Saturday, July 13, 2024
বাড়িত্রয়োদশ বর্ষ,নবম সংখ্যা, আগস্ট-২০২৩বিএনপির তথাকথিত ‘গুগলি’ এবং বাস্তবে বত্রিশ দাঁত দেখানো প্রসঙ্গ

বিএনপির তথাকথিত ‘গুগলি’ এবং বাস্তবে বত্রিশ দাঁত দেখানো প্রসঙ্গ

গণবিস্ফোরণের আঁচ যখন সৃষ্টি হয় তখন জনগণকে রাস্তায় নামানোর জন্য ‘শিগগির কর্মসূচি’ ঘোষণা করতে নেতাদের টেবিলে গিয়ে বসতে হয় না। জনগণই নেতাকে সামনে নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। নিজেরাই হয়ে ওঠে ইতিহাসের নায়ক।

শেখর দত্ত: আওয়ামী লীগ যদি ‘বোল্ড’ হয়, তবে বিএনপি সমমনাদের নিয়ে টেবিলে কেন? ‘বিএনপির গুগলিতে আওয়ামী লীগ বোল্ড আউট হয়ে গেছে। এখনও সময় আছে, পদত্যাগ করুন। অন্যথায় পালানোর পথও খুঁজে পাবেন না’- এভাবেই আওয়ামী লীগকে গত ৩১ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। মধ্য শ্রাবণে গর্জনটা বিশাল কিন্তু বর্ষণটা মৃদুও নয়, শূন্য বলা যায়। আন্দোলনের চিরাচরিত নিয়ম, সরকার পতনের দাবি দিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনের বড় কোনো কর্মসূচির ঘোষণা আসার কথা ছিল।
কিন্তু মহাসচিব আন্দোলনের নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। তিনি বলেছেন, ‘সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোটের আলোচনার মাধ্যমে খুব শিগগির আন্দোলনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করবেন। কোথায় আওয়ামী লীগ ‘গুগলিতে আউট’ হওয়ার পর বিএনপি নামবে ব্যাটিং-এ, তা নয়! তিনি দলকে ফিল্ড থেকে নিয়ে গেলেন সমমনাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে। তবে টেবিলের চারপাশে থাকবেন ‘ভক্স ওয়াগন’ পার্টির নেতারা। যাদের মানুষ নেই, জন নেই। আছেন কেবল মুখ, যা দিয়ে রাজা-উজির মারেন। এসব নেতার সঙ্গে শলা-পরামর্শ করে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার মানে এই পর্যায়ের আন্দোলন শেষ করা।
ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসমাবেশের দিনে জাতীয় একটি দৈনিকে বিএনপির মহাসচিবের একটি সাক্ষাৎকার পড়লাম। তিনি বলেছেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের ভয়’ পেয়েছে, ‘গণবিস্ফোরণ আঁচ করতে পেরেছে’ সরকার। আমাদের প্রজন্মের ছাত্র-নেতাকর্মী যারা বেঁচে আছেন, তারা গণ-অভ্যুত্থানের অংশী ছিলেন, নেতৃত্বও দিয়েছেন। তারা সবাই জানেন ও বুঝেন, গণ-অভ্যুত্থান, গণবিস্ফোরণ কখনও জানান দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে আসে না।
গণবিস্ফোরণের আঁচ যখন সৃষ্টি হয় তখন জনগণকে রাস্তায় নামানোর জন্য ‘শিগগির কর্মসূচি’ ঘোষণা করতে নেতাদের টেবিলে গিয়ে বসতে হয় না। জনগণই নেতাকে সামনে নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। নিজেরাই হয়ে ওঠে ইতিহাসের নায়ক। তেমন ধরনের কোনো পরিস্থিতি হয়নি, হওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণও পরিদৃষ্ট হয়নি। ওই সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমরা চেষ্টা করব শান্তিপূর্ণ জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থান তৈরি করে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে।’ হাসব না কাঁদব, জানি না! গণ-অভ্যুত্থান কারখানার পণ্য নয় যে তা ‘তৈরি’ করা যায়!
