Saturday, July 13, 2024
বাড়িএকাদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-২০২০বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও তার উন্নয়ন দর্শন

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও তার উন্নয়ন দর্শন

এ ম সা ই দু জ্জা মা ন

১. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়ের বিষয়টি অবিশ্বাস্য
শেখ মুজিবুর রহমানের কথা আমরা প্রথম জানতে পারি ১৯৪৮ সালে ঢাকা সচিবালয়ের কাছের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। আমি তখন হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র, ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে। তারপর শুনি ১৯৪৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সম্বন্ধে দাবির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। এরপর ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও আমরা তার কথা জানতে পারি, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সলিমুল্লাহ হলের আন্দোলন কমিটির অফিস সেক্রেটারি। তবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় ছিল ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে, মুসলিম লীগকে পরাজিত করে এবং ১৯৫৫ সালের প্রাদেশিক সরকার গঠন প্রসঙ্গে। ১৯৫৯ সালে (’৫৮ সালের সামরিক শাসন জারি করার পর) তাকে জেলে নেওয়ার বিষয়টি আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। তবে তার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ জন্মে ১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলন জাতির সামনে উত্থাপনের পর। ১৯৬৭-৬৯ কালে আগরতলা মামলার প্রেক্ষিতে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আমার আরও বেড়ে যায়। তাকে মুক্তি দেওয়ার সময় ও পরবর্তীতে ফলশূন্য রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সের সময় আমি সরকারি কর্মচারী হিসেবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কর্মরত ছিলাম (১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই)। অতঃপর আমার জন্য তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা সঞ্চারিত হয়Ñ যখন ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসু সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ আখ্যায়িত করে জাতির মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তখনও কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি।
কিন্তু আমার কথা তিনি জানতেন- যা আমি পরে বুঝতে পারি। ১৯৫৬ সালে সরকারি কর্মচারী হিসেবে তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর, কয়েকজন আমার চেয়ে প্রবীণ কর্মকর্তার সংযোগ হয়েছিলÑ যাদের অন্যতম ছিলেন জনাব রুহুল কুদ্দুস। আমার সঙ্গে তার পরিচয়ে গভীরতা লাভ করে যখন মি. রুহুল কুদ্দুস যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আমি- তার সাথে ছিলাম অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট। সেটা ছিল ১৯৫৮-৫৯ সালে। পরবর্তীতে আমি যখন ঢাকা কার্যালয়ে অর্থ বিভাগে কর্মরত, তখনও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। তিনি আমার বামপন্থি রাজনৈতিক চিন্তাধারার সম্বন্ধে জানতেন। আমার কর্মদক্ষতার জন্য তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকারে আমার একাধিক পদোন্নতি হয়েছিল এবং ১৯৬৬ সালেই আমি যুগ্ম সচিব পদে উন্নীত হই। এরপর ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বৈদেশিক সাহায্য বিভাগে ডেপুটি সেক্রেটারি পদে বদলি হই। তার কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলায় বন্দি করা হয় এবং মি. রুহুল কুদ্দুসও একজন আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হন। আগরতলা মামলা সম্বন্ধে আমি একটু আগেই উল্লেখ করেছি।
পাকিস্তান সরকারে আমি দায়িত্ব পালন করি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রায় দু-বছর। তখন বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট ছিলাম। অতঃপর এক বছরের মতো ছিলাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব এবং পাকিস্তানের বাণিজ্যনীতি যাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা হয়, তাতে সচেষ্ট ছিলাম। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে, সবাইকে তাক লাগিয়ে (এবং আমার চেয়ে প্রবীণ বাঙালি ও অবাঙালি প্রায় দুই ডজন কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে) আমাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদে নিযুক্ত করা হয়- জয়েন্ট সেক্রেটারি, এক্সটারনাল ফিন্যান্স। তখন আমার চাকরি প্রায় ১৪ বছরের কাছাকাছি ছিল, যদিও যুগ্ম সচিব পদের জন্য ন্যূনতম ১৫ বছর চাকরির প্রয়োজন বেঁধে দেওয়া ছিল। এটা ছিল আমার জন্য একটি বিশেষ সুযোগ।
পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নীতিমালা নির্ধারণের সাথে যুক্ত হওয়া, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বেশিরভাগ কাজ করা ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজেট প্রণয়ন করা। পদাধিকারবলে আমি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ হতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক নিযুক্ত হই। পাকিস্তান সরকারের/কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা সব সময়ই আমার কাছে জানা থাকত।
১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে আমি একবার ঢাকায় আসি তিন-চার দিনের জন্য। এসেই রুহুল কুদ্দুস সাহেবের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেসা করলেন- “তুমি শেখ সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছ?” আমি বললাম যে আমার সঙ্গে তো তার পরিচয় নেই। তখন তিনি আমাকে সেদিন বিকালে আবার আসতে বললেন। বিকাল ৫টার দিকে রুহুল কুদ্দুস সাহেব আমাকে ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বরে মি. নুরুদ্দীন সাহেবের বাসায় নিয়ে গেলেনÑ যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আরও তিনজনের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন ও রুহুল কুদ্দুস সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমাকে ভিতরে নিয়ে কুদ্দুস সাহেব বললেন- “এই যে সাইদুজ্জামানকে নিয়ে এসেছি।” বঙ্গবন্ধু চেয়ার ঘুরিয়ে আমাকে দেখলেন ও বললেন, “তুমিই সৈয়দুজামান?” সেটাই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তিনি আরও বললেন, “তুমি তো শুনেছি বাঙালিদের স্বার্থরক্ষার জন্য বেশ কাজ করো ও করেছ- সব মন্ত্রণালয়েই যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারে তুমি কাজ করেছ ও করছো, তবে তোমার এত ঘন ঘন প্রমোশন হয় কেমনে?”
আমি হতবাক হয়ে গেলাম। পরে বললাম, “স্যার সেটার ৫০ শতাংশ হয়তো আমার দায়িত্ব পালনে যথাযথ সময় দেওয়া ও দক্ষতার জন্য; তবে বাকি ৫০ শতাংশ আমি মনে করি, আপনার ডাকে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেশব্যাপী, ঢাকা ও অন্যান্য শহরে মিছিল করে ৬-দফা বাস্তবায়নের দাবি করেছে ও করছে, তার নিশ্চয়ই অবদান আছে।” বঙ্গবন্ধু হেসে বললেন, “এটা মনে থাকে যেন”, ও হেসে আমাকে করমর্দন করে বললেন, “যা করছো তা করতে থাক।” আমি বিদায় নিলাম।

২. বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও কর্মযজ্ঞ
দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমি পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারে ছিলাম। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে আমাকে চাকরি হতে অব্যাহতি দেয় সরকার। তারপর এক বছর পাকিস্তানে আটক ছিলাম। ১৯৭২ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাত্রে মানুষ পাচারকারীদের টাকা দিয়ে আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে (যারা ছিল অল্পবয়সী) নিয়ে পালিয়ে সীমান্ত প্রদেশের ভিতর দিয়ে খাইবার পাস পার হয়ে আফগানিস্তানের জালালাবাদে ও পরে কাবুলে পৌঁছাই ৪ জানুয়ারি ১৯৭৩। ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় কাবুল ছেড়ে উড়োজাহাজে দিল্লি ও কলকাতা হয়ে ২২ জানুয়ারি ঢাকায় আসি। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ডা. এ আর মল্লিক তখন কাবুলে ছিলেন এবং তার হস্তক্ষেপে আমার উড়োজাহাজে দিল্লি আসা তরান্বিত হয়। তিনি এ খবরটি ঢাকায় পাঠান। ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে চাকরিতে যোগদানের জন্য দরখাস্ত করি। পরের দিন আমাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন একজন প্রাইভেট সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম অনু। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখেই বললেন, “এত দেরি করলে কেন?” আমি তাকে সবকিছু বললাম। তখনই আমাকে তিনি বললেন, “যাও তোমার জন্য দায়িত্ব ঠিক করা আছে। তুমি পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের সাথে দেখা করো। উনি সব বলে দেবেন। অনেক কাজ করতে হবে।”
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে এবং একইসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ও কমিশনের বৈদেশিক সম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে।
