Friday, February 23, 2024

বঙ্গবন্ধুর নবজন্ম চাই

স ন্ জী দা খা তু ন:  জীবনে বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য লাভের তেমন সুযোগ পেয়েছি বলে মনে হয় না। তবে নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রবৈশিষ্ট্য আর বিশেষ আকর্ষণের কিছু বিষয় আমার কাছে সুপরিস্ফুট হয়ে উঠেছে, সে নিয়ে দু-চার কথা লিখব। আমাদের ১১৩ সেগুনবাগিচার পিতৃগৃহের পশ্চিম দিকের একটি বাড়িতে একসময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেশ কিছুদিন বাস করেছিলেন। সেই সময়ে তিনি টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন বলে শুনেছি।
আমার পিতা কাজী মোতাহার হোসেন ভুলো স্বভাবের মানুষ ছিলেন। একদিন সেগুনবাগিচা পাড়ার ভিতরে ঢুকে পড়েছেন এমন সময়ে আকাশ ভেঙে জোর বৃষ্টি নামল। সঙ্গে ছাতাও নেই। নিজের বাড়ি মনে করে পাশের বাড়িতেই ঢুকে পড়লেন হুড়মুড় করে। কিন্তু বৈঠকখানায় পা দিয়েই বুঝলেনÑ এ তার বাড়ি নয়। ততক্ষণে সে-বাড়ির গৃহকর্তা এগিয়ে এসে অতিথিকে সাদরে ঘরে বসালেন, পরে চা-নাশতা খাওয়ালেন, বৃষ্টি ধরে এলে ছাতা আর লোক সঙ্গে দিয়ে বাসায় পৌঁছে দিলেন তাকে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে আমার বাবা করাচিতে আটকা পড়েছিলেন। পাকিস্তান দাবা দলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে ইরানে পাঠানোর কথা হয়েছিল। করাচি পৌঁছবার পরে সেখানে আমার ছোট বোন মাহ্মুদা খাতুনের বাসায় তাকে ফেলে রেখেই দল চলে গেল ইরানে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনবার জন্যে রেডক্রসের মাধ্যমে চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। সে-ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি আমাদের সহযোগিতা করেছেন, সহমর্মিতা জানিয়েছেন।
রেডক্রস প্রথম দলেই কাজী মোতাহার হোসেনকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার মন্ত্রিপরিষদের মাননীয় এক মন্ত্রীকে দিয়ে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে কাজী মোতাহার হোসেনকে সম্মাননা জানান। আর খুব অল্পসময়ের ভিতরেই কাজী সাহেবকে জাতীয় অধ্যাপক পদে বৃত করেন।
শিক্ষক-শ্রেণির প্রতি বঙ্গবন্ধু যে কী রকম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তার এক ছবি আমার চোখে মুদ্রিত হয়ে আছে। তার মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে সে-ছবি গাঁথা হয়ে পড়েছে। ঘটনাটি পূর্বাপর খুলে লিখছি।
সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে আমাকে তখন ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে সুদূর রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল। পানিশমেন্ট ট্রান্সফার। ঢাকাতে ছায়ানটের ধর্মসম্প্রদায়নির্বিশেষ অনুষ্ঠান-আয়োজনগুলোকে বিষনজরে দেখছিল পাকিস্তান সরকার। আমাকে সেই জন্যে ঢাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। আর আমি মাসে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান-সূত্রে ঢাকায় এসে ছায়ানটের মহড়া-চলা গানগুলোর মাজাঘষা সেরে সার্থক মঞ্চপরিবেশনা করে রংপুরে ফিরে যেতাম।

বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, প্রচার আর প্রসারের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাগরণের সূচনা নিশ্চিতভাবে জাতির জনকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তিনি নিজে মনোনিবেশ করেছিলেন জাতির আর্থিক স্বার্থ এবং সার্বিক অধিকার সংরক্ষণের দিকে। তার ৬-দফার বিষয় সকলেরই জানা। বিশেষ সাংস্কৃতিক সচেতনতার দরুন একবার সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তার মন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী ওয়াহিদুল হক আর আমাকে এক বিকেলে চা খেতে ডেকেছিলেন।

