Saturday, July 13, 2024
বাড়িউত্তরণ-২০২৩ত্রয়োদশ বর্ষ,অষ্টম সংখ্যা, জুলাই-২০২৩নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক চালচিত্র

নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক চালচিত্র

এবারের নির্বাচন হবে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। জনগণ চায় সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন। চাপ কিংবা দায় তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের ওপরই রয়েছে।

শেখর দত্ত:

নির্বাচন নিয়ে দেশ আলোড়িত হচ্ছে
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ছয়/সাত মাস বাকি। এখন ‘মাত্র’ শব্দটি যুক্ত হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই দিন গণনা শুরু হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন আলোড়িত হয়ে উঠেছে। পত্র-পত্রিকায় নির্বাচন নিয়ে লেখালেখি এবং জনগণ নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। বাস্তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় নির্বাচনকে বলা হয়ে থাকে জনগণের উৎসব। কারণ একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর এই দিনে মানুষ নিজেদের ভাগ্য গড়ার অধিকার নিজেদের হাতে ফিরে পায়।
আবার অন্যদিক থেকে নির্বাচন হচ্ছে সংবিধানের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনার উদ্দেশ্যে জনগণের রায় নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যুদ্ধ। ক্ষমতায় বসে দেশ ও জনগণের সেবা করাই যেহেতু রাজনৈতিক দল গঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সে-কারণে ক্ষমতার জন্য এই দিনে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বতোভাবে পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামে। তাই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে, এটা কেবল জাতিরই কাম্য নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও জাতীয় দেশপ্রেমিক কর্তব্য।
কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, পঁচাত্তরের পর থেকে নির্বাচন সামনে এলেই বয়কট কি বয়কট নয়- এমন প্রশ্ন সামনে আসে। স্বাধীনতার আগে উগ্র-বামপন্থিরা সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন থেকে সত্তরের নির্বাচন বয়কট করেছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের পর তা বড় দল ও জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে নির্বাচন সামনে রেখে বিশেষ এক ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর যা অনভিপ্রেত।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবিধানের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে যোগদান-বয়কট-যোগদানের পর এবারে দেশের দ্বিতীয় বড় দল বিএনপি তাল-লয় ঠিক রাখতে আবারও বয়কট নিয়ে গোঁ ধরে বসে আছে। বয়কট প্রশ্নে তারা কেবল বিগত সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের অবস্থানকে জায়েজ করতে চাইছেন। বিগত নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বিজয়ী সংসদ-সরকারকে তারা অবৈধ বলছেন। প্রশ্ন হলো- যদি নির্বাচন অবৈধই হয়, তবে সংসদে তারা বসেছিলেন কেন? আবার ‘পদত্যাগ’ নাটক করে সরকারি দল ও সংসদের কাছে সংবিধান পরিবর্তন করতে বলছেন কেন?
এসব ‘কেন’-এর উত্তর তারা দিতে পারবেন না, দেনও না! অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপিরও জানার কথা, সংবিধানের ভিত্তিতে আন্দোলন বা নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আবার সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন না থাকলে সংবিধান পরিবর্তনও সম্ভব নয়। জনগণ চায় না বলে বিএনপি যেমন পারছে না আন্দোলন করতে, তেমনি অপকর্মের কারণে নেতা বিদেশে থাকায় ছত্রভঙ্গ দল নিয়ে নির্বাচনে যেতেও সাহস পাচ্ছে না। এদিক থেকে বিএনপি দলটি রয়েছে প্রবাদের ভাষায় ‘ফাটা বাঁশের চিপায়’।
প্রসঙ্গত, সরকার পরিবর্তন ও সংবিধান সংশোধনের আরও একটি বিকল্প আছে। তা হচ্ছে, অবৈধভাবে সামরিক কর্তাদের ক্ষমতা দখল। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির জন্ম এই অবৈধ ক্ষমতার ফসল। সংবিধান সংশোধনও তারা অবৈধভাবে করেছিল। বর্তমান সংবিধান সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় বিএনপি বিপাকে পড়েছে। অবৈধতার পথে তাদের যাওয়ার ক্ষেত্রে কাঁটা পড়েছে।
তদুপরি অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর গর্ভে জন্ম নেওয়া দলটি কেন সামরিক বাহিনীর মদদ পাচ্ছে না। বাস্তবে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘সুযোগ্য পুত্র’ মুচলেকা দিয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসিত তারেক জিয়া। ক্ষমতার বিকল্প লুটপাট-সন্ত্রাসের কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ আর প্রমোদের জন্য ‘খোয়াব ভবন’ করা, ডন ইব্রাহীমের সঙ্গে দেখা করা, উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের উসকে দেওয়া, সামরিক বাহিনীকে বিপদে ফেলা প্রভৃতি অঘটন ঘটানোর ফলে এমনটা হয়েছে।
সব পন্থায় সরকার পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপির এখন একমাত্র অবলম্বন বিগত নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে বিদেশিদের কাছে ধরনা। প্রসঙ্গত বলতেই হয়, আন্দোলন-সংগ্রামে জনগণ যখন রাস্তায় থাকে তখন জনগণ হয় নিজেই নিজেদের ভাগ্যবিধাতা। বিদেশিরা তখন হয়তো বা সংহতি জানাতে আসে। সমাধানে সহযোগিতা করে। কিন্তু আন্দোলন ছাড়া ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের জন্য বিদেশিদের নাক গলাতে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এটা ক্ষতিকর কাজ। বিএনপি গণসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে না-পেরে এখন বিদেশিদের নাক গালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জামাতের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ ও নির্বাচন বানচালের জন্য জনগণের বিরুদ্ধে অগ্নিসন্ত্রাস করে বিএনপি পাকিস্তানকে দেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। অগ্নিসন্ত্রাসের পথ বন্ধ হওয়ায় এবারে অন্যসব অজুহাত এনে বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।