অতএব, ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ও অবদান রেখেছিলেন- তাতে আমি জড়িত হওয়ার সুযোগ পাইনি। তবে পাকিস্তানে অবস্থানকালে রেডিওর মাধ্যমে ও অনেক বন্ধুদের পত্র থেকে (যেগুলো লন্ডন হয়ে আসত) স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর পুনর্বাসন পদক্ষেপ সম্বন্ধে কিছু কিছু খবর পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তার বিস্তৃত বর্ণনা পেয়েছিলাম ১৯৭২ সালের কর্মকা-/কর্মযজ্ঞ সম্বন্ধে।
প্রথমেই বলতে হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং ১৯৭২ সাল মিলে পরপর ৩টি শস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল (Crop failure) এবং দেশে খাদ্যাভাব ছিল। ভারত ও অন্যান্য উন্নত দেশ হতে বেশ কিছু খাদ্য সাহায্য পাওয়া যায়। জাতিসংঘের মহাসচিবের ১০ লাখ টন সাহায্যের আহ্বানে ও জাপান সরকারের অনুদানে ও কিছু বার্টার চুক্তির মাধ্যমে এবং বিভিন্ন স্তরে রেশনিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও প্রত্যাগত নাগরিকদের খাদ্য বিলি করার ব্যবস্থা করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ব্যবস্থা ছিল বলতে গেলে কপদর্কহীন এবং বৈদেশিক মুদ্রার অস্তিত্ব ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থা পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার যে সমস্ত পদক্ষেপ ও নীতিমালা গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের পুনর্গঠন ও জাতীয়করণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগঠন ও বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল গঠন, যাতে সহায়তা প্রদান করেছিল আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ এই দুটি সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে এবং এই প্রসঙ্গে যে বৈদেশিক মুদ্রার ও স্বর্ণের প্রয়োজন ছিল, তা অনুদান হিসেবে দিয়েছিল কানাডা ও সুইডেন তার পূর্বে ভারত সরকার কিছু বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ হিসেবে পৃথক করে রাখে (বিনিময় হার ভারতের হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে)।
অবকাঠামো পুনর্গঠন ছিল একটি জরুরি ও কঠিন কাজ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সরকার সড়ক, সেতুসমূহ রেল সংযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, টেলিফোন ব্যবস্থা ও বন্দরগুলো পুনর্গঠনের ব্যবস্থা হাতে নেন ও ’৭২ সালের শেষার্ধে এগুলো মোটামুটি সম্পন্ন হয়।
প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর সরকার সার্বিক প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করেন এবং নতুন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গঠন করেন। নতুন প্রশাসনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পূর্বে উল্লিখিত পুনর্গঠনের কর্মসূচি হাতে নেন ও সন্তোষজনক পর্যায়ে সেগুলো পুনর্গঠিত হয়।
পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের কাজের বর্ণনা ছিল ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে। এই পুনর্গঠনে অনেক বন্ধু-রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাহায্য দিয়েছিলেন, যেগুলো পরিশোধ করার প্রয়োজন ছিল না। এসব সাহায্যকারী দেশের মধ্যে ছিলÑ ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, পশ্চিম জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক, হল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
পুনর্গঠনের সাথে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় কৃষি খাতকে- বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এছাড়াও ’৭২-৭৩ সালের বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল পুনর্বাসনের পরই শিক্ষা খাতে।
উৎপাদন ও অর্থনৈতিক খাতে স্থিতিশীলতা আনয়ন- যা ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু সকল দেশীয় ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণের আদেশ/আইন ঘোষণা করেন।
বাংলার দরিদ্র মানুষের জন্য দুঃখ বিমোচন, সবার জন্য যাতে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়, উন্নয়নের সাথে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে ওঠে, এই ছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টা ও অবদানের লক্ষ্য।
অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা, শান্তিতে সহ-অবস্থানের নীতিমালা ও মানুষের জন্য সংগ্রামের প্রমাণ দেখেই অন্যান্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়Ñ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই।

৩. বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে মিডিয়া ও জনমনে নানারকম স্থূল প্রচারণা সম্পর্কে আপনার মতামত ব্যক্ত করুন-
