Saturday, July 13, 2024

বঙ্গবন্ধুর অম্লান স্মৃতি

র ফি কু ল ই স লা ম: ১৯৪৩ সাল থেকে আমি ঢাকার রমনা এলাকার অধিবাসী। আমার বাবা ছিলেন রেলওয়ে ডাক্তার। ফজলুল হক হলের বিপরীতে অবস্থিত রেল কলোনিতে ছিল আমাদের বসবাস। ফলে ফজলুল হক হল প্রাঙ্গণে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত। বলা চলে ফজলুল হক হল, ঢাকা হল, কার্জন হল, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ, কলাভবন, সব জায়গাতেই ছিল আমাদের খেলার ও বেড়াবার জায়গা। ১৯৪৩ সালের মে’তে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়, তার বাস্তব রূপ আমরা দেখেছি জনমানবশূন্য রমনায় বহিরাগত দুর্ভিক্ষপীড়িত ভিখারিদের ভিড়ে। ১৯৪৪ সাল থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উত্তাপ আমরা রমনায় বসবাস করে টের পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি অবকাঠামোয় সামরিক বাহিনী দখল করে নেয়। প্রায় পুরো কলাভবন হয়ে গেল সামরিক হাসপাতাল, মুসলিম হল ভবনও তাই। জগন্নাথ হলের অধিকাংশ চলে গেল সামরিক বাহিনীর দখলে। নির্মিত হলো নীলক্ষেত ব্যারাক, পলাশী ব্যারাক, সামরিক হাসপাতাল ব্যারাক। ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, ঢাকা হল ও ফজলুল হক হল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশ বিভাগ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও ঢাকার রমনা এলাকায় পূর্ব বাংলা সরকারের রাজধানী স্থাপিত হওয়ায় অবস্থার পরিবর্তন দেখা গেল। কলকাতা থেকে পাকিস্তানে চাকরির ‘অব্সন্’ দেওয়ায় বহু সরকারি কর্মচারী সপরিবারে ঢাকায় চলে এলেন। এছাড়াও কলকাতা থেকে ছাত্রছাত্রী ঢাকায় চলে এসেছিল, যার মধ্যে একটা বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, যাদের একজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পরীক্ষায় পাস করে ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন্ হলের সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন তা আমি জানি না; কিন্তু তাকে প্রায়শ ফজলুল হক হলের এলাকায় দেখা যেত। ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলটি ছিল পুকুর পাড়ে। সেটা ছিল ছাত্র-রাজনীতির কেন্দ্রস্থল। আমি ফজলুল হক হলের উল্টো দিকে রেল কলোনিতে থাকতাম, তবে ফজলুল হক হলের মাঠে খেলতাম, ঘাটে বসে আড্ডা দিতাম। সেই সুবাদে অনেক ছাত্রনেতাকে ফজলুল হক হলে ও মিলনায়তনে নিয়মিত যাওয়া-আসা করতে দেখেছি, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন শেখ সাহেব। তার সঙ্গে সে-কালের ছাত্রনেতাদেরও প্রায়ই দেখা যেত। যেমনÑ তাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, জিল্লুর রহমান প্রমুখ।
১৯৪৮ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল মূলত ফজলুল হক হল থেকেই। বাংলা ভাষার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কলাভবনের আমতলায় সভার পর শোভাযাত্রা করে ছাত্ররা ঢাকা ও ফজলুল হক হলের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাসভবন বর্ধমান হাউস বা প্রেসক্লাবের পাশে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনে কিংবা সচিবালয়ে দাবি-দাওয়া পেশ করতে যেত। ঐ সময় অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় শেখ সাহেবকে ফজলুল হক হল মিলনায়তনে, কলাভবনের প্রাঙ্গণে বক্তৃতা দিতে দেখেছি। আরও দেখেছি সচিবালয়ের সামনের গেটে অন্যান্য ছাত্রনেতাকে নিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করতে। পুলিশের লাঠিপেটা হজম করেও তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতেন না। ১১ মার্চ ১৯৪৮, বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর সচিবালয়ের প্রবেশ পথে পুলিশের প্রচ- লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপে বহু ছাত্র আহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন শওকত আলী। শেখ সাহেব তাকে রিকশায় করে রক্তাক্ত অবস্থায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে আবার সচিবালয়ে ফিরে যান এবং সেখান থেকে সচিবালয় অবরোধকারী অন্যান্য ছাত্রনেতার সঙ্গে গ্রেফতার হন। এসব দৃশ্য আমি ১৯৪৮ সালে সচিবালয়ের উল্টোদিকে রেল কলোনির ভেতর থেকে দেখেছি। পরে শুনেছি, পূর্ব বাংলায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সঙ্গে একটা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে লেখা ছিল “পূর্ব বাংলা আইন পরিষদে এই মর্মে প্রস্তাব পাস করা হবে যে, পাকিস্তান গণপরিষদের সংবিধান রচয়িতারা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করলেন।”
