Saturday, July 13, 2024
বাড়িউত্তরণ প্রতিবেদনভাষা, বিলুপ্তি ও অধিকার

ভাষা, বিলুপ্তি ও অধিকার

স্বপন নাথ : বিশ্বে সবই ভাষার প্রকাশ। সরব, নীরব, ইমেজ, ইঙ্গিত যা-ই বলি বা দেখি। অসামান্য সৃজনশীলতা ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশিত। যেদিন থেকে মানুষের প্রতীক তৈরি শুরু, সেখানেই ভাষার প্রকাশও হলো প্রতীকে। লিপির আনন্দ তা থেকেই শুরু। চিহ্ন, প্রতীক, শব্দ, লিপি, প্রকাশে ভাষা স্বয়ম্ভর হলে বলা হয় কোর ভাষা। পৃথিবীতে অনেক ভাষার স্বীয় লিপি নেই। যাদের লিপি নেই, তারা অন্য ভাষা বা প্রতিষ্ঠিত অথবা বহুল ব্যবহৃত একটি ভাষার লিপি ব্যবহারে লেখালেখি করে বা ভাব প্রকাশ করে থাকে। তবে লিপি না থাকলে ভাষা অকেজো হয়ে যায় না। অনেক ভাষার লিপি না থাকলেও ভাষায় রয়েছে চমৎকারিত্ব। এ বিশ্বের অনেক ভাষা পাওয়া যায়, যেসব ভাষায় লিখিত কোনো উপকরণ নেই। যেক্ষেত্রে শ্রুতি হলো ভাষা প্রকাশ ও বিকাশের প্রধান মাধ্যম। স্বাভাবিকভাবে লিখিত রূপ বা নিদর্শন না থাকার ফলে ভাষা সংরক্ষণের বিষয়টি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, এসব ভাষা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। শুধুই মৌখিকভাবে প্রচলিত ভাষাসমূহ নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, মৌখিক ভাষাগুলো ওই ভাষাভাষীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হারিয়ে যায়। স্মরণ রাখা দরকার, এ সভ্যতার যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, আবার বর্বরতাও আছে। সভ্যতার অনেক উপকরণ নির্মিত হয়েছে হিংসার মধ্য দিয়ে। একদিকে যেমন স্থাপত্য-প্রত্নের নির্মাণ, অন্যদিকে এসব নির্মাণে কত শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন, তার দায়ভার কেউ গ্রহণ করেনি। বস্তুত ভাষা হারানো, বিলুপ্ত হওয়া অথবা ভাষাকে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা ইত্যাদি বিষয় অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীর ওপর।
বাংলাদেশে বাসরত বাঙালি ব্যতীত আরও ৪৫টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। যাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়। সংগত কারণে উৎস বিবেচনায় স্বতন্ত্র ভাষা পরিচিতি রয়েছে। প্রতিটি গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক কতক বিষয়ে সাদৃশ্য থাকলেও ভাষিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিভাজন অত্যন্ত স্পষ্ট। তবে ব্যবধান থাকলেও ভাষা ও সংস্কৃতিতে আদান-প্রদান রয়েছে। যেমন রয়েছে বাংলা ভাষাভাষীদের সাথে। কারণ জীবনযাপনের প্রয়োজনে আদান-প্রদান বিনিময় অনিবার্য বিষয়। আমরা যদি প্রশ্ন রাখি, বাঙালি, মণিপুরি, চাকমা, মারমা, খাসি বা যে কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা না থাকলে আদৌ কোনো ক্ষতি হবে কি না? যেক্ষেত্রে ভাষার সাথে অনিবার্য হলো ক্ষমতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, সম্প্রদায়গত নানা বিষয়ের সংযোগ। ফলত ভাষিক বৈশিষ্ট্য, কিংবা সাংস্কৃতিক বোধের সমীকরণ নির্ভর করছে ভাষার ওপর। বাংলাদেশে বিভাজন না করে নৃগোষ্ঠীর কথা যদি বলি, তা হলে ভাষার কী সংখ্যানুপাতিক কোনো বিশেষত্ব ধরা পড়ে। হয়তো না। সংখ্যায় তারা এত বড় ভাষা-সম্প্রদায় নয় যে, কোনো গোষ্ঠীর ভাষা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। স্মরণীয় সংখ্যানুপাতে যদি ভাষার শক্তি প্রমাণ থাকত, তা হলে চীনা, হিন্দি, স্প্যানিশ, আরবি হতো সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা; বৈশি^ক ভাষা, তা কিন্তু নয়। এগুলো ভাষা হিসেবে অবশ্যই শক্তিশালী। কথা হলো, সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রয়োজনেই প্রতিটি ভাষার উপকরণসমূহ জরুরি। প্রতিটি ভাষায় চলমান থাকে জ্ঞানবৈচিত্র্য ও মানবসমাজের গতিপ্রকৃতি। এখন আমাদের প্রশ্ন হলো নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা কী বাস্তবতার নিরিখে একসময় বিলুপ্ত হবে? বিশেষত যাদের ভাষাভাষী সংখ্যা সীমিত। আমরা জেনেছি, একটি ভাষায় কথা বলত মাত্র ১৩ জন। এবং এ ভাষার প্রাচীন রূপটির সাথে ওই পরিবারের বৃদ্ধবয়সী ব্যক্তির শুধু যোগাযোগ ছিল। মানে তিনি বহন করতেন সে ভাষার সীমিত শব্দাবলি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ ভাষাটি হারিয়ে যাবার উপক্রম। কারণ ওই ব্যক্তি ছাড়া পরিবারের আর কেউ সংশ্লিষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারে না। ফলে মৌখিক ভাষা চলমান থাকলেও এসব ভাষায় লিখিত চর্চা করার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। বস্তুত সভ্যতা, সংস্কৃতির প্রয়োজনে বিভিন্ন ভাষার সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনে যে কোনো ভাষার একটি আদর্শ রূপ তৈরি করতে হয়। আবার আদর্শ রূপ না থাকলে যে ভাষা হারিয়ে যায়, তা নয়। অন্যদিকে কোনো আদর্শ রূপ প্রমাণ করে না একটি ভাষার ব্যবহার যোগ্যতা কেমন হওয়া উচিত। মূলত ভাষার আদর্শ রূপ বলে কিছু নেই। সাধারণ মানুষ যেভাবে ভাষাকে নির্মাণ করে, যা হয় ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য। কারণ, সাধারণ মানুষ যে ভাষা বাইরে, ঘরে, আপনজনের সাথে ব্যবহার করে সেটাই তো ভাষা। ফলে ভাষার কোনো অবনমিত রূপ নেই। প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর ভাষা স্বতন্ত্র হিসেবে এখন প্রতিষ্ঠিত। ফলত ভাষা চর্চার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে আবেগের আলোকে যে কোনো ভাষা পরিস্থিতি বিবেচনা করা ঠিক নয়। সব দেশেই রয়েছে ভাষিক বৈচিত্র্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা কী? বাংলাদেশেও রয়েছে ভাষার বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত থাকে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও অঙ্গীকার। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। যে-কারণে বাংলা ভাষার গুরুত্ব অস্বীকারের উপায় নেই। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সর্বজনীন ব্যবহারের জন্য একটি ভাষার আনুষ্ঠানিক রূপ মেনে নিতে হয়। আরও একটি বিষয় হলো বাংলা ভাষার সর্বজনীন ব্যবহার, সাংবিধানিক অঙ্গীকার নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীগুলোর সমর্থনও আছে। এক্ষেত্রে আমরা জানি, নৃগোষ্ঠীগুলোর মৃদু প্রশ্ন ও বিরোধিতা রয়েছে। বলে রাখা ভালো, এ ভূখণ্ডে বিচিত্র ভাষার মানুষ, জনগোষ্ঠীর বাস। কিন্তু বাংলা ভাষাভাষীর সাথে বিভিন্ন ভাষাভাষীগোষ্ঠীর তেমন কোনো বিরোধ ঘটেনি। যে বিরোধ বা হিংসাত্মক ঘটনাবলি নানা সময়ে ঘটেছে, এগুলোর বেশিরভাগই বস্তুগত স্বার্থ ও রাজনীতিকেন্দ্রিক। বাংলাভাষীরা কোনো কারণে অন্য ভাষাগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তারে চেষ্টা করেনি। ভাষাচিন্তাকে কেন্দ্র করে বাংলাভাষা গোষ্ঠী কখনোই উগ্রতা প্রকাশ করেনি। স্মরণীয় ১৯৫২ সালে বাঙালির রক্তদানের পরিণতিতে বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা আসে। এর পরিণতিতে স্বাধীন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠা পায়। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত সকল ভাষার স্বীকৃতি আসে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এ সূত্রে অন্য ভাষাভাষীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সকলেই জানে বুঝে যে, ভাষার সাথে ক্ষমতা, দখল, বাণিজ্য, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে এখন আর প্রমাণ দিতে হয় নাÑ এক সময় এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন ভূখণ্ডে উপনিবেশবাদ জেঁকে বসেছিল। দীর্ঘদিনব্যাপী উপনিবেশের শাসন-শোষণ অব্যাহত থাকার মূল কারণ ছিল ভাষার আধিপত্য। উপনিবেশের ভাষা বাধ্য হয়ে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী গ্রহণ করেছে। যে-কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ভাষার অবনমনে ক্ষমতার দণ্ড, দম্ভ প্রয়োগ করা হয়েছে। উপনিবেশের ভাষা সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দান বলে এর স্বপক্ষে বয়ান তৈরি করা হয়েছে। যেক্ষেত্রে উপনিবেশিত অঞ্চলে মগজধোলাই ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়। ফলত এগিয়ে যায় ভাষা বিলুপ্তির প্রক্রিয়াÑ ভাষিক গণহত্যার পথে। উন্নয়নের এ পর্বে প্রাযুক্তিক অগ্রসরতা এ গণহত্যাকে ত্বরান্বিত করবে কি নাÑ প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বে ভাষার মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়া, বিলুপ্ত হওয়াকে ভাষিক গণহত্যা, ভাষা হত্যা ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা মনে করি এটা খুব নিবিড় এক পরিভাষা। ভাষিক গণহত্যার সংজ্ঞার্থ, কারণ ও প্রক্রিয়া হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কথা প্রসঙ্গত স্মরণীয়,
(ক) “Prohibiting the use of language of the group in daily intercourse or in schools, or the printing and circulation of publications in the language of the ‘group’, many people might think of physical prohibition only. Likewise, when reading the part of the Convention which its Article ii (e) includes ‘forcibly’ transferring children of the group to another groupÓ [T Skutnabb-Kangas 2000 : xxxi] (খ) “… that most languages at least today do not die a ‘natural’ death. Linguicide ঃthus, by contrast, implies that there agents involved in causing the death of languages. In the liberal ideology, describe above, only an active agent with
the conscious intention to kill languages would cause linguicide… in my view, the agents for linguicide can be active or passive’. And it is in relation to these two ‘passive’ policies that state policies, especially in education are decisive today. [2000 : 369]

এসব বিবেচনার আলোকে এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাবনাচিন্তা ক্রিয়াশীল রয়েছে। এ জন্য জাতিসংঘ ২০২২-২০৩২ আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাদশক ঘোষণা করেছে। এর কারণ হলো ভাষা বিলুপ্তির আশঙ্কা। এ সংস্থা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলেছে, এ শতকেই ৫০ ভাগ বা তারও বেশি ভাষা হারিয়ে যাবার শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে আদিবাসী ভাষার সংখ্যাই বেশি। আরও বলেছে, আগামী ১০০ বছরে ৩ হাজার ভাষা বিলুপ্ত হতে পারে। এ বাস্তবতায় কী করার আছে আমাদের?