১৯৭৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর যেহেতু আমাকে সরকারি কর্মচারী হিসেবে প্রকৃতপক্ষে সকল সময়ই অফিসে কর্মরত থাকতে হতো, মিডিয়া ও কিছু অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীসমূহ বঙ্গবন্ধুর সরকারের সমালোচনা করত, সে-সম্বন্ধে আমি কোনো মতামত প্রকাশ করিনি। তবে শুনেছি ’৭৩ সালের নির্বাচনের পর অনেক উগ্রবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীÑ যার মধ্যে ছিল জাসদ, সর্বহারা পার্টি, চীনপন্থি কমিউনিস্ট কিছু তথাকথিত নেতা ও পাকিস্তান থেকে সহায়তাপ্রাপ্ত কিছু গোষ্ঠীকে ছিল। সেগুলো স্পষ্ট হয়েছিল যখন অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে মানুষের জীবন ধারণের ব্যবস্থায় ও পুনর্গঠনে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। এর পরিণতিতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল উত্থাপন করে দেশে ‘শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার’ ঘোষণা দেন ও বিস্তৃত ভাষণ দেন- যা ছিল বঙ্গবন্ধুর ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ ঘোষণা। এ বিষয়টি আমি পরে আলোচনা করব।

৪. বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও দর্শন সম্বন্ধে
এখানেই আমি বলতে চাই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার কিছুদিন পরই যে উদ্যোগ নেন এবং কমিটি গঠন করে বিশেষজ্ঞদের নির্দেশ ও দায়িত্ব দেনÑ সেটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেটি ছিল ডা. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি, দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ে সেই সংবিধান বঙ্গবন্ধু সংসদে পেশ করেন নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে- যেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার, মানুষের জীবন উন্নয়নের ও সমৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার একটি অপূর্ব দলিল। এর পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, যার ভিত্তি ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০ বছরেরও অধিককাল ধরে দেশের গ্রামে-শহরে ভ্রমণ করে, জনসভা করে, মানুষের আর্থিক দুরাবস্থা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিতি লাভ করে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ধারণা। বঙ্গবন্ধুর এই চিন্তা-ভাবনা ও অর্থনৈতিক দর্শন প্রকাশ পায় স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের (Constitution) মাধ্যমে। এটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
সংবিধানের শুরুতে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিলÑ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমাদের মনে রাখতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে- আওয়ামী লীগ কোনো সমাজতন্ত্রবাদী দল ছিল না। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে (Election Manifesto) উল্লেখ করা ছিল দেশের অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন ও পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন- দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া। এই ভিত্তিতেই তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীনের ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেট প্রণীত হয়েছিল- যেটিতে সংবিধানের মূলনীতিসমূহের প্রতিফলন ছিল।
বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের কিছু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিলÑ
১. স্বনির্ভরতা অর্জন, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ও
২. বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ/ব্যবহার করে, যা হতে হবে শর্তবিহীন এবং ক্রমে ক্রমে এই নির্ভরতার অংশ কমিয়ে আনতে হবে।
৩. বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন কর্মকা- ও শিল্পায়নে সম্পৃক্ত করা। ১৯৭২ সালে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের উচ্চসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ লাখ টাকায়, যা ১৯৭৪-এ ৩ কোটিতে বর্র্ধিত করা হয়।

সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর দেশের সার্বিক উন্নয়নের যে চিন্তা ও নির্দেশনা ছিল, সেগুলো বর্ণিত হয়েছে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের অনুচ্ছেদসমূহে। সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোকে উল্লেখ করা যায় নিম্নরূপ :
– স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন
– জাতীয় জীবনে মহিলাদের অংশগ্রহণ
– গণতন্ত্র ও মানবাধিকার
– মালিকানার নীতি : রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানা
– কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি
– জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মিটানোর ব্যবস্থা : অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণে মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা
– কর্মের অধিকার, যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার
– গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব
– অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা-ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ এবং নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ
– জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার
– সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বঙ্গবন্ধুর যে দিকটি আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, সেটি ছিল তার বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ইংরেজিতে যাকে বলে Pragmatic। এর একটি উদাহরণ আমি দিব যেটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমলে বৈদেশিক দাতাগণ প্রতি বছর ‘Pakistan Consortium’ নামক অনুষ্ঠানে (যা প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতো) সাহায্য (ঋণ ও অনুদান) নির্ধারিত করতেন। এর একটি অংশ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানেও ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশকে ঐ ঋণ পরিশোধের জন্য দাতাদের পাকিস্তান চাপ দিতে থাকে এবং দাতাগণ তা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি করেন। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে বিষয়টি নিয়ে দাতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের (বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক) সঙ্গে ঢাকায় একটি বৈঠক হয়, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। অনেক আলোচনার পর সরকারের সিদ্ধান্ত তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, যেহেতু বাংলাদেশ উত্তরাধিকারভিত্তিক কোনো রাষ্ট্র ছিল না (not a successor state), পাকিস্তানকে দেওয়া কোনো ঋণের জন্য বাংলাদেশের কোনো দায় আদৌ নেই।
বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ডা. পিটার কারগিল (Dr. Peter Cargill), তদানীন্তন এশিয়ান দেশগুলোর জন্য একজন উঁচু পর্যায়ের সহ-সভাপতি (Vice President)। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং আলোচনা সমাপ্তির পর আমরা তাকে ও তার দুজন সহকর্মীকে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর অফিসে নিয়ে যাই। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিলেন- ডা. নূরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব এনায়েত করিম ও আমি। ডা. কারগিল বঙ্গবন্ধুকে বললেন ও উল্লেখ করলেন, বাংলাদেশে যে সকল প্রকল্প বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতাদের অর্থে বাস্তবায়িত হয়েছে তার একটি তালিকা। এছাড়াও Commodity Aid-ও ছিল। আরও বললেন যে বিষয়টির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পেলে বিশ্বব্যাংকের ও অন্যান্য দাতাদের পক্ষে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো প্রকল্প সাহায্য ও অন্যান্য সাহায্য দেওয়া সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে ডা. কারগিলকে বলেছিলেন, তবে তাই হবে, বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। দুঃখ প্রকাশ করে ডা. কারগিল বিদায় নিলেন।
এরপর বঙ্গবন্ধু হঠাৎ আমাকে বললেন : “এই সৈয়দুজ্জামান (যে নামে আমাকে তিনি সব সময়েই ডাকতেন), এই যে কথাগুলো পিটার কারগিল বললো, তার কতটুকু সত্য? যে প্রকল্পগুলির কথা বললো সেগুলি থেকে আমরা কি কোনো উপকার পাচ্ছি? প্রকল্পগুলি যেগুলি ওদের টাকায় হয়েছিল বললো, সেগুলির কি অস্তিত্ব আছে?”
আমি বললাম, “স্যার, কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো সম্পূর্ণভাবে টিকে আছে, যেগুলো থেকে মানুষ এখনও উপকার পাচ্ছে; কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে কিংবা আংশিকভাবে। সেগুলোর পুনর্নির্মাণের জন্য যদি সাহায্য পাওয়া যায় আমাদের উপকার হবে। আর কতগুলো নতুন প্রকল্পও আমাদের প্রয়োজন- Insfrastucture, Transportation, Ports, Irigation ইত্যাদি ক্ষেত্রে।” বঙ্গবন্ধু বললেন, “শোন, এক কাজ কর। যে সকল প্রকল্প থেকে আমাদের জনগণ এখনও উপকার পাচ্ছে, সেগুলোর দায়িত্ব আমরা নেব ও যে সমস্ত তুমি বললে যে পুনর্নির্মাণ করতে হবে, ঐ সমস্ত প্রকল্পের ও যেগুলো নতুন করে করতে হবেÑ তার একটি তালিকা প্রস্তুত করে আমাকে দেখাও এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক কর- আমাদের কত টাকার দায় গ্রহণ করতে হবে এবং আরও কত টাকা আমাদের দরকার?”
বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তাদের হিসাবে পাকিস্তান দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাহায্য থেকে যে অংশ পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করেছিল, তার জন্য পাকিস্তান ১২০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করল। এ বিষয়টি বিবেচনা ও শনাক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু আমাকে চিফ নেগোসিয়েটর হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এই দায়িত্ব পালনে আমাকে অনেক জায়গায় আলোচনা করতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালের জুলাই মাস থেকে ঢাকা ছাড়াও ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস, রোম ও চেকোশ্লোভাকিয়াÑ এসব জায়গায় যেতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের উপদেশ নিয়ে এবং দীর্ঘ চাকরি-জীবনে নীতিমালার সাথে আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, আমি দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহকে (প্রধান সংযোগ ছিল বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমেই) এই দাবি ৪০০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনতে সক্ষম হই। (এটা ছিল আমার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়, যা নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়)।
আমরা এই দায়িত্ব নিতে রাজি হলাম- তখনকার দিনের বৈদেশিক সাহায্যের সবচেয়ে নম্র শর্তে- বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণের শর্তে। আমরা আরও তাদের সম্মত করালাম বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি নতুন সংস্থা বা মঞ্চ তৈরি করতেÑ যেটি হলো বাংলাদেশ এইড গ্রুপ। (অনেক নিম্ন আয়ের দেশের জন্যই এই ব্যবস্থা আছেÑ বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বের মাধ্যমে)।
বাংলাদেশ এইড গ্রুপের প্রথম মিটিং হলো ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে প্যারিসেÑ যেখানে আমরা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেলাম ৮০০ মিলিয়ন ডলারের; এবং একই অর্থবছরে দ্বিতীয় মিটিং হলো ১৯৭৫ সালের মে মাসে, যেখানে আমরা প্রতিশ্রুতি পেলাম আরও ১২০০ মিলিয়ন ডলারের। একইসঙ্গে ১৯৭৪-৭৫ সালে আইএমএফ-এর সাথে আলোচনায় টাকার অবমূল্যায়নে সায় দিয়ে আমরা এ সংস্থাটি হতেও সাহায্য পেতে শুরু করলাম।
এই সাহায্য প্রাপ্তি ও পরবর্তীতে এই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হলো, পাঁচসালা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে- তা ছিল বঙ্গবন্ধুর বাস্তবভিত্তিক (Pragmatic) সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ও ফলেই। প্রশাসনিক নীতিতে বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্ত ছিল একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক- যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।

৫. বঙ্গবন্ধুর জীবনাচরণ, তার পারিবারিক জীবন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহকর্মীদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণ
বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে আমার পক্ষে কিছু বলা কঠিন- কারণ আমি কখনও তার ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে যাইনি। এক বন্ধুর বাসায় তার পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল। কামাল বঙ্গবন্ধুরে দিনভর পরিশ্রম সম্বন্ধে অনেক কিছু বলেছিল এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর কথাও বলেছিলÑ যেটি সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু নিজেও না-কি বলতেন যেÑ দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার নিজস্ব পরিবারেরÑ বেগম মুজিব কন্যা ও পুত্রদের সঙ্গে তিনি আনন্দে যথেষ্ট সময় কাটাতে পারতেন না।
