Saturday, July 13, 2024
বাড়িকূটনীতিপৃথিবীব্যাপী আমেরিকার বন্ধুত্ব!

পৃথিবীব্যাপী আমেরিকার বন্ধুত্ব!

আমেরিকায় কি গণতন্ত্র আছে? মার্কিনীদের নির্বাচন কি অবাধ ও নিরপেক্ষ? সেই আমেরিকা আবার সারাবিশ্বে গণতন্ত্র শেখায়। তাই স্পষ্টভাবে বলা যায়, আমেরিকার মুখে কখনও অবাধ নির্বাচনের কথা শোভা পায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর ও সন্ত্রাসী দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সাইদ আহমেদ বাবু
আমেরিকা কি পৃথিবীর ভাগ্য-বিধাতা? পৃথিবীর দেশগুলো কি তার হাতের পুতুল? সন্দেহ নেই আমেরিকাই দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ। শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই কি একটা দেশ দুনিয়ার মোড়ল হতে পারে? আর কোনো যোগ্যতা লাগে না? অস্পষ্টতার আবরণ যতদূর সম্ভব সরিয়ে এ প্রশ্নের বিচার করার চেষ্টা করতে হবে। আমেরিকার মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমেরিকা দুনিয়ার এক নম্বর দেশ, এই সরল বিশ্বাস নিয়ে তারা জীবনযাপন করে। কেউ আমেরিকার অপরিমেয় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহস পাবে না, এই সহজ স্বপ্ন তারা দেখে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে হিরোশিমা নাগাসাকির ওপর পরমাণু বোমা ফেলার পর আমেরিকা দুনিয়ার একমাত্র সুপার পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের গণতন্ত্র চর্চিত হয় ব্যক্তির ইচ্ছেয় নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। এটাই আমেরিকা, এটাই আমেরিকার গণতন্ত্রের বিশেষত্ব। ট্রাম্পের কুনাট্যে সেটাই শক্তভাবে প্রমাণিত ও প্রতীয়মান হলো। এ কারণে বুঝি সারাবিশ্ব পছন্দ করুক আর নাইবা করুক, আমেরিকা স্বগর্বে-প্রত্যয় নিয়ে বলে এই পৃথিবীকে দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের।
পররাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে লাখ কথার এক কথা চার্চিল বলে গিয়েছেন, “স্থায়ী বন্ধু কেউ নেই, স্থায়ী শত্রুও কেউ নেই, স্বার্থই একমাত্র স্থায়ী।”
রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই এদিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তার নেশন-তত্ত্বের ব্যাখ্যায়। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় নেপাল মজুমদার যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, নেশনের পরম শত্রু নেশন। নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেশনকে সে উঠিতে দিতে চায় না।” এ শতাব্দীতে তো আমরা দেখেছি, উন্নত সভ্য দেশগুলো অনুন্নত দেশগুলোকে ঘাড় ধরে সভ্য করার জন্য কীভাবে তাদের ঘাড়ে চেপে রক্ত শোষণ করে গেছে।
একাত্তরে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব কিসিঞ্জার যিনি বাংলাদেশের মাটিতে পাকবাহিনীর পরাজয়ে মুষড়ে পড়ে সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন। আর তার দেশ ভিয়েতনাম, ইরাক, কম্বোডিয়ায় ও আফগানিস্তানে কী করেছে তা সারাবিশ্ব জানে।
বাঙালি সৌভাগ্যবান, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আজ ‘বাংলাদেশ’ তরণীর সফল কাণ্ডারি। তারই হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অনেকটা ডানা মেলেছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, যে বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য দূরীকরণের রোল মডেল হয়েছে, এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশ আরও উন্নত হবে। উন্নয়নশীল দেশ, এর পরে উন্নত দেশ। কেন্দ্রীয় আলোচনার অভিমুখ বদলে গিয়ে সামনের সারিতে এসেছে বাংলাদেশের উন্নয়ন।
বাংলাদেশের বিবেকবান, দেশপ্রেমিক নাগরিকের মনকে এ প্রশ্ন পীড়া দেবেই, কিসিঞ্জারের মতো মানুষ এবং তার দেশ আমেরিকা যারা গণতন্ত্র, মানবাধিকারকে পিষে মারতে সিদ্ধহস্ত, তারাই কী না বাংলাদেশের অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নয়া ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। বলা হয়েছে, নির্বাচনকে যারা বানচাল করার চেষ্টা করবে, মার্কিন প্রশাসন তাদের ভিসা দেবে না।
সেই আমেরিকা নির্বাচনের নামগন্ধবিহীন মিয়ানমারে সেনাশাসকরা গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর প্রতিবাদ-জমায়েতে বিমান থেকে বোমা ফেলা সত্ত্বেও নীরব। তারা দিব্যি সেদেশে অস্ত্র বেচে চলেছে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে বাইডেন প্রশাসন নীরব। মিয়ানমারের মতো গণতন্ত্র, মানবাধিকারকে গলা টিপে মারার এমন নজির আর ক’টা আছে? অথচ, সু চি’র দেশে না গিয়ে মার্কিন কর্তারা কেন শেখ হাসিনার বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন তাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকারের সবক শোনাতে? অথচ অমানবিক স্বার্থকুটিল প্রকৃত বৈষম্যের যে হিংস্র চেহারা, সভ্যতার মুখোশধারীরা আজও ধরে রেখেছে, তা কি চরম অসভ্যতার পরিচয় নয়? জগতের একটি বিরাট সমাজের মানুষকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার সবরকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে আর সেসব সুযোগ-সুবিধার একচেটিয়া মালিক হবে আমেরিকার সাদা চামড়ার মানুষরা- এই ছিল তখন ‘অন্ধ মহাদেশ’-এ তাদের সভ্যতা বিস্তারের রীতি।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় দু-বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবীতে আবার একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৩৭-এ লেখা মাত্র ৬টি চরণের সেই কবিতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে-

“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।”

