Friday, February 23, 2024
বাড়িনবম বর্ষ,দ্বাদশ সংখ্যা,নভেম্বর-২০১৯বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

নূহ-উল-আলম লেনিন: সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কতিপয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে বাংলাদেশে চিহ্নিত মহলগুলো তীব্র ধূম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ অনুসরণ করে ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্থ বিক্রি করে দিয়েছে বলে ডান-বাম অভিন্ন ভাষায় তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল। অতীতের মতো ‘ভারত বিদ্বেষ’ ছড়িয়ে জনমত বিভ্রান্ত করা এবং অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করাই হচ্ছে এই মিথ্যা প্রচারণার লক্ষ্য। বিএনপি-জামাত ও দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর ভেতরে লালিত পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ, মনস্তত্ত¡ এবং তাদের ভারত-বিরোধী অচল মুদ্রা সচল করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে টার্গেট করে এ-ধরনের অপপ্রচার চালাবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সেলিমবাদী সিপিবি বা তার সহযোগী বাসদ কেন এই কোরাসে কণ্ঠ মেলাবে, অভিন্ন ভাষায় মিথ্যাচার করবে, তা উদ্বেগের বিষয় না হলেও কৌতুকের বিষয় তো বটে। আর যাই হোক, ওরা তো নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে এবং ‘অন্ধ ভারত-বিরোধী’ নয় বলে নিজেদের জাহির করার কোশেশ করে থাকে।
দক্ষিণ ও বামের এই অভিন্ন কোরাস যে কতটা অন্তঃসারশূন্য এবং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচায়ক, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করব। উল্লেখ্য যে, উত্তরণ-এর চলতি সংখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ সেলিমের প্রবন্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর যৌক্তিকতা ও এ নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার জবাব দেওয়া হয়েছে।

১. বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার এই সম্পর্ককে বাংলাদেশের অন্য কোনো বন্ধু-রাষ্ট্রের সাথে এক নিক্তিতে মাপা যাবে না। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের রয়েছে ’৪৭-পূর্ব অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, নৃ-তাত্ত্বিক ও সংস্কৃতিগত মেলবন্ধন। দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ও পূর্বের মিয়ানমারের সাথে অংশবিশেষ বাদ দিলে বাংলাদেশ কার্যত তিন দিক দিয়ে ভারতের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের রয়েছে ৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্ত। পদ্মা (গঙ্গা), ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) ও মেঘনাসহ প্রধান নদীগুলো ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুদেশের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ৫৪টি অভিন্ন নদী। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা, জলসেচ, নৌ চলাচল, মানুষের যাপিত জীবন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নির্ভর করে এই নদীগুলোর জলপ্রবাহের ওপর। উজানের দেশ হিসেবে এ ব্যাপারে ভারতের কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দুটি দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতেই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে। বৈরিতা ও যুদ্ধ করে জলের ন্যায্য হিস্যা আদায় করা যাবে না।