দলটির বক্তৃতা-বিবৃতি দেখে মনে হয়, বিগত নির্বাচনের আগে আর কোনো নির্বাচন ছিল না। ভোট, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কেবল বিগত নির্বাচনের ভেতর দিয়েই। এসবের অতীত কোনো ইতিহাস নেই, নেই কোনো ধারাবাহিকতা। ‘হঠাৎ বাংলাদেশের’ মতোই হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিল ২০১৮ সালের নির্বাচন।
‘হঠাৎতন্ত্র’ যাতে দেশবাসীকে অতীতের মতো বিভ্রান্ত করতে না পারে সেজন্য অস্থিরতা-অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা-পরিহার করে ভোট, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার তথা সুশাসন ও ন্যায্যসমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম অগ্রসর করে নেওয়ার জন্য দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরানো ভিন্ন বিকল্প নেই।
প্রবাদ বলে, ‘পুরনো চাল ভাতে বাড়ে’। ভাত যেমন শক্তি জোগায়, তেমনি ইতিহাসও হচ্ছে জাতির শক্তি ও প্রেরণার উৎস। ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া, পরিত্যক্ত সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে সুবিধাবাদী-সুযোগসন্ধানী-উচ্চাভিলাষীদের নিয়ে গঠিত দল বিএনপি তাই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কাছে যেতে ভয় পায়।
এদিক থেকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। জনগণকে নিয়ে দলটি স্বাধীন জাতির ইতিহাসের অগ্রযাত্রার নায়ক। যতটুকু ধারণা করা যায়, এদিক বিবেচনায় নির্বাচন সামনে রেখে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে মোকাবিলা করার জন্য আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বিয়োগান্তক ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। এদিকটি বিবেচনায় নিয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘাটা নয়, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে- কথাটা মনে করে ভোট ও নির্বাচনের চালচিত্র নিয়ে লিখতে গিয়ে বিগত দিনের ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হলো-

ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে
এটা তো ঠিক যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সাংবিধানিক ধারা রক্ষিত ও নতুন সরকার গঠিত এবং রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালিত হয়। আগামী পাঁচ বছর দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, জনগণের জীবন-জীবিকার উন্নতি-অগ্রগতি কতটুকু কী হবে, তা সবই নির্ভর করবে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে কোন দল ক্ষমতায় আসে এর ওপর।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার আমাদের জাতীয় পছন্দ। পাকিস্তানি আমলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতি যখন শোষিত-দলিত-নির্যাতিত, তখন জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করতে এই পদ্ধতির সরকার-ব্যবস্থার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জাতি হিসেবে আমরা লড়াই করেছিলাম। নির্বাচনের বিজয়ের পর সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়ার ফলে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সশস্র মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল।
তাই রক্ত ও আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে অর্জিত এদেশে স্বাধীনতার পর অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে, এই পদ্ধতির সরকার-ব্যবস্থার মধ্যে আমরা থাকতে পারিনি। খাদ্য ঘাটতি ও আর্থিক শূন্যতার মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্র এবং সংগঠন করার স্বাধীনতার অবাধ সুযোগ নিয়ে পঁচাত্তরের পরাজিত দেশি-বিদেশি শত্রু ও কায়েমি স্বার্থবাদীরা খাদ্য ও অর্থ নিয়ে শুরু করে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত।
‘রাতের বাহিনী’ ও ‘চাটার দল’ হয় জাতীয় শত্রুদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের সহায়। এরাই সংসদীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আঘাত করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চরম দুঃখ নিয়ে ‘আবার সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলে তখনকার বিশ্ব-বাস্তবতায় একদলীয় সরকার-ব্যবস্থার দিকে যান। পরিস্থিতি যখন উন্নতি হচ্ছে, তখনই ভীত-সন্ত্রস্ত জাতীয় ও গণশত্রুরা পঁচাত্তরের দুই হত্যাকাণ্ড- পনেরো আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের বর্বর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
আমরা যদি পঁচাত্তর-পরবর্তী হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক সরকারগুলোর সময়ের ফিরে তাকাই, তবে দেখতে পাব- স্বাধীনতা-পূর্ব প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক সরকারগুলোর সময়ের মতোই স্বাধীন দেশে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক সরকারগুলোর আমলে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতির গতিধারা অগ্রসর হয়েছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টির ভিত্তি ছিল তিন জোটের পাঁচ-দফা, যাতে সর্বাগ্রে সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠারই অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