এই চুক্তি তিনি করেছিলেন পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ভাষণদানের সময়, যাতে ছাত্ররা কোনো আন্দোলন না করে সে-জন্য। ঐ চুক্তির ফলে বন্দি ছাত্রনেতারা মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তি পেলেও শেখ সাহেব নিবৃত্ত হননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে যে পুকুরটি ছিল সেই পুকুর পাড়ে অলি আহাদকে নিয়ে এক ছাত্রসভা করার পর শোভাযাত্রা সহযোগে জগন্নাথ হল মিলনায়তনে অবস্থিত পূর্ব বাংলা আইন সভার অধিবেশন ঘেরাও করেন। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং পরিষদের সদস্যদের মধ্যে প্রায় বন্দি করে রাখা হয়। ঐ অবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে উদ্ধার করার জন্য পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তদানীন্তন জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান মেজর পীরজাদার নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রাদেশিক পরিষদে প্রেরণ করেন। তারা প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে জগন্নাথ হলের বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বাইরে নিয়ে আসেন এবং বর্ধমান হাউসে পৌঁছে দেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত মাস পর পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রমনা ঘোড়দৌড় ময়দানে জনসভায় এবং কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে যান যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। যারা এর বিরোধিতা করে তারা পাকিস্তানের দুশমন এবং ভারতের চর। রমনা রেসকোর্সের সভায় এবং কার্জন হল সমাবর্তন উৎসবে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শেখ সাহেবও ছিলেন। উভয় স্থানে তার নেতৃত্বে ছাত্ররা ‘নো, নো’ ধ্বনি তুলে জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আমি রমনা রেসকোর্সের জনসভায় এবং কার্জন হলের দোতলা বেলকনি থেকে এসব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলাম মনে পড়ে। বস্তুতপক্ষে, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের পরপরই পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হয়েছিল। এই সংগঠনটি গঠনের পিছনে প্রধান ভূমিকা ছিল শেখ সাহেবের।
১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সহায়তা করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রনেতাকে বিভিন্ন অংকের টাকার জরিমানা করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যান্য ছাত্রনেতা জরিমানা ও মুচলেকা দিয়ে রেহাই পেলেও শেখ সাহেব জরিমানা দিতে অস্বীকার করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের রুটি-রুজির দাবিতে অনুষ্ঠিত সভায় জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা প্রদান করেন। কলাভবনের সামনে নিম্ন কর্মচারীদের সভায় শেখ সাহেবকে আমি বক্তৃতা দিতে দেখেছিলাম। তার পরপরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত এবং গ্রেফতার হয়ে যান। ১৯৫১ সালে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র তখনও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চলছিল। এ-সময় অর্থাৎ ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম লীগ সভাপতি খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ঘোষণা দেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন আবার রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে ৪ ও ১০ ফেব্রুয়ারি কলাভবনের আমতলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসভা এবং শহরব্যাপী ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বস্তুত, ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভাতেই স্থির করা হয়েছিল যে, ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলা আইনসভায় বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন বাংলা ভাষার দাবিতে দেশব্যাপী ধর্মঘট এবং পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন ঘেরাও করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরদার করা হবে। ঐ সময় খবর পাওয়া গেল যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ অনশন ধর্মঘট শুরু করেছেন। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এর ফলে ভাষা আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে শেখ সাহেবের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কিন্তু পুলিশের নজরদারি তিনি এড়াতে পারেননি। ফলে তাকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ হয়ে ফরিদপুর নিয়ে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে ছাত্র-জনতা তাকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ফলে উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শেখ সাহেবকে স্টিমারে করে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এভাবেই শেখ মুজিবুর রহমান রাজবন্দি থাকা অবস্থাতেও ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চরম পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলেন।
