Saturday, July 13, 2024

বিএনপি ও সন্ত্রাসবাদ

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটি গর্বিত দেশের নাম বাংলাদেশ। এদেশে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, হত্যা-খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতির দিন শেষ।

সাদিকুর রহমান পরাগ: বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। কথাটি আমার নয়। বলেছেন কানাডার ফেডারেল আদালত। তাও আবার একবার নয়, পাঁচ পাঁচবার। এরপর বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলেছেন মার্কিন আদালত। কানাডার আদালত প্রথমবার বলেছিলেন ২০১৭ সালে। মোহাম্মদ জুয়েল হোসেন নামে ঢাকার মিরপুরের স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন কর্মী রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে, তা নাকচ করে দিয়ে কানাডার আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
এরপর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে মো. মোস্তফা কামাল নামে এক ব্যক্তি রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে তখনও বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
একই বছর অক্টোবরে মাসুদ রানা এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালে ছাত্রদল কর্মী সেলিম বাদশার অভিবাসন আবেদন নাকচ করে দিয়ে কানাডার আদালত পুনরায় বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে অভিহিত করেন।
২০২৩ সালের ১৫ জুন মোহাম্মদ জিপসেদ ইবনে হক নামে এক বিএনপিকর্মীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নাকচ করে আদালত বিএনপিকে আবারও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঘটনার এখানে শেষ নয়। এরপর কানাডার পথে হাঁটেন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতও। তবে তাদের বক্তব্য কানাডার আদালতের বক্তব্য থেকেও কড়া।
ঘটনায় প্রকাশ, ২০১২ সালে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেপড়া খলিলুর রহমান ২০১৩ সালে নিজেকে ছাত্রদলের কর্মী পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। তার এই আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। এরপর সে নিজের অভিবাসনের এবং স্ত্রী ও দুই কন্যাকে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মিলিত হওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তখন সে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোম সিকিউরিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে। যেটি খলিলুর রহমান ভার্সেস ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মামলা নামে অভিহিত।
দীর্ঘ শুনানি শেষে মামলা দুটি খারিজ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র ডিস্ট্রিক্ট জাজ গ্লাসিয়ের তার রায়ে বলেন, ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস ৩টি কারণে খলিলুর রহমানের অভিবাসনের আবেদন বাতিল করেছে-
প্রথমত; সন্ত্রাসী সংগঠন-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের আইনের ধারায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বিএনপি তৃতীয় পর্যায়ের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন।
দ্বিতীয়ত; খলিলুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পার্টির নেতাদের নির্দেশে তিনি যেসব কাজ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইনের ধারায় তা সন্ত্রাসী কাজ।
তৃতীয়ত; পাবলিসিটি সেক্রেটারি হিসেবে তিনি যেসব কাজ করেছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা করার অপরাধ।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে খলিলুর রহমানের সক্রিয়তা এবং একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তার অভিবাসনের আবেদন নাকচ করা হয় এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সিদ্ধান্তটি বহাল রাখে।

সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কী
বিএনপি নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে। তাহলে বিএনপির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কী, কেন বিএনপিকে বারবার সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
সেই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে বিএনপির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই।
যদিও বাংলাদেশে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল ক্রিয়াশীল, তারপরও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুটি প্রতিপক্ষের মধ্যে একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে রয়েছে অবৈধ সেনাশাসনে জন্ম নেওয়া বিএনপি আর তার দোসর যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত সংগঠন জামায়াতে ইসলামী।