কিন্তু ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের চেয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান কেবল ব্যাপকতা ও তীব্রতার দিক থেকেই পিছিয়ে ছিল না, শক্তি সমাবেশের দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতার দিক থেকেও ছিল দারুণভাবে পিছিয়ে। প্রথমটিতে সামরিক বাহিনীর গর্ভে জন্ম নেওয়া কোনো দলের অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয়টিতে সামরিক কর্তাদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার নিমিত্তে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া দল বিএনপিও ছিল, যা ছিল ইতোমধ্যে ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে দখল করা সামরিক কর্তাদের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখার বিকল্প রাজনৈতিক দল। তদুপরি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্র ছিল অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী। কিন্তু নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনাও যুক্ত ছিল।
বলাই বাহুল্য, এসব দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা নিয়ে জাতীয় ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চের দৃঢ়ভাবে জায়গা নেওয়া সামরিক কুশীলবদের ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র সুবাদে বিএনপি জয়লাভ করে। জয়লাভ করে পাঁচ-দফাকে পদদলিত করে এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামাতের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসে।
বিএনপির বিজয়ের ভেতর দিয়ে দেশ আবারও রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারের ঘোরপ্যাচে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু জাতীয় ইচ্ছের বিরুদ্ধে ওই দলের পক্ষে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসা ছাড়া পথ থাকে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার শখ বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া মেটাতে চায় প্রধানমন্ত্রীর পদ দিয়েই। এর ফলশ্রুতিতে আসে হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের দিনগুলোর মতোই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকার লালবাগের সাত খুন ও মাগুরা নির্বাচন।
এরই ধারাবাহিকতায় ছিয়ানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারি একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর গণ-আন্দোলনের জোয়ারে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা সংবিধানে সন্নিবেশিত করে সংসদ ভেঙে দিয়ে বিএনপি প্রথমবার ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে।
সুদীর্ঘ ২১ বছর পর সংবিধানের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। জনগণের ভোট ও গণতন্ত্র ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প অবৈধ পথ না থাকায় দলটি গাড্ডায় পড়া গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথ ধরে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে অর্পণ করে।
কিন্তু কী করে বিএনপি-জামাত জোট? বিচারপতি নামের কলঙ্ক লতিফুর রহমান? লতিফুর রহমান তথা তখনকার সা-ল-সা সরকার প্রকাশ্যে বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষ নিয়ে নির্বাচনের লেভেল প্লেইং ফিল্ড ধুলায় মিশিয়ে দেয়। এবারে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ নয়, লাজলজ্জার মাথা খেয়ে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতি করে।
এর ফলশ্রুতিতে অবৈধ সামরিক শাসক জিয়া দল করার লাইসেন্স দিয়ে ‘জামায়াত’ নামে যে বিষবৃক্ষ স্বাধীন বাংলার মাটিতে রোপণ করেছিল, সেই দলকে ক্ষমতার পার্টনার করে বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া জাতীয় পতাকাকে কলঙ্কিত করে। তারেক জিয়া প্রকাশ্যে জামাতকে বুকে টেনে বলে ‘আত্মার আত্মীয়’।
জাতির কলঙ্কিত এই ইতিহাস কারোই না জানার কথা নয়। তবে জামাত প্রসঙ্গ উঠলেই বিএনপি এবং ওই দলের প্রভাবিত বা ‘সমদূরত্ববাদী’ সুশীল সমাজ ভাঙা রেকর্ডের মতো বলে ওঠে, আওয়ামী লীগও জামাতের সঙ্গে ঐক্য করেছিল। যেন দাড়িপাল্লা সমান সমানে আছে। দু-দলই সমান দোষী। কথাটা ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কারণ প্রথমত; এরশাদ-বিরোধী দুই এবং পরে তিন জোটের যুগপৎ আন্দোলনের সময় সব দল এবং ‘সমদূরত্ববাদী’ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও নীরব থেকে জামাতকে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে রাখতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পক্ষে থেকেছে। প্রসঙ্গত, ভুল বা শুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও ন্যায্য আন্দোলনের আশু লাভ বের করে আনতে শত্রুকে বিচ্ছিন্ন বা কমজোরি করতে শত্রুর শত্রুর সঙ্গে আপাতত ঐক্যের এই কৌশল রাজনীতিতে গ্রহণীয় হয়ে আসছে।
ইতিহাস বিচারে রাজনীতির বিষবৃক্ষ জামাতকে পুনর্জন্ম দেওয়া ও জাতে তোলা হচ্ছে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর ফল। এর জন্য সামরিককর্তারা দায়ী। তবে একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, জামাত নিয়ে দু-দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতি-কৌশলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
আওয়ামী লীগ জামাতকে ব্যবহার করেছে আন্দোলনের স্বার্থে এবং ওই ব্যবহারে জামাত-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি জামাতকে পুনর্জন্ম দেয় দুধ-কলা দিয়ে পুষে। ক্ষমতায় বসিয়ে গাড়িতে-বাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়। এই পার্থক্য যারা বুঝেন না, তাদের কী বলা যাবে!

ভোট ও গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার দুই প্রধান কাজ
