Sunday, July 3, 2022
বাড়িক্রীড়াবিজয়ের ৬ দিনের গল্প

বিজয়ের ৬ দিনের গল্প

আরিফ সোহেল

অগ্নিঝরা স্বাধীনতার মাসে এমন বিজয় স্রেফ বাংলাদেশ সৃষ্টির মতোই সংগ্রামের গল্পকথা। পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ শেষে লাল-সবুজের বাংলাদেশ বিজয় পেয়েছিল। যুদ্ধ ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের। লেগেছিল মাত্র প্রায় ২৭০ দিন। এবার ২২ গজের যুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে দেশ-সৃষ্টির তুলনামূলক সময় বিবেচনায় সেঞ্চুরিয়নে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে। গল্প তিন ম্যাচের সিরিজ; জয়ের নিকাশ ২-১। দক্ষিণ আফ্রিকা বিজয় রূপকথাÑ এমন ভাবনা এক ফুৎকায় উড়িয়ে দিতে পারবেন যখন সিরিজ পরিসংখ্যানে চোখ রাখবেন। দেখে নিন সে-সব বিজয়ের অধিগল্পগুলোÑ

১. শেষ ম্যাচ আর সিরিজ জয়ের গল্প
প্রথম ম্যাচে বড় জয়ের প্রেরণা তৃতীয় ম্যাচে খুঁজে পেয়েছিল সেঞ্চুরিয়নে। শেষমেষ হয়েছে ইতিহাস। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। ২৩ মার্চ তাসকিন গল্পের মতো নিজেকে সাজিয়ে-রাঙিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৫৪ রানে আটকে দেওয়ার পথ রচনা করেছিলেন। শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে অধিনায়ক তামিম ইকবাল ৮৭ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে সহজ জয় এনে দিয়েছিল।
কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর চতুর্থ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দেশের বাইরে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে দেশের বাইরে এটি সপ্তম সিরিজ জয়। তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার নাম। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই উপমহাদেশের এখনও শ্রীলংকা সিরিজ জিততে পারেনি। ভারত জিতেছে একবার, পাকিস্তান দুবার। সম্প্রতি ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হেরে এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হারের ব্যবধান ছিলÑ রানের হিসাবে ৬৮, উইকেটের হিসাবে ৭। ১০০ রানের বেশি ব্যবধানে ৪টি হার আছে, একটা তো ২০০ রানেও, ১০ উইকেটে ৩টি। সেই দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ জয়, সেটিও সিরিজ-নির্ধারণী ম্যাচে ৯ উইকেটের জয়; রীতিমতো অবিশ্বাস্য। দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদের মাঠে হারানোর অপেক্ষা ২০ বছর ও ২০তম চেষ্টায় শেষ হলো বাংলাদেশের।

২. তাসকিনের জাদুর জীয়ন কাঠির দেখা
তৃতীয় ম্যাচে তাসকিন আহমেদের দাপট; বাংলাদেশের এই পেস বোলারের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা। একে একে কাইল ভেরেনে, জানেমান মালান, ডেভিড মিলার, ডুয়াইন প্রেটোরিয়াস ও কাগিসো রাবাদার উইকেট নেন তিনি। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চারজন পেস বোলার ৫ উইকেট নিয়েছেন ওয়ানডেতেÑ ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, লাসিথ মালিঙ্গা এবং এবারে তাসকিন আহমেদ। ৯ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে তাসকিন ৫ উইকেট নিয়েছেন সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে। ম্যাচ শেষে তাসকিন বলেন, ‘প্রতি ম্যাচেই আমাকে আগ্রাসী হতে বলে অধিনায়ক। সেটাই চেষ্টা করে গেছি।’ ২০১৪ সালের ১৭ জুন, মিরপুরে অভিষেকেই ৫ উইকেট পেয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। যদিও সে-ম্যাচটা বাংলাদেশের ভুলে যাওয়ার মতোই ছিল। ভারতকে ১০৫ রানে আটকে দেওয়ার পরও বাংলাদেশ হেরেছিল ৪৭ রানে। এরপর তাসকিন খেলেছেন আরও ৪৭ ম্যাচ। ঠিক ৮ বছর পেরিয়ে আবারও ৫ উইকেটের দেখা পেয়েছেন এই পেসার। মাঝে বেশ কিছুদিন দলের বাইরেও ছিলেন এ ফাস্ট বোলার। বাংলাদেশি পেসার হিসেবে দেশের বাইরে ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান, ২০১৯ বিশ্বকাপে লর্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ম্যান অব দ্য সিরিজ তাসকিন ১১২ রান দিয়ে ৮ উইকেট নিয়েছেন।

