Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderনতুন ন্যায়সংগত বিশ্ব গড়তে সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

নতুন ন্যায়সংগত বিশ্ব গড়তে সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

মে দিবসের রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে আমেরিকায়। আর দিনটি পালনের ঘোষণা আসে ইউরোপ থেকে। এ বিবেচনায় প্রথম থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। এমন রূপ নেওয়াটা আকস্মিক ছিল না।

শেখর দত্ত

এক
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস মে দিবস পালিত হয়ে গেল। বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৩৩ বছর ধরে। আমাদের এই মানচিত্রে প্রথম পালিত হয় ৮৬ বছর (১৯২৭ সালে কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলে) আগে। এত সুদীর্ঘ বছর ধারাবাহিকভাবে বিশ্বব্যাপী দিবস পালনের উদাহরণ আর নেই। কেবল সময়ের দিক থেকে নয়, সার্বিক বিচারে দিবসটি সর্বমানবের মিলনের চেতনায় লালিত ও উদ্ভাসিত। সৌহার্দ্য, একাত্মতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জ্বল এবং অনন্য।
রাষ্ট্র বা সমাজ-জীবনের মেঘ বা অন্ধকার একে আড়াল বা উৎখাত করতে পারেনি। অবস্থা অনুকূল কিংবা প্রতিকূল যা-ই হোক না-কেন, যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত জনতার স্বপ্ন তথা শ্রমের অধিকার ও অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী ঐতিহ্য ও সুমহান বাণী বহন করছে বলে এ দিনটির মৃত্যু নেই।
জাতি হিসেবে আমরা গর্ব করতে পারি এজন্য যে, দিনটি আমাদের জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেবল শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষেরা নয়, দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল জনগণও শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশের জন্য দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে। পাকিস্তান আমলে ও মুক্তিযুদ্ধে দিবসটি আমাদের জাতির জীবনে ঐক্যবদ্ধ থেকে সংগ্রাম-আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
পাকিস্তানি কারাগারের ফাঁসির মঞ্চের সামনে থেকে স্বাধীন স্বদেশে বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন সুদীর্ঘ বছরের লড়াই-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে ‘গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের কাজ। আমাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য ও চেতনা এবং পরিকল্পনা-কর্মসূচির সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ হওয়ায় তিনি মে দিবস সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।