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ‘ভুয়া জন্মদিন’ পালন করা ছাড়াও দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপি-জামাত জোটের দুটো কাজ হচ্ছে- ভোট ও গণতন্ত্রকে বিপদাপন্ন করার দিক থেকে সবচেয়ে গণবিরোধী ক্ষতিকর কাজ। প্রথমত; ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’ বলে বিএনপি কথিত এবং বাস্তবে দুধ-কলা দিয়ে পোষা উগ্র-সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে বোমা-গ্রেনেড হামলা করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে প্রাণে মেরে ফেলার পরিকল্পনা ও অপপ্রচেষ্টা করে। কেবল তাই নয়, গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের জমায়েতে-অফিসে এবং এমনকি ব্রিটিশ হাইকমিশনাকে বোমা-গ্রেনেড দিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার প্রচেষ্টাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বাস্তবে মেরে ফেলার প্রতিহিংসাপরায়ণতা কখনও গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না, যেতে পারে না। বিস্ময়ের বিষয়, এ ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি মাপও চায় না। ‘সমদূরত্ব’ বজায় রাখার উদ্দেশে ‘নিরপেক্ষ’ বলে বিবেচিত সুশীল সমাজও এ নিয়ে তেমন কিছু বলে না। গা-সওয়া করে নেয়! তবে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যেমন প্রকৃতিতে বিরাজমান, তেমনি রাজনীতিতেও থাকতে একান্তভাবে বাধ্য।
দ্বিতীয়ত; বহু রক্ত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থায় পেরেক পুঁতে দেওয়া। ২০০১ সালের সা-ল-সা সরকারের অধীনে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বিএনপি-জামাত জোট পুঁতেছিল প্রথম পেরেক। আর ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর নীলনকশা কার্যকর করতে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো, ভুয়া ভোটার লিস্ট প্রণয়ন এবং সবশেষে ‘টু ইন ওয়ান’ রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ইয়াজউদ্দিনকে বসানো প্রভৃতির ভেতর দিয়ে এ ব্যবস্থায় শেষ পেরেক পুঁতে দেয় বিএনপি-জামাত জোট।
প্রশ্ন হলো- দেশের বুদ্ধিজীবীসহ ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে হাত ভেজা জামাতকে সঙ্গে রেখে এমন সব কাজ করার সময় কি বিএনপি ভোট-গণতন্ত্র, আইনের শাসন-মানবাধিকারের কথা স্মরণে রেখেছিল? বিএনপি এখন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছে; কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। গোড়াতে হাজারো গিট্টু রেখে ক্ষমতার মুলা খেতে নিজের মতো করে সহজ-সরল পথ চাইবেন, এমনটা তো হতে পারে না। কৃতকর্মের ফল ভোগ করুন।
ইতিহাস ইতোমধ্যে প্রমাণ রেখেছে, সামরিক কর্তারা জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ-পাকাপোক্ত-দীর্ঘস্থায়ী করতে যে রাজনৈতিক দল গঠন করে, সেই রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে যায়। এদিকটি বিবেচনায় নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে বিএনপিকে পুনরায় দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শামিল হওয়া ভিন্ন টিকে থাকার আর কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রের জন্য ‘মেরামত’ কর্মসূচি দেওয়ার আগে বিএনপির নিজেকে ‘মেরামত’ করা বেশি জরুরি।

জনপ্রত্যাশার রকমফের
এটা সবার জানা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন যে, দেশে বিশেষত করোনা সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমস্যা-সংকট রয়েছে। এতে জনগণ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ধারণা করা চলে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট বাড়াতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরাও তৎপর। এদিকে বিশ্ব ও উপমহাদেশের রাজনীতিতে জাতিগত বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যাপক ও জোরদার হওয়ায় জনগণের মনোজগতের পরিবর্তন হয়েছে।
স্বাধীনতার সময়ে বিশ্ব ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে। আর এখন উল্টো। এ বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনীতি-অর্থনীতি-কূটনীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। এতে বাস্তব জীবনে যেমন তেমনি মনোজগতেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সচেতন অংশ ও জনগণ আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অনেক আশা করে বলে কষ্টে-অভিমানের মধ্যে রয়েছে। কখনও ক্ষুব্ধ আবার কখনও হতাশ হচ্ছে।
কিন্তু বিএনপিকে জনগণ বিকল্প মনে করছে না। এমনটা মনে করে না বলেই নেতাকর্মীরা আন্দোলনেও নামছে না। যদি জেল-মামলা, লাঠি-টিয়ার গ্যাস-গুলি আন্দোলনের সমস্যা হতো, তবে দেশে অতীতে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম হতো না। আন্দোলনকে যে বিএনপি জনসম্পৃক্ত করতে পারে না, এর কারণ বিএনপির বায়োডাটা, অতীতের অনৈতিক-অবাঞ্ছিত-ক্ষতিকর কীর্তিকলাপ।
জনগণ কখনও বিএনপিপ্রধান অঘটনঘটনপটীয়সী দুর্বিনীত তারেক রহমানকে দেশে এনে ক্ষমতায় বসাতে চাইবে না। বিদ্যুতের খুঁটি খাম্বা হয়ে যাক, জেট ফুয়েল কেরোসিন হোক, হাওয়া ভবন দুর্নীতির কেন্দ্র হোক প্রভৃতি যেমন, তেমনি ভুয়া ভোটারে ভোটার লিস্ট ভরে উঠুক, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হোক প্রভৃতির পুনরাবৃত্তি জনগণ কখনও চাইবে না। জামাত আবার ক্ষমতার পার্টনার হতে পারবে, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা বোমা-গ্রেনেড ফাটাবে প্রভৃতিতে জনগণ আর ফিরে যেতে চাইবে না। যদি চাইত, তবে জনগণ অতীতের মতো জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে নামত।