একচ্ছত্রভাবে বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ও নীতি-নির্ধারক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এখন পর্যন্ত পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার তেজ ও ক্ষমতা ভালোভাবে অবলোকন করছে বিশ্ব। বিশ্বজুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বব্যাপী এত সামরিক ঘাঁটি কোনো দেশ স্থাপন করতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ শতাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এতে মোতায়েন রয়েছে প্রায় ৫ লাখ সেনা। এসব দেশে কখনও সামরিক চুক্তি, কখনও ব্যবসায়িক প্রপার্টির নিরাপত্তার কথা বলে, আবার কখনও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে সেসব দেশে সেনা মোতায়েন করেছে দেশটি। বিগত কয়েক দশকে অন্তত পাঁচ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেশগুলো পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও আফগানিস্তান বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এছাড়া বহু দেশে গণতন্ত্র তো প্রতিষ্ঠা হয়নি; বরং সামাজিক, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়েছে। বিগত ২০ বছরে আফগানিস্তানে হত্যা করেছে ৩ লাখ মানুষ। তারও আগে ইরাক-ইরান আট বছরব্যাপী যুদ্ধ বাধিয়ে হত্যা করিয়েছে ১০ লাখ লোক। একসময়ের সমৃদ্ধ জনপদ ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া মার্কিনীদের কারণে আজ বিরাণভূমি। সিরিয়া থেকে এখনও তেল তুলে নিচ্ছে আমেরিকা।
মার্কিনীরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরিকল্পনা করে কেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে তা সবারই জানা। ২০২৩ সালে আবারও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পাখা মেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেন্টমার্টিন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প আর চীনকে ঠেকানোর জন্য নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধুয়া তুলছে দেশটি।
এদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত এপ্রিলে সংসদে দাবি করে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য কৌশল অবলম্বন করছে। তারা দেশের গণতন্ত্রকে বিলুপ্ত করতে চাইছে এবং এমন একটি সরকার চালু করার চেষ্টা করছে, যাতে গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তাদের এ পদক্ষেপ একটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ।
মিয়ানমার, ইরান, বেলারুশ ও কিউবাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব কমে যাওয়া এবং পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে বৈশ্বিক ক্ষমতার চলমান পরিবর্তন মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞাগুলোকে কম কার্যকর করে তুলছে। যা হোক, পশ্চিমারা এখনও বিশ্বব্যাপী আর্থিক স্থাপত্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ডলারকে এখনও বিশ্বের প্রাথমিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই নিষেধাজ্ঞাগুলো এখনও আমেরিকান নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এই ভিসানীতি একটি আধিপত্যবাদ সম্প্রসারণের কৌশল। মার্কিনীরা কখনোই বাংলাদেশের বন্ধু না। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বন্যাপীড়িত বাংলাদেশে জাহাজভর্তি খাদ্যসামগ্রী মার্কিনীরা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। যার ফলে এদেশে সৃষ্টি হয়েছিল মারাত্মক দুর্ভিক্ষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারা আশ্রয় পায় আমেরিকায়।
আমেরিকায় কি গণতন্ত্র আছে? মার্কিনীদের নির্বাচন কি অবাধ ও নিরপেক্ষ? সেই আমেরিকা আবার সারাবিশ্বে গণতন্ত্র শেখায়। তাই স্পষ্টভাবে বলা যায়, আমেরিকার মুখে কখনও অবাধ নির্বাচনের কথা শোভা পায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর ও সন্ত্রাসী দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আয় বৈষম্যের দেশ আমেরিকা। আমেরিকার নীতির কারণে আজ ইউক্রেন জ্বলছে। পৃথিবীতে যুদ্ধ-সংঘাত বাধিয়ে রাখে এই আমেরিকা। সারাবিশ্বের সন্ত্রাসীদের ও দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়স্থল আমেরিকা। দুটি পাশাপাশি বন্ধুত্বসুলভ দেশের সম্প্রীতি দেখলে সেখানে কৌশলে যুদ্ধ বাধায় আমেরিকা। বাংলাদেশের সৃষ্টির সঙ্গে যারা বিরোধিতা করেছে সেসব দেশকে বাংলাদেশের জনগণের ঘৃণা করা উচিত।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো মূল্যবোধকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসহ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাইডেন প্রশাসনের কৌশলগত অবস্থান হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হিসেবে দেখা না-হলেও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা এবং বিশ্লেষণ। বাংলাদেশের গণতন্ত্র মানবাধিকার ও আইনের শাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন কেন সোচ্চার, সেটি নিয়েও আছে কৌতূহল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করায় মধ্য আমেরিকার ৪টি দেশের ৩৯ ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশ ৪টি হলো- নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস ও এল সালভাদর। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। দেশে-বিদেশে বিশ্লেষকদের অভিমত, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মতো যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার পেছনে আসল উদ্দেশ্য ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত স্বার্থ- গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন বা মানবাধিকার নয়। বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিবর্তন, তার মূল লক্ষ্য চীনকে ঠেকানো। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্পৃক্ত। যেখানে উদ্দেশের অসততা রয়েছে সেখানে ভিসানীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রকল্পে সফল হবে, তা কতটুকু বাস্তবসম্মত? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। যেসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ন প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ভূ-রাজনৈতিক। উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং নিকটেই সিটওয়ে বন্দর এগুলো চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে দীর্ঘমেয়াদে এসব জায়গায় চীনের পরিবর্তে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হোক। এটা সত্যিই একটা দীর্ঘমেয়াদি খেলা।
আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে এ বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এশিয়ার নির্বাচনের এই সিরিজে কার্যকর গণতন্ত্র চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অঙ্গীকার ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশটির সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে বাংলাদেশ। শ্রীলংকার মতো উচ্চপর্যায়ের অবকাঠামো চুক্তি করেনি চীনের সাথে। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তি ও উদীয়মান মার্কিন মিত্র, ভারত।
স্বল্পমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানকে পুরস্কৃত করেছে আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‌্যাবের ছয় সদস্যের ওপর দেশটিতে গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই ফোর্স বাংলাদেশে মাদক ও জঙ্গিবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই ফোর্সের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।
পৃথিবীতে এমন অনেক দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্র বা নির্বাচন বলতে কিছুই নেই এবং সেসব দেশের মানবাধিকার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন আছে। অথচ ওই দেশগুলোকে ফেলে ওয়াশিংটন হঠাৎ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুটি উদাহরণ উল্লেখ করছি- উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে বাংলাদেশের রয়েছে সর্বোচ্চ আঞ্চলিক গড়। লিবারেল ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্সে ০.১২ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম, যেখানে কম্বোডিয়া ১৬০তম। কম্বোডিয়া গণতন্ত্র ও নির্বাচনে বাংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও আসন্ন গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভিসানীতি ঘোষণা করেনি। উদ্বেগ প্রকাশ আর পর্যবেক্ষক না পাঠানোর মধ্যে সীমিত থেকেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নির্বাচন এখনও কয়েক মাস বাকি থাকতে ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি জারি করেছে। বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতলববাজি এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়। এ নিষেধাজ্ঞা কি দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে, না-কি ভূ-রাজনৈতিক কোনো অভিপ্রায় ও কৌশলগত বিষয় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি বিশ্বের যেসব দেশে (নাইজেরিয়া ও সোমালিয়া) প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানে কোনো সাফল্য আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশে সামরিক হস্তক্ষেপকে যুক্তিসংগত প্রতিপন্ন করতে গণতন্ত্রকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করেছে। সেদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রায়শই বিপরীত ফল বয়ে এনেছে। অন্য দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের বোঝাপড়া ও কৌশলে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। লাতিন আমেরিকায় গণতন্ত্র রপ্তানির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯১২ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করেছে।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কর্তৃত্ববাদ নতুন চল হিসেবে হাজির হয়েছে। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকছে। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভেনেজুয়েলা, মিশর, ফিলিপাইন- এমন অনেক দেশের নাম বলা যাবে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এসব দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘উদীয়মান বিশ্বে আমাদের জন্য, আমাদের ভাগ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।’ নতুন নতুন প্রজন্ম আসে এবং মূল্যবোধও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু আশা বাঁচিয়ে রাখে সবচেয়ে নবীন প্রজন্ম। সেই নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অন্তর শক্তি। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম বুনন করেছে জাতি-চেতনার নতুন নকশা। হয়তো এখন শুনব রবীন্দ্রনাথের একটি গান- “বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান-/তুমি কি এমন শক্তিমান!/আমাদের ভাঙ্গা গড়া তোমার হাতে এমনি অভিমান-/তোমাদের এমনি অভিমান?” আজকের তরুণ প্রজন্মই হবে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই দেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং আরও উন্নত করবে। সব বাধা পেরিয়ে তারা যেন সেই স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরিতে অবদান রাখবে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য