এ ছাড়াও জীববৈচিত্র্যের বিনাশে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হতে পারে। মনে রাখতে হয়, সকল জ্ঞান ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। এক্ষেত্রে ভাষাবৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্যের ঐক্য রয়েছে। জীববৈচিত্র্যের উপাদান হলো বংশগতি, প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্র। যেসব মানবভাষাকে প্রভাবিত করে। লক্ষণীয় বৃহদার্থে জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যের জাতি, প্রজাতির নামাঙ্কন, শনাক্তসহ বিভিন্ন কারণে বৈচিত্র্যকেন্দ্রিক ভাষা, পরিভাষা সৃষ্টি হয়েছে। যে বৈচিত্র্যে আমরা বিভিন্ন প্রতীকও গ্রহণ করেছি। সাধারণভাবে এ বিষয় সংশ্লিষ্টতা মানবসমাজের জন্য অনিবার্য বিষয়। খুব সহজ বিষয় হলো, এসব হারানোর ফলে ভাষা ও পরিভাষা আর প্রয়োগ না হওয়ারই কথা। আমরা জানি জীববৈচিত্র্যের ওপর মানবসমাজের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। যেক্ষেত্রে অনেক মানুষের জীবনযাপন, আয়-রোজগার নিহিত। বিশে^র বিভিন্ন দেশে আদিবাসী বা নৃ-জনগোষ্ঠীগুলো সরাসরি এ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনযাপনই ওই পরিবেশের উপাদানের সাথে সংশ্লিষ্ট। ফলে জীববৈচিত্র্য বিনাশ মানে মানববৈচিত্র্যকে হারানো। মানুষের আধিপত্য, নির্বিচার প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস কার্যক্রম এ জীববৈচিত্র্যকে হুমকির সম্মুখিন করেছে। কাল ব্যবধানে আইইউসিএন এ বিষয়ে লাল তালিকাও প্রকাশ করছে। এ সংস্থার প্রতিবেদনে জীব, প্রকৃতি এবং ভাষা-সম্পর্কিত তালিকায় বিলুপ্তির কথাও বলা হয়েছে। হারিয়ে যেতে যেতে যা আছে, সেগুলোর মধ্যেও কয়েকটি সামনের দিনগুলোতে হারাতে পারেÑ এমন কথাই বলা হয়েছে। আইইউসিএন বলছে, ৪২ হাজার ১০০ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির সম্মুখিন হয়েছে।
উপর্যুক্ত বিষয়ের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতি কেমন। তার জন্য বিশেষ কোনো গবেষণার প্রয়োজন হয় না। ঘরে মাতৃভাষা ব্যবহার হলেও বাইরে বিভিন্ন কাজে বাংলা ও অন্যান্য ভাষা ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ বাণিজ্য, বিদেশের সংযোগ ও উৎসাহে ব্যবহৃত হয় ইংরেজি। ধর্মীয় প্রয়োজন ও শিক্ষায় ব্যবহৃত হয় আরবি, ফারসি, পালি, সংস্কৃত ও উর্দু। নৃগোষ্ঠীগুলোর আন্তঃসংযোগে চলমান আছে স্ব-স্ব মাতৃভাষা। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলা ভাষা সকলেই ব্যবহার করে। ফলে এ অঞ্চলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সূত্রপাত। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রতি যে আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। যুক্তিসংগতভাবে বাংলা ভাষা সর্বজনীন, সর্বস্তরে ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি এখনও। এর কারণ কী? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভাষা আন্দোলনের পরপরই বাংলাভাষা বিরোধী অবস্থানে চলে গেল এদেশের এলিট-শ্রেণি। মনে রাখতে হবে, এলিট গ্রুপের মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিজীবী বলে খ্যাত শিক্ষকসহ বিভিন্ন ধরনের লোকজন। কেউ কেউ বাংলা ভাষার বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের যুক্তি হলোÑ বাংলা ভাষা সীমাবদ্ধ, শিক্ষায় এর উপযোগ সমস্যা রয়েছে। শিক্ষা, বাণিজ্য, ব্যাংকসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থানই নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন আর বাংলা ভাষার চর্চা তেমন হয় না। এমনকি এখন সাধারণ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। কিন্ডারগার্টেনসহ বিপুল সংখ্যক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোতে ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া চলে। আরও রয়েছে