সুশীল সমাজের কোনো কোনো প্রতিনিধি বলে থাকেন, বিএনপি গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ-কথার জবাবে বলতে হয়, গণ-অভ্যুত্থান কখনও ঘণ্টা বাজিয়ে বা জানান দিয়ে আসে না। জনগণকে তা চাইতে হয়। তাহলে কোন নেতার নেতৃত্বে জনগণ রাস্তায় সব ফয়সালা করতে চায়, গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। গণ-অভ্যুত্থান ধ্বংসের জন্য নয়, সৃষ্টির জন্য দানা বেঁধে ওঠে। অতীতে ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি সৃষ্টি তথা জনগণকে কিছু দিতে বা ভাগ্য পরিবর্তনের কিছু যোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রকৃত বিচারে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাকের দিক থেকে পরিস্থিতিজাত কারণে জনগণের বাস্তব ও মনোগত যত ব্যথা কিংবা হতাশাই থাকুক না কেন, আওয়ামী লীগ দেশের ইতিহাসে কৃতিত্বের দাবিদার এ জন্য যে, সর্বোচ্চ সময় নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে গণসম্পৃক্ততাহীন অস্থিরতা-অরাজকতা-উগ্রতার মধ্যে না ফেলে, দলটি উন্নয়নের ভেতর দিয়ে দেশকে বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবার মতো উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পায়ের তলায় মাটি এবং রাজনীতি-অর্থনীতির জোর আছে বলেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এখন কথা বলতে সাহস পাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
আরও বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, পরিবর্তিত বিশ্বসমাজে আওয়ামী লীগ ডানপন্থি দল নয়, জাতীয়তাবাদী বামমুখী দল হিসেবে অতীতের মতো চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। মার্কিনীরা আওয়ামী লীগের ওপর কখনও বা চটা তো এ-কারণে। উল্লিখিত ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আসন্ন নির্বাচনের মাস গণনা শুরু হয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে বাম ও ডান দলগুলো
নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় জনসমর্থন কম-বেশি আছে বিধায়, প্রধানত চারটি দল আলোচনায় আসে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামাত। বাম বহুধাবিভক্ত ও শক্তিহীন থাকায় আলোচনায় তেমনভাবে আসে না। দেশের রাজনীতির ইতিহাসের এটা একটা গুণগত পরিবর্তন। সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগে পাকিস্তান আমলের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর আমল পর্যন্ত দেশের রাজনীতি ছিল বামমুখী। বঙ্গবন্ধু ‘গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র’র কর্মসূচি দিয়ে এবং ‘বিশ্ব শোষক-শোষিত দুইভাগে বিভক্ত’ কথা বলে দেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে বামদিকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন।
ওই সময় থেকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা পতনের পূর্ব পর্যন্ত দেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলো নানাভাগে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও ছিল দেশের রাজনীতির বড় ফ্যাক্টর। পরাশক্তি রাশিয়ার সঙ্গে থেকে রুশপন্থি বাম দলগুলো এবং অপর পরাশক্তি মার্কিন সমর্থক চীনের সহযোগী হয়ে চীনপন্থি বাম দলগুলো ব্যাপক কর্মী-সমর্থক নিয়ে তখন রাজনীতিতে অবস্থান নিতে পেরেছিল। এখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। বাম রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমাগত এখন আরও খণ্ড-বিখণ্ড, অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ১৪-দলীয় জোটে থাকা জাসদ (ইনু) ও গণতন্ত্রী পার্টি ভেঙেছে।
প্রসঙ্গত, অতীতে যেসব বাম দল আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করেছিল, তাদের একটা অংশ ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু) প্রভৃতি দল বর্তমানে রয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর যে বাম দলগুলো পক্ষে ছিল তাদের মধ্যে সিপিবি রয়েছে আওয়ামী লীগের তীব্র বিরোধী হয়ে। এ পরিবর্তনটা যেমন অনুসন্ধিৎসু, তেমনি বিস্ময়কর।
এদিকে অতীতে বামদিকে আন্দোলনের ধাক্কা দিয়ে দেশকে ডানে নেওয়া যেত। কিন্তু শক্তি বহুধা বিচ্ছিন্ন ও জনসমর্থন কমে যাওয়ায় সে-ক্ষমতাও বাম দলগুলোর এখন দারুণভাবে সীমিত। এ অবস্থায়ও শক্তির ভারসাম্য রক্ষা বা দল ভারী করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রয়োজন রয়েছে বাম দলগুলোর। তাই এখনও যারা কোনো জোটে নেই, সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে পক্ষে রাখতে দুই বড় দল চাইবে। যদিও ভোট প্রাপ্তির যোগ-বিয়োগে সেসব দল ফ্যাক্টর হবে না।
একটু খেয়াল করলে স্মরণে আসবে, বেশ কয়েক মাস আগে বিএনপি- জামাতের নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট থাকবে না কথাটা প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক ঐক্য (মাহমুদুর রহমান মান্না), গণসংহতি পরিষদ (জোনায়েদ সাকি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (সাইফুল হক) প্রমুখ বাম দলগুলো জোট গড়তে উদ্যোগী হয়। সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রভৃতি ১৪-দফা দাবি নিয়ে ১২টি দল ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নাম নিয়ে জোটবদ্ধ হয়। এই জোট এখন বিএনপির সঙ্গে জোট বা যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরু গঠিত গণ-অধিকার পরিষদ গঠিত হয়। হানিমুন পিরিয়ড পার না হতেই পারস্পরিক পাল্টাপাল্টিতে যেসব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ উঠে এলো, তা যদি বিন্দুমাত্র সত্য হয়, তবে তা থেকে অনুধাবন করা যায়, বিদেশিরা জনসমর্থনহীন সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর জন্য তাদের ব্যবহার করতে পারে। এদিকে আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষৎ করার পর কাদের সিদ্দিকীর দল কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ কী করছে, তা জানা যাচ্ছে না।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরে যেসব দল উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল এবং পরে গজিয়ে ওঠা দল ও গ্রুপগুলোসহ ‘আমরা হব তালেবান’পন্থি দলগুলো এখন প্রকাশ্যে বিলীনই বলা চলে। তবে কল্যাণ পার্টি (ইবরাহীম), জাতীয় পার্টি (জাফর)-সহ ২২-দল জোট বেঁধে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিএনপির সঙ্গে থাকতে চাইছে ১২ + ২২ = ৩৪টি রাজনৈতিক দল। এত্তসব দলকে সঙ্গে রাখা শক্তি বৃদ্ধি না-কি শক্তি ক্ষয়ের সহায়ক, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে!

