Sunday, July 3, 2022
বাড়িSliderবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ: সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ: সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান

২৫ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। এই জয়কে শেখ হাসিনা আগামী ব্যালটের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে আহ্বান জানান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

আমির হোসেন আমু: জনগণের সংগ্রামই ইতিহাস নির্মাণ করে। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জনগণের চিন্তা-চেতনা, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন দিয়ে তৈরি যে রাজনৈতিক দল তার ভাষা আপামর জনসাধারণেরই কণ্ঠের ভাষা। আমরা ভাগ্যবান, আমরা তেমনই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের উত্তরাধিকার এবং আলোকিত তেমনই জননেতার আলোকবর্তিকায়। আমাদের দল আওয়ামী লীগ, আমাদের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবোধ সব একাকার এ মাটির ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে এবং স্বাধীনতায়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আওয়ামী লীগ একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক গণসংগঠন। আর তাই এ দলটি জন্মলগ্ন থেকে জনগণনির্ভর জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক, নির্ভীক, ত্যাগী, উদার অসাম্প্রদায়িক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের আগের অনেক বিষয়ই গুরুত্বপূর্র্ণ এবং উল্লেখ্য; কিন্তু আমি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথাই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব এ কারণে যে, এদেশের মানুষের জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রথমে এই একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যা বাংলার মূল শেকড়কে আশ্রয় করেই ক্রমে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এখানে বিশেষ বিশ্লেষণে গিয়ে ইতিহাসের ইভেন্টগুলো তুলে ধরলেই দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই শুধু তথ্যগুলোই এখানে তুলে ধরা হচ্ছে, যাতে করে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক উত্থান এবং এদেশের সংগ্রামী জনগণের মূল চেহারাটা আমরা দেখতে পাব।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, মুসলিম লীগের মধ্যে মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল পূর্ববঙ্গ। বিশেষ করে ঢাকা। ঐ সময়ই শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের বিশাল কর্মীবাহিনীর মধ্যে অন্যন্য সাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। জনপদের সাধারণের মধ্যে অনায়াস বিচরণ, বাস্তব অভিজ্ঞান, স্মরণশক্তি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণ ছিল তার। অর্থাৎ ঊনপঞ্চাশে যে আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছিল, সেই সংগঠনের হাল তৈরি হচ্ছিল আগে থেকেই। দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক রীতির প্রাধান্য, নেতৃত্বের মূল্যবোধ ও তার বিকাশ, সময়োচিত কর্মসূচি প্রণয়ন, জনগণের চিন্তা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলনÑ এসব কিছুই মুজিব ধাতস্থ করেছিলেন রাজনীতির শুরু থেকে।
ঢাকার ১৫০নং মোগলটুলিতে মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই শাখা অফিসকে কেন্দ্র করে অফিসটি ঢাকায় হলেও সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের নাজিমউদ্দিন-বিরোধী তরুণেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। মুসলিম লীগকে নতুন করে সংগঠিত করার জন্য ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প’ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুসলিম লীগ সভাপতি আকরাম খান সদস্য সংগ্রহ বই দিতে অস্বীকার করলে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে।
এমনি সময় জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকা হাইকোর্টে দবিরুল ইসলামের হেবিয়াস কার্পাস মামলাটি পরিচালনা করার জন্য ঢাকা আসেন। তখন বিরোধী বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইতোমধ্যে তিনি মুসলিম লীগের বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পক্ষে নতুন দল গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তিনি ঢাকার নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে, যাতে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং একমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলেই জনগণের ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামটিও তার দেওয়া। এ পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সকাল ১০টায় কেএম দাশ লেনের বশির সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে মুসলিম লীগ কর্মী, নেতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান একজনই যুগ্ম-সম্পাদক।
১৯৪৯ সালের ২৪ জুন আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা হয়। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই। জেল থেকে বেরিয়ে জেলায় জেলায় প্রথম যে কমিটিগুলো তিনি করেছিলেন, বস্তুত সেই কমিটিগুলো হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক স্তম্ভ।
এদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জন্ম এবং উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দেশে তখন খাদ্য সংকট, চালের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১১ অক্টোবর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ জনসভা করে এবং জনসভা শেষে একটি ভুখামিছিল বের হয়। মিছিলটি নবাবপুর রেলক্রসিংয়ে পৌঁছালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং ভাসানী, শামসুল হকসহ অনেকে গ্রেফতার হন। ভাসানির পরামর্শে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার এড়িয়ে পাকিস্তানে যান সোহরাওয়ার্দীর সাথে পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনা করতে। কয়েক সপ্তাহ পাকিস্তানে থেকে সোহরাওয়ার্দীসহ মামদতের নবাব, মানকি শরিফের পীর সাহেবের সাথে আলোচনা করে ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরেন এবং ১ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। একটানা ২৬ মাস কারাভোগ করেন।
১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লিয়াকত আলী খান মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করেন। সংবিধান রচনায় ভিত্তি হিসেবে এই রিপোর্ট গ্রহণ করার কথা ছিল; যার ভিতর ছিল হাউস অব ইউনিটস, হাউস অব পিপলস নামে দুটি আইন সভা নিয়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদ, ফেডারেল পদ্ধতির সরকার এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় আন্দোলন করে তা প্রতিহত করে।
এরপর ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন অর্গানাইজ করার কারণে এবং তার সমর্থনে অনশন করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর জেলে পঠিয়ে দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু এবার মুক্তি পেলেন ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, তাও ফরিদপুর জেল থেকে। ওখানে তার বিরুদ্ধে একটা মামলা ছিল। তাকে ঢাকা জেল থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়েছিল ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গের গভর্নর হয়ে আসেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার পল্টনে এক সভায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের কথা বললেন। এ জনসভায় আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের লড়াইয়ের জন্য বড় রকমের আত্মত্যাগের জন্য আহ্বান জানান।