আর জনসম্পৃক্ততা শিশুর হাতের মোয়া নয়। চাইলেই তা পাওয়া যায় না। যদি কখনও কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে নেতার আহ্বানের সঙ্গে গণচেতনা মিলে যায়, তবে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি হয়। বাড়ি থেকে নানা বুঝ দিয়ে ঢাকায় বাসে-ট্রাকে করে এনে হোটেলে রেখে বিরিয়ানি-খিচুড়ি খাইয়ে গণসম্পৃক্ততা কখনও হয় না। আন্দোলনের গণসম্পৃক্ততা হয়, গণবিস্ফোরণের আঁচ সৃষ্টি হয় জনগণের সচেতন ও স্বতঃস্ফূর্ততার সম্মিলনে।
গণ-অভ্যুত্থান, গণবিস্ফোরণ সম্পর্কে বুঝতে কবি শামসুর রাহমানের কয়টি লাইন বিএনপি নেতাদের পড়তে বলি : “কোন্ সে জোয়ার/করেছে নিক্ষেপ আমাদের এখন এখানে এই/ফাল্গুনের রোদে? বুঝি জীবনেরই ডাকে/বাহিরকে আমরা করেছি ঘর, ঘরকে বাহির।” কেন, কখন, কীভাবে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়, তা কেবল কবির কাছেই প্রশ্ন নয়। এর আবির্ভাব নেতা বা নেতৃত্বের কাছেও চিরদিন প্রশ্ন হয়ে থাকবে। বাস্তব পরিস্থিতি কখনও সবৈবভাবে কোনো নেতা, দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না। নেতাকে কেবল লক্ষ্য স্থির রেখে তাল-লয় ঠিক রাখার জন্য হাল ধরে রাখতে হয়।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও বিএনপি-র মহাসচিব মির্জা ফখরুলের এসব জানারই কথা। ধারণা করি, বিদেশ পালিয়ে থেকে নেতাকর্মীদের পুতুল বানাতে তিনি বলে চলেছেন। কথায় বলে, তীর বা বন্দুকের গুলির চাইতে কথা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শক্তিশালী এবং বাগাড়ম্বর সবসময়ই উল্টোমুখী হয়। তীর বা গুলি, যিনি বা যারা ছুড়েন, তাকে বা তাদেরই আঘাত করে।

পদত্যাগের আগে কেন বলেননি সংসদ অবৈধ বিএনপির কাছে সংবিধান নিরাপদ নয়
বিএনপি এখন বলছে, বর্তমানের আওয়ামী লীগ সরকার অবৈধ। বললেই তো আর তা হয়ে যায় না। বর্তমান সংসদ সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই সংসদে বিগত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত বিএনপির সংসদ সদস্যরা ছিলেন। বক্তব্যও দিয়েছেন। বেতন-ভাতাসহ সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন, এটা ‘পাগল ও শিশু’ এবং অন্ধ ও মতলববাজরা ছাড়া সবাই বুঝতে পারবেন।
এখন যদি বিএনপি নেতাদের প্রশ্ন করা যায়, বিএনপি পদত্যাগ করা এমপিরা কি অবৈধ ছিল! সংসদ সদস্য হিসেবে অর্জিত অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণও কি অবৈধ! এসব প্রশ্নের উত্তর বিএনপি নেতারা দিতে পারবেন কি? পদত্যাগের সময় বিএনপির এমপিরা কিন্তু অবৈধ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে রুমিন ফারহানা এমপি বলেছিলেন, ‘সংসদে আমরা জনগণের পক্ষে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বারবার আমাদের মাইক বন্ধ করে দিয়েছিল। এই সংসদে থাকা আর না-থাকা সমান।’
তখন দেওয়া হয়েছিল মাইক বন্ধের দোষ আর এখন বলা হচ্ছে, সংসদ অবৈধ। পদত্যাগের সময় এমপিদের কথা না-কি এখনকার কথা। কোনটা সঠিক? বিএনপি দলটির কাছে অবশ্য সঠিক-বেঠিক কোনো বিষয় নয়। জন্মলগ্ন থেকে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ঘোলা পানিতে মাছ মারতে তৎপর দলটি। এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কারণ পঁচাত্তরের হত্যা-ক্যুয়ের ধারাবাহিকতায় দলটির জন্ম হয়েছে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের গর্ভে আর কলেবর বৃদ্ধি করেছে সুযোগসন্ধানী-সুবিধাবাদী-উচ্চাকাক্সক্ষীদের একত্র করে পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যে।