জামাত ও জাতীয় পার্টির অবস্থান
নির্বাচনী ফলাফলের যোগ-বিয়োগের অঙ্কে অবস্থান নেওয়া ভোটপ্রাপ্তিতে দেশের চতুর্থ দল জামায়াতে ইসলামী এখন আর সরাসরি বিএনপির সঙ্গে ঐক্যজোটে নেই। ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ২০১৮ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে ২০১৪ সালে দলটি নির্বাচন বয়কট করে আগুন-সন্ত্রাসীতে নামে আর ২০১৮ সালে নির্বাচনে নিবন্ধন না থাকায় অংশ নিতে পারেনি।
বর্তমানে দলটি বহু বছর পর আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে জনসমক্ষে হাজির হতে চাইছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, নেতাদের মুক্তি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রভৃতি দাবি সামনে রাখছে দলটি। জুন মাসের প্রথম দিকে দলটির সমাবেশ থেকে বলা হয় ‘কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন কিংবা যৌথ আন্দোলন শুরু হতে পারে।’ এ বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট, দলটি এখনও বিএনপির সঙ্গে আছে।
ওই সমাবেশের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, আওয়ামী লীগ জামাত তোষণ নীতি নিয়েছে। এর জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওয়াবদুল কাদের এমপি সঠিকভাবে বলেছেন, জামাত বিএনপির ‘বি-টিম’। এই পাল্টাপাল্টির প্রেক্ষিতে জামাত বলেছে, বিএনপি জোট ভেঙে দেওয়ার পর তারা একা পথে হাঁটছে। সবশেষে ১৭ ও ১৮ জুন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত জামাতের মজলিশে সুরার সভায় ঠিক হয়েছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপি কী করতে পারে, তা দেখে দলটি আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেবে। বর্তমানে দলীয় কার্যালয় খুলতে চাইছে দলটি।
জামাতের অবস্থান ও কথাবার্তা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্ট, নিজ স্বার্থে অর্থাৎ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিএনপি যেমন জোট ভেঙে দিয়েছে, তেমনি জামাতও নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় বিএনপিকে ছেড়ে থাকার ভান দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে যোগাযোগ থাকার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। ভোটের বাক্সে ফ্যাক্টর হওয়ায় এই দল বে-আইনি না হওয়ায় নিঃসন্দেহে নির্বাচন সামনে রেখে খেলতে পারবে। সহজে ধারণা করা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পূর্ব অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিএনপির ‘আত্মার আত্মীয়’ এই দল সম্পর্কে সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের মৃত্যুর পর ভোট প্রাপ্তির দিক থেকে দেশের তৃতীয় দল জাতীয় পার্টির প্রভাব যেমন কমেছে, তেমনি টানাটানি ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। দলের সভাপতি জিএম কাদের ও বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ অর্থাৎ ভাবী-দেবরের মধ্যে টানাপোড়েন কতদূর পর্যন্ত রয়েছে বা চলবে, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। তবে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ইতোমধ্যে তার পক্ষে দলকে সংহত করতে চেষ্টা করছেন।
বিগত বছরের শুরুতে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক কলামে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লিখেছেন : একই ধরনের ভাবধারার দুটি রাজনৈতিক মঞ্চ হচ্ছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির যতটুকু শক্তি বাড়ে, বিএনপি ততটুকু শক্তি হারায়। আবার বিএনপির সমৃদ্ধি জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করে। এ কারণে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়, সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে।
আর বিএনপি চায়, যে কোনো মূল্যে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে রাখতে। তিনি বলেন, দুই দলের দুই অবস্থান জাতীয় পার্টিকে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা’ করতে এবং ‘ক্ষমতার চাবিকাঠি হয়ে দেশ পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা’ রাখতে সহায়ক অবস্থা সৃষ্টি করবে। ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্ট এই কথা যথার্থ। এই বিবেচনায় দলটি সর্বদাই ‘আনপ্রেডিকটেবল’ হয়ে থাকবে এবং ভোটের অংকে ফ্যাক্টর বিবেচনায় দলটি সুবিধামতো অবস্থান নেবে।
ইতোমধ্যে সংসদে জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বাজেট আলোচনায় সরকারের সমালোচনা করার সাথে সাথে বলেছেন, ‘সংঘাত এড়াতে’ তিনি ‘সংলাপে বিশ্বাসী’। ‘সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে আগামী জাতীয় নির্বাচন কীভাবে হবে। অসাংবিধানিক সরকার ঠেকাতে ক্ষমতা পরিবর্তনের জন বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে হবে।’ ধারণা করা চলে, নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর আগ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি এ অবস্থানে থাকবে এবং অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখোমুখি
নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রয়েছে সবদিক থেকেই মুখোমুখি অবস্থানে। নির্বাচনী প্রচার ইতোমধ্যে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। ১ জুলাই কোটালীপাড়ায় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত সাড়ে ১৪ বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন। যারা উন্নয়ন দেখে না তাদের চোখ থাকতে অন্ধ বলে সমালোচনা করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়।’ তিনি নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানান।
পরদিন টুঙ্গিপাড়ায় মতবিনিময় সভায় বলেন, ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুক, সেটা আমরা বরদাশত করব না।’ ৩ জুলাই গণভবনে সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী প্রস্তুতিতে আমরা যেন এগিয়ে থাকি।’ ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বিশেষত মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ঈদ উদযাপনের সুযোগে নির্বাচনী গণসংযোগের কাজ ভালোভাবে চালিয়েছেন। অনেকটা ফাঁকা মাঠে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জনগণের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন। এবারে বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। নির্বাচন-সংসদীয় ধারা বয়কট করে বিএনপি বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে বটে; কিন্তু রাজনীতির অঙ্গনে কী হারাচ্ছে, তা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিএনপি বয়কটের ধারায় থেকে আন্দোলনের চেষ্টা করছে। তাতে বিএনপি সফল হতে পারেনি। দলের বাইরে জনগণের মধ্যে কোনো আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি বড়জোর সময় পাবে তিন/চার মাস। বিএনপির নেতারা বলছেন, আগস্ট পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে। তারপরই শুরু হয়ে যাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া। সময় আর বেশি নেই।
যতই সময় যাবে, নির্বাচনের মাঠে বিএনপির অবর্তমানে জাতীয় পার্টি সুযোগ নিতে থাকবে। বিএনপির মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীও দাঁড়িয়ে যাবে। বিগত নির্বাচনে দলটি একদিকে জামাতসহ ২০-দলীয় জোটকে সঙ্গে রাখে আর অন্যদিকে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের ইমেজকে কাজে লাগাতে বেশ কতক দল ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যজোট’ গড়ে তুলেছিল।
এতে হিতে বিপরীত ফল পায় বিএনপি। এদিকে ড. কামাল হোসেনের দলও ভেঙে গেছে। তাই ওই পথে এবারে যাবে বলে মনে হয় না। ১২ এবং ২২-দলীয় জোটের সঙ্গেও আলোচনা চূড়ান্ত করতে পারেনি দলটি। ঈদের পর ‘আন্দোলন আসছে’ কথাটা কিছুদিনের মধ্যে রাখাল বালকের গল্পের মতো হয়ে যেতে পারে।