ইংরেজি ও আরবি মাধ্যম এবং ভারসনের প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে এদেশের বিত্তবান, উচ্চমধ্যবিত্ত, ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট সংস্থার মালিক ও অংশীজনের সন্তানরা বাংলাভাষা মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে না। তারা সকলেই ইংরেজি মিডিয়াম, ইংরেজি বা আরবি ভারসনের প্রতি আগ্রহী। বাংলা ভাষা তাদের দৃষ্টিতে অকেজো ভাষা হিসেবে পরিগণিত। বাংলা ভাষার পক্ষ-বিপক্ষ, শত্রু-মিত্র, সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। এই বাংলা ও নৃভাষাবিরোধী একটি গোষ্ঠী এখানে খুব কায়দা করে অ্যান্ডারসনের সূত্র অনুযায়ী একটি ইমাজিনড জাতি গড়ে তুলতে চেষ্টারত। এ অবস্থায় নৃ-জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষাসমূহের কী অবস্থান থাকতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
এখন বৈশি^ক সমাজ ভাষা বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। খানিকটা উগ্রতাও প্রকাশ করে কেউ কেউ। কেউ কেউ ভাষা বাঁচানোর জন্য আন্দোলন অথবা ভাষা রক্ষার জন্য নানা কর্মসূচি প্রণয়নে ব্যস্ত। সকলের জন্যই আগাম বার্তা দিয়ে রাখা যেতে পারে। যা আমরা কল্পনা করিনি, ভাবিনি, এমন সব ঘটছে এ বিশে^। মানবসমাজের অনেক প্রয়োজন, আয়োজন, সংস্কৃতি আর থাকবে কি না সন্দেহ। ফলে কোনো ভাষার আয়তন ছোট না বড় হবে, তা নিশ্চিত বলা যায় না। এখন বিশে^ প্রযুক্তির অসামান্য বিকাশের কারণে জীবনযাপনের অনেক গল্পই পালটে যাচ্ছে। আগামীতে যে পরিবর্তন হবে, তা এখন হিসেবেও আনতে পারছি না। তবে সম্ভাব্যতা অনুমান করতে পারি। সবকিছু পরিবর্তনের কারণে ভাষাও পরিবর্তিত হবে। ফলে পৃথিবীতে নতুন এক ভাষা পরিস্থিতি অবলোকন করতে হবে। সেই ভাষা আমরা সকলে ব্যবহার করব। এখন ব্যবহার করছিও। এ-সময়ে আমরা অনলাইনে অনেক অহেতুক কথা বলি, যা হয়তো কথপোকথনের কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়, তবুও করছি। দ্রুত পরিবর্তনের কারণে আগামী প্রজন্ম ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে প্রবেশ করবে। ধীরে ধীরে এর ভেতরে ভুক্ত হওয়ার ফলে বুঝতে পারছি নাÑ কোথায় যাচ্ছি, ছুটছি আমরা। আমরা খুব ভালো জানি নতুন কিছু পেতে হলে, অনেক কিছু হারাতে হয়। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন কালের ইঙ্গিত জানাবোঝা অতি জরুরি হয়ে গেছে।
বস্তুত রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ক্ষমতা, ইত্যাদি সব মিলিয়ে ভাষার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। শুধু কথা বললেই প্রভাব তৈরি হয় না। বিশ^ায়নে ক্ষমতার অর্থ, বাণিজ্য ও ভাষার পরিধি প্রসারমান। বিশেষত গণমাধ্যমের স্থানটি খেয়াল রাখতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে এখন ভাষা ব্যবহারের ধরন বদলে গেছে। এখন যদি কোনো রাষ্ট্রে ভাষা পরিকল্পনা করতে হয়, তা হলে অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমের ভাষার কোন আদর্শরূপ কী হবে, তা কিন্তু কোনো সংস্থা থেকে বলা হয়নি। যা কিছু হচ্ছে, তা সাইবার সিকিউরিটির বন্ধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে এখন প্রান্তীয় ভাষাগুলোর প্রয়োগও বেড়েছে। আন্তর্জালিক সংযোগ ও প্লাটফরম বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। গতির কারণে এখন চিঠি লেখা কমে গেছে; কিন্তু বেড়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ। সাধারণ মানুষ যারা সাহিত্যচর্চা করেনি, বা কোনো ভাষাচর্চা করেননি, তারাও সামাজিক মাধ্যমে অনেক কিছু লিখে যাচ্ছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইল, ব্লগ, টুইটারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লেখা কী কম হচ্ছে। ফলে ভাষাসংরূপের নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হচ্ছে। ব্যাকরণ বা প্রথাগত দৃষ্টিতে এ মাধ্যমের ভাষার অনেক ভুল ধরতেই পারেন অনেকে। বলা হয়, ‘টাকা আর ভাষা, দুটোরই গূঢ় সত্তা বিমূর্ত, ভাবাশ্রয়ী; কিন্তু সাংকেতিক প্রক্রিয়ায় সেগুলো সারগর্ভ বাস্তবনির্দেশ করে। সেই সারবত্তা অগ্রাহ্য করায় এখন সংকেতগুলোর উদ্দেশ্য ব্যর্থ; সেগুলো আর বিমূর্ত নয়, স্রেফ অন্তঃসারহীন।’
