Saturday, July 13, 2024
বাড়িচতুর্দশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-২০২৩মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প : শিউলি ফুল

মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প : শিউলি ফুল

পাকিস্তানি মিলেটারিরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ঘুমন্ত মানুষের ওপরে আক্রমণ করেছে। শত শত মানুষ মারা গেছে। বিভিন্ন মহল্লায় ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আমাদের রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে।

জানে আলম মুনশী: সকাল থেকে শত ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছে শিউলির। বেলা ফুরিয়ে দুপুর গড়িয়ে এলো। এখনও বাজার করে ফিরতে পারল না শিউলির স্বামী হাবিলদার নুর ইসলাম। এদিকে, বাপের বাড়ি থেকে পুকুরের মাছ, হরেকরকম শাক-সবজি, কত কী পাঠিয়েছে তার মা। শিউলি মনে মনে খুশি হলেও উপরে উপরে একটা আলগা রাগ দেখায় মায়ের ওপর। উচ্চস্বরে বলে :
– মা কেন যে বাড়ি থেকে রোজ রোজ এত জিনিসপত্র পাঠায়? এই অসময় এত মাছ কে কাটে? যত সব ঝামেলা।
উদ্দেশ্য কথাটা পাশের বাসার ময়না ভাবীর কানে পৌঁছানো। কার বাপের বাড়ির অবস্থা কতটা স্বচ্ছল, কার বাপের বাড়ির থেকে কী কী জিনিসপত্র আসে, এটা বোঝাতে হবে না? কথাগুলো বলার জন্য বলা, এই আর কী!
একই বাড়িতে ভাড়া থাকে শিউলি আর ময়না। দুজনের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। দুজনের স্বামীই পুলিশে চাকরি করে। দুই স্বামীর মধ্যে যেমন মিল তেমনি ভাবীদের মধ্যেও মিল রয়েছে। এদের মধ্যে একজন হাবিলদার নুর ইসলাম, যিনি শিউলির স্বামী। অন্যজন হাবিলদার মোস্তফা কামাল। দুজনের মধ্যে হাবিলদার নূর ইসলামের দাপট একটু বেশি। প্রচণ্ড সাহস আর রাগী স্বভাবের এ লোকটিকে এলাকার ছোট-বড় সবাই চেনে, দারোগা বাবু বলে ডাকে। সম্মানও কম করে না কেউ।
আর হাবিলদার মোস্তফা কামাল ময়নার স্বামী। কথা বলে কম। একটু নরম প্রকৃতির মানুষ। বাইরের মানুষের সাথে খুব একটা মেশে না। তার কাছ থেকে একবার জিজ্ঞেস করে কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে দেখলে অনেকটা রাশভারী বলেই মনে হবে। দুজনের মধ্যে দারুণ মিল। একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করে। ডিউটির সময়ও নিজেদের মধ্যে যতটুকু পারে একে অন্যকে সাহায্য করে।
এলাকার লোকের সাথে কোথাও কোনো প্রয়োজন হলে কথাবার্তা যা বলার হাবিলদার নুর ইসলামই বলে। এলাকার মানুষের সাথে তার ওঠাবসা আছে। সবাই তাকে চেনে, ভালোও জানে। আজ বাজারে মানুষের মুখে শুনেছে সে- আজ না-কি শেখ মুজিব গ্রেফতার হবে। সে যখন বাজার থেকে বাড়ি আসছিল, হঠাৎ মাঝ-বয়সী এক পথচারী তার পথরোধ করে জিজ্ঞেস করল :
– দারোগা সাব, দারোগা সাব, কথা কি সত্য?
– কী কথা?
– শুনলাম আজ আপনারা না-কি শেখ মুজিবকে অ্যারেস্ট করবেন?