ইতোমধ্যে জানা যাচ্ছে, নির্বাচন ও বয়কট প্রশ্নে মামলার রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত ও সরকারের বদান্যতায় গৃহে থাকতে পারা মা খালেদা জিয়া এবং মুচলেকা দিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকা ও মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পুত্র তারেক জিয়ার সঙ্গে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সাবেক চেয়াপারসন মা খালেদা জিয়া সংলাপ ও নির্বাচনের পক্ষে এবং বর্তমান চেয়ারপারসন তারেক জিয়া সংলাপ-নির্বাচনের বিপক্ষে। তারেক জিয়া মনে করছেন, বয়কটির লাইনে শেষ যুদ্ধ ছাড়া বিএনপির সামনে কোনো পথ আর খোলা নেই। জয়লাভ না করলে দল হয়ে যাবে নিশ্চিহ্ন।
ইতোমধ্যে নাইকো দুর্নীতি মামলার নড়চড় শুরু হয়েছে। সরল ও স্বাভাবিক বিবেচনায় বলা যায়, নির্বাচন যত সামনে আসতে থাকবে বিএনপির মধ্যে নির্বাচন-বয়কট নিয়ে মতদ্বৈধতা ও অস্থিরতা বাড়তে থাকবে। এর মধ্যে মা ও ছেলের মধ্যে যদি মতভেদ থাকে, তবে তা বিএনপির জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে পারে।
বিএনপির মধ্যে আগে থেকেই রয়েছে নবীন-প্রবীণ মতানৈক্য, যা পুনরায় দানা বেঁধে উঠতে পারে। এ অবস্থায় বিএনপি সংলাপ-নির্বাচনে গেলে নির্বাচনী চালচিত্র হবে একরকম, আর না-গেলে হবে অন্যরকম। আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়বে, না-কি ফাঁকা মাঠে গোল দেবে, তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এর উত্তর দিতে পারবে না।
এদিকে আওয়ামী লীগ রয়েছে সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুসংগঠিত হয়ে। দলে সংসদ সদস্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা পাল্টাপাল্টি থাকটা অস্বাভাবিক নয়। এটা দলটির চলমান সমস্যা। তবে মেয়র নির্বাচন ও উপনির্বাচনগুলো দেখিয়ে দিয়ে গেল, প্রথমত; বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে, নিন্দিত প্রার্থী আটকাতে, নতুন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিতে দলীয়প্রধান সজাগ। দ্বিতীয়ত; আওয়ামী লীগ তৃণমূলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
কেবল ইতিহাসই নয়, বর্তমানও রয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ইতোমধ্যে দেশে যে উন্নয়ন-অগ্রগতি হয়েছে, তা জনগণ যেমন বুঝে তেমনি দিন-দুনিয়ার খবরও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের অজানা নয়। সময়টা সত্তর, আশি, নব্বইয়ের দশকের মতো নয় যে জনগণকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে। ‘মায়ের কাছে মাসীর গল্প’ করার মতো ‘রাষ্ট্র মেরামত’-এর কল্পকাহিনি আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারে নামলে বিএনপির জন্য বুমেরাংও হতে পারে। হয়েছেও মনে হয়, যদি তা হতো, তবে ‘মেরামত’ নিয়ে সোরগোল শুরু হতো।
বিএনপি সমস্যা-সংকট নিয়ে আন্দোলন করতে চাচ্ছে; কিন্তু মূল নেতার অনুপস্থিতিতে কতটুকু কী করতে পারবে বলা কঠিন বিধায় গণবিচ্ছিন্নভাবে বিদেশিদের টেনে আনতে চাইছে। বিদেশি ফর্মুলায় নির্বাচন হবে বলে মনে করছে। সংবিধানের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব- এ পরামর্শ দিয়ে পরিচিত গোষ্ঠীর সুশীলরা অতি তৎপরতা দেখাছেন। আগে ‘মাইনাস টু’ করতে চেয়েছিল। এখন তো একজন আদালতের রায়ে মাইনাসই রয়েছেন।
আর একজন, যিনি তাদের ‘প্রধান টার্গেট’ তাকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে উৎখাত করতে পারলেই তো কল্লা ফতে। তাই ড. ইউনূস ক্ষণে ক্ষণে মাঠে উদয় হচ্ছেন। এদিকে বিএনপি দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে বিদেশের কাছে ঝুঁকছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সাক্ষতে নালিশ করেছে।
বর্তমানে বহু বিগ পাওয়ারে বিভক্ত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিশ্বে বিএনপির বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া এবং কোনো বিশেষ ওয়াদা করার ফল হতে পারে মারাত্মক, চরম ক্ষতিকর। এটা তো আর জানা যাবে না যে, বিএনপি ২০০১ সালের গ্যাস রপ্তানির মতো সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে কী অঙ্গীকার করেছে? বিএনপি এই আগুন নিয়ে খেলা বিরত রেখে জনগণকে নিয়ে সাংবিধানিক পথে আসুক, রাজনীতির যুদ্ধ রাজনীতির ময়দানে হোক- এটাই দেশবাসীর একান্ত প্রত্যাশা।
বিদেশি চাপ : উদ্দেশ্য গণতন্ত্র নয়, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ
অতীত ও সাম্প্রতিক সময়ে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, সুপার পাওয়ার দেশগুলো সব সময় জাতীয় ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে কর্মপন্থা ঠিক করে। ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগে তাও নীতি-নৈতিকতা বিষয় বিবেচ্য ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশনীতি ছিল আমাদের মতো দেশগুলোর জনগণের জাতীয় স্বাধীনতার চেতনা ও সংগ্রামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এখন কিন্তু কোনো পক্ষেই নীতি-নৈতিকতার ব্যাপার নেই। জাতির স্বার্থ তাদের কাছে বড়, যা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘোষিত নীতি হচ্ছে, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো শক্তিকে প্রশ্রয়-আশ্রয় না দিয়ে অর্থনীতির কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া। বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক যে-কোনো বিরোধ শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাস্তবে বিশেষভাবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় জাতীয় স্বার্থ অনেক সময় বিগ পাওয়ারের দেশগুলোর বিপরীতমুখী হয়। তাদের প্রভাব অনেকটা সর্বব্যাপী হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে রাজনীতিতে।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে গ্যাস রপ্তানি নিয়ে বিএনপি ওয়াদা এবং আওয়ামী লীগের বিপরীতমুখী অবস্থান আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তখন ছিল এককেন্দ্রিক বিশ্ব, তাই যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। কিন্তু বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে যাওয়ায় আগের মতো বিশ্ব এখন আর সেই জায়গায় নেই। বিশ্ব এখন বহুধা বিভক্ত, বহু কেন্দ্র-উপকেন্দ্র গড়ে উঠছে। তাই সব দেশই তাদের উপযুক্ত ভারসাম্যের জায়গাটা খুঁজছে।
বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভারসাম্য বজায় রেখে অগ্রসর হতে পেরেছে বলেই দেশ আজ উন্নতি-অগ্রগতি বিবেচনায় বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে বিগ পাওয়ারগুলো বাংলাদেশকে স্ব-স্ব স্বার্থে চাপ দেবে- এটাই স্বাভাবিক। পঁচাত্তরে খাদ্য ও অর্থের চাপ এবং একবিংশ শতকের প্রথম বছরে গ্যাস রপ্তানির চাপের সময় আওয়ামী লীগ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি।
এবারেও জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে আমেরিকার ভিসা নীতি ও সেন্টমার্টিন চাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগকে আমেরিকার চাপ সামলাতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, মধ্য জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু সফরে আসার আগেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব (পূর্ব) সৌরভ কুমার ঢাকা আসছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমানভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে উঠছে, এটা তারই প্রমাণ। দেশের ভবিষ্যৎ কী রূপ নেবে এ চিন্তা রেখে প্রশ্ন হলো- আমেরিকা কি জনগণকে এমন আশ্বাস দিতে পারবে যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষিত হবে? উন্নয়নের পথে দেশ অগ্রসর হবে?