২. ’৪৭-এ দেশভাগ হয়েছিল বৈরিতার মধ্যে। গোটা পাকিস্তান আমলে সেই বৈরিতা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় সেই বৈরিতার অবসানের সুযোগ এনে দেয়। রেডক্লিভ সাহেব সীমান্ত রেখা টানতে গিয়ে দু’দেশের অভ্যন্তরে কতগুলো ‘পকেট’ বা ‘ছিটমহল’ রেখে যান। গোটা পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলের প্রায় পুরোটাই সীমান্তের এই ছিটমহলগুলো ও অচিহ্নিত কতক সীমান্ত অঞ্চল দুদেশের মধ্যে শান্তির সীমান্ত গড়ে তোলার অন্তরায় হয়ে ছিল। স্বাধীনতার পর মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও, চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সাংবিধানিক বাধা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সরকারগুলোর সমস্যা জিইয়ে রাখার আত্মঘাতী কৌশলের জন্য চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। সীমান্তে প্রায়শ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। শেখ হাসিনার সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং ভারত তার সাংবিধানিক অন্তরায় দূর করায়- এখন বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত নিয়ে, ছিটমহল নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই। সমুদ্রসীমা নিয়েও ভারত ও মিয়ানমারের সাথে আমাদের সমস্যার সমাধান হয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আদালতের রায় অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের বিপুল এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৩. ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আছে। এই ৭টি রাজ্য প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বাংলাদেশের অবস্থানের কারণে। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার হয়ে শত শত মাইল ঘুরপথে আগরতলা, মিজোরাম, কোহিমা, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, আসাম ও মেঘলায়ে যেতে হয়। খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই ৭টি রাজ্যের কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। বহু বিচিত্র জাতিসত্তার বাস এই রাজ্যগুলোর কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান।
দ্বিতীয়ত, এই রাজ্যগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রæপ সক্রিয় থাকায় ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং ধর্ম ও জাতিসত্তাগত সম্প্রীতি সব সময়ই একটা স্পর্শকাতর সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান ছিল এবং আছে। এ-সমস্যা আরও তীব্র হয় বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী, পাকিস্তানপন্থি সরকার ও রাজনৈতিক শক্তির কর্মকাণ্ডে। অতীতের বিএনপি-জামাত সরকার জাতীয় স্বার্থ ভুলে গিয়ে পাকিস্তান ও তার আন্তর্জাতিক মুরুব্বীদের স্বার্থে ভারতের উগ্রবাদী ও বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও বাংলাদেশ ভ‚খÐকে ব্যবহার করতে দিয়েছে। ভারতের সন্ত্রাসীদের জন্য পাচারকালে চট্টগ্রাম বন্দরে দশ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে; আর এই অস্ত্র চোরাচালানির সাথে যুক্ত ছিল বিএনপি-দলীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানসহ মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ।
বাংলাদেশের সাথে বৈরিতা থাকলে এই রাজ্যগুলোর উন্নয়ন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এসব রাজ্যের পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে পারা, তাদের উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। এ দুটি বিষয়ে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। ভারতকে তা উপলব্ধি করতে হবে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্যক্ষেত্রেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে একটি বড় বাধা। সম্প্রতি বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

. ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ। ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির সাথে বাংলাদেশের সমকক্ষতা সৃষ্টি করা টেকনিক্যালি অসম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এবং বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত কারণে ভারতের স্বার্থেই এক ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি করার উপযোগিতা রয়েছে। এটা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা বাণিজ্যযুদ্ধ দ্বারা সৃষ্টি হবে না। উভয় রাষ্ট্রের স্বার্থেই এক্ষেত্রে পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়া ও সহযোগিতা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা হচ্ছে, এককভাবে কোনো দেশের পক্ষেই তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান সম্ভব নয়। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নও এককভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে করা সম্ভব নয়। কোনো যুদ্ধ জোটে আবদ্ধ না হয়েও একাধিক দেশ বা একটি অঞ্চলের দেশসমূহ যৌথ নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। ‘এক দেশ অন্য দেশকে আক্রমণ করবে না’- এটাই একটা রক্ষাকবচ হতে পারে। পৃথিবী এখন পরস্পর নির্ভরশীল। কাজেই এক্ষেত্রে পরস্পরনির্ভর নিরাপত্তা কৌশল ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা সম্ভব। একপক্ষকে দুর্বল রেখে অন্যপক্ষের শক্তি সঞ্চয় বা উন্নয়ন সম্ভব নয়Ñ এ ধারণা যদি আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ভিত্তি হয় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অলঙ্ঘনীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়, তাহলেই Interdependent security and inter dependent economic development strategy গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব।

. বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের কাছে প্রধান বা এক নম্বর এজেন্ডা হচ্ছে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা। কোটি কোটি মানুষের জীবন থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে দিয়ে একটা সমৃদ্ধিশালী মানবিক সমাজ গড়ে তোলা। এই এজেন্ডা রূপায়ণেও পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

. দুদেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা এই পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে একটি পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতাকে বহুমুখীকরণ এবং সুদৃঢ় মেলবন্ধন গড়ে তোলা পরস্পরকে জানা-বোঝার পথ উন্মুক্ত করে দেবে।


বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা ও ভিত্তি স্থির করে দেন। ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব’- এই ছিল এবং আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক ভিত্তি। বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ও কোনো যুদ্ধজোটে জড়ানোর বিরোধী।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিতটি রচিত হয় রক্তের রাখিবন্ধনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন উল্লিখিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য দ্রুত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত এবং অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে। এ লক্ষ্য থেকেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি। ভারত-বিরোধী শক্তিগুলো বিশেষত সামরিক শাসক জিয়া, এরশাদ এবং স্বৈরশাসক খালেদা জিয়া এই চুক্তিকে ‘গোলামির চুক্তি’ আখ্যা দিলেও, ওরা ক্ষমতায় থাকাকালে কেউই এই চুক্তি বাতিল করেনি। পক্ষান্তরে এই চুক্তি ছিল বলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ভারত কোনোদিন হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। বস্তুত জিয়া, এরশাদ, খালেদা- এই তিন শাসকই এই চুক্তির সুফল ভোগ করেছে। এই চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার এই চুক্তি আর নবায়ন করেনিÑ মেয়াদ বাড়ায় নি।
পূর্বতন সরকারগুলোর ভারতবিদ্বেষী নীতি পরিহার করে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য রূপায়ণে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিএনপি-জামাত গোষ্ঠী এই চুক্তিরও তীব্র সমালোচনা করেছে। চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে বলে চিৎকারও করেছে। বিএনপি-জামাত ও দক্ষিণ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলো ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে গঙ্গা চুক্তি বাতিলও করেনি, এমন কী পর্যালোচনাও করেনি। অভিন্ন অবশিষ্ট ৫৩টি নদীর পানি বণ্টনে বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয়নি। যৌথ নদী কমিশনকে অকার্যকর করে রেখেছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লি সফরে গিয়ে ‘পানি বণ্টনের কথা ভুলেই’ গিয়েছিলেন। দু’দেশের স্বার্থেই সে-সময়ে (১৯৯৭) পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিএনপি-জামাত গোষ্ঠী এই চুক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিল। খালেদা জিয়া দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখলে চলে যাবে। মতলববাজ, অশিক্ষিত ও তীব্র ভারত-বিরোধী সাম্প্রদায়িক বিএনপি নেত্রী দেশের ভেতর যেমন নিজ দেশের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি ও যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখতে চেয়েছেন, তেমনি ভারতের সাথে চেয়েছেন শত্রুতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে।
বিএনপি ও বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে বাংলাদেশের মাটিতে ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ দিয়েছিল, অস্ত্র-অর্থ জোগানোর রুট করে দিয়েছিল, তেমনি বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর নেতাদের খোদ রাজধানীতে গোপন আস্তানা গড়ার সুযোগ দিয়েছিল। ভারতের জন্য এই কাজগুলো ছিল চরম শত্রæতামূলক এবং ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। খালেদা-জামাত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থের বাহক হিসেবে যেমন তাদের মদত নিয়েছে, তেমনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টির কাজে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই-কে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে।
কেবল তা-ই নয়, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকেও আইএসআই মদত দিয়েছে। মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে বাংলাদেশ ও ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাবটিও বিএনপি-জামাত সরকার খারিজ করে দিয়েছে। অথচ ২০০১ সালে ভারতে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রপ্তানির অঙ্গীকার করেই তারা ক্ষমতায় এসেছিল, পক্ষান্তরে গ্যাস রপ্তানিতে অস্বীকৃতির খেসারত দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের স্বার্থ নয়, খালেদা-বিএনপি-জামাত সরকারের পরারাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ছিল পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রক্ষা করা। ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি এবং ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত সহযোগিতার নীতি-কৌশলের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের মাটি এখন কোনো দেশের ইনসার্জেন্ট বা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পায় না।
বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ সীমান্তকে শান্তির সীমান্ত হিসেবে গড়ে তোলার ধারার সূত্রপাত হয়েছে। সাব্রুম শহরের নাগরিকদের খাওয়ার পানির প্রয়োজন মেটাতে ফেনী নদী থেকে মাত্র ১.৮ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের সুযোগ দিয়ে শেখ হাসিনা প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনেতার পরিচয়ই কেবল দেননি; মানবিকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ভারতের কাছ থেকে তিস্তাসহ অবশিষ্ট অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক অফেনসিভ গ্রহণ করে ভারতীয় জনমতকে প্রভাবিত করার কৌশল গ্রহণ করেছেন। ভারতের জনগণই এখন শেখ হাসিনার মহানুভবতার নজির দেখিয়ে সেদেশের সরকারকে তিস্তা চুক্তি ত্বরান্বিত করা এবং অন্য যে ৬টি নদী চিহ্নিত করা হয়েছে, তার পানি বণ্টনে তাগিদ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দেওয়ার ব্যাপারে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত ও অন্য প্রতিবেশীরা বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার (যা বিশ্বের অনেক দেশই করে থাকে) করতে পারলে দেশের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের নির্ভরশীল কেন্দ্র।
এক দেশ অন্য দেশের ভিতর দিয়ে পণ্য পরিবহন, ট্রেন, সড়কপথে মানুষ চলাচল তথা ট্রানজিট এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। মাত্র একটি দেশের পাসপোর্ট নিয়ে পশ্চিম ইউরোপের সব দেশ ভ্রমণ করা যায়। আমাদের অঞ্চলে তা হবে না কেন? দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সমঝোতা এবং চুক্তির মাধ্যমে ভিসা সহজীকরণ, যান চলাচলের সুযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে সবারই উচিত সবার জন্য ভ্রমণের বাধা অপসারণ করা।
বাংলাদেশের সাথে ইতোমধ্যেই ভারতের জ্বালানি ও বিদ্যুৎক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশেরই উন্নয়ন অভিযাত্রা ত্বরান্বিত হচ্ছে। ভারতে বাংলাদেশ কোনো নিজস্ব গ্যাস রপ্তানি করছে না। অথচ বিএনপি-সিপিবিসহ গো মুর্খের দল পুরো ব্যাপারটা না বুঝে না জেনেই অপপ্রচারে নেমেছে। বাংলাদেশ বিদেশ থেকে যে তরলীকৃত এলপিজি গ্যাস আমদানি করছে, তা থেকে অংশবিশেষ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে রপ্তানি করবে। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায় বিঘ্নিত হলো? বরং আমরা বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ পেলাম। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি পূরণে অবদান রাখবে এই চুক্তি। রাডার-ব্যবস্থা গড়ে তোলা, আমাদের সমুদ্রসীমায় নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। চীন বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং অন্য কোনো দেশ যাতে আমাদের সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন করতে না পারে, সেটারই ব্যবস্থা হবে। আমরা তো চীনের কাছ থেকেও ডুবোজাহাজ, মিগ যুদ্ধজাহাজ ইত্যাদি ক্রয় করেছি। আমরা আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য যেটুকু প্রয়োজন, সেটুকুই করছি। কোনো আক্রমণাত্মক লক্ষ্য থেকে নয়; বরং নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা সংহত করার জন্যই এই পদক্ষেপ।
উপসংহারে আবারও বলছি, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে ভারতের বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা দুরূহ। বৈরিতা নয়, সহযোগিতার নীতি ছাড়া অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা- সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দারিদ্র্য মুক্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য পরস্পর নির্ভরশীল অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হবে যথার্থ নীতি-কৌশল। এই একটি ক্ষেত্রে, অর্থাৎ দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা ঐকমত্য রয়েছে। এর আগেরবার ভারত সফরে গেলে বিরোধী দল, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ সুস্পষ্ট ভাষায় শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত সরকারের নীতি-পদক্ষেপের ব্যাপারে তারা মোদি সরকারের সাথে অভিন্ন মত পোষণ করেন। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের ভারত-নীতির তীব্র সমালোচক। আমাদের জাতীয় স্বার্থেও আমরা ঐকমত্য সৃষ্টি করতে পারি না। বিএনপি-জামাত বা তথাকথিত বাম দলগুলোর সংকীর্ণ ভারত-বিরোধী অবস্থান আখেরে ভারতের সাথে আমাদের বার্গেনিং ক্ষমতাকে দুর্বল করে, তেমনি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অধিকতর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধার সৃষ্টির করে। জননেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য জনবিচ্ছিন্ন এসব দলের নেতিবাচক অবস্থানের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য