১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এ অধিবেশনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব অ্যাটর্নি জেনারেল পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং কাউন্সিলে সভাপতি পদে পরাজিত হন। শেখ মুজিব তখন হক সাহেবকে আওয়ামী লীগে যোগদান করতে বলেন, উনি রাজি হন। চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তৃতায় বলেন, “যারা চুরি করবেন তারা মুসলিম লীগে থাকেন, যারা ভালো কাজ করবেন তারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আমি বুড়া মানুষ, আর বলব না, শেখ মুজিবের বক্তৃতা শোনেন।”
পরবর্তীতে হামিদুল হক চৌধুরী, মোহন মিয়া এদের প্ররোচনায় তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন নাই। যোগদান না করে কেএসপি গঠন করেন। অনেক টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
যুক্তফ্রন্টে যে দলগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলো হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি (১৯৫৩ সালের অক্টোবরে গঠিত), গণতন্ত্রী পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খিলাফতে রাব্বানী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি।
১৯৫৩ সালের ১৪-১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগ কনফারেন্সে ৪২-দফা নির্বাচনী ইশতেহার গ্রহণ করে, পরে সেটিকে ছোট করে ২১-দফা যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৩০৯টি আসনের মধ্যে আসনের সংখ্যা ২৩৭। যুক্তফ্রন্ট পেয়েছিল ২২৩টি, মুসলিম লীগ ৯টি এবং স্বতন্ত্র ৫টি। অন্যদিকে সংখ্যালঘু আসনে জাতীয় কংগ্রেস ২৫টি, কাস্ট ফেডারেশন ২৭টি, সংখ্যালঘু যুক্তফ্রন্ট ১৩টি, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি এবং গণতন্ত্রী দল ৩টি আসন। বাংলার জনগণের রায় থেকে এটাই বোঝা গিয়েছিল যে মুসলিম লীগকে তারা মন-প্রাণ থেকেই বর্জন করেছে। ১৯৫৪ সালের ২৫ মার্চ কর্ণফুলি পেপার মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গায় ১০ জন প্রাণ হারান। ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরিতে যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে। পালামেন্টারি দলের নেতা মনোনীত হন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। চিফ মিনিস্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি ঐদিনই। সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং আবু হোসেন সরকার ও পরের দিন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল আশরাফ উদ্দিন আহমেদকে নেওয়া হয় মন্ত্রী হিসেবে। শেরে বাংলা কলকাতায় সফরে গিয়ে তার ভাষণে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে কী একটা কথা বলেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। শেরে বাংলা দেশে ফিরে ঐ অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করা যায়নি। শেরে বাংলা কলকাতা থেকে ফিরে ১৯৫৪ সালের ১৩ মে আতাউর রহমান খান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, আবদুস সালাম খান, শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দিন হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ, হাশিমুদ্দিন আহমদ, কফিলউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে মন্ত্রী হিসেবে নেন। নতুন মন্ত্রীগণ গভর্নর হাউসে শপথ নেওয়ার সময়ই ডেমরায় আদমজী পাটকলে বিহারি বাঙালি দাঙ্গা বেধে যায়।
১৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৩০ মে পাকিস্তান সরকার ৯২(ক) ধারামতে প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন কায়েম করে। ঐদিন সকালে বঙ্গবন্ধু, আতাউর রহমান সাহেবসহ শেরে বাংলার বাসভবনে গিয়ে কেবিনেট মিটিং ডেকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন, হক সাহেব কিছু না বলে উপরে উঠে যান।
১৯৫৪ সালের ৩১ মে প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক জননিরাপত্তা আইনে নিষিদ্ধ করা হয়।
ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশ ভেঙে এক ইউনিট গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১৯৫৪ সালের ১২ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান ফিরে এলেন। সোহরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় ১৯৫৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর শেখ মুজিব ঢাকা জেল থেকে মুক্তি পেলেন। ভাসানীর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৫৪ সালের ২০ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান করেন।
১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রূপমহল সিনেমা হলের সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়।
১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ রাতে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। পরিষদে সেদিন শেখ মুজিব বলেছিলেন, পূর্ববঙ্গের নাম পূর্ব পাকিস্তান রাখার অধিকার এ পরিষদের নেই এবং সংবিধানে তা বৈধ নয়, একটি দেশের নাম বদল করতে হলে সেদেশের জনগণের রায়ের প্রয়োজন। পূর্ববঙ্গ হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যম-িত একটি জনপদ। এ নামের সঙ্গে জনগণের জাতীয় পরিচয় অবিচ্ছেদ্য। দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার দাবিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৬ সালের ২ মে থেকে অনশন শুরু করেন। ১৬ মে পরিস্থিতি যখন চরম পর্যায়ে, শেখ মুজিব আরমানিটোলা ময়দানের জনসভায় গণ-আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন বলে ঘোষণা করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে মওলানা ভাসানীর অনশন ভাঙালেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন হয়। ১৯৫৬ সালের ২৬ মে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাসন জারি করেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালের ১ জুন আবার তা তুলে নেওয়া হয়।
১৯৫৬ সালের ২৩ জুলাই পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করলেন। অবিলম্বে ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে ঢাকা শহর অচল করে দেওয়া হবে বলে তিনি চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন। ১৯৫৬ সালের ১৫ আগস্ট খাদ্য সরবরাহ তদারক করার জন্য কেএসপি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা প্রদান করেন। কিন্তু প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনের কারণে ঢাকা শহরের অবস্থান অবনতি ঘটে মিছিল-মিটিং আর বিক্ষোভে। ১৯৫৬ সালের ২২ আগস্ট কেন্দ্র ৩০ আগস্টের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকার নির্দেশ দিলে, ১৯৫৬ সালের ২৯ আগস্ট যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদলবলে পদত্যাগ করে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে এটা কোনো পাতানো নাটক। কিন্তু পরিস্থিতি অন্যরকম হলো। ৩০ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শহরে ভুখামিছিল চলছিল। পুলিশ মিছিলে গুলি করে কয়েকজনকে হত্যা করে। সমস্ত শহর কেঁপে ওঠে। দুপুরের মধ্যেই সমস্ত অফিস আদালত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, গভর্নর শেরে বাংলা মুষড়ে পড়েন। তিনি আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য অনুরোধ জানান। এ সময় কেন্দ্র এবং প্রদেশের রাজনীতি অতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। এদিকে আওয়ামী লীগে ১৯৫৬ সালের ৫ এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ১১ জন মন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন চূড়ান্ত করলেন। চিফ মিনিস্টার আতাউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মুনসুর আহমদ, কফিউদ্দিন চৌধুরী (কেএসপি), মাহমুদ আলী (গণতন্ত্রী পার্টি), মনোরঞ্জন ধর (কংগ্রেস) ও শরৎচন্দ্র মজুমদার (কংগ্রেস)। আওয়ামী লীগের সামনে ছিল দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা। সরকার পরিচালনা এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আওয়ামী লীগ সরকার একটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা হলো সরকার এবং দলের অবস্থান নির্ধারণ। ওদিকে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনিও পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারকে সহায়তা করেছেন। ১৯৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে আফ্রো-এশীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং সভায় শুধু কেন্দ্র নয়, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সরকারকেও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়।
আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ১৯৫৬ সালের ২১ মে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী দলের সাংগঠনিক কমিটির দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। ১৯৫৬ সালের ২১ মে’তেই যারা যারা মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তাদের সকলেই দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ সালের ৩১ মে মন্ত্রিত্বের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সাথে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদেই রয়ে গেলেন। তার ঐ সিদ্ধান্ত যে কতটা জরুরি ছিল, তা তখন না বোঝা গেলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্তে জাতি উপলব্ধি করেছে। হঠাৎ করে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে একটি বড় রকমের ধাক্কা এলো দলে। জেলা, মহকুমা ও থানার শাখা কমিটিগুলোর অনেকে চলে গেল মওলানা ভাসানীর সঙ্গে। কেউ কেউ আবার ফিরেও এলেন। সাতান্নতেই হাল ধরতে হলো শেখ মুজিবকে, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিলেন। তখন থেকেই মুজিবের আওয়ামী লীগ বলে দলের পরিচিতি লাভ করেছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর। অনেকেই ধারণা করছিল যে পূর্ব পাকিস্তান আবার গভর্নরের শাসনে চলে যাবে। নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছিল। গভর্নর শেরে বাংলা এ সময় সরাসরি কেএসপি’কে সমর্থন করে নতুন আইন জারি করেছিলেন পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠার বিষয়ে। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ গভর্নর শেরে বাংলা আওয়ামী লীগ সরকারকে বরখাস্ত করে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবু হোসেন সরকারকে চিফ মিনিস্টারের দায়িত্ব প্রদান করলেন। কিন্তু এই অনাহূত কাজটি ছিল নিছক আইন বিরুদ্ধ। সোহরাওয়ার্দী বিষয়টি প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর গোচরে আনলেন। গভর্নর নিরপেক্ষ নয় বলে তিনি তাদের কাছে প্রমাণ রাখলেন। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে গভর্নরের পদ থেকেই বরখাস্ত করে দেয়। আবু হোসেন সরকারের শপথ নেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তার পরিবর্তে আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান এসে শপথ নিলেন পরদিন ১ এপ্রিল।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে কয়েকটি দেশে সফর করতে পাঠিয়েছিলেন। ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তিনি বলেছিলেন, এদেশের ভবিষ্যতের নেতৃত্বের ভার তাকেই নিতে হবে। কেএসপি সরকারের পতনের পরই কেএসপি সর্বত্রই জঙ্গি মনোভাব নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। হামিদুল হক চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে ১৯৫৮ সালের ৩ এপ্রিল এবং পল্টনে জনসভা করে ৪ এপ্রিল। ১৯৫৮ সালের ৫ এপ্রিল পরিষদের সভা বসে। সভায় অধিবেশন মূলতবি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিষদ কক্ষের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি শুরু হয়ে যায়। সেই মারামারির জের চলে শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত। ১৯৫৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অন্যান্য দিনের মতো বিরোধী দল পরিষদ কক্ষে হৈচৈ মারামারিতে এত বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে আওয়ামী লীগের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে তারা আঘাত করে মারাত্মকভাবে। সেই আঘাতে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী ঢাকা মেডিকেলে ২৬ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। অন্যদিকে জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি করেন ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে তাড়িয়ে শেষে নিজেই পাকিস্তানের সর্বময় দখল করে বসেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম ধাপেই গ্রেফতার হলেন, মুচলেকা দিয়ে অনেক নেতাই মুক্তি পেয়েছিলেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মেজাজে ঐ ধরনের কিছু কোনোদিনই ছিল না। তিনি মুচলেকা দিলেন না, ফলে তিনি মুক্তি পেলেন ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। আওয়ামী লীগের জন্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য এটা ছিল সবচেয়ে গুরুতর সময়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে-সময় যে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তা অবশ্যই ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়।
১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হঠাৎ করেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে আইয়ুব খান সরকার। বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলাতেই ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিরোধী দলের রাজনীতিকরা ক্রমেই নড়েচড়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান তার পক্ষে দেশের একটি শাসনতন্ত্র রচনা করে। প্রেসিডেন্টের অপার ক্ষমতা। উভয় ইউনিট থেকে ৪০ হাজার করে মৌলিক গণতন্ত্রীদের নির্বাচিত করে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ গঠন করা হলো রাতারাতি। ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদের এবং ১৯৬২ সালের ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দেওয়া হয়। দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। কবে, কোথায়, কখন এনডিএফ গঠিত হয়েছে তা সঠিক বলা যায় না।
১৯৬২ সালের ৬ জুন শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পান, বললেন আইয়ুবের এই সংবিধান গ্রহণযোগ্য নয়।
১৯৬২ সালের ২৪ জুন ৯ জন বিরোধী দলের নেতা এক যুুক্ত বিবৃতি দান করেন, আইয়ুব খান-বিরোধী ঐ বিবৃতিটি ছাপা হলে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়, রাজনীতির বাতাস বইতে শুরু করে। বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেন তারা হলেনÑ নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, শেখ মুজিবুর রহমান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, মাহমুদ আলী, সৈয়দ আজিজুল হক ও মওলানা পীর মোহসীন উদ্দিন আহমদ। ১৯৬২ সালের ৮ জুলাই পল্টনে ৯ নেতা সামরিক আইন ও আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। ১৯৬২ সালের ১৪ জুলাই আইয়ুব দলবিধি গঠন করে, দল পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারের কাছে বিভিন্ন বিবরণ দিয়ে অনুমতি নেওয়ার প্রচলন শুরু করে। ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এনডিএফ গঠিত হয়। পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সমগ্র পাকিস্তানে জনসভার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের আন্দোলন গড়ে তোলেন। জেল থেকে বের হওয়ার পরপর তার অপরিসীম পরিশ্রমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে হোটেলে ইন্তেকাল করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় আওয়ামী লীগের এক বিশেষ সম্মেলন ডাকেন। এতে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, সকল জেলা এবং মহকুমা শাখার সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকগণ উপস্থিত হন। এখানেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালের ১ মার্চ আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়ে পুনরুজ্জীবন ঘটায় এনডিএফের নেতাগণ বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রচ-ভাবে ক্ষেপে যান। উল্লেখ্য, একমাত্র আওয়ামী লীগেরই নিবেদিত এবং সংগঠিত কর্মীবাহিনী ছিল অলিতে-গলিতে-মহল্লায়। আওয়ামী লীগের একদল নেতা এনডিএফের বাইরে দলের আত্মপ্রকাশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন।
