Sunday, September 24, 2023
বাড়িকৃষিনান্দনিকতা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে অনিবার্য কাঠ

নান্দনিকতা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে অনিবার্য কাঠ

রাজিয়া সুলতানা: অপরূপ সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি আমাদের এই পৃথিবী। আবাসযোগ্য জমিনে সবুজ-শ্যামলময় প্রাণপ্রদায়ী উপাদানের অন্যতম বৃক্ষরাজি। প্রাণ বাঁচানোর প্রধানতম উৎস্যমূল বৃক্ষ। তাই মানবজীবনে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এক কথায় বৃক্ষহীন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তাই সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানুষের যাপিতজীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। মানব সভ্যতার শিখরে এসেও বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর বৃক্ষের নানা ব্যবহারে প্রতিটি সমাজই সমৃদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে কাঠের আসবাবের গুরুত্ব সর্বাগ্রে। বাংলাদেশসহ একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের ঐতিহ্য-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ফুটে ওঠে নান্দনিক কাঠের কারুকাজে। শিল্পের চরম বিকাশে কাঠের ব্যবহার আদি থেকে চলছে অন্তহীন। সেই কারণেই দেশের অর্থনীতিতে কাঠের তথা বনাঞ্চলের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের বেশি অর্থ এসেছে কৃষি ও বনায়ন খাত থেকে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। শুধু ফসল ফলিয়ে কৃষকরা জিডিপি’তে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অবদান রেখেছেন। হাঁস-মুরগি, গরুসহ গবাদিপশু পালনে সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বনায়ন হতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বনজ শিল্পের যদি কাঠের আসবাবপত্রের দিকে দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখি যে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের আসবাব রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এ অঙ্ক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ে ১৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আসবাবপত্র রপ্তানি হয়েছিল ৬ কোটি ৩১ লাখ ডলারের। এর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ আসবাব রপ্তানি করে ১ কোটি ৯২ লাখ ডলার আয় করেছিল। সেই হিসাবে ২০০৯-১০ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ পর্যন্ত ১০ অর্থবছরে আসবাব রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। সার্বিক বিবেচনায় অর্থনৈতিক হোক আর জীবন রক্ষার জন্যই হোক, বৃক্ষ রোপণের কোনো বিকল্প নেই। আজ যে বৃক্ষ নিয়ে আলোচনা করব, তা সকল বৃক্ষ নয়। কাষ্ঠল বৃক্ষ। অর্থাৎ যেসব বৃক্ষ থেকে আমরা কাঠ পেয়ে থাকি। আদিম হতে মানুষ যখন সভ্য হওয়া শুরু করল তখন থেকেই নিজেদের রক্ষা, আশ্রয়সহ বিভিন্ন কাজে কাঠ ব্যবহার শুরু করে। নিজেদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোন গাছের কাঠ কোন কাজে ব্যবহার করলে ভালো হয়, তা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে যেসব গাছ কাঠ গাছ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে তাদের একটি তালিকা দেওয়া হলো Ñ শাল, সেগুন, মেহগনি, চাপালিশ, গামারি, গর্জন তেলসূর, লোহা কাঠ, বাবলা, গজারি, শীল কড়াই, চিকরাশি, জাম, জারুল, কাঁঠাল, আকাশমনি, শিশু ইত্যাদি। যদিও চিরচেনা এই গাছগুলো রয়েছে আমাদের আশপাশে, তারপরও এদের সম্পর্কে স্বল্পবিস্তর আলোচনা করা হলো Ñ