৩. নাটকের অবসান এবং সাকিবনামচা
সাকিবের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে পানি কম ঘোলা হয়নি। তাকে নিয়ে বইছিল সমালোচনার ঝড়। ঠিক সেখান থেকেই বিসিবির সভাপতির কথামতো সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। এবং আরেকবার প্রমাণ করেছেন তিনি যতই নাটক করুনÑ মাঠে তিনি সেরা ক্রিকেটার। সূচনা ম্যাচে বল হাতে উইকেট শূন্য সাকিব; কিন্তু ব্যাটার দলের সেরা পারফরমার। অনবদ্য ৭৭ রানের সুবাদে ম্যাচসেরার পুরস্কারটা পেয়েছেন তিনি। সাকিবের ইতিবাচক ব্যাটিং ম্যাচটা পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছে। ইয়াসির আলীর সঙ্গে ৮২ বলে ১১৫ রানের জুটিতেই প্রথম ৩০০ ছাড়ানোর আশা জাগে। সাকিব (৭৭) ও ইয়াসির (৫০) ফিরে গেলেও সে শক্তভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে মাহমুদউল্লাহ, আফিফ ও মিরাজরা শেষ ১০ ওভারে ৯১ রান তুলে নিয়েছে। দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশও পারেনি; পারেননি সাকিবও।

৪. অধিনায়ক তামিমে সিডন্সের বাজি
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে সর্বোচ্চ রান করেছেন তামিম ইকবাল। প্রথম ম্যাচে অল্পের জন্য হাফ সেঞ্চুরি মিস করা তামিমের তৃতীয় ম্যাচে স্টাইলিস্ট অনবদ্য ৮৭* রান ছিল চোখ বিমোহিত করা এক ইনিংস। এই সিরিজে তার মোট রান ১২৯। তামিমকে নিয়ে বড় উচ্চাশা কোচ সিডন্সের। দেশ ত্যাগ করার প্রাক্কালে বলেছিলেনÑ ‘তামিম ইকবালের এখনও ক্রিকেটকে অনেক কিছু দেওয়ার বাকি।’ দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে অন্যরকম এক তামিমকে খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ। দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং সতীর্থদের গাউডলাইন দেওয়া। সিরিজে লিটন দাসের ব্যাটে ১১৩ রান।
৫. সেঞ্চুরিয়নে নতুন ইতিহাস রচনা
এই সফরের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে কোনো সংস্করণেই জেতার অভিজ্ঞতা ছিল না বাংলাদেশের। প্রথম ওয়ানডে জেতার পর সাফল্যের নতুন বিজ্ঞাপনের পাশে নাম লিখেছেন তামিম-সাকিবরা। দ্বিতীয় পথভোলা জোহান্সেবার্গে বাংলাদেশ খেই হারিয়েছে। কিন্তু পরের ম্যাচেই পরভূমে দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় সিরিজ জয়ের আনন্দ এনে দিয়েছে। উইকেট পতন ঘটানোর সূচনা করেছিলেন মিরাজ। পরের কাজ সেরেছেন পেসার তাসকিন। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ের তৈরি হওয়া জয়মঞ্চ অনায়াসে দখল করেন ব্যাটার তামিম-লিটন-সাকিবরা। কঠিন কন্ডিশনের বাধা সরিয়ে প্রোটিয়াদের স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। হারের ব্যবধান ৯ উইকেট। তাও মাত্র ২৬.৪ ওভারেই কব্জা করেছিল বাংলাদেশ। এ যেন হাতে পাওয়া সোনার হরিণ।
সেঞ্চুরিয়নে বাংলাদেশ ক্রিকেট পরাশক্তিতে আবির্ভূত হয়ে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিল। বাংলাদেশের জয়ের বড় নায়ক পেসার তাসকিন। প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত বল করেও সাকিবময় ম্যাচে ছিলেন পার্শ্ব নায়ক। এবার ৩৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে প্রোটিয়াদের বিধ্বস্ত করে উঠলেন যেন শীর্ষ চূড়ায়। এমন ম্যাচে তাসকিনের সঙ্গী হিসেবে কাঁধে হাত রেখেছিলেন বোলার সাকিব ২/২৪। ৮২ বলে ৮৭ রানের আগ্রাসী ইনিংসের নায়ক অধিনায়ক তামিম ইকবাল।

৬. দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ
সফরের প্রথম ম্যাচেই রানের ফেরিওয়ালা হয়েছিল বাংলাদেশ; ৩১৪/৭। এমন ফাইটিং স্কোরই এগিয়ে রেখেছিল আলোচিত সাকিবের বাংলাদেশকে। ব্যাটারদের অনুপ্রেরণায় চাঙা হয়েছিলেন বোলাররা। সাকিব-লিটন-ইয়াসির-তামিমে পেয়েছে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহও। সাকিব, লিটন দাস ও ইয়াসির আলি চৌধুরীর ফিফটিতে বাংলাদেশ ৭ উইকেটে করেছে ৩১৪ রান। দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের আগের সেরা ছিল ৭ উইকেটে ২৭৮। ২০১৭ সালের সফরে প্রথম ওয়ানডেতে ওই রান করেও হেরেছিল ১০ উইকেটে।
২০১৫ সালে পরপর তিন সিরিজে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় পেয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল আর ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালও বাংলাদেশ। বিশেষ করে নামেভারে বড় প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই বিজয় নিশ্চতভাবে থাকছে অনুপ্রেরণা হয়ে। আর এই সিরিজ জয়ে ভারতে ২০২৩ বিশ্বকাপের সুপার লিগ অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের। ১২০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বাংলাদেশ। দেশের আফগানিস্তানকে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে ১০০ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছিল তামিম-সাকিবরা। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় আরও ২০ পয়েন্ট; এ যেন নতুন রূপকথা। এই জয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ স্পর্শ করার স্বপ্নও দেখতে পারে।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

 

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য