১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসে। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঐ সভায় ১১-দফা পেশ করেন। ১১-দফা নিয়ে সভায় বেশ হৈচৈ শুরু হয়। কেউ কেউ এটাকে দুঃসাহসিক বলে অভিহিত করেন। সম্পূর্ণটাই ছিল স্বায়ত্তশাসনের বিষয়। এতে ফেডারেলভিত্তিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা ব্যবস্থা, মুদ্রার আয়-ব্যয় হিসাব পৃথককরণ, পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পূর্বাঞ্চলে স্থাপন ইত্যাদি ঐ ১১-দফায় ছিল। অনেক আলোচনার পর ১১-দফা গৃহীত হলেও প্রচার এবং দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে কিছুটা অনীহা প্রকাশ পায়। বলা হয়, এতে আওয়ামী লীগের ওপর চরম দমননীতি শুরু হবে।
১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন অনুষ্ঠানে গভর্নর মোনেম খাঁ ছাত্রদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্যান্ডেল ইত্যাদি ভেঙে ফেলে। মোনেম খাঁ কোনোরকম যান পালিয়ে বাঁচে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণির এমএ বাংলা, রোল-৭৪, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং আসমত আলী এমএ ইতিহাস, রোল-২৫৮, এ দুজনের এমএ ডিগ্রি বাতিল করে। দুজনই ১৯৬২ সালে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ এ সময় ১৯৬৪ সালের ৩ জুনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের শাখা কমিটি গঠনের সাংগঠনিক কাজ শুরু করে। ১৯৬৪ সালের ১৩ জুলাই আওয়ামী লীগ দল পুনর্গঠনের পর প্রকাশ্য জনসভা করে পল্টনে। সভার সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। রাজবন্দিদের মুক্তি, শিক্ষাঙ্গনে সরকারি সন্ত্রাস বন্ধ, যুক্ত নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রভৃতি দাবি ছাড়াও জোর দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ওপর। ১৯৬৪ সালের ১৪ জুলাই পুলিশ নগর আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায়। কমপক্ষে উপস্থিত আটজনকে গ্রেফতার এবং দলিলপত্র সিজ করে। বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ একযোগে কর্মসূচি নিয়েছিল আরবি বা উর্দু হরফে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ তার প্রতিটি জনসভায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব, বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে বক্তব্য রাখত, যাতে এদেশ অন্যান্য বিরোধী দলের অনীহা ছিল। সরকার বাংলাকে উর্দু হরফে লেখার ঐ প্রস্তাব রেখেছিল ১৯৬৪ সালের ১৭ মে। আওয়ামী লীগ তার লিফলেট, প্রচারপত্র এবং জনসভায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বসহকারে প্রচার করত। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ লেগে যায়। ১৭ দিন যুদ্ধের পর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধ থামে। যুদ্ধে পাকিস্তানের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। পশ্চিম পাকিস্তানেই যুদ্ধ চলেছে। আইয়ুর খানের ধারণা হয়েছিল, যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের ঐক্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরে। আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থাই পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। ১৯৬৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের বিশেষ অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের ঐ অসহায় বিশ্লেষণ হয় এবং এইসঙ্গে বলা হয় যে ঐ যুদ্ধের সিংহভাগ ব্যয়ভার পূর্ব পকিস্তানকে বহন করতে হবে। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আইয়ুব খানের মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। এনডিএফের নুরুল আমিনও চুক্তির বিরোধিতা করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, আমরা তাসখন্দ চুক্তির বিষয়ে মোটেও উৎসাহিত নই, আমরা চাই পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। ১৯৬৬ সালের ১৬ জানুয়ারি ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় শেখ সাহেবের বাসভবনে ওয়ার্কিং কমিটির সভার পর ঐ বিবৃতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে আইয়ুব খানের পক্ষে এনডিএফের নেতা আতাউর রহমান পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন তাসখন্দ চুক্তির বিষয়ে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৬৬ সালের ১৮ জানুয়ারি যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আইয়ুব খানের মন্ত্রী খান আবদুস সবুর এক বিবৃতিতে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার দাবির নিন্দা জানান। ১৯৬৬ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টা বিবৃতিতে বলেন, জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়াটা অসুবিধা হলে নিশ্চয়ই তাসখন্দ চুক্তিটা অর্থহীন।
এ সময়টা শেখ মুজিবের ওপর দমননীতি চলে, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিবসে প্রদত্ত ভাষণের জন্য মামলা চলছিল, তিনি জামিনে ছিলেন, ১৯৬৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ঐ মামলার শুনানিকালে তার জামিন নামঞ্জুর হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গেই হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালের ৩১ জানুয়ারি এনএসএফের সম্মেলনে মোনেম খাঁ বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা পাকিস্তান ভাঙতে চায়। তিনি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। এতে বোঝা গেল পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকার কড়া মনোভাব নিচ্ছে। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেজামে ইসলাম প্রধান লাহোরের চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে পাকিস্তানের সবগুলো বিরোধী দলের সভা বসে। কিন্তু তার আগে ৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ঐ বৈঠকের সকল খবর প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্য নির্দেশ জারি করেন। বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি পেশ করেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোনো অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কথা না তোলার জন্য আহ্বান জানায়। আওয়ামী লীগ বৈঠক বর্জন করে। ঐ দিনই তিনি লাহোরে সাংবাদিক সম্মেলন করে ৬-দফা ঘোষণা করেন। ১৯৬৬ সালের ৭ মার্চ পাকিস্তানের সকল পত্র-পত্রিকায় ৬-দফার খবর ছাপা হয়। ১৯৬৬ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিক সম্মেলনে ৬-দফার ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি এটাকে বাঙালির বাঁচার দাবি বলে আখ্যায়িত করেন সেদিনই। কিন্তু অবাক ব্যাপার ছিল এটাই, তরুণ সমাজ তার প্রত্যাবর্তনের আগেই বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সর্বত্র পোস্টার এবং দেয়াল লিখনে ছেয়ে ফেলেছে ৬-দফার কথায়। ৬-দফার প্রথম প্রচার পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয় প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন কর্তৃক, যা গ্লোব প্রিন্টার্স থেকে মুদ্রিত। পুস্তিকাটি সম্ভবত প্রথম প্রচার করা হয় ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনারে। তখনই বোঝা যাচ্ছিল ৬-দফার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কেউ কেউ দল থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