ইতোমধ্যে সেন্টমার্টিন চাওয়ার বিষয়কে আমেরিকা অস্বীকার করছে। কিন্তু এটা তো বহু পুরনো চাপ! প্রমাণ রেখে এসব কেউ বলে না-কি! কয়েকমাস আগে বিবিসি পরিবেশিত সংবাদের হেডিং ছিল- ‘চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তৈরি হচ্ছে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি’। সেই খবরের প্রতিবাদ আমেরিকা করেছে কী না জানি না। তবে এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকা কর্তৃত্ব ধরে রাখতে ঘাঁটি গড়তে অতীতেও চেয়েছে, ভবিষ্যতেও চাইবে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নিলে বিপদটা দেশের ঘাড়েই চাপবে।
ইতোমধ্যে র‌্যাবের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার দেড় বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্বাচনকে ইস্যু করে বাংলাদেশের জন্য নতুন করে আমেরিকা ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে মানবাধিকার ভোট নিয়ে যখন এত কিছু করছে আমেরিকা, তখন পাকিস্তানের রক্তাক্ত ঘটনা নিয়ে দেশটি নিশ্চুপ থাকছে। ফ্রান্সে গুলি করার আইন কিংবা বালক মৃত্যুর বেদনাদায়ক ঘটনার কী প্রতিবাদ করেছে দেশটি!
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে হেফাজতে মৃত্যু তথা ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ কাজে জড়িত থাকার অপরাধে র‌্যাব ও এর ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির পর, তা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ওই পদক্ষেপে বিএনপি মহল উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল। এখন যে ভিসা নীতি দেওয়া হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ বিএনপি কেন, সব দলই ওই নীতির আওতায় পড়তে পারে।
প্রশ্ন হলো- এই নীতি মেনে কতটা নির্বাচন হবে। ভিসা নীতি ঘোষণার পর মেয়র নির্বাচন ও উপনির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচন অবিতর্কিত হওয়ার এবং সংবিধান রয়েছে বিধায় আওয়ামী লীগ রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। বিএনপি পড়েছে বিপাকে। মাসের প্রথম দিনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আগেই বলেছি হরতাল-অবরোধের মতো কোনো কর্মসূচিতে সচেতনভাবে চাচ্ছি না। সহিংসতায় যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
এই বোধোদয় বিএনপির হঠাৎ জাগলো কেন? জনগণ বিএনপিকে বিকল্প ভেবে হরতাল-অবরোধে যেতে চায় না বলে না-কি ভিসা নীতির ভয় পেয়ে এ সুরে কথা বলছে। না-কি দুটো কারণই এখন বিএনপিকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলবে। এ-কথা বলার পর তিনি বলেন, ‘সরকার যদি কোনোভাবে ওইসব দিকে ঠেলে দেয়, তা সরকারের দায়।’
তিনি ‘সরকারের দায়িত্ব’ মন্তব্য করে বলেন, ‘আলোচনা করেই তারা একটি পথ বের করতে পারে। এটি খুব কঠিন কাজ না।’ প্রশ্ন হলো- সংবিধান সংশোধনের দাবি সরকার মেনে নেবে কেন? দাবি কি শিশুর হাতের মোয়া! চাইলেই হাতে এসে যাবে। ‘শেষ যুদ্ধ’ শুরু করার কথা ভাববেন আর সহজে মোয়া চাইবেন- এমনটা হতে পারে না। ২০০১-০৬ অপশাসন-দুঃশাসনের পর দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্য করে তুলতে পারলেন না, দাবি মানতে বা ক্ষমতায় যেতে চাইবেন- এমনটা তো আর হয় না।

জনগণ চায় সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন
সবশেষে বলতে হয়, উল্লিখিত রাজনৈতিক চালচিত্র প্রেক্ষাপটে রেখে দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে। এবারের নির্বাচন হবে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। জনগণ চায় সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন। চাপ কিংবা দায় তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের ওপরই রয়েছে। কোন দল সামনে কি ভূমিকা গ্রহণ করে, তা দিয়েই নির্ধারিত হবে নির্বাচন কী রূপ নিয়ে হবে, দেশ কোন পথে অগ্রসর হবে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য