বিএনপির জন্মদাতা প্রেসিডেন্ট জিয়া মুখে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ কথা বলেছেন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপেই উপহার দিয়েছেন মার্শাল ল’র মধ্যে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। যাতে ২ শতাংশ ভোট না পড়লেও দেখানো হয়, উপস্থিতির হার ৮৮.১০ শতাংশ আর জিয়া ‘হ্যাঁ’ ভোট পান ৯৮.৯০ শতাংশ। ব্রিটেনের সুবিখ্যাত ‘দ্য গার্ডিয়ান’ প্রচার করেছিল, কোথাও কোথাও ভোট পড়েছে ১১০-১২০ শতাংশ। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভোট ছিল ‘জাতীয় উৎসবের’ মতো। জিয়ার উল্লিখিত ‘হুকুমের নির্বাচন’ দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভোটব্যবস্থা সবৈবভাবে কলঙ্কিত হয়।
জিয়া-সাত্তার প্রথমবার এবং খালেদা জিয়ার দুবারের শাসনামলের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে- কীভাবে দেশের ভোটব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করতে বিএনপি দলটি ভূমিকা রেখেছে। ভোট কলঙ্কের হোতা বলেই বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রতিবারই সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল ব্যর্থই নয়, প্রতিবারই ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছে।
সাত্তার না-কি ছিলেন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি! যদি তাই হন, তবে নত মস্তকে সেনাপ্রধান এরশাদের কাছে ক্ষমতা দিয়ে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে এসেছিলেন কেন? ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছেড়েছিলেন কেন? ওটাও তো পালানো! আর পুতুল ‘টু ইন ওয়ান’ রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন! তিনিও পালিয়ে বেঁচেছিলেন! একবার নয়, দুবার নয়, তিনবারের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে বিএনপির কাছে সংবিধান, গণতন্ত্র ও ভোটব্যবস্থা নিরাপদ নয়।
বিএনপি আসলে সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতা সুরক্ষা করার ব্যাপারে ‘ডিফল্টার’। আইনি প্রবাদ বলে, একজন ডিফল্টার সব সময়ই ডিফল্টার। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়া মানে সংবিধান ‘বাঘের কাছে ছাগল বর্গা’ দেওয়া প্রবাদেরই নামান্তর। প্রকৃত বিচারে বিএনপির ক্ষমতায় থাকা মানে ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র সৃষ্টি হওয়া। জিয়া ও সাত্তারের আমলে প্যারালাল কেন্দ্র ছিল ক্যান্টনমেন্ট সরকারি-বেসরকালীন বিকল্প কেন্দ্র রাখা যাদের অভ্যাস, তাদের কাছে সংবিধান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোনোটা কখনোই নিরাপদ থাকতে পারে না।

উগ্র-সন্ত্রাসবাদ গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু বিএনপি ‘টায়ার থ্রি’ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত
সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের পতন রাস্তায় নেমে যে কোনো দল চাইতেই পারে। যদি চায়, তবে তা হবে আইন অমান্য আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলনের চেয়ে এই আন্দোলন রয়েছে আরও একধাপ এগিয়ে। যে কোনো দেশে যে কোনো দল যদি সংবিধান, সংসদ ও আইন অমান্য করে রাস্তায় সব ফয়সালা করতে চায়, তবে সব দেশের সরকারই জনগণের জানমাল নিরাপত্তা বিবেচনায় আইনি অধিকার রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে আইনের মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের মোকাবিলা করা।