বলা হচ্ছে, বিশ^ায়ন যে কোনো ভাষার আন্তর্জাতিক পরিসরে বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ^ায়নের সংজ্ঞার্থে বলা হয়Ñ ‘সময় ও পরিসর’-এর সংকোচন। এ ধারণা ও বিশ্লেষণের সুযোগে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলমান। কৌশলে বলা হচ্ছে, যোগাযোগের সুযোগে একটি প্রান্তীয় ভাষা সম্পর্কেও জানাবোঝার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যাদের পণ্য ও বিনিময় প্রক্রিয়া শক্তিশালী, তাদের ভাষার গুরুত্ব বেশি। ফলত বাণিজ্যিক ক্ষমতা ভাষার মর্যাদা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নয়নে, দ্রুত পরিবর্তনশীলতার ফলে বিদ্যমান ভাষাগুলোর প্রয়োগ গৌণ হতে চলেছে। লক্ষণীয়, ভাষিক ক্ষমতার পরিবর্তন অবশ্যই ঘটেছে। আমরা যেসব ভাষা ক্ষমতার শক্তিতে একসময় চর্চা করেছি। এখন তা অচল প্রায়। আমরা বিশ^ায়নের ভাষাই গ্রহণ করছি। একসময় ঔপনিবেশিক ভাষা উপনিবেশ ও উৎকর্ষের কারণে জনপ্রিয় ও গৃহীত হয়। ঔপনিবেশিক করতলে উপনিবেশিত জাতি, দেশ, গোষ্ঠী ওই ভাষাকে নিজের বলে মেনে নিয়ে নিজের মূল ভাষাকে বিসর্জন দিয়েছে। এ কারণে অনেক ভাষাই ক্রম হারিয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়েছে। অন্যদিকে খোলাবাজার অর্থনীতিতে দায়বোধ বলে কিছু নেই। পণ্য, লেনাদেনা, বাণিজ্য হলো বড় কথা। এক্ষেত্রে ভাষিক মূল্যবোধ না থাকারই কথা। এ সুযোগ ব্যবহার করছে বিশ^ায়িত ভাষাভাষী গোষ্ঠী, রাষ্ট্র, দেশ ও জাতি। তারা প্রচার করছে বিশ^ায়িত ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের ভাষা নয়, এ-যুগের টুল ও প্রযুক্তি। এক্ষেত্রে সাফল্য শতভাগ বলা যায়। এ অবস্থায় অন্য ভাষাকে বিশে^ তুলে ধরতে গেলে, ওই টুলের স্থানে যেতে কী কী করণীয় তা ভাবতে হবে। তবে শুধু টুল হিসেবে ব্যবহার যোগ্যতা বাড়ালেই হবে না। তার বাণিজ্যিক ও প্রাযুক্তিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। না হলে একটি কোর ভাষাও একসময় আর ব্যবহার করা যাবে না বা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। এখন বিশে^ যে প্রাযুক্তিক ভাষা তৈরি হচ্ছে, এর ঔপভাষিক বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। যেক্ষেত্রে আমরা রোমান হরফ ব্যবহার করছি মাত্র। যেভাবে একটি ভাষার হরফ না থাকলে আমরা সুবিধাজনক একটি হরফ ব্যবহার করি। সেভাবে প্রাযুক্তিক ভাষার হরফ হিসেবে রোমানকে অংশত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মনে রাখতে হয়, মানুষের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি হলো কোনো জাতিগোষ্ঠীর মৌলসত্তা। এর সাথে মানবাধিকারের প্রসঙ্গ জড়িত। এসব বিষয়ে যখন কোনো গোষ্ঠী অবনমনের শিকার হয়, তখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এ-দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় হলো সকলকে ধারণ করা। এ চেতনা থেকেই বলা হয় বহুভাষিক, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের কথা। আপাতভাবে মনে হয় বিশ^ায়ন প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা বিকাশের পথ সুগম করেছে। একটু থেমে ভেবে দেখুন বিষয়টি উল্টো কি না? আগে যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় বাইরের বাণিজ্যপুঁজির সাথে কারও যোগাযোগ ছিল না। ফলে জীবনযাপন নিজস্ব কাঠামোর ভেতর অকৃত্রিম ছিল। এখন বিভিন্ন চাকচিক্যময় প্রলোভনে কেবল সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে বাণিজ্যের ভাষা ও প্রযুক্তি আসলে কী। বলে দিচ্ছেÑ ‘তোমারটা দিয়ে আর তুমি চলতে পারবে না। বিশে^র নানা প্রান্তে সাঁতার দিতে গেলে বৈশি^ক ভাষায় যোগাযোগ করতে হবে। তুমি ভালো পণ্য হতে পারবে না। অতএব এগুতে গেলে শেকড়ের আবেগ ছেড়ে হতে হবে বিশ^নাগরিক।’ শুরু হলো দৌড়। এখন দৌড়ের ওপর আছে সকলে। এর ফলে বাণিজ্যপুঁজির দুনিয়া এখন প্রক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, এতে ভয়ের কিছু নেই। তারা প্রচার করছেÑ ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও পুনরুজ্জীবন হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়ার মর্মার্থ কেউই বুঝতে পারছে না। বিশে^র নিয়তি হলো এমনই যে, ক্ষমতার ভাষিক প্রক্রিয়ার কাছে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। এ প্রক্রিয়া মূলত ভাষাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। নিতান্ত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক প্রয়োজন ব্যতীত আমরা ভাষা কেন, কোনো বিষয়ই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি না। বিশ^ অর্থনীতির অস্থিরতা, বাণিজ্যিক প্রলোভনের কারণে আমরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভাষাকে অধিক আগ্রহ ও গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করছি। একটু গভীরে চিন্তা করে দেখা যাচ্ছে, মাতৃভাষা বা নিজের ভাষা বলে যে বোধ ও মূল্যবোধ, সবই কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন অপ্রিয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা। গভীরভাবে তলিয়ে দেখা যায়, আসলে আমরা আমাদের মাতৃভাষায় কোনো কাজই করি না। প্রথমত; সংশ্লিষ্ট ভাষার কৃত্রিম আদর্শ রূপ মাতৃভাষাকে গিলে ফেলে। আমরা ঘরের বাইরে আর এ ভাষার যোগ্যতা রাখি না। শিল্প, সাহিত্য, আনুষ্ঠানিকতার বাহানায় যে ভাষায় জন্মেছি, সে ভাষাও হারিয়ে ফেলি। দ্বিতীয়ত; অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্যতার লোভে আধিপত্যের প্রতি নমনীয় হয়ে অধিপতির ভাষা ব্যবহার করি। তৃতীয়ত; জ্ঞানবিদ্যা ও ক্ষুণ্নিবৃত্তির সুবিধা পেতে অন্যভাষার দখল মেনে নিচ্ছি অনায়াসে। চতুর্থত; সাংস্কৃতিক ফিউশনের করতলে অন্যভাষার আধিপত্য মেনে নিই ক্ষমতার ভাগ পেতে ও সুবিধা আদায়ে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে মানুষের ভেতরে ক্রিয়া করে ক্ষমতার সুবিধা, বর্ণ বা সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি। এর মানে হলো জাগতিক ক্ষমতাহীনতা, নিজের ভিখারিত্ব ঢেকে রাখা, শ্রমহীন আধিপত্যের ভাগাভাগি, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতার সুবিধা গ্রহণ, স্বাধীন চিন্তার অনুপস্থিতি ইত্যাদি সহায়ক হয়ে ওঠে।
আজ যে বিশে^ ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বেড়েছে। এখন নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহ্যিক পরিচিতিকে ভুলে যখন আমরা বিজাতি বা ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছি। ঔপনিবেশিক যে ভাষা শুধু আমাকে ভুলিয়ে রাখে না, আমার পরিচিতিকে মুছে দেয়। সেখানে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে উগ্রতা প্রকাশ পায়, এবং ভাষাগোষ্ঠী নিজেকে অস্বীকার করে স্বার্থ ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ভাষার ভেতর। আমরা সেই ক্ষমতা ও রাজনীতির মোহে টের পাই না, ভেতরে ভেতরে কী সমস্যা হচ্ছে। আবার যখন একটা জাতি তার সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে, সেখানে নিজের ভাষা সংস্কৃতির প্রতি আর শ্রদ্ধাবোধ থাকে না। ফলত, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত উগ্রতায় নিজেকে ভুলে যায় সকলেই। ভাষার প্রতি নৃবৈশিষ্ট্যগত ভাষার মূল্য আর বজায় থাকে না। আমরা ক্ষমতা ও হেজেমনির ভাষার প্রেমে পড়ি। ফলে ধর্ম, সংস্কৃতি, বাণিজ্যকেন্দ্রিক ভাষা যা-ই হোক, এসব অস্বীকার করে নিজের ভাষার চর্চা করা প্রয়োজন। এ কারণে যে, ভাষার সাথে সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের পরম্পরাগত সম্পর্ক আগে থেকেই রয়েছে। আসলে ইচ্ছেকৃতভাবে যারা নিজের ভাষা ব্যতীত উগ্রতার সাথে অপর ভাষা ব্যবহার করে, তারা ইচ্ছেকৃত করে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, নিজের মাটি-সংশ্লিষ্ট পরিচিতিকে মুছে ফেলা।