– কী জানি বাপু, এ আর নতুন কী? পাকিস্তান সরকার তো প্রতিদিনই শেখের বেটারে অ্যারেস্ট করে? অ্যারেস্ট করলে তো জানবেনই।
বিরক্তির স্বরে কথাটা বলে বাজারের ব্যাগ হাতে দ্রুতগতিতে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করল নুর ইসলাম।
রাস্তাঘাটে বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করতে চায় না সে। তার ওপর গ্রামের বাড়ি থেকে মেহমান আসছে, তাও শ্বশুর বাড়ির মেহমান। বউ বলছে, জলদি জলদি বাজার নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে। সময়মতো না পৌঁছলে খবর আছে তার।
হাবিলদার নুর ইসলাম বাইরে খুব চোটপাট দেখালেও ঘরে একেবারে বিড়াল হয়ে থাকে। বউয়ের কথার একটুও এদিক-সেদিক যায় না সে। যায় না মানে যেতে পারে না। পারবেই বা কেমনে? যার বাবার বাড়ি থেকে বছরে দু-চারবার চাল-ডাল, মাছ-তরকারি আসে, তার কথা না শুনে উপায় আছে? এত কিছুর পরেও দাম্পত্যসুখে ভরপুর নুর ইসলাম আর শিউলির এই ছোট সংসার।
আজ ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সাল। নুর ইসলামের চাকরি-জীবনের বারো বছর পূর্ণ হলো। আজ তার দিনে ডিউটি নেই। রাতে ডিউটি আছে। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু রেস্ট নেওয়া অনেকটা ডিউটির মতো মনে করে সে। দুপুরে রেস্ট না নিলে রাতে ডিউটি করতে সমস্যা হয় তার। তাই দুপুরের খাবার শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে হাবিলদার নুর ইসলাম।
রাজারবাগ-সংলগ্ন শান্তিনগরে দুই রুমের একটি আধাপাকা বাড়িতে ভাড়া থাকে তারা। শিউলির বিয়ের সময় তার বাবা সংসারের কিছু আসবাবপত্র দিয়েছিল তাকে, সেগুলোই তার বাসার সম্পদ। এছাড়া আর তেমন কোনো সয়-সম্পত্তি নেই তাদের। শিউলির একমাত্র ছেলে মাহি। বয়স তিন বছর। এখনও স্কুলে যায় না। স্বামী-স্ত্রী আর একমাত্র সন্তান নিয়ে বেশ আরাম-আয়েশে দিন কাটছে শিউলি ও নুর ইসলামের।
সন্ধ্যা গড়িয়া রাত নেমে আসছে। নুর ইসলামের ঘুম ভাঙে না। এত শান্তির ঘুমের ব্যাঘাত করতে চায় না শিউলি। তাই তো ডাকতে সাহস পায় না সে। কিন্তু কী আর করা, ডিউটির সময় হয়ে গেছে, ডাকতে তো হবেই। ভয়ে ভয়ে নুর ইসলামের শরীরে ভালোবাসার হাত বুলায় শিউলি। তারপর কোমল স্বরে ডাকে :
– শুনছেন? আড়মোড় দিয়ে হু বলে জবাব দেয় নুর ইসলাম।
– উঠেন, ডিউটির সময় হয়ে গেছে।
– বলো কী, কয়টা বাজে?