সেক্ষেত্রে রাস্তায়ই সবকিছু ফয়সালা করার প্রশ্নটা এসে যায়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকায় গণতন্ত্র রয়েছে অনেক এগিয়ে। এ অবস্থায়ও খোদ আমেরিকায় বিগত নির্বাচন যথাযথ হয়েছে কি হয়নি- এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি হচ্ছে। অভিযুক্ত হলে কয়েক বছরের জেল হবে। তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দলের হোয়াইট হাউস ঘোরাও এবং হামলাকাণ্ডের পর সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি।
জনগণের জানমাল রক্ষায় রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগের অধিকার সব দেশেই সরকারের হাতে থাকে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ পুলিশের প্রতি ‘অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বন্ধের’ আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘তারা যেন শুধু যেখানে অত্যন্ত প্রয়োজন সেখানেই বল প্রয়োগ করে।’ ‘অতিরিক্ত’ ও ‘অত্যন্ত প্রয়োজন’ শব্দ দুটোর তুমুল বিতর্ক চিরবহমান। যে কেউ ট্রাম্পের ওপর যা হচ্ছে, তাকে অতিরিক্ত ও অত্যন্ত প্রয়োজন নয় বলতে পারেন। ফ্রান্সে সড়কের তুচ্ছ ঘটনায় সন্ত্রাসের অভিযোগে পুলিশের গুলিতে সারাদেশ উত্তপ্ত হওয়ার কথাও সবারই জানা। তবে সহনশীল, উন্নত সংস্কৃতিসম্পন্ন গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে কখনও আমাদের দেশের তুলনা চলে না।
বিশ্ব পরিমণ্ডলের সব কিছুর মতো আইন প্রয়োগ ও মানবাধিকার বিষয়টিও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় আপেক্ষিক। গণতন্ত্রের সূতিকাগার ইউরোপে আইনের প্রয়োগে বাড়াবাড়ি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক প্রতিনিয়ত হচ্ছে। পরপর দুই বিশ্বযুদ্ধের পর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী যুদ্ধ চলছে সেখানে। অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং এমনকি খাদ্য নিয়ে নিষেধাজ্ঞা কি আদৌ গণতান্ত্রিক-মানবিক! মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ৩০ লাখ মানুষ হত্যার সময়ে আমেরিকার অবস্থান এবং ১৯৭৪ সালে যে চুক্তি করেও বাংলাদেশ খাদ্য পায়নি, এটাও তো মানবিক ছিল না। তখন কোথায় ছিল জাতিসংঘ!
পঁচাত্তরের পর ক্যু-পাল্টা ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসন যখন চলছে, মোশতাক-জিয়া-এরশাদ আমলে জনগণ যখন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে, তখন অকাতরে ঋণ ও সাহায্য দিয়ে গেছে আমেরিকাসহ পাশ্চত্যের সব ধনী দেশ ও সংস্থা। দেশের বাস্তবতার কারণে জামাত ক্ষমা না চেয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে, তাই বৃহৎ শক্তিধর আমেরিকা ওইসব কাজের জন্য ক্ষমা চাইবে- এমনটা তাই আশা করা বৃথা।
অনুশোচনার সুরও শোনা যায় না; বরং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে অনভিপ্রেতভাবে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ তো পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণ করে মত-পথ নির্বিশেষে বড়-ছোট সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়। আমাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ফেলে দেওয়া কোন ধরনের গণতন্ত্র ও মানবতা!
