Saturday, July 13, 2024

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন

আওয়ামী লীগকে সংখ্যালঘুরা ভোট দেন, এটা কোনো অপরাধ হতে পারে না। ভোট দেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। তাহলে কেন নির্বাচনকালে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়?

কানিজ চিনু : ১৯৪৭ থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে চলেছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অত্যাচারে হিন্দু ধর্মের বহু পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ১৯৪৭, ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যা ছাড়াও নানা উপলক্ষে, বিশেষত নির্বাচনকালে সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক আদর্শের রাজনৈতিক দল হওয়ায় সংখ্যালঘুদের ভোট সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সত্তরের নির্বাচন থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনেও সংখ্যালঘুর ভোট আওয়ামী লীগের পক্ষেই পড়েছে। বিএনপি-জামাতের আক্রোশটা সেখানে। সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক, এই বিবেচনাতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালে সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত হানে।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর হামলা, মামলা, সূক্ষ কারচুপি, ষড়যন্ত্র এবং প্রকাশ্য নির্যাতনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে দেয়নি সাম্প্রদায়িক শক্তির সাহায্যে টিকে থাকা স্বৈরশাসকরা। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করায় স্বৈরশাসকসহ সাম্প্রদায়িক দলগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে পরের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের জয় ঠেকাতে। এরই ফলশ্রুতিতে ২০০১-এর নির্বাচনকেন্দ্রিক নির্মম সহিংসতা শুরু হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামাতের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সংখ্যালঘুরা। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে থেকে চাঁদপুর, ফরিদপুর, যশোর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, বগুড়া, পিরোজপুরের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় উগ্রবাদীরা। কোলের শিশুদের কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। মনিরামপুর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা, বাগডাঙা, নলডাঙা, বেজপাড়াসহ কিছু অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে গেলে আর ফেরত আসতে পারবে না কেউ। নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি-জামাত জোটের নেতাকর্মীরা আরও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুট থেকে হেন কোনো অত্যাচার নেই, যা তারা সংখ্যালঘুদের করেনি। ৮ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার দেলুয়া গ্রামের অনিল কুমার শীলের ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী পূর্ণিমাকে ১১ জন দলবেঁধে ধর্ষণ করে। ঘরের পুরুষদের বেঁধে রেখে তাদের সামনে মা, স্ত্রী, বোন, কন্যাকে গ্যাং রেপ করে বিএনপি-জামাতের ক্যাডাররা।
সে-সময়ে চারদলীয় জোট সরকারের ক্যাডার বাহিনীর হাতে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ধানডোবা গ্রামের ৩০টি, বিল্লগ্রামের ২৫টি, চাঁদশী গ্রামের ২০টি, খাঞ্জাপুর গ্রামের ১৫টি, ইল্লা গ্রামের ৫টি, গেরাকুল গ্রামের ৫টি ও আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার গ্রামের ৫০টি, রামানন্দেরআঁক গ্রামের ২৫টি, বাহাদুরপুর গ্রামের ৩০টি, বাকাল গ্রামের ২৫টি, পতিহার গ্রামের ৩০টিসহ কয়েকশত পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এছাড়া জোট ক্যাডারদের হিংস্র্র থাবা থেকে এসব এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিবারের তরুণী, যুবতী ও গৃহবধূদের রক্ষা করতে অধিকাংশ পরিবার গোপনে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। যাদের পাঠাতে পারেনি তাদের রক্ষার জন্য রাতের আঁধারে কলাগাছের ভেলায় বসিয়ে নির্জন পুকুর কিংবা দিঘির মাঝে ভেলা ভাসিয়ে রাখত অসহায় পরিবারগুলো। ভয়ংকর সেসব ঘটনা আজও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের তাড়া করে ফিরে।
২০০১ সালের নির্বাচনকালীন (১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ অক্টোবর) সময়ে সারাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৭ জন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। ধর্ষিত হন ৬১ জন, যৌন নিপীড়নের শিকার হন ৬৪ জন। হামলায় আহত হন ৬৬৬, অপহৃতের সংখ্যা ১৪। কয়েকটি স্থানে আদিবাসী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনও হামলার শিকার হন। প্রায় সব ঘটনাতে নির্বাচনে জয়ী বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা জড়িত ছিল। বেশির ভাগ স্থানে থানা মামলা নেয়নি। আবার মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত জোট সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে গেছে বিএনপি-জামাতের ক্যাডাররা।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর ঘোষণা দেয়। নির্বাচনে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিজয়ী হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করে। দীর্ঘকাল দেশব্যাপী জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসকের বন্ধ করে দেওয়ার ৩৫ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারকাজ শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে শুরু থেকে বিএনপি-জামাত মরিয়া হয়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে সহিংসতা ঘটাতে থাকে। বিশেষ করে কাদের মোল্লা, দেলওয়ার হোসেন সাঈদী এবং সালাউদ্দিন কাদেরের বিচারের রায়ে সহিংস হয়ে ওঠে তারা। আবারও টার্গেট করে সংখ্যালঘুদের। নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও গাইবান্ধা জেলায় সংখ্যালঘু বসতি এবং মন্দিরে হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে যশোরের অভয়নগরে শতশত বাড়ি, মন্দির, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হামলা, লুটপাট, ভোট দিতে যাওয়ার সময় জমিতে ফেলে বেধড়ক পিটানো, ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলা, ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হামলা, ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে হামলা, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী পালনকালে সুনামগঞ্জের শাল্লায় আক্রমণসহ বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার সাথে বিএনপি-জামাত ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলগুলো জড়িত ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামাতের ক্যাডারদের হাত থেকে রক্ষা পেতে যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ার নারীরা শিশু কোলে নিয়ে শীতের রাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
