Saturday, July 13, 2024

ভাষা আন্দোলনে নারী

অধ্যাপক ড. জেবউননেছা : ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯১২ সালের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাঙালির যে সামগ্রিক জাগরণ ঘটে এবং সেই জাগরণের মধ্যে ভাষাভিত্তিক, উদার, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক যে চেতনার জন্ম হয়, পরবর্তীকালের বুদ্ধিজীবীমহল অনুপ্রেরণা পান। এরই ধারাবাহিকতায়, বহু ভাষাবিদ-শিক্ষক ও দার্শনিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করার স্বপক্ষে ১৯২০ সালে শান্তিনিকেতনে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১)-এর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার স্বপক্ষে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করেন। ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা ভাষা হবে, এটা বলাই বাহুল্য।” তবে তার পূর্ব থেকে পূর্ব পাকিস্তানের কবি-সাহিত্যিক এবং বৃদ্ধিজীবীগণ বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সোচ্চার ছিলেন। ১৯৪৭-এর সেপ্টেম্বরে ভাষার দাবিতে প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকাতে আবুল মনসুর আহমদ ও ড. কাজী মোতাহের হোসেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে লিখেছেন। পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি পাকিস্তান সৃষ্টির তিন বছর আগেই ঘোষণা দিয়েছে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এছাড়াও ২২ এবং ২৯ জুন ১৯৪৭-এ ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ প্রকাশিত হয়। একই লেখকের লেখা ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ৩০ জুন ১৯৪৭-এ প্রকাশিত হয় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্টি’ পত্রিকায় ড. এনামুল হক ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রেক্ষিতে উর্দু ও বাংলা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। ১৯৪৮ সালের ৩ আগস্ট আব্দুল হক ‘সাপ্তাহিক বেগম’ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেন। ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুবলীগ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক।’ অতঃপর, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত সংগঠনের ১০টি দাবির মধ্যে ৭ নম্বর দাবি ছিল, পূর্ব-পাকিস্তানের বিশ^বিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজসমূহে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান এবং পরীক্ষা গ্রহণের আশু ব্যবস্থা। পরবর্তীকালে ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিশের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সংবাদে ঢাকার শিক্ষক ও ছাত্র-সমাজ বিক্ষুব্ধ হন। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবন বর্ধমান হাউসে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় যেন বাংলা ভাষার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সে-জন্য শিক্ষক ও ছাত্র-সমাজ বর্ধমান হাউসকে ঘিরে ফেলে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে ‘২১-দফা ইশতেহার’-এ বঙ্গবন্ধুসহ ১৪ জন রাজনৈতিক নেতার প্রচারপত্রে স্বাক্ষর করেন। যে প্রচারপত্রে দুটি দফা ছিল রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত। ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এবং নঈমুদ্দিন আহমদের নামে প্রকাশিত খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসে মুসলিম লীগের সভা চলাকালে বর্ধমান হাউসের বাইরে একটি পুস্তিকা বিক্রি হয়েছিল। এ-সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই স্মারকলিপির জন্য নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ, বৃহস্পতিবার ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। যদিও বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে দিবসটির নাম লিখেছেন- ‘বাংলা ভাষা দিবস’। এ দিবসটি যথাযথভাবে পালনের লক্ষ্যে একাধিক প্রচারপত্র ঢাকাসহ সারাদেশে বিতরণ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ মার্চ ৯ জনের স্বাক্ষরে একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়, যার ৪ নম্বরে ছিল বঙ্গবন্ধুর নাম। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল এই প্রচারপত্রের মূল বক্তব্য। ১১ মার্চের কর্মসূচি সফল করার জন্য বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর, যশোর, খুলনা (দৌলতপুর) এবং বরিশাল হয়ে ঢাকায় ফেরেন। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় বঙ্গবন্ধু যোগদান করেন। সভার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন- “আমাদের প্রায় সত্তর পঁচাত্তর জনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।” ভাষা আন্দোলনের প্রথমসারির নেতা অলি আহাদ তার স্মৃতিকথায় বলেন, ‘১০ মার্চ সভায় বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম পরিষদ যোগদান না করলে ১১ মার্চের রাষ্ট্রভাষা দিবস কর্মসূচি সফল হতো না।’