আওয়ামী লীগ জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করলেও বিএনপি-জামাত জোট বরাবরই অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা করে আসছে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও, অশুভ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা গণতন্ত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। যে কোনো উপায়ে ক্ষমতা দখলই তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে সন্ত্রাসবাদকে উপজীব্য করে আবর্তিত তাদের রাজনীতি। মূলত সন্ত্রাস, হত্যা-খুন ও দমন-পীড়নই হয়ে ওঠে তাদের মূল রাজনীতি। প্রয়োজনবোধে বাংলাদেশের অস্তিত্ব এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও তারা দ্বিধা করে না।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় যে জিয়াই ছিল বঙ্গবন্ধু-হত্যার মাস্টারমাইন্ড। অবৈধ ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে কথিত ক্যু-এর নামে হাজার হাজার সেনা সদস্যকে হত্যা করে জিয়াউর রহমান।
যে দলটির জন্মের মধ্যে রক্তের দাগ লেগে রয়েছে, যে দলটির জন্ম অশুভ ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে, সেই দল যে একটি সন্ত্রাসী দল হবে, সেই দলের আদর্শ যে সন্ত্রাসবাদই হবে- সেটিই তো স্বাভাবিক।

বিএনপির সন্ত্রাসবাদের স্বরূপ
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে হত্যা-খুনের রাজনীতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতন, নির্বাচিত সরকার উৎখাতে সহিংসতা, আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হত্যা, বিরুদ্ধ মত দমনে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর তোষণ- এসব অপকর্মের কথা বললে অবধারিতভাবে বিএনপির নামটি সবার আগে চলে আসে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড : ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। বিএনপি-জামাত দুঃশাসনে বাংলাদেশ পরিণত হয় এক ভয়াল জনপদে। এ-সময় আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিএনপি। তারেক রহমানের নীলনকশায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় শাহ এএমএস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমাম, মমতাজ ফকিরসহ পাঁচ সংসদ সদস্যকে। বিএনপির সন্ত্রাসীরা সারাদেশে আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করে। চিরতরের জন্য পঙ্গু হয়ে যায় হাজার হাজার নেতাকর্মী।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা : বিএনপির রাজনৈতিক সন্ত্রাস এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তারা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেও চিরতরে নির্মূল করে দিতে চেয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউর জনসভায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা সেদিন প্রাণে রক্ষা পেলেও এই হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন প্রায় ৩ শতাধিক নেতাকর্মী।
এই ঘৃণ্য হামলার পরপরই বিএনপি-জামাতের পক্ষ থেকে এটিকে আওয়ামী লীগের সাজানো নাটক বলে প্রচার করে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত এবং হামলাকারীদের আড়াল করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। শুধু তাই নয়, নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে গ্রেনেডসহ হামলার বিভিন্ন আলামত নষ্ট করা হয়। নানারকম কূটকৌশলের মাধ্যমে তদন্ত এবং মামলাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে জনৈক জালাল নামের একজন নিরীহ মানুষকে ‘জজ মিয়া’ সাজিয়ে গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করানো হয়।
অথচ পরবর্তীতে মামলার প্রধান আসামি মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, এই হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তারেক রহমান সরাসরি যুক্ত ছিল। আরও যুক্ত ছিল বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু, কাজী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জামাত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, এনএসআই-র সাবেক প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমসহ অনেকে।
২০০১ সালের নির্বাচনকালীন নির্যাতন : নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করে অমানবিক নির্যাতন চালায় বিএনপির সন্ত্রাসীরা। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে এর ভয়াবহতা ছিল ব্যাপক। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে গঠিত তদন্ত কমিশন এ-ধরনের নিপীড়নের ৫ হাজার ৫৭১টি অভিযোগ পায়। ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬২৫টি। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৩৫৫টি এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, গুরুতর আঘাত, চিরতরে পঙ্গু করা, সম্পত্তি দখল ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ ৩ হাজার ২৭০টি। তদন্তে ৩ হাজার ৬২৫টি ঘটনায় ১৮ হাজারেরও বেশি বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসী জড়িত বলে চিহ্নিত করা হয়।
যেহেতু বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব হামলা, লুটপাট, গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, সেহেতু ন্যায়বিচার পাবে না জেনে অনেকে থানায় বা আদালতে অভিযোগ দায়ের করেনি বা করতে সাহস পায়নি। কেউ কেউ সাহস করে অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক কারণে সেগুলোর তদন্ত হয়নি। এমনকি হামলা-সন্ত্রাস লুটতরাজসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে ৫ হাজার ৮৯০টি মামলা প্রত্যাহারও করে নেয় বিএনপি-জামাত জোট সরকার। ফলে এসব মামলার ১২ হাজার অপরাধী বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে থাকে।