জাতিসংঘসহ কোনো দেশ বা সংস্থা কি এমন গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে তবে ২০০১-০৬ সালের মতো জামাতসহ তালেবানপন্থিদের ক্ষমতার পার্টনার করবে না? মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে? খালেদা-নিজামীর আমলে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’, ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ প্রভৃতি অভিধায় বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছিল তো পাশ্চাত্যের ধনবাদী দেশগুলোই। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের ওপর বোমা-গ্রেনেড হামলার কথাও তো যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
বাস্তবে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখনও রয়েছে উগ্র-ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের টার্গেট হিসেবে। বাংলাদেশের জনগণ মনে করে, বর্তমান সময়েও আমাদের দেশে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু উগ্র-সন্ত্রাসবাদ এবং ওইসব আশ্রয়-প্রশ্রয় ও উসকানি দেয় যারা-তারা। ইতোমধ্যে পত্রিকায় দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট বিএনপিকে ‘ট্রায়ার থ্রি’ (নিষিদ্ধ সংগঠন নয়। প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না। কিন্তু আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ইন্ধন দেয়) স্তরের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কানাডার আদালতও বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী দল’ বলেই রায় দিয়েছে।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের জনগণ চাইবে বাংলাভাই আর মুফতি গং-দের অভয়ারণ্য না হোক এবং কায়মনোবাক্য প্রত্যাশা করবে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আহ্বানদাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রধান শত্রু সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আস্কারাদাতাদের গণতন্ত্র নিয়ে মায়াকান্নাকে আমলে নেবে না। কেননা এখনও পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সব আইন ও নিয়মকানুন মেনে সন্ত্রাসবাদ দমনের কোনো পথ বের হয়নি।
বিএনপির ‘সরকার পতনের আন্দোলন’ নির্বাচনের আগে কি হতে পারে রাজনৈতিক দৃশ্যপট
এটা তো দেশের বাস্তবতা আর বর্তমানের জমায়েতও দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশ দুইভাগে বিভক্ত। নির্বাচনের আর মাত্র রয়েছে বড়জোর ছয় মাস সময়। এ সময়ের মধ্যে বিএনপি রাস্তার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার ‘পতন’ আন্দোলন সফল হতে পারার বিন্দুমাত্র লক্ষণও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। বিএনপির বায়োডাটা থেকে তো সুস্পষ্ট দলটি যড়যন্ত্র-চক্রান্তে ওস্তাদ। তাই কখন কী ঘটে বা ঘটবে তা নিয়ে তো আর ভবিষ্যদ্বাণী করা চলে না। এ দিকটি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কোন্ কোন্ রাজনৈতিক দৃশ্যপট সৃষ্টি হতে পারে, সেসব বিকল্প নিয়ে আলোচনা বোধকরি হবে আগ্রহোদ্দীপক।
রাস্তার ফয়সালায় যদি আওয়ামী লীগ জেতে, তবে কোনো দল নির্বাচনে আসুক আর না-আসুক, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন হোক বা না-হোক, সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে। যেমন হয়েছিল ২০১৪ সালে নবম সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বয়কট করায় বিএনপি ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ অর্থাৎ চরম দুর্দশায় পড়ে। দুঃসহ ও করুণ অভিজ্ঞতা থেকে দলকে বাঁচাতে ২০১৮ সালে বিএনপি কৌশল পাল্টিয়ে নির্বাচনে যায়।