দুই
পঁচাত্তরের আগস্টের সেই নিষ্ঠুর ও রক্তাক্ত কালরাত্রির পর রাজনৈতিক ক্ষমতার উল্টোমুখী পটপরিবর্তন হয়। দেশ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে চলে যায় যথাসম্ভব পাকিস্তানি ধারায়। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ স্লোগান এবং ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে তুলে লুটপাটের অর্থনীতি চালু করা হয়। মন থেকে মুখ যার পৃথক, মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট যার, তারই প্রয়োজন হয় মুখোশের।
১৯৭৬-এর মে দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অস্ত্রসহ উর্দি পরে সরাসরি ক্ষমতা দখলের হীন উদ্দেশ্যে জনগণকে ভাঁওতা দিতে সামরিক কর্তা জিয়াউর রহমানের ‘আমরা সবাই শ্রমিক’ কথাটা তাই দেশবাসী স্মরণে রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় হত্যা-ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে আরেক সেনাশাসক বসেন ক্ষমতার উচ্চাসনে। দেশ পড়ে টাউটবাজদের খপ্পরে।
পরিণতিতে শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ হয় সবচেয়ে শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিতে আশির দশকে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক শ্রমিক ঐক্য। শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, স্কপ আমাদের দেশের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনের সর্বোচ্চ রূপ। জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়নের জন্য মালিক ও সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তার আন্দোলন ও আলোচনায় দরকষাকষিতে স্কপের আন্দোলন ইতিহাস অমোচনীয় কালিতে লিপিবব্ধ রাখবে। বলাই বাহুল্য, এই ইতিহাস রচিত হয়েছে মে দিবসের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংগ্রামের পথ ধরে।
দেশের মধ্যে যখন এসব ঘটে চলেছে তখন বিশ্বব্যাপী হতে থাকে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিকভাবে যুগান্তকারী সব পরিবর্তন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। পরিবর্তনের গতি ও উল্লম্ফনের রূপ কল্পনাকেও হার মানায়। ভেঙে পড়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা। এককেন্দ্রিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার ধারণা দেখা দিয়ে যায় বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে।
সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগের বিশ্ব এখন আর নেই। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব-শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন-নিপীড়নমুক্ত বিশ্ব, যা সমাজতন্ত্র শব্দের ভেতর দিয়ে অভিব্যক্ত, অবস্থাদৃষ্টে তা এখন ‘দূরের বাদ্য’। এদিকে জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, গোত্র-বর্ণে হিংসা, দ্বেষ, দম্ভ ও বিবাদ ক্রমে বাড়ছে। রক্ত ও লোভের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে উন্মত্ত এই পৃথিবী।
কোভিড-দুর্যোগ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও পরিণতিতে বাণিজ্যযুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে, শ্রমিক-শ্রমজীবীসহ কর্মজীবী জনগণের জীবন-জীবিকার অধিকার ও নিশ্চয়তা বিশ্বব্যাপী যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরে রয়েছে। বিশ্বব্যবস্থার বাইরে নেই বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবে ঝড়-ঝাপটার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দুর্দশা-দুর্ভোগের প্রচণ্ড চাপ যে সইতে হচ্ছে, শ্রমিক-শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের, তা বোধকরি থাকবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
দেশের জাতীয় মূলধারার প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দল স্বাধীনতার পর দেশবাসীকে ‘গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মুখোমুখি করেছিল। জাতীয় চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর দেশকে দাঁড় করাতে প্রয়াসী হয়েছিল। এভাবেই মে দিবস হয়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্য ও চেতনার প্রতীক।
১৯৭২ সালে জাতির উদ্দেশ্যে মহান মে দিবস পালনের দিনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দেশ আজ স্বাধীন। সম্পদের মালিক আজ জনগণ। তাই কোনো শ্রেণি-বিশেষের লোভ-লালসার জন্য, এ লোভ চরিতার্থ করার নিমিত্ত এই সম্পদকে অপচয় করতে দেওয়া হবে না। লক্ষ্য হচ্ছে সমাজতন্ত্র কায়েম করা। এ ব্যবস্থায় দেশের সমুদয় উৎপাদিত ও প্রাকৃতিক সম্পদ কৃষক, শ্রমিক ও সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করা হবে। যদিও বাধা অনেক, তবু লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের এগিয়ে যেতেই হবে।’
জাতি হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু তার বাণী ও আদর্শ তো চিরন্তনী। আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে সব পাল্টে গেছে, যাচ্ছে। কিন্তু তার আদর্শের নির্যাস বা মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীর তো জাতির চলার পথের পাথেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে মে দিবসের বাণীতে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম করে যাচ্ছে।’

