Sunday, July 3, 2022
বাড়িছোট গল্পভূমিপুত্র

ভূমিপুত্র

জীবন তাপস তন্ময়

স্বপ্ন উন্মোচনের অপেক্ষায় পদ্মাসেতু‘বাজান, নিয়ত করছি ডাহা যাইমুগা। টেহা কামাইমু। দেদারছে।’ আমি তাকাই। দেখি মতি চাচার চোখে স্বপ্ন। মতি মিয়া। রিকশা চালায়। সত্তর ছুঁই-ছুঁই। এখনও তিনি গতর খাটেন। রিকশা চালান। গতি মন্থর নয়। বেশ জোরেসুরেই চালান রিকশা। সজোরেই প্যাডেলে পা পড়ে। এতো দ্রুত চালাতে কম চালককেই দেখেছি।
ফিনফিনে গড়ন। চিকনকায়। বাতাসে পড়ে যাবেন। মনে হতে পারে। পরনে লুঙ্গি। গায়ে হালকা ফতুয়া। মাথায় টুপি। থুতনির দিককার এক মুঠো দাড়ি। মুঠো বলা যায় না। সামান্য দাড়ি। অনেকে ঠাট্টা করে ছাগল-দাড়িই বলে।
শহরের কালিবাড়ি মোড় থেকে বাসায় যাব। রাত একটা ছুঁই-ছুঁই। অটো খুঁজছি। একটাও নেই। রিকশাও দেখছি না। পুলিশের একটা টহল গাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। অনেকখানি সময় অপেক্ষা করে হাঁটতে শুরু করি। কাঁচারি বাজার যেতেই একটা রিকশা পেছন দিক থেকে আসছে। সজোরেই। আমাকে দেখেই থামায়। বাজান কই যাইবেন? শিক্ষক পল্লি। উঠেন। ভাড়া? দিয়েন। কতো বলেন? যা পারেন, দিয়েন। সব সময়ই যান, কওন লাগতো না। আমি সাধারণত রিকশায় দামদর করি না। কী আর নেবে? গতর খাঁটুনি থেকে। এই প্রথম দাম করলাম। কেন জানি না।
‘আমি মতি মিয়া। লতিবপুর তাহি। আরেকজনের বাড়িত। এক পোলা দুই মাইয়া। মাইয়া দুইডার বিয়া দিসি। ভালোই আছে। জামাইর বাড়ি। পোলাডাও বিয়া করছে। পোলাডারে লেহাপড়া করাইছি। উপযুক্ত অইছে। ভালোই কামায়। আমারে দেয় না। বউডা ভালা না। বউ যেমনে কয়, এমনেই চলে। সাদাসিদা আছিন পুতটা। বিয়ার পর কেমুন যেন অয়া গেছে। টেহাপয়সা দেয় না। মাইয়া দুইডা টেহা দেয়। জামাই বাবাজিরা যে হাত খরছের টেহা দেয়, হেইতা থাইক্কাই আমারে কিছু দেয়। যা পারে। কইনচাইন হুনি, মাইয়ারার টেহায় আমি চলমু? কীতা কইন বাজান, এইডা অয়? ইট্টু জাগা আছিন, ঘরও আছিন, পোলা বেঁচইয়া বেক টেহা নিছেগা। কয় ঢাহা তাকব। গেরামে না। আমরারেও নিবো। দুয়েকদিন আছিলাম। বউডা খালি জ্বালায়। বেক কাম আফনের চাচীরে দিয়া করায়। কিছতা করে না। টেঙ্গের উপরে টেঙ তুইল্লা বইয়া তাহে। রাগে একদিন আয়া পড়ছি। একজনে দয়া কইরা বাড়িত জাগা দিছে। মাইয়ারার টেহায় রিকশাডা কিনছি। এইডা চালাইয়াই খাই। কীতা কইতাম বাজান যুগডাই জানি কেমুন অয়া গেছে গা। বাজান হুনচুইন?’
মুখে রা নেই। কী আর বলবো? মতি চাচার জীবনের গল্প। সমাজের দর্পণ। কিছুই বলিনি, নিজের থেকেই বলছে। আমি জিজ্ঞেসও করিনি। তবে ভেতরে এই জিজ্ঞাস্য ছিল। প্রশ্ন ছিল। এই বয়সে একটা লোক রিকশা চালায়? শরীরে কিছু নেই। মনোবল একটুও কমেনি। স্ত্রীর সম্মানে-আত্মসম্মানে নিজে কাজ করছেন। কারও কাছে হাত না পেতে।