তবে একটি দিনের করা আমার মনে আছে। ১৯৭৫ সালের গোঁড়ার দিকে জনাব রুহুল কুদ্দুস আমাকে কিছু ফাইল নিয়ে তার সঙ্গে গণভবনে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কাছে। কাজের শেষে রুহুল কুদ্দুস সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেন, “বঙ্গবন্ধু, আপনি দিনের বেলা আপন দায়িত্ব নিয়ে, মিটিং করে, দর্শনার্থীদের সময় দিয়ে এখানে কাটান- যেখানে আপনার অফিস পর্যন্ত আসতে পরিচয়পত্র দিতে হয়, দু-তিনটি স্থানে অস্ত্রধারী গার্ড ও সৈনিকদের অনুমতি নিয়ে আসতে হয়, দোতলায় উঠতে আবার সার্চের সম্মুখীন হতে হয়; দুপুর বেলায় কিছু খেয়ে এখানেই শুয়ে থাকেনÑ নিরাপত্তা প্রহরীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে। কিন্তু রাত্রিবেলা তো ৩২ নম্বরে গিয়ে একটি ‘পাখির বাসায়’ রাত্রিযাপন করেন! এটি পরিবর্তনের একটি প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। বঙ্গবন্ধু তেমন কিছুই বললেন নাÑ শুধু হাসলেন এবং বললেন, “বাংলাদেশের মানুষ আমার কোনো ক্ষতি করবে না।”
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহকর্মীদের প্রতি তার যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সেটি সম্বন্ধে আমার সামগ্রিক ধারণা হয়- ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে তার ভাষণের মধ্য থেকে যে বৈঠকটিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়েছিল- ও পরবর্তীতে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন আমাকে ঐ অধিবেশনে দর্শকের গ্যালারিতে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার অফিসের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে।
ঐ অধিবেশনের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি কথা আমার মনে আছেÑ
– এই দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই এই সংশোধন।
– সংবিধান সংশোধন করে দেশবাসীর প্রতিনিধিরা আমাকে প্রেসিডেন্ট করে দিয়েছেন। তার অর্থ হচ্ছে আমি আর এই সংসদের সদস্য থাকব না, এটা আমার জন্য অতি দুঃখজনক।
– তবে সংবিধানকে আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি, যাতে একটি সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা দেশে কায়েম করা যায়। মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে, অত্যাচার অবিচার হতে বাঁচতে পারে। আমি বলতে চাই, এটা আমাদের ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য।
আমাদের আওয়ামী লীগ পার্টি অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সংগ্রাম করেছে; কিন্তু কোনোদিন আদর্শ বিচ্যুত হয় নাই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগকেই আমি পরিবর্তন করছি- এই আশা করে যে, যারা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন, তাদের প্রত্যেকের জন্যই এই দলের- বাকশালের দ্বার উন্মুক্ত। আসুন কাজ করুন, দেশকে রক্ষা করুন, মানুষকে বাঁচান আর দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর চোরাকারবারীদের উৎখাত করুন। এটা হবে শোষিতের গণতন্ত্রের পথ।
– আমরা কোনো ক্ষেত্রেই স্বয়ংসম্পূর্ণ না। খাদ্য, বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য, ওষুধ, কোনোটাতেই না।
-দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে কৃষি খাতে, কল-কারখানায় সবখানে। Population Planing আমাদের করতে হবে, Population Control করতে।
– আমি চাই দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক এবং সেজন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
– দেশে বন্যা হয়েছে, ভয়াবহ বন্যা। বন্ধু-রাষ্ট্রের সহায়তা নিয়েছি, অন্য সূত্র থেকেও সাহায্য পেয়েছি, লঙ্গরখানা খুলেছি, Relief Operation চালিয়েছি- কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না সকলকে, ২৭ হাজার লোক না খেয়ে মারা গেল।
– দেশের বর্তমান অবস্থার জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব পড়েছে। আমরা যা কিছু আমদানি করি-তার মূল্য আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির (Inflation) জন্য সকল ক্ষেত্রেই বেড়ে গেছে। তবুও দুনিয়ায় বন্ধু-রাষ্ট্ররা আমাদের সাহায্য করেছে সকল প্রকার এইড দিয়ে।