তিন
মে দিবসের রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে আমেরিকায়। আর দিনটি পালনের ঘোষণা আসে ইউরোপ থেকে। এ বিবেচনায় প্রথম থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। এমন রূপ নেওয়াটা আকস্মিক ছিল না। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের বিকাশ এবং শ্রমিক আন্দোলনের এক বিশেষ পটভূমিতে মে দিবসের আবির্ভাব ঘটে।
শিল্প বিপ্লব ও ইউরোপের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পটভূমিতে সামন্ততন্ত্রের পতন ও পুঁজিবাদী সমাজ বিকশিত হওয়ার ভেতর দিয়ে ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার গতি ও বিস্তৃতিকে তরান্বিত করে। এ ব্যবস্থা পুঁজিপতি এবং শ্রমিক- দুটো শ্রেণিকে সমাজের বুকে নিয়ে আসে। পুঁজিপতিরা হয় ধনসম্পদ, কাঁচামাল ও কল-কারখানার মালিক এবং সহায়-সম্বলহীন শ্রমিকদের কল-কারখানায় কাজ করা ছাড়া বেঁচে থাকার কোনো উপায় থাকে না।
প্রথম থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বিবিধ রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। একদিকে যাদের কিছু নেই তাদের বেঁচে থাকার জন্য কর্মসংস্থান বাড়ে, কাজের ক্ষেত্র স্থির করার বিষয়ে স্বাধীনতা সৃষ্টি হয়; উল্টোদিকে মুনাফা ও লাভের জন্য নিদারুণ এক অমানবিকতা ও বর্বরতার শিকার হয় শ্রমিকরা। প্রথম দিকে অমানবিকতা ও বর্বরতা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা শ্রমিকরা জানত না। কাজের সময় ও অধিকারের কোনো বালাই ছিল না। মজুরি দিয়ে শ্রমিক ও তার পরিবারের খাবার জুটত না। সর্বোপরি মেশিনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হতো বলে দম ফেলার সয়মটুকুও মিলত না।
এ অবস্থা থেকে শ্রমিকরা মুক্তি পেতে চাইত। তারা মনে করত যন্ত্রদানবই তাদের শত্রু। ফলে শ্রমিকরা শুরু করে মেশিন ভাঙার ও কল-কারখানায় আগুন দেওয়ার আন্দোলন। ১৭৬০ সাল থেকে এই আন্দোলন শুরু হয়। ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের ‘রূপকথার রাজা বা সেনাপতি’ নেড লুড এই ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। তার নামানুসারে এই আন্দোলন ইতিহাসে ‘লুডাইট আন্দোলন’ নামে সুপরিচিত।
অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই আন্দোলন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এ আন্দোলন চলতে থাকে। এ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শ্রমিকরা বুঝতে পারে, কল-কারখানায় আগুন ও কারখানায় আগুন দিয়ে তাদের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। কেবল দুর্দশাকে বাড়িয়ে তুলবে। মালিকদের সঙ্গে লড়াই-সমঝোতা-লড়াই করে ন্যায্য অধিকার আদায় করে বেঁচে থাকতে হবে।

চার
লুডাইট আন্দোলন চলার মধ্যে শ্রমিকদের ধর্মঘট আন্দোলন শুরু হয়। মালিক ও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে বা দমন-পীড়ন দিয়ে বন্ধ করার প্রচেষ্টা চলে। ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে আইন পাস হয়।
ধর্মঘট আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ক্রমে শ্রমিকরা ক্লাব বা ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। বিপদ বা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে শ্রমিকরা তাদের স্বল্প আয় থেকে অর্থ বাঁচিয়ে ছোট ছোট সমবায় অর্থভাণ্ডার গড়ে তোলে। সদস্য হওয়ার জন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক চাঁদা একটি বিশেষ বাক্সে জমা রাখা হতো। প্রথম দিকে জমা সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক ছিল না। এদের বলা হতে থাকে ‘বক্স ক্লাব’।
এভাবে সংগঠিত হওয়ার ভেতর দিয়ে শ্রমিকরা ক্রমে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হয়। বিদ্যমান বাস্তবতা মেনে নিয়ে সভা-সমাবেশ-মিছিল-প্রচার ও ধর্মঘট আন্দোলনের ভেতর দিয়ে দরকষাকষির মাধ্যমে কীভাবে আরও অর্থনৈতিক-সামাজিক-নিরাপত্তামূলক অধিকার আদায় করা যায়, সেটিই হয় ট্রেড ইউনিয়নের লক্ষ্য। ক্রমে ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপক ও তীব্র হয়ে ওঠে।
এতে মালিক ও সরকারগুলোর টনক নড়ে। ১৭৯৯-১৮০০ সালে ইংল্যান্ডে, ১৮৩০-১৮৪৭ ফ্রান্সে ও ১৮৪৭ সালে জার্মানিতে নানা ধরনের আইন করে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে অকেজো করে রাখার চেষ্টা হয়। এ প্রেক্ষাপটে শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে শ্রমিকরা রাজনৈতিক আন্দোলনে এগিয়ে আসে। মার্কস-এঙ্গেলস সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের তত্ত্ব উত্থাপন করেন। আওয়াজ ওঠে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। শ্রমিক-শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হয় লক্ষ্য।
এ তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৮৬৪ সালে ‘শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি’ বা ‘ফাস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয় এবং ইউরোপের দেশে দেশে এই সংগঠন শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে গড়ে ওঠে। ১৮৭৬ সালে এই সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে। এ সংস্থার প্রভাবে ১৮৭০ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সের শ্রমিকরা ক্ষমতা দখল করে, যা প্যারি কমিউন হিসেবে ইতিহাসে সুপরিচিত। ৭১ দিন ক্ষমতা ধরে রাখার পর প্যারি কমিউনের পতন ঘটে।
উল্লিখিত তত্ত্ব ১০০ বছর পরও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এতটা প্রভাবিত করে যে, এই স্লোগান নিয়ে শ্রমিক ও শহর-গ্রামের শ্রমজীবীরা স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের সংবিধানের ২০ নম্বর ধারায় ১ নম্বর উপধারায় মার্কসের হুবহু বাক্য যুক্ত করেন। বলা হয়, ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতা অনুসারে এবং প্রত্যেকের কর্মানুয়ায়ী’ পারিশ্রমিক লাভ করার নীতি কার্যকর করা হবে।