শাল : শাল বাংলাদেশের একটি পরিচিত গাছ। অনেক সময় এটি গজারি নামেও পরিচিত। দেশের উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, ঢাকার সাভার, জয়দেবপুর ও মধুপুর এলাকায় শালগাছ ভালো জন্মে। গোড়া থেকে চারা গজায় বলে ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে শালকে গজারি বলে। শালগাছ পাহাড়ি এলাকা, এমন কী হিমালয় অঞ্চলে ৫ হাজার ফুট উচ্চতায়ও জন্মে। মূলত মধ্য ভারতের একটি বৃক্ষ প্রজাতি। শালগাছ সরল ও লম্বা। শাখা-প্রশাখা খুব কম। শাল কাঠ খুবই শক্ত, মজবুত ও ভারবাহী। কাঠের রং খয়েরি, তবে কাটার পর আস্তে আস্তে প্রায় কালো হয়ে যায়। কাঠ ভালো পলিশ নেয় না, তাই এই কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানানো যায় না। কিন্তু ঘর তৈরির কাজে এবং যেখানে মজবুত কাঠের প্রয়োজন সেখানে শাল কাঠ ব্যবহার হয়ে থাকে। রেললাইনের সিøপার, মাটি ঠেকানোর জন্য খুঁটি, নৌকা তৈরিতে শাল কাঠ ব্যবহার করা হয়। এজন্য সরকারি উদ্যোগেই শাল বাগান করা হয়। শালের বীজ থেকে এক ধরনের স্নেহ পদার্থ পাওয়া যায়, যা রান্না ও চকলেট তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। শাল পাতার ঠোঙা বহুল ব্যবহৃত। গাছ থেকে এক ধরনের আঠা পাওয়া যায়, যা ধুনো-ধূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধুনো আগুনে জ্বালালে যে ধোঁয়া হয় তা জীবাণুনাশক ও সুগন্ধিযুক্ত। বাতাসে রোগের-জীবাণু ছড়িয়ে পড়লে শালের ধুনো সেই জীবাণু নষ্ট করে দেয়। শাল গাছের পাতা, আঠা ও কচি কাঠ ক্রিমি দূর করতে, গনোরিয়ার চিকিৎসায়, ফোঁড়া পাকাতে, চুলকানি সারানোসহ বিভিন্ন অসুখে উপকারী। সার্বিকভাবে শালে তেমন রোগবালাই নেই বললেই চলে।
সেগুন : সেগুন নিরক্ষীয় ও ক্রান্তিয় অঞ্চলের গাছ। কাঠ বেশ শক্ত, বার্নিসের পর খুব সুন্দর দেখায়, তাছাড়া ঘুণপোকাও ধরে না, তাই আসবাবপত্র বানাতে এই কাঠ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষত ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে এই গাছ পাওয়া যায় ও বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষ করা হয়, যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলো আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশসমূহ। তবে পৃথিবীর মোট সেগুন কাঠের জোগানের এক-তৃতীয়াংশই আসে মিয়ানমার থেকে। ১৮৭১ সালে প্রথম চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে এই গাছ বপন করা হয়। পরে ১৮৭৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট বনাঞ্চলে সেগুন লাগানো শুরু হয়।
মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। ২০-৩০ মিটার উঁচু। গুণগত বিচারে কাঠের মধ্যে সেগুন সর্বোত্তম। প্রথম কাটা কাঠ সোনালি হলুদ বর্ণের, ক্রমে তা গাঢ় রং ধারণ করে। কাঠ খুবই শক্ত, দৃঢ়, ভারি, টেকসই এবং উত্তম পালিশযোগ্য। আসবাবপত্র তৈরিতে সেগুন কাঠের ব্যবহার বেশি। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ, বাড়ির দরজা-জানালা, রেলের বগি, বাদ্যযন্ত্র, জাহাজের মাস্তুল ইত্যাদি তৈরিতে এই কাঠ ব্যবহার করা হয়। কচি পাতা এবং মূলের বাকল থেকে লাল রং তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রাপ্ত বছরে মোট প্রায় ৬০ লাখ ৬৫ হাজার ঘনফুট কাঠের মধ্যে একটি বড় অংশ আসে সেগুন গাছ থেকে। চাষের ক্ষেত্রে বড় প্রাপ্তি সেগুনের তেমন কোনো রোগবালাই নেই বললে চলে।