– বঙ্গবন্ধু সংসদে বলেন, দেশে হত্যা, অত্যাচার, বেড়ে গিয়েছে- সাংসদের চারজন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে- যাদের নাম তিনি বলেন। অনেক থানায় সরকারি কর্মচারীকে হত্যা করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র দিয়ে ঘরে ঢুকে শৃগাল-কুকুরের মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

মোট কথা, বঙ্গবন্ধু দায়ী করেছিলেন- দুর্নীতিপরায়ণ কিছু মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাকে (যাদের বরখাস্ত করা হয়), জাসদ, সর্বহারা পার্টিকে, চীনপন্থি কমিউনিস্ট দলকে ও পাকিস্তানপন্থি সহায়তাপ্রাপ্ত একটি গোষ্ঠীকে।
আমার কর্মজীবনে একটি নতুন ঘটনা ঘটে- যখন বঙ্গবন্ধু একদিন আমাকে ডেকে কিছু কাগজ সই করতে বললেন। পড়ে দেখি সেগুলো ছিল বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদে যোগদান-সংক্রান্ত। আমি বললাম, “স্যার আমি তো একজন সরকারি কর্মকর্তা। আমাকে কেন রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে আসতে চান? তিনি বললেন, তোমাকে চাই এজন্য যে এই যে নতুন সর্বদলীয় পার্টি গঠন করেছি তাদের সদস্যদের, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির মেম্বারদের বুঝাতে হবেÑ উন্নয়ন কি জিনিস, উন্নয়ন কি করে করতে হয়, বিনিয়োগের সম্পদ দেশ ও বিদেশ থেকে কীভাবে নিতে হয়, কীভাবে ও কত তাড়াতাড়ি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া যায়, কীভাবে প্রকল্প তৈরি করতে ও বাস্তবায়ন করতে হয়। তাহলে ওরা দেশসেবার পন্থা সম্বন্ধে জ্ঞাত হবে ও আমার প্রত্যাশামতো দেশসেবায় নামবেÑ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন করতে, শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। পরবর্তীতে বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে (১৯ জুন ১৯৭৫) বঙ্গবন্ধু এ-সম্বন্ধে কিছু বলতে আমাকে নির্দেশ দেন। একদিন আমি বঙ্গবন্ধুকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন আপনি এটি করলেন? তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে তিনটি বছর সময় দাও। আবার আমি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসবোÑ আল্লাহ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন। গত তিন বছর অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের দুর্যোগের কারণে মানুষের জন্য তেমন কিছুই করতে পারি নাই। এ আমার বড় দুঃখ।”
ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার সঙ্গে আমার যে নৈকট্য তৈরি হয়েছিল- সেটি ছিল মূলত তার সঙ্গে সরকারি কাজে। বৈদেশিক ভ্রমণের সময়েই বেশি। তিনি তার ছাত্র-জীবন ও রাজনৈতিক-জীবনের কথা কখনও বলতেন, ও আমাকে সরকারের কিছু কিছু মন্ত্রী ও সচিবদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। আমি খুবই সর্তকতার সাথে উত্তর দিতাম।
১৯৭৫-এর মে মাসে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কমনওয়েলথের মিটিংয়ে জ্যামাইকা যাই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আর ছিলেন ডা. কামাল হোসেন, নিউইয়র্কে নিযুক্ত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি জনাব এসএ করিম, লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার ফারুক চৌধুরী। ঐ সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ফসল উৎপাদন বাড়ছিল, মুদ্রাস্ফীতি বিশ্ব পর্যায়ে ও বাংলাদেশে ক্রমে সহনীয় পর্যায়ে এসেছিল। বঙ্গবন্ধু ঐ সভার প্রথম অধিবেশনেই অন্য সদস্যদের এ-কথাগুলো বলেছিলেন। এবং আরও বলেছিলেন, “ তোমরা আমাদের সহায়তা করেছিলে বলেই আমরা আজ এগিয়ে যাচ্ছি, এভাবে এগোচ্ছি।”
সবশেষে বলতে হয় যে, বাংলাদেশের জন্য ও আমাদের সকল বাঙালিদের জন্য এলো মারাত্মক দুর্যোগ এবং আমাদের অশেষ দুর্ভাগ্য ও সব কিছুর দুঃখজনক পরিণতি ঘটল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, যেদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সাবেক পরিকল্পনা সচিব, অর্থ সচিব, উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য