– সাতটা পার হইছে।
নুর ইসলাম ঘুম থেকে তাড়াহুড়া করে উঠে, তারপর পোশাক পরে রেডি হলো ডিউটির জন্য। রাত আটটা থেকে ডিউটি, তাই ডিউটিতে যাওয়ার আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিল সে। প্রতিদিনের মতো আজও খাবার শেষে একখানা পান বানিয়ে নুর ইসলামের সামনে ধরল শিউলি। তারপর নির্ভরতার চোখে চেয়ে আস্তে আস্তে বলল :
– চারদিকে চোখকান খোলা রেখে সাবধানে ডিউটি করবেন। শুনছি আজ না-কি রাজারবাগে গণ্ডগোল হবে।
– কার কাছে শুনলা? প্রশ্ন করে নুর ইসলাম।
– কলপাড়ে, ভাবীরা বলাবলি করছিল, সেখানে ময়না ভাবীও ছিল। মোস্তফা ভাই না-কি ভাবীর সাথে আলাপ করেছে, আজ রাজারবাগে সে যখন ডিউটি করছিল তখন শুনছে পূর্ব পাকিস্তানের বড় বড় অফিসাররা গোপনে গোপনে কী সব প্রতিরোধের প্রস্তুতির কথা বলছিল। আরও কী কী যেন কইলো, আমি পুরাটা শুনি নাই।
– আরে না, শিউলিকে সান্ত¦না দেয় নুর ইসলাম। কিছু হবে না। এ-রকম তো কত কী শুনি। তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমার ডিউটির সময় হয়ে গেছে, আমি চলি।
বলেই রওয়ানা দিল হাবিলদার নুর ইসলাম। তিন বছরের শিশুসন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল বাবাকে।
– যাবা না, যাবা না, আমি আজ রাতে তোমার কাছে ঘুমাব।
হেসে হেসে ছেলেকে আদর করে কোলে নেয় বাবা। তারপর আদরের স্বরে বলে :
– আমাকে যে যেতেই হবে বাবা। তা-না হলে আমার স্যার আমাকে বকা দিবে। বেতন পাব না। আর বেতন না পেলে, আমরা খাব কী? তোমার জন্য সাইকেল কিনব কী দিয়ে? এ মাসে বেতন পেলে তোমাকে একটা লাল সাইকেল কিনে দিব। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তুমি মায়ের সাথে খেলা করো, আমি চলি।
মায়ের কোলে সন্তানকে তুলে দিয়ে বিদায় নেয় বাবা।
– মাহির দিকে খেয়াল রেখ, বলেই হাঁটতে শুরু করল হাবিলদার নুর ইসলাম।
এখন অনেক রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়ছে। ঘুম নেই শিউলির চোখে। এমনিতে হাবিলদার যখন নাইট ডিউটি করে, সে-রাতে তার ভালো ঘুম হয় না। আজ আবার কলপাড়ে কত আজেবাজে কথা শুনল সে। হাবিলদারও ডিউটিতে গেল। নানারকম দুশ্চিন্তা এসে ভর করছে মাথায়। সত্যি সত্যি গণ্ডগোল লাগবে না তো! আজ শত চেষ্টা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারল না শিউলি।
সকল চিন্তার বাঁধ ভেঙে হঠাৎ দুমদুম শব্দ। আঁতকে ওঠে শিউলি। কোন্ দিক থেকে শব্দ হলো? বাস্তব না স্বপ্ন- বিছানায় শুয়ে খেয়াল করতে পারল না শিউলি।
– কীসের শব্দ? রাজারবাগে গণ্ডগোল নয় তো? ঘুমঘুম চোখে শুয়ে শুয়ে ভাবছে শিউলি। বাইরে থেকে ডাক দেয় ময়না ভাবী।
– ভাবী, ও শিউলি ভাবী? কান খাড়া করে শিউলি।
– কে?
– আমি, আমি ময়না।
– ও আচ্ছা, এত রাতে? আশ্চর্য হয়ে উঠে বসে শিউলি, ভীতু স্বরে আস্তে করে জানতে চায় ময়না ভাবী :
– ভাই কই?
– ডিউটিতে গেছে। ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় শিউলি।
বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে আসে সে। দরজা খুলে দেখে ময়না ভাবী কাঁপাকাঁপা গলায় বলছে :
– ভাবী খবর জানেন?
– না তো, কী খবর?