প্রসঙ্গত সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়া শুধু একটি রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে না। ভাষা এর একটি অন্যতম অঙ্গ। আমরা এর প্রমাণ পেয়েছি বায়ান্নে পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলনে। এর বাইরে ঘটেছে কাছাড়, শিলচর, আসামে মণিপুরি ও বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ভাষায় সাম্রাজ্যবাদের ধারণা এসেছে সাম্রাজ্যবাদের প্রচলিত ধারণা থেকেই। এ প্রক্রিয়া রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্যেই শুধু ক্ষান্ত থাকে না, ভাষা ও সংস্কৃতিতে আরও বেশি আগ্রাসী পরিস্থিতি নির্মাণ করে। এখন অনিবার্যভাবে আর্থ-সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ। রবার্ট ফিলিপসন ইংরেজি ভাষার বর্তমান আধিপত্যবাদী অবস্থান থেকে যা বলেছেন,the dominance of English is asserted and maintained by the establishment and continuous reconstitution of structural and cultural inequalities between English and other
languages [Phillipson 1992]
কেন বলা হচ্ছে ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যদি ভাষিক অসমতা তৈরি হয়- সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম, যোগাযোগ এবং সামরিক বিষয়ে। চলে শোষণ বঞ্চনা। একইসাথে ক্ষমতার ভাষার আধিপত্য বিস্তার লাভ করে। অন্য ভাষাকেন্দ্রিক জ্ঞানকে মøান করে ক্ষমতার ভাষার উৎকৃষ্টতা প্রচার করা হয়। ভিন্ন ভাষাভাষীকে অবনমন করা হয়, একইসাথে তাদের সুবিধা ও অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ভাষার পরিচয়ে চালানো হয় বর্ণবাদ, যৌননিপীড়ন, শ্রেণিশোষণ। তা হলে নিঃসন্দেহে এ প্রক্রিয়াকে বলা যায় ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ। এ প্রক্রিয়া যে কোনো ভাষাভাষী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
লক্ষণীয় উপমহাদেশসহ নানা দেশে শাসকবর্গ, তাদের ভাষা অনুযায়ী শাসিতদের জন্য ভাষা পরিকল্পনা করেছে। বিশ^যোগের কথা বলে পশ্চিমাকরণ বা বিশ্বায়িত করেছে। এ বিশ্বায়িতকরণে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার ছিল মুখ্য। অতএব সকলেই শাসকবর্গের ভাষাকে ভক্তিসহ গ্রহণ করেছি। এ প্রচার ও আধিপত্য খোলাবাজারে প্রবেশে করেছে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। সবচেয়ে মজার হলো, যারাই ভাষা নিয়ে সংরক্ষণের কথা বলেছে, তারাই আবার এটাকে গৃহবন্দি করেছে। ভাষা মুক্ত করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ১৯৬৬ সালের জাতিসংঘের Convention of Civil and Political Rights-এ বলা হয়েছে, In those States in which ethnic, religious or linguistic minorities exist, persons belonging to such minorities shall not be denied the right, in community with the other members of their group, to enjoy their own culture, to profess and practise their own religion, or to use their own language.
অতএব ভাষার অধিকার বিবেচনা সংখ্যাতত্ত্বের ওপর নির্ভর করে না। বিশে^র সকল কূটাভাষ সম্পর্কে সচেতন থাকা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নিজ ভাষার চর্চাই প্রতিরোধ করবে ভাষা গিলে ফেলার প্রক্রিয়া। এখানেই নিহিত রয়েছে মানবিক অধিকার ও ভাষার লড়াই প্রসঙ্গ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, উপ-পরিচালক, নায়েম

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য