২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর বিএনপি-জামাতের হত্যা, ধর্ষণ, লুট এবং নির্যাতনের কথা প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব হিন্দুদের ওপর সহিংস আচরণ করা হয়েছে তারা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়।
জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান : জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিএনপির জন্য নতুন নয়। দলটির ডিএনএ-র মধ্যেই জঙ্গি তোষণের ব্যাপারটি রয়েছে। বিএনপির ইতিহাস বলে যে, দলটি তার জন্মলগ্ন থেকে জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। যেহেতু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, সেহেতু ক্ষমতায় টিকে থাকতে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুকে ব্যবহার করে বিভিন্ন রকমের কূটকৌশল অবলম্বন করে। একদিকে বাংলাদেশের ভিতরে ঘাঁটি তৈরি করে বিভিন্ন দেশের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদান করা হয়। অন্যদিকে সে-সময় বাংলাদেশ থেকে অনেক তরুণ-যুবককে জেহাদ করার জন্য সিরিয়া, লেবানন, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইনে যেতে উৎসাহিত করা হয়। জিয়াউর রহমানের কারণে বাংলাদেশ পরিণত হয় জঙ্গি সৃষ্টির ‘আঁতুড়ঘরে’।
নব্বই দশকের পর জঙ্গিরা দেশে ফিরে আসে এবং বিএনপির সহযোগিতায় দেশের ভিতরে সংগঠিত হয়। জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়াও জঙ্গি তোষণের নীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকে। আফগানফেরত মুজাহিদরা সংগঠিত হয়ে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। বিএনপি সরকারের মদদ না পেলে এভাবে একটি জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারত না।
২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি জঙ্গিদের বিস্তারে অধিক তৎপর হয়ে ওঠে। বিরুদ্ধ মত দমনে জঙ্গিগোষ্ঠীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হাওয়া ভবনের নীলনকশায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বাংলাভাই, জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ নামে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটানো হয়। মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্য ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ধারাবাহিক বোমা হামলায় বিচারক ও আইনজীবীসহ ৩০ জনকে হত্যা করা হয়। আহত হয় চার শতাধিক। ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় স্থানীয় উদীচীর দুই নেতাসহ আটজন নিহত হন। আহত হয় শতাধিক। সে-সময় যখন জঙ্গিরা প্রকাশ্য দিবালোকে একের পর এক হামলা চালিয়ে মানুষ খুন করছিল, তখনও বিএনপি-সরকার জঙ্গিদের অস্তিত্বের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছিল, দেশে জঙ্গি নেই, এগুলো মিডিয়ার সৃষ্টি।
বিএনপি নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের বিষয়টি অস্বীকার করলেও প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বিএনপির প্রশ্রয়েই জঙ্গিদের উত্থান ঘটানো হয়। এ বিষয়ে ২০০৭ সালের ৩০ জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম আলো লিখেছে : “বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের অনেক নেতাই জঙ্গিগোষ্ঠীর ‘গডফাদার’ হিসেবে কাজ করেছিলেন। জঙ্গি সংগঠন জেএমজেবি-র নেতা মওলানা শায়খ রহমান ও বাংলাভাইয়ের সঙ্গে বিএনপির একাংশের এবং জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কটি ছিল ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম (জঙ্গি কর্মকাণ্ডের উপদেষ্টা), ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস দুলু (২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে দুলুর বাসায় শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাই দলবল নিয়ে বৈঠক করেন), গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির (যিনি মোবাইলে শায়খ রহমান ও বাংলাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতেন এবং ওদের বাসায় দাওয়াত দিয়েছিলেন), তৎকালীন মেয়র মিজানুর রহমান মিনু (মাহবুব নামের এক জঙ্গির কাছে বাংলাভাইয়ের জন্য ৫০ হাজার টাকার ব্যাংক চেক দিয়েছিলেন), সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা (যিনি পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা বাংলা ভাইয়ের হাতে তুলে দেন) ও সংসদ সদস্য আবু হেনার (যিনি আপন ভাতিজার মাধ্যমে বাংলাভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন) নিবিড় সম্পর্ক ছিল জেএমজেবির সঙ্গে।”
দেশের ভেতরে একের পর এক জঙ্গি হামলা হলেও জঙ্গি তৎপরতা দমনে বিএনপি বরাবর নির্লিপ্ত ছিল। এ বিষয়ে ২০০৩ সালে বিএনপি-সরকারকে ইঙ্গিত করে কানাডিয়ান ইন্টিলিজেন্স সিকিউরিটি সার্ভিস (সিআইসিএস) তাদের এক প্রতিবেদনে বলে, “Bangladesh government is not doing enough to
prevent the country from becoming a haven for Islamic terrorists in South Asia and pointed out that religious extremists are connected to Al Qaeda.”
শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার সময় নয়, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ও বিএনপি জঙ্গি তৎপরতা প্রসঙ্গে রহস্যজনকভাবে নীরব থেকেছে। বরং আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গি দমনে তৎপর হলে, তারা বলেছে সাজানো নাটক।
আগুন সন্ত্রাস : বিএনপি যে সন্ত্রাসী সংগঠন, তার আরেকটি বড় উদাহরণ হচ্ছে আগুন সন্ত্রাস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি নজিরবিহীন এই আগুন সন্ত্রাসের সূচনা করে। হীন ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে তারা যে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না; ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আগুন সন্ত্রাস দিয়ে আবারও তার প্রমাণ দিয়েছে।
আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে নৈরাজ্যকর একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল দুটো। প্রথমত; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত; খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে শত শত মানুষ বিএনপির আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়। সে-সময় তারা ১৬৫ মানুষকে হত্যা করে। প্রাণ দিতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ২৪ জন এবং পরিবহন সেক্টরের ৫৫ জনকে। নির্বাচনের দিন হত্যা করা হয় প্রিজাইডিং অফিসার জোবায়দুর রহমানসহ ২৬ জনকে। নির্বাচন প্রতিহতের নামে সারাদেশে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ৫৮২টি স্কুল।
এরপর ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা দিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার ৬৮ সঙ্গীকে নিয়ে ৯২ দিন তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করে বর্বোরোচিত আগুন সন্ত্রাসের নির্দেশনা প্রদান ও সার্বিক তদারকি করেন। তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে বিএনপি-জামাত দুর্বৃত্তরা সংসদ সদস্যকে হত্যা করতে হামলা করেছে, বিচারপতির বাড়িতে হামলা করেছে, মন্ত্রীর বাড়িতে বোমা মেরেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে, রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, বাসের যাত্রীদের আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে, পুলিশের গাড়িতে হামলা করেছে, গণমাধ্যমের ওপর হামলা করেছে, সরকারি অফিস ও স্থাপনায় আগুন দিয়েছে। তাদের এই অগ্নি-তাণ্ডব থেকে নারী-পুরুষ-শিশু, চিকিৎসক-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য-পরিবহন শ্রমিক-স্কুলশিক্ষক-দিনমজুর-ছাত্র-ছাত্রী কেউ রেহাই পায়নি।
সাধারণ মানুষের ওপর ৫০০-রও বেশি বোমা হামলা করে বিএনপি-জামাতের দুর্বৃত্তরা। এই আগুন সন্ত্রাস কতটা ভয়াবহ ছিল তার জন্য ছোট্ট একটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ করাই যথেষ্ট। আগুন সন্ত্রাসের প্রথম তিন মাসে বিএনপি-জামাত সন্ত্রাসীরা প্রতিদিন গড়ে তিনজন সাধারণ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে।
বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীরা কলেজ-ছাত্র অভি, ছয় বছরের রূপা, অন্তঃসত্ত্বা মনোয়ারা বেগম, গাইবান্ধায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন, স্কুলশিক্ষিকা শামছুন নাহার ঝর্ণাসহ ২৩১ জনকে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মারে।
ইডেন কলেজ ছাত্রী শারমিন আক্তার, ব্যাংক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম, ১২ বছরের রাকিব মিয়া, নাজিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কুন্তলা শিকদারসহ ৩ হাজার ৩৬ জনকে আগুনে দগ্ধ করা হয়।
শিশু জুঁই, স্কুলছাত্রী অন্তু বড়ুয়া, স্কুলছাত্র অনিক, হৃদয়সহ কয়েক হাজার মানুষ বোমায় আহত হয়। এর মধ্যে আহত হয় ৫০০-রও বেশি পুলিশ সদস্য।
৩ হাজার ২৫২টি গাড়ি, ২৯টি রেলগাড়ি ও ৯টি লঞ্চ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ৭০টি সরকারি অফিস ও স্থাপনা ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ৬টি ভূমি অফিস।
আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীর পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িতেও হামলা-অগ্নিসংযোগ-লুটপাট করা হয়।
আগুন সন্ত্রাসে দেশের আর্থিক ক্ষতি হয় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
এই অগ্নিসন্ত্রাস এতটাই ভয়াবহ ও নারকীয় ছিল যে ২০১৭ সালে কানাডার ফেডারেল আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নেই
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে বিএনপি তার অবস্থান থেকে একবিন্দুও সরে আসেনি। যতই আড়াল করার চেষ্টা করুন না কেন, তার সন্ত্রাসী রূপটি ঠিকই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তাদের মৌল চরিত্রের কোনো বদল হয়নি।
টেকব্যাক বাংলাদেশ সেøাগান দিয়ে বাংলাদেশকে তারা আবার সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে চায়। তার প্রমাণ সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তথাকথিত এক-দফার আন্দোলন। আন্দোলনের নামে বিএনপি আবারও সহিংস রাজনীতি, জ্বালাও-পোড়াও এর অশুভ রাজনীতি শুরু করেছে। গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, মিডিয়ার ওপর হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করেছে দলটি।
কিন্তু বিএনপির নেতৃত্ব বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে যে এই বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নেই। কথায় কথায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা করে দাবি আদায়ের সেই দিন এখন আর নেই। কোনো রক্তচক্ষু, কোনো হুমকি-ধমকিতে এদেশের মানুষ ভয় পায় না। এদেশের মানুষ এখন আর সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় না।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটি গর্বিত দেশের নাম বাংলাদেশ। এদেশে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, হত্যা-খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতির দিন শেষ। তাই সন্ত্রাসবাদকে অবলম্বন করে রাজনীতি করতে গেলে দেশের মানুষের কাছে বিএনপি আবারও প্রত্যাখ্যাত হবে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য