– রাজারবাগ পুলিশ লাইনে না-কি পাকিস্তানি মিলিটারিরা আক্রমণ করছে। পুলিশের সাথে গোলাগুলি হইতেছে।
কথাটা শোনার পর আঁতকে ওঠে শিউলি। যা ভাবছে তাই। রাজারবাগে গণ্ডগোল? তার মানে নুর ইসলাম তো রাজারবাগেই বেশি ডিউটি করে।
– ভাইর ডিউটি কোথায় জানেন? জানতে চায় ময়না।
– জানি না। নিরুপায়ের মতো এক কথায় উত্তর দেয় শিউলি। দ্রুত খাটের কাছে ফিরে যায় সে। একবার তাকায় তিন বছরের শিশু মাহির দিকে। আরেকবার গ্রাম থেকে আসা ভাইয়ের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে অস্থির হয়ে পড়ে শিউলির মন।
– ভাবী, মোস্তফা ভাই কোথায়? বাসায় না-কি ডিউটিতে? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে শিউলি।
– বাসায় আছে, অপেক্ষা করছে। যদি ডাক পড়ে ডিউটিতে যাবে।
ঘর থেকে আঙিনায় নামে শিউলি। এ-মুহূর্তে বাড়ির সকল মানুষই বাইরে। নানারকম কানাঘুষা করছে। কেউ বলছে শেখ মুজিব অ্যারেস্ট হইছে। কেউ বলছে রাজারবাগে আক্রমণ হইছে। আবার কেউ বলছে কয়েকজন পুলিশ না-কি মারাও গেছে। এবার নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে শিউলি। তার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
মনের মধ্যে নানান রকম প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
– হাবিলদার তো ডিউটিতে গেল। কী ডিউটি? কোথায় ডিউটি? ডিউটি কি রাজারবাগের ভিতরে? না বাইরে? কিছুই জানে না সে। মোস্তফা ভাইকে জিজ্ঞেস করল, সেও কিছু বলতে পারল না। এখন কী করবে? কার কাছ থেকে খোঁজ পাওয়া যাবে? দিশাহারা হয়ে পড়ে শিউলি। এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে, আর যাকে সামনে পায় তাকেই জিজ্ঞেস করে মাহির বাপের খবর কেউ জানে কি না? কেউ কোনো খবর দিতে পারল না তাকে।
ঘরে ঢুকে গ্রাম থেকে আসা ছোট ভাই মধুকে বাবুর পাশে শুতে বলেই সে আবার বেরিয়ে গেল মেইন গেটের বাইরে। কারও কাছে কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায় কি না, মাহির বাবাকে কেউ দেখছে কি না?
এত রাতে গেটের বাইরে কেউ নেই। রাস্তায় কোনো রিকশা-ভ্যান, গাড়ি-ঘোড়া কিছুই দেখা যায় না। মাঝে মাঝে মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করলেও, বুঝা যায় না মানুষটা ঘরে না বাইরে। আবার গেটের ভিতর আসে শিউলি। এখনও গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। গোলাগুলির শব্দ এবার স্পষ্ট। এটা যে রাজারবাগকেন্দ্রিক তাও নিশ্চিত। দিশাহারা হয়ে পড়ল সে। মনে মনে আর্তনাদ করে :
– আমার হাবিলদার, আমার ভালোবাসার মানুষ, আমার সন্তানের বাবা, কোথায় আছো তুমি? কী করছো? কোনো বিপদ-আপদ হয়নি তো! আল্লাহ্ তুমি তাকে রক্ষা করো। মনের অজান্তে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে তার। এবার আর শরীরে বল্ পায় না সে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল শিউলি। আশপাশের ভাবীরা সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে তাকে।
– ধৈর্য ধরেন ভাবী, বাবুর আব্বার কোনো ক্ষতি হবে না, দেখবেন সে ঠিকই ডিউটি শেষে সকাল সকাল বাড়ি ফিরে আসছে।