জি বলেন। আমি শুনছি। তাহলে ঢাকা কেন যাবেন? কী করবেন? ছেলের বাসায় উঠবেন? ‘আরে নাহ! এইতা কীতা কইন বাজান? ছেড়া নাই। থাইক্যাও নাই। আপনের চাচীরে থুইয়া আমি ঢাহা যাইমুগা। এই রিশকাডা লইয়া। সারারাইত রিশকা চালাইমু। দিনে গাড়ি-ঘোড়া বেশি থাহে রাস্তায়। আমার অসুবিধা অয়। রাইতে ঝামেলা নাই। আরাম কইরা চালাইতাম পারি। রিশকা চালাইয়া বেক টেহা মজিদের ইমামের টাইন থুইয়া দিমু। ইশটিশনো ঘুমাইমো। কোনু গাছের তলে। রিশকা লইয়া। কী কইন বাজান? কামডা টিহইবো না?’
অবাক হই। মতি চাচার মনের জোর দেখে। এই বয়সে সে কাজ করছে। ভিক্ষা না করে। হাত না পেতে। বললাম, ‘আপনি এই বয়সে ঢাকা কেন যাবেন? তাছাড়া শুনেছি সরকার শহরকে যানজট মুক্ত করতে রিকশা ওঠিয়ে দেবে! এ-কথা শুনে মতি চাচা একটু রেগেই গেলেন! মনে হলো।’ আফনে ঠিক কইছুইন না। শেখের বেডি আছে না, হে থাকতে কেউ আমরারে উডাইবার পারব না। হে-ই আমরারে দেখব! হে আছে বইলাই তো বাঁইচ্যা আছি। বয়স্ক ভাতা পাই, আমি আর আফনের চাচী দুইজনেই। হুনছি ঘরঅ দিতাছে। চেরম্যানে কইছে, আমরারেও দিব। গরিবের দুঃখু বোঝে শেখের বেডি!’ একজন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার প্রতি মতি মিয়ার নির্ভরতা দেখে অবাক হই! এখানে যে টাকা কামান, তাতে যদি আপনার চলে, আমি বলবো ঢাকা যাবেন না। তাছাড়া সরকার আপনাকে ঘর দিবে, এখানেই ভালো থাকবেন। ঢাকা গেলে আপনার কষ্ট হবে। মসজিদের ইমাম হলেই যে সবাই ভালো, কী করে বুঝবেন? তাছাড়া ব্যাংক আছে, আপনি ব্যাংকেই টাকা জমা রাখতে পারবেন। লাভবানও হবেন। নিরাপত্তাও পাবেন। আপনার বয়স হইছে। এই বয়সে এমন সিদ্ধান্ত না নেয়াই উচিত।
মতি চাচা কথা বলে না। চুপ থাকে। এরই মাঝে বাসায় চলে আসি। নির্ধারিত ভাড়া থেকে দ্বিগুণ দিই। তিনি অর্ধেক টাকা ফেরত দেন। বললাম, এখন রাত। ভাড়া একটু না হয় বেশিই নিলেন।
‘না বাজান। আমারে বিশ টেহা দিলেই অইবো। বেশি লাগব না। জোর করেও তাঁকে বেশি দিতে পারিনি। দুয়েকদিন পর দেখা হয় মতি চাচার সাথে। বাসায় ফেরার পথে। হেঁটে বাসায় যাচ্ছি। রাত সাড়ে বারোটায়। আমাকে দেখেই মতি মিয়া রিকশা থামায়। বলে, ‘বাজান আপনে? কতো খুঁজছি। উডেন রিশকায়।’ আমি রিকশায় উঠি। যেতে যেতে মতি মিয়া বলেন, ‘বাজান আপনে আমারে বাঁচাইয়া দিছেন। আমি আপনের কথা ভাবছি। বাড়িত গিয়া। আপনে টিহই কইছেন। এই বয়সে ঢাহা গিয়া কীতা করমু? কই থাকমু? আমার ইহানোই ভালা। অহন আমারে শেখের বেডি ঘর দিছে, ভাতা দিতাছে। আমার আর কারও কাছে আত পাতন লাগে না। আল্লায় ভালা রাখছে। আফনের কথায় আমি একটা একাউন করছি। ব্যাংকঅ। কিছু টেহাও জমছে। আফনের চাচীরে লইয়া ভালাই আছি। আমি আর ঢাহা যাইমু না। কী তা কইন বাজান, কামডা ঠিক করছি না?’

লেখক : গল্পকার

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য