১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি দেশের সর্বত্র আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ দিবস প্রতিপালিত হয়। প্রভাতফেরি, শহিদানের কবর ও প্রতীকী শহিদ মিনারে পুষ্প অর্পণ, কালো পতাকা উত্তোলন, সভা, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, একুশে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ, একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ঘোষণায়, বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমি স্থাপন প্রভৃতি দাবির মাধ্যমে নুরুল আমিনের মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে দেশবাসী। ফলে ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ পূর্ব বাংলা আইনসভার অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল অগ্রিম স্থির হয়ে যায়। এ নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল প্রভৃতি নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন ছাত্রলীগ নেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ঐ মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকার দু-মাসও টিকতে পারেনি। পূর্ব বাংলায় ৯২(ক) ধারা জারি এবং কেন্দ্রীয় শাসন চালু করা হয়। মেজর জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। যুক্তফ্রন্টও ভেঙে যায়। প্রথমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। পূর্ব বাংলায় প্রথমে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্ব কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং পরে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হয়। এ-সময় শেরে বাংলাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের নির্বাচনের পর কেন্দ্রের সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার এবং প্রদেশে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে দুটি ইউনিটে পরিণত করা হয়। ঐ দুই ইউনিট থেকে সমানসংখ্যক প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তবে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘পূর্ব বাংলা’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ করায় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা লোপ করার প্রতিবাদস্বরূপ গণপরিষদের সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের নবপ্রণীত শাসনতন্ত্রে স্বাক্ষরদান করেননি। তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বে অব বেঙ্গল’ ছাড়া আর কোথাও বাংলা নামের অস্তিত্ব রইল না।
১৯৫৭ সালে ঢাকায় পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সভাকক্ষে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সভায় যোগদানকারী পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের জন্য প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশে পূর্ব বাংলা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কার্জন হলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে বলেছিলেন। শেখ সাহেব আমাদের অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করেছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মঞ্চে এসে আমাদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “তোমাদের অনুষ্ঠান দেখে আমি এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত মন্ত্রী ও এমপিরা সবাই মুগ্ধ। তোমরা কি চাও?” আমরা বললাম, “আমরা পশ্চিম পাকিস্তান যেতে চাই এবং সেখানে বড় বড় শহরে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে চাই।” সোহরাওয়ার্দী সাহেব বললেন, “বেশ তাই হবে, মুজিব এদের সফরের ব্যবস্থা কর।” শেখ সাহেব সম্মতি জানিয়ে পরদিন সকালে আমাদের তার বাসায় যেতে বললেন। আমরা পরদিন সকালে যথাসময় শেখ সাহেবের ১নং সেক্রেটারিয়েট রোডের মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। তিনি সকালের নাশতা করছিলেন এবং আমাদেরও যোগ দিতে বললেন। নাশতা খাওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীকে দলের অন্তর্ভুক্ত করতে বললেন। যেমনÑ সমরদাশ, সোহরাব হোসেন, আবদুল লতিফ, আবদুল আলিম। নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল ও তার দল। তিনি এই সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের নেতা নির্বাচন করে দিলেন তাজউদ্দীন আহমদকে। আমরা প্রায় ৫০-৬০ জনের এক বিশাল দল নিয়ে যথাসময়ে পিআইএ বিমানযোগে করাচি পৌঁছে গেলাম। আমাদের থাকা-খাওয়া ও রিহার্সেলের ব্যবস্থা হয়েছিল তাজ হোটেলে আর আমাদের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়েছিল করাচির কাটরাক হলে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী তার বাসভবনে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন শেখ সাহেব করাচি গিয়ে হাজির। তিনি তাজ হোটেলে গিয়ে তাজউদ্দীন সাহেবকে নিয়ে আমার রুমে এসে বসলেন এবং সবাইকে