এবারে রাস্তায় ফয়সালা না করতে পারলে দলটি কী করবে তা তাদেরই ঠিক করতে হবে। তবে বিদেশিরা এসে যে তাদের ক্ষমতার চামচ মুখে তুলে দেবে না, এটা তাদের স্মরণে রাখতে হবে। আর রাস্তার ফয়সালায় যদি বিএনপি জেতে তবে কী হবে? বিএনপি তো আর বিপ্লব করছে না যে সরাসরি ক্ষমতায় বসবে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়, বিএনপি যদি রাস্তার আন্দোলনে জেতে, তবে কতক বিকল্পের সৃষ্টি হতে পারে।
প্রথম বিকল্পের উদাহরণ ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করেছিল বিএনপি নিজেই। গণ-আন্দোলনের তীব্রতা ও ব্যাপকতায় সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করে খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার পালিয়ে রক্ষা পেয়েছিল। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা আন্দোলনের শুরুতে দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি সরকার, সরকারের কোনো রূপরেখা বিএনপি দেবে দেবে করেও দেয়নি।
দেবে কীভাবে ওই ব্যবস্থার কফিনে সব পেরেক ঠুকেছে বিএনপিই। অবাক কাণ্ড! নিজে যা ধ্বংস করেছে, তা-ই আবার পেতে চাইছে। আর আওয়ামী লীগকে রাস্তার আন্দোলনে পরাজিত করা দুঃসাধ্য। কারণ দলটি তো আর সামরিক স্বৈরশাসকের ‘হুকুমের দল’ নয়। যে দলের আন্দোলনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সেই দল বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগকে বাধ্য করবে- এমন ভাবাটা দিবাস্বপ্ন দেখারই সমতুল্য। এমনটা দেখতে দেখতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে, বিএনপি আবারও পড়তে পারে ২০১৪ সালের মতো দুর্দশার ঘোটচক্রে।
দ্বিতীয় বিকল্পের উদাহরণ রয়েছে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। তখন ছিল গণবিচ্ছিন্ন সামরিক শাসক এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির সরকার ক্ষমতায়। তখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ছিল। সর্বোপরি ছিল তিন জোট আট-দল, সাত-দল ও পাঁচ-দলের ঐক্য, জাতীয় সমঝোতা। এবার তো আর গণবিচ্ছিন্ন দল ক্ষমতায় নয়। বাস্তবে আওয়ামী লীগ না থাকলে জাতীয় ঐকমত্য সোনার পাথরবাটি ভিন্ন আর কিছু নয়। সোনার পাথরবাটি কল্পনা করা যায়; কিন্তু ক্ষমতার ‘রসগোল্লা’ তা থেকে জোটে না।
তৃতীয় বিকল্প ২০০৯ সালের নির্বাচনের আগের আর্মি-নিরপেক্ষ সুশীল সমবায়ে জরুরি আইনের সরকার, যে সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে দুই নেত্রীকে মাইনাস এবং ‘কিংস পার্টি’ গঠন করে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত ও নিরঙ্কুশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিশেষভাবে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের তীব্র ও ব্যাপক চাপে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। একটু খেয়াল করলে স্মরণে আসবে, ওই সরকার ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে বিদেশিদের নাক গলাতে হয়েছিল।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্ট, বিএনপি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ১/১১-এর মতো আর্মি ব্যাকড সুশীল সমাজের সরকার ক্ষমতায় আনতে চাইছে। এজন্য ইতোমধ্যে বিএনপি পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আভাস দিয়ে রেখেছে, এবারে আর সাবেক বিচারপতি নয়, নির্দলীয় বুদ্ধিজীবী হবে তদারকি সরকারপ্রধান। বাস্তবে ক্যান্টনমেন্টের দল বিএনপি অতীতের মতো রাজনীতিকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করতে চাইছে। কিন্তু ইতোমধ্যে যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কর্ণফুলি দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে, তা হিসাবে নিচ্ছে না।

আন্দোলনের ১০ ও রাষ্ট্র মেরামতের ২৭-দফা ‘হাওয়া ভবনের’ মতো হাওয়ায় উড়ে গেছে