গর্জন : গর্জন সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ। সুন্দরবনের নদী ও খালের তীরে এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। এই গাছটি অস্ট্রেলিয়া (কুইন্সল্যান্ড এবং উত্তরাঞ্চলীয় অংশে), গুয়াম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মাইক্রোনেশিয়া, নিউ ক্যালিডোনিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলংকা, তাইওয়ান, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ভানুয়াটু এবং ভিয়েতনামে দেখা মিলে।
গর্জন মূল্যবান কাঠের গাছ হিসেবে পরিচিত। তবে কাঠের জন্য বিখ্যাত হলেও গর্জন ফুলের সৌন্দর্য উপেক্ষা করা কঠিন। উচ্চতার দিক থেকে ৪০-৫০ মিটারের মতো উঁচু। গাছের আঠা সাদা রঙের। গর্জনের কাঠ লালচে বাদামি রঙের। আলসার ও দাদ নিরাময়ে এই গাছের কষ ব্যবহৃত হয়। কাঠের তেল উৎকৃষ্টমানের জ্বালানি ও ঘুণপোকা নিরাময়ে কাজে লাগে।
চাপালিশ : প্রায় বিপন্ন উদ্ভিদ চাপালিশ। চাম্বল, চাম্বুল, চাম, কাঁঠালি চাম হিসেবেও পরিচিত। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রাকৃতিক অবস্থায় চাপালিশের বংশ বৃদ্ধি সীমিত হয়ে গেছে। চাপালিশ ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ডাল ভাঙলে দুধের মতো ল্যাটেক্স বের হয়। ভারতের সিকিম, আসাম ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এই গাছ জন্মে। বাংলাদেশে মধুপুর, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের বনভূমিতে পাওয়া যায়। চাপালিশ গাছের ফল খাওয়া যায়। স্বাদে হালকা টক-মিষ্টি। বীজ আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া যায়। স্বাদে আনেকটা চীনাবাদামের মতো। ফল হাতির খুবই প্রিয় খাবার। সারি কাঠ মূল্যবান, হলুদাভ বাদামি, শক্ত, মজবুত, টেকসই ও মসৃণ।
গামারি : বাংলা নাম গামার, গাম্বার। ভারতবর্ষের গাছ। লম্বা গড়নে ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জন্মে। ভারতের আসাম, দক্ষিণ বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় এই গাছ জন্মে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গামারি জন্মায়, তবে চিটাগাং গামারির মতো এত উন্নত হয় না। চিটাগাং গামারি একটু ঘিয়ে রঙের কাঠ। চিটাগাং গামারির বাঁকা হওয়ার প্রবণতা অনেক কম। এর মধ্যে ময়েশ্চার অনেক বেশি থাকে। সিজন করতেও নরমাল কাঠের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগে। ঠিকভাবে সিজন না হলে এই কাঠের দরজা ফাঁক হবেই। এই কাঠে কখনও পোকা ধরে না। অন্যান্য কাঠের তুলনায় এটা একটু হাল্কা। যেহেতু এই কাঠটা একটু হাল্কা, সে জন্য এই কাঠ দিয়ে ভিতরের দরজাগুলো বানানো হয়।
এই কাঠের একটাই সমস্যা, এটিতে পোকা খাওয়া থাকে, যাকে আমরা করাই কাটা বলে থাকি। দরজা বানানোর শেষে পোকা খাওয়া জায়গাগুলো ডাস্ট ও সুপার-গ্লু দিয়ে নিখুঁতভাবে রিপেয়ার করতে হয়। এই কাঠের দাম যশোরের মেহগনির চেয়ে একটু বেশি।
আমরা সকলেই জানি যে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ও জলবায়ুর প্রয়োজনে দেশের মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অত্যাবশ্যক। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশ। তাই আর দেরি না করে যেখানে যতটুকু জায়গা পাই সেখানেই গাছ লাগাই। ভবিষ্যৎ বংশধরদের বেঁচে থাকার পথ সুগম করি।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য