১৯৬৬ সালের ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ৬-দফা অনুমোদন করা হয়।
১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ মতিঝিলের হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। সভাপতি মাওলানা তর্কবাগীশ অনুপস্থিত থাকেন। ঐ কাউন্সিলেও ৬-দফা বিপুল সমর্থনে অনুমোদিত হয়। করাচি আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া মঞ্জুরুল হক তার ভাষণে সর্বাত্মক সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। ১৯ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঐ দিনই সন্ধ্যা নাগাদ কমিটিও অনুমোদন করেন কাউন্সিলররা। সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ।
৬-দফাই পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাজনৈতিক বিষয় হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ৬-দফার প্রথম জনসভাটি হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ। পূর্ব পাকিস্তানে ৬-দফার আন্দোলনই একমাত্র আন্দোলনে পরিগণিত হয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ অর্থনৈতিক টানাপোড়নে ৬-দফাকেই মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচনা করে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ৬-দফা যে বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাবে কেউই কল্পনা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি জনসভাতে বলতেন, ওরা বেশি সময় দেবে না। দ্রুত নিজেদের আত্মত্যাগের জন্য তৈরি হতে হবে। ৬-দফা প্রচারে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ২০ মার্চের পর শেখ মুজিব সময় পেয়েছিলেন মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। ৩৫ দিনে তিনি প্রায় ৩২টি মূল জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। পল্টনের জনসভার সময় আইনমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে ৬-দফা পাকিস্তানের জনগণের জন্য যে আত্মঘাতি, তা তিনি প্রমাণ করতে পারেন। শেখ মুজিব তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু ভুট্টো আর এগোননি। ১৯৬৬ সালের ১৯ এপ্রিল খুলনায় তাকে গ্রেফতার করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। পরে যশোর পুলিশ তাকে যশোরে গ্রেফতার করে ঢাকায় রাষ্ট্রদ্রোহী ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে। সঙ্গে সঙ্গে জজকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল মুজিব ঢাকা এসডিও কোর্টে হাজির হন। এসডিও তার জামিন বাতিল করে গ্রেফতারের আদেশ দিলে জজকোর্ট থেকে আবার জামিন নেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল রাত ১২টার সময় তাকে ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি ১৯৬৬ সালের ৪ এপ্রিল সিলেটের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন, সিলেট প্রশাসন রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল। ২৩ এপ্রিল সিলেট জজকোর্টে তার জামিন হলে জেলগেট থেকে বের হওয়ার আগেই পুলিশ ময়মনসিংহের ভাষণের মামলার জন্য তাকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ নিয়ে যায়। সিলেট প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ময়মনসিংহের জজকোর্টে জামিনের আবেদন জানানো হয় ১৯৬৬ সালের ২৫ এপ্রিল। জামিন মঞ্জুর হয়। ১৯৬৬ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ ভিন্ন ভিন্নভাবে সারাদেশে ৬-দফার প্রচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৬৬ সালের ৭ মে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তিনি ৬-দফা আন্দোলনের কর্মসূচি নতুন করে তৈরি করে দেন। ১৯৬৬ সালের ৮ মে তিনি নারায়ণগঞ্জে বিশাল জনসভা করলেন। এটাই ছিল তার ৬-দাফার শেষ জনসভা। সম্ভবত তিনি নিজেও তা আগে থেকে জানতেন। বক্তৃতায় তিনি সকলকে বৃহত্তর আত্মত্যাগের আহ্বান জানিয়ে তার নিজের অবস্থার কথাও ব্যাখ্যা করেছেন। ঐ দিনই গভীর রাতে ৩২ নম্বরের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সরাসরি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এবার তার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ দাঁড় করানো হয় ৩২ ধারা মোতাবেক, কঠোরতম দেশরক্ষা আইনে।
বঙ্গবন্ধুসহ বন্ধীদের মুক্তির দাবি এবং ৬-দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ১৩ মে পল্টনে জনসভা হয় এবং ২০ মে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং থেকে ৭ জুন হরতালের কর্মসূচি দেওয়া হয়।
৭ জুন হরতাল পালনের সময় তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল বেভারেজের শ্রমিক সিলেটের মনু মিয়া গুলিতে প্রাণ হারান। এতে বিক্ষোভের প্রচণ্ডতা আরও বাড়ে। তেজগাঁওয়ে ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। আদাজ এনামেল অ্যালুমোনিয়াম কারখানার নোয়াখালীর শ্রমিক আবুল হোসেন ইপিআরের গুলিতে শহিদ হন। বিকালের দিকে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের কাছে পুলিশের গুলিতে মারা যান ছয়জন শ্রমিক। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যায় কারফিউ জারি করা হয়। দুই শহরে প্রায় ১ হাজার গ্রেফতার হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা নারায়ণগঞ্জের থানা থেকে বন্দীদের ছাড়িয়ে আনতেও দ্বিধা করে না। ফলে ১৯৬৬ সালের ১৩ জুনের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৃতীয়সারির নেতারাও গ্রেফতার হয়। ১৫ জুন ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুন ইত্তেফাক এবং নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হঠাৎ করেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে আইয়ুব খান সরকার। বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলাতেই ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিরোধী দলের রাজনীতিকরা ক্রমেই নড়েচড়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান তার পক্ষে দেশের একটি
শাসনতন্ত্র রচনা করে। প্রেসিডেন্টের অপার ক্ষমতা।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি সরকারি প্রেসনোটে উল্লেখ করা হলো, ভারতীয় হাইকমিশনের ফাস্ট সেক্রেটারি মিস্টার ওঝার সঙ্গে যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল সরকার তার বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন। এ যাবৎ বিভিন্ন বিভাগের ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইতিহাসে এটাই আগরতলা মামলা নামে পরিচিত, যদিও মামলার শিরোনাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান গং বনাম পাকিস্তান। ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা জেলে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে জানানো হয়েছিল যে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটা ছিল গভীর রাতের ঘটনা। জেলগেটেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যাওয়া হলো। উল্লেখ করা যেতে পারে, এবার ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা জেলে ছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালের ২৩ জুন সৈয়দ নজরুল ইসলামের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, যা লিফলেট আকারে হাজার হাজার কপি সারাদেশে বিলি করা হয়েছিল। এতে উল্লেখ ছিল ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা জেলগেট থেকে ধরে পশ্চিমা আর্মিরা কোথায় নিয়ে গেছে কাউকে জানানো হয়নি। ১৯৬৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা মামলায় অভিযুুক্ত সকলের মুক্তির দাবিতে দেশের প্রায় সবগুলো শহর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বহু গ্রেফতার হয়। ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের এক অর্ডিনেন্সে জানানো হয় যে, পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১ এবং ১৩১ ধারায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের বিচার করা হবে। এ জন্য ঢাকায় বিশেষ একটি আদালত গঠন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এসএ রহমান ও পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবর ও মাকসুদুল হাকিমের সমন্বয়ে গঠিত কুর্মিটোলা সেনানিবাসের বিশেষ আদালতে ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন বিচার শুরু হয়। অভিযুক্তদের নাম এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান, এলএস সুলতান আহমদ, এলএসডিআই নুর মোহাম্মদ, আহমদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ, আবুল বাশার মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহাম্মদ ফজলুল হক, খন্দকার রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, বিভূতিভূষণ ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহিরুল হক, ক্লার্ক মজিবর রহমান, প্রাক্তন সার্জেন্ট মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, প্রাক্তন এটি মোহাম্মদ খুরশিদ, খান এম শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার একেএম শামসুল হক, হাবিলদার আজিজুল হক, এএসপি মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শাসমুল হক, মেজর শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এম শওকত আলী, ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা, ক্যাপ্টেন এএনএম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এএকে তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমদ ও ফার্স্ট লে. আবদুর রউফ।
১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট ফজলুল হক ও সার্জেন্ট জহিরুল হকের ওপর গুলি চালায়। সার্জেন্ট জহিরুল হক ঘটনাস্থলে নিহত হন। কেউ কেউ এটা আইয়ুব খানবিরোধী সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র বললেও খবরটি ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। পল্টনে সার্জেন্ট জহিরুল হকের লাশ নিয়ে আসা হলো। এখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে বেরিকেড দিয়ে ছাত্র-জনতা মিলিটারি প্রতিরোধ করে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে প্রায় বিনা উসকানিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শামসুজ্জোহাকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামল দেওয়া সেনাবাহিনীর পক্ষেও অসম্ভব হয়ে ওঠে। সারাদেশ থেকে মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। আগরতলা মামলার বিচারকের অস্থায়ী বাসভবনসহ আইয়ুব খানের ১০ জন মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ঢাকা সেনানিবাস যে কোনো সময় জনগণ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, এ ধরনের আশঙ্কার কথাও ক্ষমতাসীন মহল চিন্তা করতে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি কঠোর কারফিউ বলবৎ করা হয়। ছাত্র-জনতা শহরের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে।
১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান এক বেতার ভাষণে ঘোষণা করলেন, তিনি আর কখনও প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন না। আগরতলা মামলা খারিজ করা হলো এবং তিনি বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বসে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা চান। আনন্দ-উল্লাসিত জনতার ঢল নামে রাজপথে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ লক্ষ জনতার অনুমোদনক্রমে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত করেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ৬-দফা বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬-দফার ব্যাপারে কোনো আপোস নেই। যেখানে যার সঙ্গেই সংলাপ হোক না কেন। ১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক বসে। আইয়ুব খানের পক্ষ থেকে ১৫ জন, নির্দলীয় ২ জন এবং ১৬ জন রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা সফল হয় না, ১০ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা মুলতবি রাখা হয়। ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ আবার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হয়। ৬-দফাই ছিল মূল আলোচ্য বিষয়। বঙ্গবন্ধুকে ৬-দফার একটি দফা প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানানো হয়; কিন্তু তিনি তা নাকচ করেন। ফলে আলোচনা ভেঙে যায়। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারি করে সমস্ত জেনারেল ইয়াহিয়ার হাতে ন্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।
১৯৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া পাকিস্তানের এই ইউনিট বাতিল, সমগ্র পাকিস্তানে বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদের এবং ১৯৭০ সালের ২২ অক্টোবরের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের কথা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্যে রাজনীতি অনুমোদন করে। গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬-দফার পক্ষে একটি দলও সমর্থন দেয়নি। বঙ্গবন্ধু ঘরোয়া রাজনীতির মধ্যেই অনেকগুলো জেলায় সাংগঠনিক সফর করেন। অন্যদিকে ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তান নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে ৩-দফা চুক্তিতে আবদ্ধ হন।
১৯৭০ সালের ৪-৫ জুন হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তার ৪০ মিনিটির ভাষণে বলেন, বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলন আওয়ামী লীগকে একাই করতে হবে। আওয়ামী লীগের কোনো বন্ধু নাই। ৬-দফাকে পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো দল সমর্থন করে নাই। ৬-দফা জনগণের মুক্তির সনদের জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছি; আপনারাও যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকবেন।
১৯৭০-এর ৩১ মার্চ লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক (এলএফও) আইনি মাধ্যমে ঘোষণা করেন ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০-এর ৭ জুন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ৬-দফাকে রেফারেনডাম ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করে ৩ মার্চে সংসদ অধিবেশন পহেলা তারিখে স্থগিত ঘোষণা করলে; সারাদেশ দাবানলের মতো আন্দোলনে জ্বলে ওঠে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে, একদিকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, ট্যাক্স-খাজনা বন্ধ করে দিতে বললেন, পাশাপাশি ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। বললেন, রক্ত যখন দিয়েছিÑ রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
পাক-হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ আক্রমণ করলে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেনÑ শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে শত্রুদের মোকাবেলার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ লোকের আত্মাহুতির বিনিময়ে ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের মাধ্যমে আমরা বিজয় অর্জন করি।
জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় আসেন। এসে পেলেন, পুরো দেশটা ছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত, সাড়ে ৩ কোটি লোক গৃহহারা, ১ কোটি লোক বিদেশের মাটিতে আশ্রিত, ৩০ লাখ শহিদ পরিবার, ২ লাখ বীরাঙ্গনা, রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট-রেললাইন সব ধ্বংসপ্রাপ্ত। ব্যাংকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা নাই, খাদ্যের গুদামে খাদ্য নাই, পোর্ট-বিমানবন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবকিছু সচল করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য- অর্থনৈতিক মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে যখন তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিলেন সে-মুহূর্তে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে যে সামরিকতন্ত্র এদেশের মানুষের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধ হত্যা করে সংবিধানের চার মূলনীতি ফেলে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা পুনঃপ্রবর্তন করেছিল। এই অপশক্তি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নব্য পাকিস্তান সৃষ্টির প্রক্রিয়া করছিল। এ সময় দেশে চলছিল দল ভাঙার রাজনীতি, যা থেকে আওয়ামী লীগও রেহাই পায়নি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র হনন, জিয়াউর রহমান ঘোষিত ও I Shall Make Politics Difficult for the Politicians-এর মতো বিরাজনীতিকরণের হুঙ্কার। হুন্ডা-গুন্ডা-স্টেনগানের মাধ্যমে ভোট ব্যবস্থা বিধ্বস্ত ও গণতন্ত্র হত্যা, জেল, জুলুম, গুম, হত্যা, নির্যাতন মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছিল অতিষ্ঠ। তখনকার দেশের বিরাজমান এ পরিস্থিতিতে ১৯৮১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি পিতৃ-মাতৃহীন স্নেহের ভাই রাসেলসহ ভাইদের হারিয়ে স্বজনহারা বুকভরা বেদনা নিয়ে ঢাকায় অবতরণ করেন। ৬৫-৭০ মাইল বেগের ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। মনে হচ্ছিল, মানুষ তাদের হারিয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষায় ছুটে এসেছেন। বিমান বন্দর থেকে শেরে বাংলা নগরে ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় তার সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত হয়ে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, খুনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার জনগণের কোনো কল্যাণ করতে পারে না। তিনি জনগণের কাছে বিচার দাবি করেন, যেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে, শোষণমুক্ত সমাজ, শোষণহীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সোনার বাংলা কায়েমের মধ্যেই সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমি নেতা নই; সাধারণ মেয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাব। এই সংগ্রামে জীবন দিতে আমি প্রস্তুত।
১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সশস্ত্র সেনা বিদ্রোহীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক ধারা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন এবং যার ফলে তখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অব্যাহত ধারায়ই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিচারপতি সাত্তার সাহেব রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন।
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এরশাদের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলে গুলিবর্ষণ করলে জয়নাল, কাজল, দীপালি সাহাসহ মারা যায় অনেকে।
শেখ হাসিনা খবর পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে যান বিশ্ববিদ্যালয়ে, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে এই হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন এবং অবিলম্বে সাংবিধানিক ধারা পুনঃপ্রবর্তনের আহ্বান জানান।
১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়, সহস্রাধিক ছাত্র গ্রেফতার করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ মিটিং করার সময় শেখ হাসিনাসহ আমাদের ৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ১ মার্চ শেখ হাসিনা মুক্তিলাভ করেন এবং সবশেষে আমি ২৯ মার্চ মুক্তি পাই। ১৯৮৩ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের লক্ষে নেতা-কর্মীদের শপথ পাঠ করান।
১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দেশে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হওয়ার সাথে সাথে ১৫-দলীয় জোট গঠন হয়। ১৯৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাঞ্জা প্রত্যাহারের সাথে সাথে জোটনেত্রী শেখ হাসিনা সর্বাগ্রে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ২৭ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। হাজার হাজার মানুষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘেরাও কর্মসূচি সফল করে। ঐ দিনই এই শান্তিপূর্ণ অবরোধ চলা অবস্থার শেষ পর্যায়ে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। আমরা তাড়াতাড়ি ওখান থেকে উনাকে নিয়ে ট্রাকে উঠে মিছিল শুরু করলে সেই ট্রাকের উপরও গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। আমরা মতিঝিলে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে কিছুক্ষণ থেকে তারপর চলে এলাম। এরশাদ রাতে সকল রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং শেখ হাসিনাকে তার মহাখালির বাসায় গৃহবন্দি করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর গৃহবন্দি থেকে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮৪ সালের ৭ জানুয়ারি পুনরায় ঘরোয়া রাজনীতি করার অনুমতি প্রদান করে এবং উপজেলা নির্বাচনের ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫-দলীয় জোট উপজেলা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানায়। এই আন্দোলনে ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক উঠিয়ে সেলিম ও দেলোয়ারকে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা এ ঘটনাকে ফ্যাসিস্ট ও বর্বরোচিত বলে পরের দিন হরতালের আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা উপজেলার সমস্ত প্রার্থীদের প্রত্যাহারের আহ্বান জানালে ৭০০ প্রার্থী প্রত্যাহার করেন। এরশাদ সরকার বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ ১৫-দল ও সাত-দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। ১৫-দলীয় জোট ১৮০ ও সাত-দল ১২০টি আসন নির্ধারিত হয়। কিন্তু রাতে বিএনপি সাত জোট নির্বাচন থেকে পিছিয়ে যায়, এরশাদকে ছাড় দেয়। ৭ মে নির্বাচনে ১৫-দলের আট-দল নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যখন এগিয়ে আসছে, ভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করা হয় এবং দীর্ঘ ১২ দিন পরে মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে সরকার ১৫৮ সিট নেয়। ৪ সেপ্টেম্বর এরশাদ ১৫ অক্টোবর নির্বাচনের ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেন, সাত-দলীয় জোট ও পাঁচ-দলও প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর ড. ওয়াজেদ মিয়ার মহাখালির বাসভবনে শেখ হাসিনার সাথে খালেদা জিয়ার এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তিন জোটের ডাকে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি সচিবালয় ঘেরাওসহ পালিত হয়। এই দিন যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক ও স্বৈরাচার নিপাত যাক’ বুকে-পিঠে লিখে শেখ হাসিনাকে সালাম করে ফিরে দাঁড়াবার সাথে সাথে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিতে ও শহিদ হয়। এরপর ঐ দিনই কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসক্লাবের সামনে ক্রেন দিয়ে শেখ হাসিনার গাড়ি টেনে তুলে ফেলা হয়। শেখ হাসিনা উত্তাল জনসমুদ্রে বলেন, এখন আমাদের এক-দফা দাবি এরশাদের পদত্যাগ।
