস্ত্রভাবে অবস্থান নিই এবং পাকসেনাদের দিকে অনর্গল গুলি করতে থাকি। আমাদের মধ্যে মোসাব ও কাদের দুজনেই খুব দুঃসাহসী ছিল। গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ওহাব (কাজীপুর) বাহিনী, হানিফ (বেতবাড়িয়া) বাহিনী, মামুনুর রশীদ (হাড়াভাঙ্গা) বাহিনীসহ আরও অনেকে ছিলেন। যুদ্ধে আমাদের সাথে শরণার্থীসহ স্থানীয়রাও সশরীরে শামিল হয়েছিল। এখনও মনে আছে, আমি লাইং (শয়ন) পজিশনে থাকা অবস্থায় গোলাগুলি চলাকালীন শরণার্থী ক্যাম্পের এক মাঝবয়সী মহিলা কলসিতে পানি আনতে গিয়ে আমার পাশে হাজির হন। তাকে আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার জন্য ইশারা করলে তিনি শুয়ে পড়েন। কয়েকজন লোকও লাঠিসোটা হাতে আমাদের পাশে অবস্থান নেয়। জনগণ ও মহিলারা আমাদের সাথে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতা করে। এসবও মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ভিত্তিমূল রচনা করেছিল।
১৬ ডিসেম্বরের বেশ কিছুদিন আগে থেকে আমরা এলাকায় প্রকাশ্যভাবে অস্ত্রশস্ত্রসহ ঘুরতে থাকি। আমাদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছিল। শত্রুসেনারা তখন অনেকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আমরা নিজেদের অবস্থান অনেকটা সবল করে নিয়েছিলাম। এমনি অবস্থায় বামুন্দিতে অবস্থিত পাকসেনা ছাউনিসহ তৎসংলগ্ন রাজাকার অধ্যুষিত এলাকায় আমরা আক্রমণের পরিকল্পনা নিই। একদিন গভীর রাতে আমরা যুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে বামুন্দি সেনা ছাউনি আক্রমণের জন্য যাত্রা শুরু করি। আমরা পাকা রাস্তার পাশে নিচু ঝোপে অবস্থান নিয়েছিলাম। আমাকে যে এলাকায় দেওয়া হয়েছিল তা শত্রুসেনাদের অবস্থান থেকে কোয়ার্টার মাইলের মধ্যে ছিল। কিন্তু ঐ রাতে সুবিধা করতে না পেরে দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের পর আমরা ফিরে আসি। গভীর রাতে অপেক্ষা করতে করতে অস্ত্র ও গোলাসহ আমার জন্য বরাদ্দকৃত স্থানে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অপারেশনের পরে আমার বড়ভাই মকবুল হোসেন আমাকে খুঁজে না পাওয়ায় তিনি আমার জন্য বরাদ্দকৃত স্থানে গিয়ে আমাকে নিয়ে আসেন। আজ আমি এই জীবন সায়াহ্নে বসে এ-কথা ভাবি যে, কী দুঃসাহস, কী অদম্য মনোবল, কী দেশমাতৃকার প্রতি গভীর উন্মত্ত ভালোবাসা। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধসামগ্রী নিয়ে সদা প্রস্তুত সম্মুখ সমরে আমি এক নাবালক মুক্তিযোদ্ধা। আমি যুদ্ধে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিকই; কিন্তু প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাইনি। ঐদিন মারা গেলে হয়তো নামহারা শহিদ হতাম ইতিহাসের পাতায়। আমাদের সাথে বদর নামে এক সহপাঠীও এভাবে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এ-রকম আরও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা অকাতরে দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন। আধুনিক ও শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত পাকসেনাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উচ্চমানের; কিন্তু আমাদের নাবালক মুক্তিযোদ্ধার সাধারণ অস্ত্র নিয়ে তাদের মোকাবিলা করার সাহসিকতা নিতান্তই বালখিল্য হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আমাদের অগাধ ও উন্মত্ত ভালোবাসা, অবিচল আস্থা ও অফুরন্ত তেজোদীপ্ততা এক্ষেত্রে অঘটনঘটনপটিয়সী হিসেবে স্বীকৃত। সর্বোপরি, মুজিব ভক্তি অসীম প্রাণশক্তির আধার ছিল।
বামুন্দিতে বিশাল ব্যাংকারসহ পাকসেনারা প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেছিল। আর তাদের সেনা ছাউনির চারপাশে কয়েক কিলোমিটার সড়ক পথে মাইন/বুবি ট্রাপ দিয়ে রেখেছিল, যা পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী পরিষ্কার করেছিল। ১৬ ডিসেম্বরের দু-একদিন আগে পাকসেনারা মুক্তিবাহিনীর শক্তি-সাহস দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বামুন্দি সেনা ছাউনি থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়েছিল। পথিমধ্যে তারা ভেড়ামারা পাকশীতে অবস্থিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করার সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়। এ সময় ভারতীয় বোমারু বিমান থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে বোমা নিক্ষেপ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সেখানে অনেক পাকসেনা নিহত হয়। ঐ যুদ্ধে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধাও শহিদ হন। মুক্তিযোদ্ধারা অসম সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। পাক-সরকার ও সেনাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও পিচ কমিটির সদস্যরা গা-ঢাকা দেয়। তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যাদের পাওয়া যাচ্ছিল তাদের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ধরে সমুচিত শাস্তি দিয়েছিল। অনেককে গুলি করে হত্যা করেছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তখনও চোখে দেখিনি; কিন্তু তার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম দুচোখ আচ্ছন্ন করেছিল। তাকে ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দেখতে পাইনি। এটির সূচনা হয়েছিল ’৬৬-এর ৬-দফা ও ১১-দফা, ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন, এরপর ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে তা বৃদ্ধি পায় এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তা পূর্ণতা লাভ করে। এ সময় তার মহান নেতৃত্বে বৈপ্লবিক আদর্শ ও যুগোপৎ নির্দেশনার প্রতি গভীর ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে সেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতার প্রতি প্রগাঢ় প্রেমে নিঃশর্তভাবে পতিত হই। তিনি তার হৃদয়ের মহানুভবতা, বিশাল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সুবিবেচনাপ্রসূত যথার্থ দিক-নির্দেশনা দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতির অগ্রভাগে এসে আধারঘন অমানিশাতে স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য এক আলোকবর্তিকা হস্তে উপনীত হন। এ যেন এক অলৌকিক বিস্ময়কর অভূতপূর্ব ঘটনা।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য