বাস্তবে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সরকারের রূপরেখা না দিয়ে ‘সরকার পতনের’ ডাক দিয়ে তারেক জিয়া কথিত ‘শেষ যুদ্ধে’ বিএনপি নেমেছে উল্লিখিত শেষ বিকল্পটি কার্যকর করতে। অর্থাৎ নিজের সৃষ্ট যে ট্রাপে খালেদা-নিজামীর সরকার পড়েছিল ২০০৬ সালে, সেই ট্রাপে ভিন্ন অবস্থানে থেকে সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে ফেলতে চাইছে। কিন্তু ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণসম্পৃক্ত আন্দোলনের যে ব্যাপকতা ও তীব্রতা সৃষ্টি করেছিল, এর থেকে বিএনপি রয়েছে যোজন যোজন দূরে।
বিএনপির ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে, ২০০৬-০৮ সালে অবৈধভাবে কেউ ক্ষমতা দখল করলে সাংবিধানিকভাবে শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না। এখন যদি কোনো অবৈধ শক্তি সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতায় বসতে চায়, তবে সেই শক্তিকে পরবর্তীতে সাংবিধানিক শাস্তির বিধানটা স্মরণে রাখতে হবে। উল্লিখিত সবদিক বিবেচনায় নিয়ে বলতেই হয়, বিএনপি কি বুদ্ধিতে, কার পরামর্শে, কী চিন্তা করে ‘শেষ যুদ্ধে’ নামল, তা অজ্ঞাত ও রহস্যময়।
পিছনের দিকে তাকালে এমনটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ছিল বক্তৃতা ও বিবৃতির মধ্যে। সংবাদপত্রের পাতাকেই দলটি বেঁচে থাকার অবলম্বন করে নিয়েছিল। তখন সর্বসাধারণের মধ্য থেকে এমন কথাও শোনা যাচ্ছিল, বিএনপি শেষ হয়ে গেছে। তবে বিএনপির অতীত বিবেচনায় এমনটা ধারণা করা গিয়েছিল, নির্বাচন দূরে থাকায় বিএনপি অর্থ-শক্তি ক্ষয় করতে চাইছে না। নির্বাচনের আগে আগে দলটি সর্বশক্তি দিয়ে রাস্তায় নামবে।
বাস্তবে এই হিসাব বা কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভুল। আন্দোলন-সংগ্রাম ম্যাচবাতির কাঠির মতো নয় যে, হঠাৎ জ্বলে উঠবে। পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে ধাপে ধাপে অগ্রসর করতে হয় এবং দাবি ন্যায্য ও জনগণের মনের সঙ্গে মিললে তা ব্যাপক ও তীব্র হয়। অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা সুস্পষ্ট যে, নভেম্বরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশগুলো দলকে আলোড়িত করেছিল। তাই অতি উৎসাহে দলকে চাঙ্গা করতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেন। সংসদের ভেতরে সংগ্রাম করার অস্ত্রটি হারায় বিএনপি। ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগ মাঠে বিভাগীয় সমাবেশে বিএনপি ১০-দফা দাবি ঘোষণা করে।
এই দাবি জনগ্রাহ্য হওয়া দূরে থাক, দলের ভেতরে তেমন প্রচারের আগেই বিএনপি নামি-দামি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে ‘রাষ্ট্র মেরামতের ২৭-দফা’ রূপরেখা ঘোষণা করে। নেতাকর্মীরা বুঝতে পারার আগেই ১০-দফা, ২৭-দফা মিলেমিশে তালগোল পাকিয়ে যায়। তারপর বিএনপি সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ মিছিল-পদযাত্রা-অবস্থান কর্মসূচি করে চলেছে। দফা দুটো থেকে যায় কাগজপত্রে। কেউ মনেও রাখে না। ‘হাওয়া ভবন’-এর মতো হাওয়ায় উড়ে যায়!
সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক হলো, তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এর কোনো রূপরেখা বিএনপি দেবে দেবে করেও দেয় না। দেবে কোন মুখে? দলটির নেতা তারেক রহমান যে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে গিয়ে তাতে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবারের মতো এবারেও বলতে থাকে ঈদের পর কঠোর আন্দোলনে যাবে বিএনপি। দুই ঈদ চলে যাবার পর ‘কঠিন আন্দোলন’, রাখাল বালকের ‘চোর আসছে’ ‘চোর আসছে’ গল্পে পর্যবসিত হতে থাকে। বিএনপি নির্বাচন সামনে রেখে কী করবে তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা চলতে থাকে।

‘কামড়াতেই যদি না পারো দাঁত দেখিও না’ প্রবাদ মরণ কামড় মানে হচ্ছে মৃত্যু