পরের দিন পুলিশের নির্যাতন এবং গ্রেফতারের প্রতিবাদে দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ১৩ এবং ১৪ মার্চ সর্বত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ এপ্রিল বিকালে মুসলিম লীগ পরিষদের সদস্য এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের সাথে খাজা নাজিমুদ্দিন দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করতে সম্মত হন। ১৬ মার্চ সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে সাধারণ সভায় বঙ্গবন্ধু সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন অনেকগুলো ঘোষণার মধ্যে একটি ঘোষণা দেন যে, প্রাদেশিক পরিষদের পরবর্তী অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সুপারিশ করা হবে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন এই ফলাফলের মাধ্যমে শেষ হয়। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাষা-সংক্রান্ত স্বৈরতান্ত্রিক বক্তব্য দেন এবং এর বিরোধিতা করে ছাত্র-সমাজ। এরপর ফজলুল হক হলে জিন্নাহর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’ বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যের রেশ ধরেই ১৯৫২ সালে ভাষা শহিদদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে তা সত্যিকার অর্থেই প্রমাণিত হয়। পরবর্তীতে নতুন গভর্নর জেনারেল লিয়াকত আলী খান ঢাকায় এলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। নানা পথ-পরিক্রমায় আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা জ্বলন্ত দিন। ১৪৪ ধারা অমান্য করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগানে মুখরিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা। আন্দোলনে নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। আন্দোলনে আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমান, আবদুল জব্বার, আব্দুল আউয়াল, অহিউল্লাহ শহিদ হন। এই হত্যার তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং বাংলা ভাষার দাবিতে যারা বিতর্ক করেন, তাদের মধ্যে আনোয়ারা খাতুনের নাম উল্লেখযোগ্য। এ আন্দোলনে নারী-সমাজও কাজ করেছে, ইতিহাস তা সাক্ষ্য দেয়।
এ নিবন্ধে ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করা হবে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়, তাতে মিসেস লীলা রায় (সম্পাদিকা, জয়শ্রী), মিসেস আনোয়ারা চৌধুরী (সেক্রেটারি, নিখিল বঙ্গ মোসলেম মহিলা সমিতি) স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়াও তৎকালীন সময়ে বেগম আফসারুন্নেসা ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেন। নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের মহিলা সংগঠন সম্পাদক মিসেস রুকিয়া আনোয়ার একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন- মিসেস লিলি খান এবং আনোয়ারা খাতুন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পর যারা মিছিলে অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে শাফিয়া খাতুন, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু, রওশন আরা বেগম, রওশন আরা রহমান, শামসুন্নাহার, সারা তৈফুর, মোসলেমা খাতুন, কামরুন্নাহার লাইলি, ফরিদা বারি মালিক, হোসনে আরা, লায়লা নূর, কায়সার সিদ্দিকী, কুলসুম হুদা, সুরাইয়া আশ্রাফ, ড. হালিমা খাতুন অন্যতম। ইডেন কলেজের ছাত্রীরা আন্দোলন ও ধর্মঘটের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে শরিফা খাতুন, খালেদা-মঞ্জুর-ই খুদা, মাহবুবা খাতুন, হেনা, রহিমা, লুৎফা, আমির, দুলু ও মনু ছাত্রী সক্রিয় ছিলেন। পোস্টার লেখা, বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলাসহ নানারকম কাজ করতেন এবং এর মধ্যে অনেকে গ্রেফতারও হয়েছেন। হয়েছেন আহত। এছাড়াও জুলেখা হক, হোসনে আরা হক এবং হাসনা বেগম বীথি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
নারায়ণগঞ্জ মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গ্রেফতার হন। কারাগার হতে বন্ড সই করে মুক্তি ক্রয় করতে অস্বীকার করলে মমতাজ বেগমকে তার স্বামী তালাক দেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা শহরে নারীরা ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
খুলনার বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে রোকেয়া মাহবুব শিরি, মাজেদা আলী, রত্না, কৃষ্ণা, খুকু প্রমুখ মিছিল-মিটিং করতেন। চট্টগ্রামে জওশন আরা, প্রণতি দস্তিদার, হালিমা খাতুন, তালেয়া রহমান। তারা জনমত গঠন, পোস্টার লাগানোসহ নানা ধরনের কাজে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
বরিশালে শামসুনানাহার, রাণী ভট্টাচার্য, হোসনে আরা বেগম, আনজিরা বেগম, মঞ্জুশ্রী সেন, মাহেনুর বেগম, মিসেস অবনিনাদ ঘোষ, মিসেস প্রাণ কুমার সেন, হালিমা খাতুন, নূরজাহানসহ সাধারণ নারীগণও আন্দোলনে জড়িয়ে যান।
রাজশাহীতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-ছাত্রী মিছিল করে। ছাত্রসভায় মোহসেনা বেগম বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়াও হাফিজা বেগম, ফিরোজা বেগম, কুলসুম বেগম, হাজেরা খানম, ড. সারা খন্দকার, হাসিনা বেগম, খুকু সকলে মিলে একটি পালকি গাড়িতে করে মাইকের পরিবর্তে চোঙ্গা নিয়ে প্রচারণায় বের হন। মনোয়ারা, জেরিনা বেগম, জাহানারা বেগমও কাজ করেন।
সিলেটেও ভাষা আন্দোলনে নারীরা ভূমিকা পালন করেন। বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী, সৈয়দা সাহার বানু চৌধুরী, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা বেগম, জেবুন্নেসা হক, সৈয়দা নজিবুন্নেনা বেগম এবং রাবেয়া খাতুন মুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। সিলেটে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সে পরিষদে অন্যতম সদস্য ছিলেন হাজেরা মাহমুদ।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে অনেককে বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পরিবার থেকেও বাধা এসেছে। এমনকি আন্দোলনে অংশগ্রহণের অপরাধে অনেকে পিতার হাতে অনেকবার প্রহৃত হয়েছেন। তাও নারীরা থেমে থাকেননি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. জেবউননেছা সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ : বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতা’ নামক গ্রন্থে ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু লিখেন- “চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের ছাত্রীদের জন্য সহপাঠী ছাত্রদের সঙ্গে সমভাবে ভাষা আন্দোলনে যোগ দেয়া সহজ কথা ছিল না। তখন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরাই লেখাপড়া করত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের ভয়, অভিভাবকদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেবার ভয়, সামাজিকভাবে মেয়েরা নিগৃহীত হওয়ার ‘পাছে লোকে কিছু বলে’- এ সকল ভয়-ভাবনা মাথায় রেখেই আন্দোলনে যোগ দিতে হয়েছিল।”
একই লেখকের আর একটি সম্পাদিত ‘আলোকিত নারীদের স্মৃতিতে মৃক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক গ্রন্থে ভাষা সংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দি লিখেন- “ফেব্রুয়ারি মাস জাগরণের মাস, পুনঃঅঙ্গীকার নেবার মাস হিসেবে আমরা পালন করতাম। কালো ব্যাজ পরে নগ্ন পায়ে শহিদদের মাজারে গিয়ে শপথ নিতাম- তোমাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। পুলিশের নজর এড়িয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে নানা জায়গায় কালো পতাকা উত্তোলন আমাদের ভোরের কাজ ছিল।”
একই গ্রন্থে ভাষা সংগ্রামী অধ্যাপক ড. হালিমা খাতুন লিখেন- “সেই কবেকার কথা। সবার নাম মনে নেই। সেতারা নুরী ও আর একটা মেয়ে, আখতারি ও পুতুলকে নিয়ে আমি প্রথমসারিতে ছিলাম। তখনকার আর্টস বিল্ডিংয়ে (এখন মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগ) দরজার সামনে মুখোমুখি সারিতে বসে থাকা পুলিশের বন্দুকের ডগা ঠেলে অনেকটা জোর করে আমরা বের হয়ে এসেছিলাম (বর্তমান জগন্নাথ হল) দিকে যাবার জন্য। আমাদের ইতিহাস বেত্তারা নারীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ না করলেও, ভাষা আন্দোলনের ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নারীদের অবদান অমর হয়ে থাকবে। অনেক আত্মত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে বাংলা ভাষাকে আমরা প্রতিষ্ঠা পেরেছি।”
ভাষা আন্দোলনকে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণ। এই আন্দোলনে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা জারির বিরুদ্ধে যে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই মিছিলের প্রথম সারিতে ছিল নারীরা। এই তেজস্বী নারীরা পরবর্তীকালে গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে গৌরবময় অবদান রাখে। নারীর চলার পথ দুর্গম। এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েই নারীকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হয়। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যেসব নারী আন্দোলন সংগ্রামে অবদান রেখেছে, তাদের অবদান কতটুকু আমরা স্বীকার করি? তদুপরি যারা এগিয়ে চলেছে পথ আলোকিত করে, সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নারীরা মুক্তির আন্দোলনে এগিয়ে যাবে- এই প্রত্যাশা। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব নারীকে প্রতি শ্রদ্ধা রইল। আমরা চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম তাদের কাছে। কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচিত ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার শেষ চরণ দিয়ে ইতি টানব ‘ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা’। “তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মত জ্বলবে/প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।”

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য