কিন্তু কোনো সান্তনাই স্থির করতে পারল না শিউলির মন। একবার ভাবে রাজারবাগের দিকে যাবে, আবার চিন্তা করে এত রাতে কেমনে রাজারবাগ যাবে সে? রাতের বেলা এই যুদ্ধের মধ্যে রাজারবাগ গিয়ে কি বাবুর আব্বার কোনো খবর বের করতে পারবে? আশাহত হয়ে দিক-বিদিক ছোটাছুটি করে শিউলি।
মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। কালো রাত ফর্সা হতে শুরু করেছে। আশপাশের মানুষের ছোটাছুটির আওয়াজ পাওয়া যায়। এবার হয়তো একটা খোঁজ পাওয়া যাবে হাবিলদার নুর ইসলামের। শিউলি আবার বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। খানিকটা যাওয়ার পর শিউলি দেখে কয়েকটা পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বেডিংপত্র নিয়ে অন্ধকারে পালিয়ে ঢাকা ছাড়ছে। সেই বহরে আঙ্গুরার মাকেও দেখা গেল। আঙ্গুরার মা এগিয়ে এসে শিউলিকে তাদের সাথে পালাতে বলল। হঠাৎ সে দেখে পিছন থেকে হাবিলদার মোস্তফা তাকে ইশারায় ডাকছে। কিছুটা হলেও আশার আলো দেখে শিউলি। কেবল মোস্তফা ভাই পারে তার খবর বের করতে। দ্রুত মোস্তফার কাছে ছুটে আসে সে।
– কিছু জানতে পারলেন ভাই? মোস্তফা চুপ।
– চুপ থাকবেন না, কথা বলেন আপনার ভাইর কোনো খবর পেলেন?
– ভাইর খবর নাই। তবে দেশের খবর খুব খারাপ।
– কী হইছে খুলে বলেন।
– পাকিস্তানি মিলেটারিরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ঘুমন্ত মানুষের ওপরে আক্রমণ করেছে। শত শত মানুষ মারা গেছে। বিভিন্ন মহল্লায় ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আমাদের রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। এ-মুহূর্তে আমাদের ঢাকা ছাড়তে হবে, তা না হলে আমরাও মারা পড়ব।
হাবিলদার মোস্তফা কামালের কথাগুলো শোনার পর আরও অস্থির হয়ে পড়ে শিউলি। কী করবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। কোথায় হাবিলদার নুর ইসলাম। কোথায় তার দুধের শিশু! কোথায় যাবে পালিয়ে? এ-রকম একটা পরিস্থিতিতে কী করা উচিত জানা নেই শিউলির।
মোস্তফার কথায় দ্বিমত পোষণ করে শিউলি মোস্তফাকে জানিয়ে দিল- নুর ইসলামকে রেখে সে কোথাও যাবে না। নানান কথার জালে শিউলিকে বুঝাতে চেষ্টা করল মোস্তফা ও তার স্ত্রী ময়না; কিন্তু কোনো কথাই তাকে সান্তনা দিতে পারল না। বরং এবার প্রকাশ্যে অশ্রু ঝরাতে শুরু করল শিউলি।
চারদিকে একটা আতঙ্কিত ভাব। মানুষজন দিক-বিদিক ছোটাছুটি করছে। শিউলিদের বাড়িওয়ালা ও ঘরবাড়ি তালা দিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা করছে। আশপাশের পরিচিত অনেকে ঘরবাড়ি ছাড়ছে। কিন্তু শিউলি তার সিদ্ধান্তে অনড়, নুর ইসলাম বাসায় না আশা পর্যন্ত সে বাসা ছাড়বে না। এতে মিলেটারিরা যদি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়- দেক। ঘরে আটকা পড়ে যদি পুড়তে হয়, পুড়ে মরবে, তবুও নুর ইসলামকে ছাড়া ঘর ছাড়বে না শিউলি..

পূর্ববর্তী নিবন্ধকবিতা
পরবর্তী নিবন্ধজেনোসাইডের স্বীকৃতি কবে মিলবে?
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য