নভেম্বর ২০২২ থেকে জুলাই ২০২৩। আট মাস এভাবে চলতে চলতেই হঠাৎ করে বিএনপি ঘোষণা দেয়, ‘অবৈধ সরকারের পদত্যাগ চাই। আর কোনো দফা নেই। এক-দফার আন্দোলন চলবে।’ কোথায় ধাপে ধাপে আন্দোলনকে অগ্রসর করা কিংবা দাবি সামনে আনা। কিছুই নয়! এক লাফে চলে যায় আন্দোলনের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ পর্যায় আইন অমান্য আন্দোলনে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ১০ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ নেতাকর্মীদের উত্তেজিত করার জন্য বলেই যাচ্ছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসছেন।
এখানেও বিএনপি হয়ে যাচ্ছে সেই রাখাল বালক। এদিকে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত তারেক রহমান লন্ডনে থেকে আইন অমান্য করে অনলাইনে দলীয় সভা থেকে শুরু করে মহাসমাবেশে বক্তৃতায় হুমকি দিয়ে চলেছেন। নেতা আছেন মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে বহাল তবিয়তে প্রবাসে আর নেতাদের ‘বড় গলায়’ কথা বলতে উসকে দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ না-কি ‘পালাবার পথ খুঁজে পাবে না।’ জনগণ জানে প্রবাদে বড় গলা কার থাকে। এমন নেতার হুকুমের হুমকি-ধমকি জনগণ আমলে নেবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ কখনও পালায় না, পালিয়ে যায়নি কখনও।’ ইতোমধ্যে ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশপথ বন্ধ এবং হাইকোর্টে সস্ত্রীক তারেক জিয়া অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জনের মামলার রায় ঘোষণার পর সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদকের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, অস্থির ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিএনপি আবারও ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসের দিকে যাবে।
এজন্যই ৪ আগস্ট সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কী বলল, যুক্তরাজ্য কী বলল বা ভারত কী বলল, এটা নিয়ে মাথা ঘামানের দরকার নেই।… মানুষ খুব পরিষ্কার বলছেন, “বিদায় হও।” আর সময় নেই। সরকারকে যেতেই হবে।’ দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থক বাদে জনগণ রাস্তায় নামল না, গণ-অভ্যুত্থান-গণবিস্ফোরণ হলো না, শূন্যে তলোয়ার ঘোরানোর মতো তিনি বলতে লাগলেন, সরকারকে পদত্যাগ করতেই হবে।
যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ বিএনপির কাছে আছে। ঘষা দিলেই দৈত্য এসে ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে দেবে! বাস্তবে তেমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না-হওয়া সত্ত্বেও কোন্ মুরুব্বীর আশ্বাসে, কাদের ভরসায় বিএনপি এমন ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, তার প্রত্যক্ষ হদিস পাওয়া যে কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের পক্ষে অসম্ভব। প্রশ্ন হলো বিএনপি কি পরিস্থিতি না-বুঝে মরণ কামড় দিতে চাইছে। পরিস্থিতি না-বুঝে মরণ কামড় দেওয়া মানেই হচ্ছে মৃত্যু।
তাই প্রবাদ বলে, ‘কামড়াতেই যদি না পারো দাঁত দেখিও না।’ বিএনপি কিন্তু ৩২টি দাঁতই দেখিয়ে দিচ্ছে। দাঁত দেখিয়ে ফাঁদে পড়েছে বিএনপি। তাই আন্দোলনের কর্মসূচি না দিয়ে সমমনাদের নিয়ে টেবিলে যাচ্ছে। নির্বাচন যতই কাছিয়ে আসবে, হয় দাঁত দেখানো বন্ধ করতে হবে, সাংবিধানিক পথে পা বাড়াতে হবে নতুবা ২০১৪ সালের মতো অরাজকতা-অস্থিরতা সৃষ্টির দিকে যেতে হবে।
দেশবাসী অরাজকতা-অস্থিরতা চায় না। সবৈবভাবে এর বিরুদ্ধে। জনগণ চায় সংবিধানের ভিত্তিতে সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন। ইতোমধ্যে সুস্পষ্ট, বিদেশিরাও সংবিধান নিয়ে কোনো কথা বলবেন না। তারাও চাইবেন জনগণের মতোই সুষ্ঠু নির্বাচন। বিএনপি কি দাঁত দেখানো বন্ধ করে সাংবিধানিক পথে যাবে, না-কি মরণ কামড় দিতে উদ্যত হবে- এটা জাতীয় শোকের মাসে নির্বাচন সামনে রেখে জনগণের প্রশ্ন!

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য