তখন বিভাগীয় (ডিভিশনাল) ইন্টেলিজেন্স অফিসারকে ঢাকায় তলব করে আমার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ হলো। ডিআইও ভদ্রলোক রংপুরে ফিরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বললেনÑ ‘কে আপনি, তাই দেখতে এসেছি। আপনার ফাইল পড়বার জন্যে আমাকে ঢাকাতে ওভারনাইট হল্ট করতে হয়েছে।’ প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। প্রতিবেশী প্রফেসর জাহাঙ্গীর সাহেবের কাছে থেকেও শুনলেন অনেক কথা। জানলেন, প্রফেসরের সন্তানদের আমিই কলেমা মুখস্থ করাই আর ইসলামিয়াত পড়িয়ে দিই। কলেজে আরবি-ফারসিবহুল শব্দে-ভরা কবিতা বা গদ্য রচনা পড়াবার জন্যে সংশ্লিষ্ট ভাষার শিক্ষকদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করি, সবই শুনলেন।
ক’দিন পরে ওর সাইকেল-পিওন এসে খবর দিল, স্যার বলে পাঠিয়েছেন আমি যেন লোক দেখিয়ে নামাজ পড়ি। জানা গেল, অফিসার সাহেব ঢাকায় আমার বিষয়ে লিখেছিলেন- ‘She is a highly religious lady’. এই ‘religious’-এর অর্থ ‘ধর্মপ্রাণ’ নয় ‘নিষ্ঠাবতী’। জবাবে তিনি ধমক খেয়েছেন- ‘কীসের religious? নামাজ পড়ে?’
ফলত, আদেশ জারি হলো- আমাকে তিন মাস আন্ডার সার্ভেইলেন্স্ (Under surveillance) থাকতে হবে। রংপুর থেকে ঢাকা আসবার আগে বিশেষ এক টেলিফোন নম্বরে খবর দিতে হবে- কবে থেকে কবে ঢাকায় থাকব, কোন্ ঠিকানায় থাকব। আর ফিরে এসে জানাতে হবে রংপুরে ফিরে এসেছি। একবার রংপুরে ফিরে ফোন করলে আমাকে ধমক দেওয়া হলো যে-ঠিকানা জানিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, সেখানে না-কি আমাকে পাওয়া যায়নি!
ঢাকায় তখন সবকিছু চলছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। তাই আব্বুকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে সমাধান চাইব ভাবলাম। যাওয়া হয়নি। তখন একবার গিয়েছিলাম তার কাছে। আরও একবার, দেশ শত্রুমুক্ত হবার পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কিছু সমস্যা নিয়ে তার কাছে সুরাহা চাইতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে বেরিয়ে ৮টারও আগে পৌঁছেছিলাম তার বাসায়।
কাজী মোতাহার হোসেন দেখা করতে গিয়েছেন শুনে তিনি হাঁকডাক করতে লাগলেন- শিগগির ওনাকে নিয়ে আয়। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম, সিঁড়ির মাথায় তিনি নিজেই ছুটে এসে সিঁড়ির কয়েক ধাপ নেমে আব্বাকে তুলে নিয়ে গেলেন। সেই যে চশমা খুলে হাতে নিয়ে দ্রুত নেমে-আসা- সে ছবি আমার চোখে আঁকা হয়ে গেছে। সেই দৃশ্যই দেখি, খুনিরা তাকে হত্যা করতে গেলে সেই ভাবেই যেন তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন। সেই নামা আর শেষ হলো না, গড়িয়ে পড়লেন সিঁড়ির ওপরে!
আব্বাকে বৈঠকখানায় বসিয়ে গোয়াল থেকে টাটকা দুধ দুইয়ে জ্বাল দিইয়ে খাইয়েছিলেন তিনি সেদিন। সেই আন্তরিক যত্নের কোনো তুলনা হয় না। শিক্ষক-জাতি তার কাছে এমনই সম্মানের পাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই রূপটি আমার কাছে দারুণ উজ্জ্বল।

দুই
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ্বে আমি শান্তিনিকেতন থেকে এমএ পাস করে ফিরেছি। খবর এলো কার্জন হলে কী-একটা সমাবেশে আমাকে গান গাইতে হবে। সে-সময়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইবার জন্য কোনো অনুরোধ আসে না একেবারে। মহাপুলকিত হয়ে প্রস্তুত হলাম। আয়োজনটি ছিল দিনের বেলা। হঠাৎ এক যুবক এসে বলল, শেখ মুজিবুর রহমান আপনাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে বলেছেন। ঘাবড়ে গেলাম- অত বড়ো গানখানা তো আমার মুখস্থ নেই। পাঁচ স্তবকের বিশাল গান যে! ‘গীতবিতান’-এর খোঁজ পড়ল। বই দেখে পুরো গানখানি গাইলাম সে-দিন।
কীসের সমাবেশ ছিল, কেন ‘সোনার বাংলা’ গাইবার অনুরোধ এলোÑ বুঝলাম না কিছুই। শুনেছিলাম- পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিরা সেদিন সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। আর শেখ সাহেব সবার সামনে ‘সোনার বাংলা’ বিষয়ে আমাদের প্রগাঢ় আবেগ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সৌভাগ্য আমার, সেদিন সে গানখানি আমিই গেয়ে শুনিয়েছিলাম।
এই গানখানির প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ তিনি পরেও বারবার প্রকাশ করেছেন। যেমনÑ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শিল্পী জাহিদুর রহিমকে তিনি এই গানটি গাইবার জন্যে সঙ্গে রাখতেন। জাহিদ তার বলিষ্ঠ কণ্ঠে বহুবার এই গানখানি জনতাকে শুনিয়েছে।