ডাকতে বললেন। সব শিল্পী এসে ফ্লোরে কার্পেটের ওপর বসে পড়ল। শেখ সাহেব কুশলবিনিময় এবং শো কেমন হচ্ছে জেনে তার আসল কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন, “শোন ভাইবোনরা, তোমাদের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে শুধু নাচ-গান করার জন্য নয়। এখানে তোমরা যেখানেই যাওÑ পিন্ডি, মারি, পেশাওয়ার, লাহোরÑ সব জায়গাতেই চোখ-কান খোলা রাখবা, দেখবা আমাদের পাট, নিউজপ্রিন্ট, চামড়া, চাÑ এসব রপ্তানি করে সেই টাকায় কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন করছে। আমাদের পাট রপ্তানির টাকায় পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডির কাছে ‘পাটওয়ার প্লেটো’তে পাকিস্তানের নতুন আলিশান রাজধানী ‘ইসলামাবাদ’ বানাচ্ছে আর আমাদের পূর্ব বাংলাতে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখে দিয়েছে।” এভাবে শেখ সাহেব অনেকক্ষণ ধরে আমাদের ‘ব্রিফ’ করলেন এবং সত্যি সত্যি আমাদের চোখ-কান খুলে গেল। আমরা এক মাস ধরে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠান করেছি এবং পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য উপলব্ধি করছি। বলাবাহুল্য যে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে যখন যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তিনি সর্বদাই পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানের দুঃশাসন, শোষণ ও চরম অবহেলা সম্পর্কে সচেতন থাকতেন এবং প্রতিবাদ জানাতেন।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের পটভূমিকায় দেশরক্ষার বিষয়ে পূর্ব বাংলার অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি উত্থাপন করেন। শুরু হয় বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফা আন্দোলন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এই আন্দোলন দমন করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব থেকে শুরু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত বিশেষ আদালতে মামলা পরিচালনা করতে থাকেন। প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভে পূর্ব বাংলা ফেটে পড়ে। শুরু হয় ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন বা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্থাপনের সংগ্রাম। আগরতলা মামলা বুমেরাং হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ সাহেব মুক্তিলাভ করেন। তার পরপরই রমনায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে ডাকুস ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই সময় ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সমর্থনে যে ৪০ জন শিল্পী-সাহিত্যিক পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন, তারা বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করেন। পাকিস্তানের দালাল শিল্পীদের এই সংবর্ধনার আয়োজনের সংবাদে আমি অত্যন্ত ক্রদ্ধ হই এবং আমাদের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করি। বঙ্গবন্ধু আমাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং আমার সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্য জানতে চান। আমি রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার পক্ষে-বিপক্ষে যারা বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাদের তালিকা পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করে একটি ফাইল তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি বেতার ও টেলিভিশনের কতিপয় শিল্পী যে সংবর্ধনার আয়োজন করেছেন, তাতে যোগ দিচ্ছেন কি না? তিনি সম্মতি সূচক উত্তর দিলেন। আমি তাকে বললাম, “বঙ্গবন্ধুর এ সংবর্ধনার আয়োজকরা সব রবীন্দ্রসংগীত-বিরোধী দালাল শিল্পী। এই দেখুন তাদের বিভিন্ন বিবৃতির পেপার কাটিং।” আমি ফাইলটা তার হাতে দিলাম, তিনি ঐ ৪০ জন দালাল শিল্পীর নাম দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং আমাকে বললেন যে, তিনি সংবর্ধনায় যাবেন এবং আমাকে মজা দেখনোর জন্য যেতে বললেন। তিনি ফাইলটি তার কাছে রেখে দিলেন।
নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখলাম, মঞ্চে উপবিষ্ট বঙ্গবন্ধু এবং তার হাতে আমার সেই ফাইটি। মঞ্চ থেকে মাইক্রোফোনে যখন দালাল শিল্পীরা একে একে বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালি সংস্কৃতির জয়গান করছিলেন তখন তিনি ফাইলটি খুলে নামগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিলেন। সংবর্ধনা শেষে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেওয়ার পালা এলো তখন তিনি ফাইলটি হাতে নিয়ে ডায়াসে গিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন এবং বললেন যে আমি কারাগারে যখন বন্দি ছিলাম তখন পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার পক্ষে যারা বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাদের নামের তালিকা আমার কাছে রয়েছে। আজকে আবার আমি তাদেরই দেখতে পাচ্ছি রবীন্দ্রনাথের জয়গান করতে। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের মতও যদি বদলে গিয়ে থাকে তাহলে ভালো কথা, তবে আমার অনুরোধ, আপনারা আমাকে রবীন্দ্রনাথের একটা গান শোনাবেন। অনেক দিন আমি এ গানটি শুনতে পাইনি। গানটি হলো, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’ ঐ দালাল শিল্পীদের অধিকাংশই ছিলেন আধুনিক গানের। ফলে ‘আমার সোনা বাংলা’ গানটি নির্ভুলভাবে গাওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তখন তারা বিভিন্ন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। দু-তিনজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীকে পাওয়া গেল, যাদের একজন ছিলেন জাহেদুর রহিম, আর অপর দুজন সম্ভবত সুধীন দাশ ও অজিত রায়। ঐ তিনজন শিল্পী ‘আমার সোনা বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি সমবেত কণ্ঠে গাইলেন আর সঙ্গে সঙ্গে দালাল শিল্পীরা লিপসিং করতে লাগলেন। সে এক বিচিত্র দৃশ্য। আমরা বঙ্গবন্ধুর রসবোধ দেখে মুগ্ধ হলাম। এভাবেই তিনি সেদিন দালাল শিল্পীদের নসিহত করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে বিজয়ীর বেশে স্বদেশ প্রত্যবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রূপে সরকার গঠন ও সংবিধান রচনায় মনোনিবেশ করেন। এ সময় কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। প্রথম যোগাযোগ; এমএ প্রিলিমিনারি পরীক্ষার্থীদের বিনা পরীক্ষায় এমএ ফাইনাল ইয়ারের প্রমোশনের দাবিতে একাডেমিক কাউন্সিল অবরোধ করে রাখার ঘটনায়। অবরোধের দ্বিতীয় দিনেও ঘেরাও শিক্ষকদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলার আমি ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং ইংরেজির সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও আহসানুল হক পুরনো গণভবনে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে এ ঘটনার কথা জানাই। এ সংবাদে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং কোনো প্রকার পুুলিশ প্রহরা ছাড়া আমাদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রেজিস্ট্রার্স অফিসে অবরুদ্ধ শিক্ষকদের মুক্ত করার জন্য আসেন। বঙ্গবন্ধুকে দেখেই অবরোধকারী ছাত্ররা পালিয়ে যায় এবং বঙ্গবন্ধু একাডেমিক কাউন্সিলের ঘেরাও করা শিক্ষকদের মুক্ত করেন। তিনি ছাত্রদের এই আচরণের জন্য শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় আগমন ডাকসু আয়োজিত বঙ্গবন্ধুকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত সভায়। সভাটি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে। পরে টিএসসি’তে তিনি আমাদের সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হয়েছিলেন। তখন ডাকসু’র সভাপতি ছিলেন উপাচার্য প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী, ট্রেজারার আমি, সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমরা বাংলা বিভাগ থেকে একাধিকবার গিয়েছিলাম। প্রথম অসুস্থ নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা এবং ঢাকায় কবিকে স্থায়ীভাবে রাখার জন্য। বঙ্গবন্ধু নজরুলকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা এবং ধানমন্ডিতে নজরুল ভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখার ব্যবস্থা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা ১৯৭২ সালে প্রথম নজরুলজয়ন্তী উদযাপন করি কবিকে নিয়ে বাংলা একাডেমিতে। নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান সূচক ‘ডি-লিট’ উপাধি দেওয়া হয়। তাকে তার বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে ধানমন্ডি ২৮ নম্বর সড়কের বাড়িতে নজরুলকে দেখতে যেতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগে একদিন বঙ্গবন্ধু নজরুলকে দেখতে যান এবং কবিকে বেশ অসুস্থ দেখতে পান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নজরুলকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তিনি হাসপাতালের সুপার ড. আশিকুর রহমানকে নজরুলের চিকিৎসার ও পরিচর্যার দায়িত্ব দেন। প্রফেসর ড. নুরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে দেন। এর কয়েকদিন পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, সপরিবারে ঘাতকরা পৃথিবী থেকে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে নজরুলও আর বেশিদিন বেঁচে থাকেননি। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে তিনিও পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাকে কবর দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর কাছে বাংলা বিভাগ থেকে আমরা ১৯৭৪ সালে গিয়েছিলাম শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মতিসৌধ নির্মাণের অনুরোধ নিয়ে। তিনি আমাদের বললেন, “আমি তো একাত্তরের শহিদদের জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ স্থাপন করতে যাচ্ছি। বুদ্ধিজীবীদের জন্য আলাদা কেন?” আমরা বঙ্গবন্ধুকে বললাম, সাভারে শহিদ স্মৃতিসৌধ নির্মিত হবে একাত্তর যুদ্ধে নিহত অগণিত শহিদদের জন্য, কিন্তু যেসব বুদ্ধিজীবী শহিদ হয়েছেন, তাদের স্মৃতি অমøান করে রাখার জন্য আলাদা স্মৃতিসৌধ প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, রাজাকার-আলবদরদের হাতে নিহত কোনো কোনো শহিদ বুদ্ধিজীবীর লাশ পাওয়া যায়নি। আমরা একে একে তাদের বলতে লাগলাম, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন, সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারÑ এদের লাশ পাওয়া যায়নি জেনে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত ব্যথিত হলেন এবং বললেন, অবিলম্বে শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হবে। তিনি স্থান জানতে চাইলেন। তখনও ঢাকায় বেড়িবাঁধ তৈরি হয়নি। রায়েরবাজার বধ্যভূমি জলাভূমি। সেখানে তখনও শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ বানানো সম্ভব নয়। আমরা বিকল্প প্রস্তাব রাখলাম মিরপুর গোরস্তান সংলগ্ন বধ্যভূমির কথা, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সম্মত হলেন এবং বললেন, ১৯৭৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তিনি ঐ স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করবেন। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বর ঐ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়াতে ২২ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু স্বয়ং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করলেন। এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা বিভাগের প্রধান ড. নীলিমা ইব্রাহিম। স্বাগত ভাষণ দেন উপাচার্য প্রফেসর আবদুল মতিন চৌধুরী, প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু। তিনি অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল শহিদ বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে শহিদ মিনারটির উদ্বোধন করলেন। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ড. সন্জিদা খাতুনের নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন- ‘মরণ সাগর পারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি’…
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়ে গেছে, সুতরাং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতেও বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিসৌধ গড়া সম্ভবপর ছিল। শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে দ্বিতীয় শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়, যেটি তিনি উদ্বোধন করেন ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর।
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য নিউইয়র্ক যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এ খবরও পেলাম যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। এ সংবাদে উল্লসিত হয়ে আমরা বাংলা বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে নতুন গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তাকে অভিনন্দন জানাই। আমরা জানতে চাই, তিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় যে লিখিত ভাষণটি পাঠ করবেন সেটি মুসাবিদায় আমরা বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা কোনো সাহায্য করতে পারি কি না? বঙ্গবন্ধু আমাদের কথা শুনে তার প্রেস সেক্রেটারি তোয়াব খানকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে আমাদের কথা জানালেন। তোয়াব খান জানালেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ভাষণ ইতোমধ্যেই বাংলায় রচিত হয়ে গেছে। সুতরাং আপনাদের কষ্টের কোনো প্রয়োজন নেই। এ-কথা শুনে আমরা অত্যন্ত খুশিমনে বঙ্গবন্ধুকে অগ্রিম অভিনন্দন জানিয়ে বিদায় নিলাম।
বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩’। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের জন্য অনেক দিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শিক্ষক সমিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের একটি খসড়া বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যান। তিনি আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরকে ঐ খসড়াটির অধ্যাদেশ অবিলম্বে জারি করতে বলেন। এভাবেই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩’ জারি হয়েছিল, যা অদ্যাবধি চালু রয়েছে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমিরিটাস, নজরুল গবেষক ও নজরুল একাডেমির সভাপতি

পূর্ববর্তী নিবন্ধযেটুকুই পেয়েছি
পরবর্তী নিবন্ধবঙ্গবন্ধু নেতা, প্রতিষ্ঠাতা, মানুষ
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য