১১ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে আবার গৃহবন্দি করা হয়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। ১৯৮৭ সালের ১০ ডিসেম্বর অন্তরীণ অবস্থা থেকে শেখ হাসিনা মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী চট্টগ্রামে জোটের মহাসমাবেশে যান। উত্তাল জনস্রোত নিয়ে শেখ হাসিনা সভাস্থলে যাওয়ার পথে মুসলিম হাই স্কুলের মোড়ে পুলিশ বাধা দেয়, একই সময় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়, তাকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেন যুবলীগ কর্মী আবুল হাসেম। শুরু হয় পুলিশি তা-ব, আইনজীবীরা শেখ হাসিনাকে আদালত ভবনে নিয়ে যান, ঐ দিনও চট্টগ্রামে প্রাণ হারান ২৪ জন। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে থাকা অবস্থায় ফ্রিডম পার্টি তাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা চালায়। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর তিন জোটের সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এদিনই শেখ হাসিনার উদ্যোগে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এবং আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত দেন। ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর তিন জোট বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। ৬ ডিসেম্বর নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৭ মার্চ উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় শেখ হাসিনা সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনের আহ্বান জানান। ১৯৯১ সালের ১৪ এপ্রিল শেখ হাসিনার নির্দেশে সংসদ উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদ একাদশ সংশোধনী বিল আনেন (সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করার)। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। ১৯৯৪ সালের ২১ মার্চ মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ৩০ মার্চ মাগুরা ও মিরপুর উপনির্বাচনের নজিরবিহীন কারচুপির প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে এবং এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ৫ এপ্রিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনা ট্রেন মার্চ শুরু করে এবং ঈশ্বরদীতে তার ট্রেনে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। ১৯৯৪ সালের ৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নেই, সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রস্তাব অবাস্তব, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদলীয় সকল সংসদ সদস্য শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ২৮ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব কটি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন। ১ মার্চ শেখ হাসিনার ডাকে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৯ মার্চ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সকল শ্রেণি-পেশা মানুষের উদ্যোগে প্রেসক্লাবের সামনে গড়ে ওঠে জনতার মঞ্চ। অবশেষে আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে। ২৫ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। এই জয়কে শেখ হাসিনা আগামী ব্যালটের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে আহ্বান জানান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার একক উদ্যোগে ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৭ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন করেন। ১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, এই অঞ্চলে দীর্ঘ ২৫ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনের জন্য শেখ হাসিনা UNESCO শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি UNESCO কর্তৃক আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা হিসেবে মহান ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃত হয়। ২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম একটি সরকার মেয়াদ উত্তীর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বিএনপির সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালায়। আল্লাহর রহমতে উনি বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার, পছন্দমতো দলীয় লোককে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান করার জন্য বিচারপতির চাকরির বয়স বাড়ানো ও পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন সাজানো এবং তারপর সব অপশন বাদ দিয়ে দলীয় রাষ্ট্রপতির অধীনে নির্বাচন ঘোষণার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামাত জোট ছাড়া সমস্ত দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ফলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীনের ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনা গ্রেফতার হন এবং আন্দোলনের মুখে ২০০৮ সালের ১৬ জুন তাকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেন। ২০০৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশে এসে আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সকল ষড়যন্ত্র বানচাল করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃঅন্তর্ভুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের এবং যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার অনুষ্ঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পাপমুক্ত করেছেন। আজ শেখ হাসিনার নির্ভিক, তেজস্বী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের এবং সফল রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত ও পরিচালনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাতা ও উন্নয়নের কাণ্ডারি, উন্নত, সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণের রূপকার।
শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে এবং দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প, দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরসহ মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তার সফল রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, শিশু ও মাতৃ-মৃত্যুর হার হ্রাস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, শিক্ষানীতি প্রণয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, শান্তি, জঙ্গি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বহু মর্যাদাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে গৌরবান্বিত করেছেন।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার নতুন মাত্রা দিয়েছেন। শেখ হাসিনা আজ বিশ্বে একজন নন্দিত সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি সৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বে তৃতীয় স্থানের অধিকারী হয়েছেন। বর্তমানে অত্যন্ত সফলতার সাথে করোনা পরিস্থিতি এবং পাশাপাশি উপর্যুপরি বন্যার মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। আজ তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়া যাবে- তার ঘোষিত ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক : সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য