Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderনতুন বছরের আলোচিত প্রযুক্তি ‘চ্যাটজিপিটি’

নতুন বছরের আলোচিত প্রযুক্তি ‘চ্যাটজিপিটি’

চ্যাটজিপিটি রচনা লিখতে পারে, চাকরির বা ছুটির আবেদন, চুক্তিপত্র, কোনো ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা, ছোটখাটো প্রতিবেদন তৈরি করে দিতে পারে। এটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, গান বা কবিতাও লিখে দিতে পারে
ব্যবহারকারীর জন্য।

সালেহীন বাবু: ‘চ্যাটজিপিটি’ গুগলের মতোই সার্চ ইঞ্জিন। গত বছরের নভেম্বরে তৈরি হওয়ার পর সারাবিশ্বেই এখন ‘চ্যাটজিপিটি’ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শুধু জানুয়ারি মাসেই বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি মানুষ চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছে। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি চ্যাটবট সিস্টেম বা আলাপচারিতা করার অ্যাপলিকেশন।
চ্যাটজিপিটির পূর্ণ রূপ হচ্ছে চ্যাট জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফর্মার। এটি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি অ্যাপলিকেশন যাকে বলা হয় ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল টুলস’। এটি চালু করেছে ওপেনএআই। ওপেনএআই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানি, যার একজন প্রতিষ্ঠাতা হলেন ধনকুবের ইলন মাস্ক।
চ্যাটজিপিটি রেসিপি থেকে শুরু করে গণিত সমাধান, ভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট, রিপোর্টের সব ধরনের তথ্য পাবেন এ চ্যাটবটে। এমন কী এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চ্যাটবট আপনার রিপোর্ট-প্রেজেন্টেশন তৈরি করে দেবে মুহূর্তেই। চ্যাটজিপিটি রচনা লিখতে পারে, চাকরির বা ছুটির আবেদন, চুক্তিপত্র, কোনো ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা, ছোটখাটো প্রতিবেদন তৈরি করে দিতে পারে। এটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, গান বা কবিতাও লিখে দিতে পারে ব্যবহারকারীর জন্য।
সফটওয়্যারের পাশাপাশি কনটেন্ট ও কপিরাইটারের কাজও করতে পারে চ্যাটজিপিটি। যেমন তাকে যদি বলা হয় ‘মিস্টার আলীর জন্য একটি কাভার লেটার লিখে দাও, তিনি পেশায় সাংবাদিক এবং আবেদন করছেন সিনিয়র সাব-এডিটর পদে’, তাহলে চ্যাটজিপিটি চমৎকার কাভার লেটার মুহূর্তেই লিখে দিতে সক্ষম। একইভাবে পণ্য ও সেবার বিস্তারিত বিবরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টের জন্য ক্যাপশন, কপিরাইট নোটিস, এমন কী যে কোনো বিষয়বস্তুর ওপর পূর্ণাঙ্গ ব্লগ পোস্ট বা পোস্টের কিছু অংশ লিখতে সক্ষম চ্যাটজিপিটি। মূলত পুরো পোস্টের চেয়ে লেখা শুরু করার জন্য বিষয় নির্বাচন, ভূমিকা লেখা বা পোস্টের প্রথম ড্রাফট তৈরির জন্যই চ্যাটজিপিটিকে কাজে লাগাচ্ছেন লেখকরা।
গবেষণায়ও চ্যাটজিপিটি কাজে লাগানো সম্ভব। যে কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার জন্য চ্যাটজিপিটি অত্যন্ত কাজের, তার চেয়েও বড় সুবিধা সে-বিষয়ে কী কী গবেষণা করা যেতে পারে, সেটিও চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করলে পাওয়া যাবে তালিকা। এরপর সম্ভাব্য গবেষণার বিষয়বস্তু নির্বাচন করে, সেটির হাইপোথেসিস কী হতে পারে সেটিও চ্যাটজিপিটি লিখে দিতে পারে। হাইপোথেসিসটি কী উপায়ে পরীক্ষা করা যায়, সেটিও চ্যাটজিপিটি বলে দিতে সক্ষম। যেমন যদি বলা হয় অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপের সঙ্গে অবসাদের সম্পর্ক নিয়ে কী গবেষণা করা যেতে পারে, চ্যাটজিপিটি হয়তো বলবে হাইপোথেসিস হবে ‘পরীক্ষার সময়ের বাড়তি স্ট্রেসের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ বৃদ্ধি পায়।’ এরপর বলবে গবেষণার তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ থেকে সেরা কিছু ছাত্র-ছাত্রী এবং কিছু সাধারণ ফলাফলের ছাত্র-ছাত্রীর স্যাম্পল নিয়ে, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে তাদের রক্তে কর্টিসোলের মাত্রা এবং মানসিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। এরপর তাকে তথ্যগুলো কীভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, সেটির একটি ‘আর’ সফটওয়্যারের কোড লিখে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলে সেটিও চ্যাটজিপিটি দিতে সক্ষম। এছাড়া গবেষণাপত্রের ভূমিকা এবং ভেতরের কিছু লিটারেচার রিভিউও চাইলে চ্যাটজিপিটি লিখতে পারে। তবে অনেক ছাত্র তাদের অ্যাসাইনমেন্ট, বইয়ের ওপর রিপোর্ট বা বড়সড় রচনা চ্যাটজিপিটি কাজে লাগিয়ে তৈরি করতে পারেন। সেগুলো রুখে দিতে ওপেনএআই নিজেরাই তৈরি করেছে এক সেবা, যাতে শিক্ষকরা চ্যাটজিপিটি কাজে লাগিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট করা হয়েছে কী না সেটি পরীক্ষা করতে পারেন। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি মেধা বিকাশে বিঘ্ন ঘটাতে পারেÑ এমন শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলে নিষিদ্ধ হলো ‘চ্যাটজিপিটি’।
চ্যাটজিপিটি চালাতে আপনাকে .ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। প্রথমে OpenAI ওয়েবসাইটে যান : https://openai.com/, এরপর Sign up বা Register বাটনে ক্লিক করুন। এখন একটি ফর্ম আসবে। সেখানে নাম, ই-মেইল ঠিকানা এবং পাসওয়ার্ড লিখে ফিলআপ করুন। আপনার ই-মেইল আইডিতে একটি ভেরিফাই লিঙ্ক আসবে। এরপর আপনার মেইল থেকে OpenAI থেকে পাঠানো ই-মেইলটি খুলে, সেখানে থাকা ভেরিফায়েড লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে। অ্যাকাউন্ট ভেরিফায়েড হয়ে গেলে আপনি OpenAI-এর সেবাগুলো ব্যবহার করতে পারেন। হয়ে গেল আপনার অ্যাকাউন্ট ওপেন। এরপর আপনিও চ্যাট জিপিটিতে আপনার যে কোনো প্রশ্ন থাকলে করে ফেলতে পারেন।
চ্যাটজিপিটির মূল সীমাবদ্ধতা, ২০২১ সালের পর কোনো নতুন তথ্য এতে দেওয়া হয়নি। তাই সর্বশেষ ঘটনাবলি আবিষ্কার এবং সংবাদের ওপর ভিত্তি করে কিছু করা সম্ভব নয়। সঙ্গে এর নির্মাতারা বারবার জানিয়েও দিয়েছেন, চ্যাটজিপিটি অঙ্কের জন্য একেবারেই কার্যকর নয়। কেননা এটি চট করে গাণিতিক ভুল ধরতে পারে না। তাই ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে বারবার।
বাংলাদেশের অনেক এজেন্সি ও ফ্রিল্যান্সার যেহেতু অ্যাডমিন সাপোর্ট, গ্রাহকসেবা এবং কল সেন্টারের সেবা দিয়ে আসছে, তাদের চাকরির বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে। আবার সফটওয়্যার তৈরির কাজ যারা করছেন, তাদের কাজের পরিধি বাড়বে। যেহেতু এই চ্যাটজিপিটি এবং এ-ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার জনপ্রিয় হচ্ছে, তাই এগুলো ব্যবহার করে নতুন নতুন অ্যাপ তৈরি করা যাবে। বাজারে এ-ধরনের অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের চাহিদা তৈরি হবে। তাই কেউ যদি নিজেকে এসব বিষয়ে দক্ষ করে তোলেন, তাহলে ভবিষ্যতে ভালো করতে পারবেন।
সম্প্রতি জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইট ফাইভআর কাজের নতুন বিভাগ যুক্ত করেছে। এই বিভাগের মধ্যে রয়েছে চ্যাটজিপিটি অ্যাপ্লিকেশন, মিডজার্নি আর্টিস্ট, চ্যাটবট ডেভেলপার ইত্যাদি। এসবই হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি নতুন প্রযুক্তি।
গুগলও চ্যাটজিপিটির মতো বার্ড নামের একটি চ্যাটবটের ঘোষণা দিয়েছে। এত বছর যারা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন নিয়ে কাজ করতেন, তাদের এখন এআই-সম্পর্কিত কাজগুলোর জন্যও অপটিমাইজেশন করতে হবে। তাই কাজের পরিধি কিছু ক্ষেত্রে কমলেও অনেক ক্ষেত্রেই বেড়ে যাবে। দরকার শুধু নিজেকে নতুন বিষয়ে দক্ষ করে তোলা।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য