তিন
আমরা জানি, পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথকে এদেশে বিদেশি হিন্দু কবি হিসেবে বর্জন করবার প্রচার-প্রচারণা ছিল। ১৯৬৫ সালের ২২ শ্রাবণ উপলক্ষে শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রস্মরণে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমরা প্রশাসনের বিমুখতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। কুষ্টিয়াতে সুফিয়া কামাল আর কাজী মোতাহার হোসেনকে প্রশাসন থেকে আপত্তি-অসন্তোষের কথা জানানো হয়েছিল।
রাষ্ট্রযন্ত্রের অমন মনোভাব জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর জনসভাতে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিপুল আকর্ষণের কথা বঙ্গবন্ধু খোলাখুলি বলতেন। এভাবে বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরবার এই চর্চা থেকেই দেশবাসী রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে চিনেছিল। এরই জন্যে দেশকে শত্রুমুক্ত করবার সংগ্রামে সাধারণ রাখাল বালক থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই মনপ্রাণ দিয়ে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইতে পেরেছিল।
১০ জানুয়ারি জল্লাদদের বন্দিশালা থেকে বেঁচে ফিরে ক্যাবিনেট ডিভিশনের এক মিটিংয়ে বসে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘স্বরবিতানে’ এ গানের যে স্বরলিপিই থাকুক, যে সুর গেয়ে দেশবাসী দেশকে স্বাধীন করেছিল, সেই সুরই আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর। সে-অর্থে ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষ এই গানটিকে অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করে তুলেছে দিনে দিনে।

চার
‘ছায়ানট’ ১৯৬১ সাল থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার সংরক্ষণের যে-সংগ্রাম করে এসেছে, সেদিকে বঙ্গবন্ধুর তীক্ষè দৃষ্টি ছিল। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, প্রচার আর প্রসারের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাগরণের সূচনা নিশ্চিতভাবে জাতির জনকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তিনি নিজে মনোনিবেশ করেছিলেন জাতির আর্থিক স্বার্থ এবং সার্বিক অধিকার সংরক্ষণের দিকে। তার ৬-দফার বিষয় সকলেরই জানা। বিশেষ সাংস্কৃতিক সচেতনতার দরুন একবার সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তার মন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী ওয়াহিদুল হক আর আমাকে এক বিকেলে চা খেতে ডেকেছিলেন। সেই মনোরম বিকেলে তিনি জানিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সুফিয়া কামাল আর সন্জীদা খাতুন কি ছায়ানট চালাইব- আমার হাতে দিয়া দেখুক কী করি! তিনি ছায়ানটের উদ্দেশ্যটা যথাযথ বুঝে নিয়েই কোনো পরিকল্পনার ছক কাটছিলেন সে-কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আমরা ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলনে ব্যাপৃত ছিলাম, আর তিনি হয়তো সমগ্র দেশের সাংস্কৃতিক জাগরণ আর উত্থানের কথা ভাবছিলেন! আর কোনো রাজনীতিবিদকে এমন সাংস্কৃতিক জাগরণের চিন্তা করতে দেখিনি!
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে যখন থেকে থেকে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরুদ্ধতা নখদন্ত বিস্তার করে, তখন মনে হয় বঙ্গবন্ধু যদি আর কিছুটা সময় পেতেন! সমগ্র দেশকে সংস্কৃতি শিক্ষার সাধনায় নিয়োজিত করে যেতে পারতেন, তাহলে হয়তো ভিতরবাসী সংস্কৃতির শত্রুদের প্রতিরোধ করবার যথার্থ পথটি পাওয়া যেত। সাংস্কৃতিক স্বাধিকার বোধে মাথা উঁচু করে আমরা বাঙালি জাতীয়তার ধ্বজা উপরে তুলে ধরতে পারতাম। জাতীয় স্বাধীনতার বিরোধীরা দেশের ভিতরে এমন করে মূল গেড়ে বসতে পারত না। কেন্দ্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে শত্রুপক্ষকে পরাজিত করবার মতো বল সংগ্রহ করা যেত। সংস্কৃতিই জাতীয় উজ্জীবনের সহায়ক শক্তি, এ-কথা আর কবে বুঝব আমরা?
আমরা কী তবে বঙ্গবন্ধুর নবজন্মের জন্যেই অপেক্ষা করে থাকব?

লেখক : ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শিক্ষাবিদ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য