আওয়ামী লীগকে সংখ্যালঘুরা ভোট দেন, এটা কোনো অপরাধ হতে পারে না। ভোট দেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। তাহলে কেন নির্বাচনকালে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়?
একটু পিছনে তাকালে আওয়ামী লীগের ওপর সংখ্যালঘুর আস্থা এবং সংখ্যালঘুর ওপর তৎকালীন সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং আজকের বিএনপি-জামাতের আক্রমণের চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে জমি দখল থেকে নারী নির্যাতন, সবটাই ছিল সাম্প্রদায়িক হামলা। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে একে বিভ্রান্ত করতে আইয়ুব-বাহিনী সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এই প্রতিরোধ কমিটি জনগণের মাঝে ‘বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও’ প্রচারপত্র বিলি করে এবং টিম গঠন করে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে নিরাপদ রাখতে পাহারা দেয়।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৯৮ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। সাধারণ বাঙালি নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচনোত্তর ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেন এবং শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সকলের জন্য করণীয় তুলে ধরেন। সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু সংখ্যালঘুর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বিশেষভাবে বলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার কিছু আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। পাকিস্তানের কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক চাপে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সংবিধান তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রস্তুত কমিটি প্রণীত এই সংবিধান ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রথম বার্ষিকী হতে এটি কার্যকর হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান হলো স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই সংবিধান কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনই নয়, এই লিখিত দলিলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূল চরিত্র বর্ণিত রয়েছে। সমাজতন্ত্র হলো দর্শন, গণতন্ত্র হলো প্রশাসনের ভিত্তি এবং জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা হলো এই ভূমির আবহমান চরিত্র।
রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তবে সাম্প্রদায়িক দলগুলোর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা প্রকাশ্যভাবে বন্ধ থাকলেও পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতাকারী রাজাকার, আলবদর, আলশামসের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সময় হস্তগত করা অস্ত্র দিয়ে ক্রমাগতভাবে অপতৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, পিডিপি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক দলগুলো গোপনে সংগঠিত হতে থাকে। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি মওলানা ভাসানী মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি সমাজতন্ত্রের ধারণা নিয়ে বঙ্গবন্ধু-সরকারের বিরোধিতা শুরু করলে গোপনে সংগঠিত পাকিস্তানি দালাল সাম্প্রদায়িক দলগুলো সরকারকে অস্থিতিশীল করতে একই সাথে মাঠে নামে। ভাসানী খোলাখুলিভাবে উগ্র-সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-বিরোধিতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তারা ভারত থেকে ফিরে আসা হিন্দু শরণার্থীদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। তাদের হুমকি দিতে থাকে, যাতে নিজেদের বাড়িঘর ও জমি তারা ফেরত না চায়।
উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংগঠিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও দণ্ড প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের অধীন দণ্ডযোগ্য বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২ জারি করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন করা হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ৩৭ হাজারের কিছু বেশি অপরাধীকে আটক করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পায়। বাকি ১১ হাজার শীর্ষ অপরাধীকে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, বলপূর্বক ধর্মান্তর করা, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধসহ আন্তর্জাতিক আইনের অধীন দণ্ডযোগ্য অপরাধে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়। এসব অপরাধীর বিচারের জন্য ৭৩টি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হতো। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৬৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার পর সদ্য-স্বাধীন দেশের মানচিত্র থাকলেও বিচারিক ও সামাজিক চিত্রটাই বদলে যায়। সুশাসন ও ন্যায়বিচারের কাঠামো ধসে পড়ে। সামরিক শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২-এর অধীনে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। সামরিক ফরমান বলে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২ বাতিল করে উক্ত আইনে দণ্ডিত এবং বিচারাধীন আটক সব অপরাধীকে মুক্তি দেয় এবং তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে ৩৮ অনুচ্ছদের শর্তগুলো তুলে দেওয়া হয়। জেনারেল জিয়া ১৯৭৯ সালে রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট দিয়ে উল্লিখিত সামরিক ফরমানগুলোর বৈধতা দেয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত সাম্প্রদায়িক দলগুলো সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে এদেশে পুনর্বাসিত হয় এবং ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সামরিক সেনা ছাউনিতে গড়া দল বিএনপি এবং আরেক সামরিক শাসক এরশাদ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে যুদ্ধাপরাধী দল জামাতসহ পাকিস্তানপন্থিদের প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্নভাবে রসদ জুগিয়েছে। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ফুলেফেঁপে উঠে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে জায়গা করে নিয়েছে। জোট সরকার চিহ্নিত রাজাকারদের গাড়িতে স্বাধীন দেশের পবিত্র পতাকা উড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমাজ প্রতিষ্ঠার চিন্তাকে প্রতিহত করে দেশে বিশাল এক ধর্মান্ধ ও ধর্ম ব্যবসায়ী লুটেরা শ্রেণি তৈরি হয়েছে। এদের হাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুরা বছরের পর বছর নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের পরে রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার মূল চাওয়াই ছিল সমতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সফল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা এই দেশকে পিছিয়ে নিতে চেয়েছে তাদের প্রবলভাবে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মৌলবাদ ও উগ্রবাদমুক্ত শান্তির দেশ, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য