পাঁচ
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে প্যারি কমিউন পর্যন্ত ইউরোপব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিপ্লববিরোধী শক্তি তীব্র দমন-পীড়ন ও শ্বেত সন্ত্রাস চালায়। ফলে দলে দলে ইউরোপ থেকে নেতারাসহ শ্রমিক ও শ্রমজীবীরা আমেরিকা গমন করেন। এদের মাধ্যমে সংগ্রামী চেতনা আমেরিকায় প্রসারিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৮৬৬ সালে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের ৬০ হাজার শ্রমিক প্রতিনিধিকে নিয়ে ‘ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা পায়।
লোহা ঢালাই শ্রমিক তরুণ নেতা উইলিয়ম এইচ সিলভিস এই সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে নেতৃত্ব দেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সংগঠন সর্বপ্রথম ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবি উত্থাপন করে। ৪১ বছর বয়সে তার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে এই সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে। ইতোমধ্যে জন সুইনটন নামে এক সাংবাদিকের সাপ্তাহিক পত্রিকা ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবিকে জনপ্রিয় করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’।
এই সংগঠন ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে ধর্মঘট আহ্বান করে। তখনও বিরোধিতাকারীরা ছিল। অপর ফেডারেশন ‘নাইটস্ অব লেবার’ এই কর্মসূচির বিরোধিতা করে। কিন্তু শ্রমিকরা সেøাগান তোলে : ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন। ক্রমে এই দাবি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিকরা মালিকদের কাছ থেকে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়। মজার ব্যাপার, জুতা কারাখানায় ৮ ঘণ্টা দাবি কার্যকর হলে, তার নাম হয় ‘৮ ঘণ্টা জুতো’। এভাবে চুরুট কারখানার পণ্য হয় ‘৮ ঘণ্টা চুরুট’। চারদিকে ‘৮ ঘণ্টা উন্মাদনা’ ছড়িয়ে পড়ে।
১ মে প্রচণ্ড বিরোধিতা ও অপপ্রচারের মধ্যে অভাবিত আলোড়ন তুলে ধর্মঘট পালিত হয়। শিকাগো ছিল শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২ মে ছিল রবিবার। এইদিন আন্দোলনের আরও বিস্তৃতি হয়। ৩ মে ধর্মঘট জঙ্গি রূপ ধারণ করে। ম্যাককর্মিক ফসল কাটার কারখানায় সভা চলাকালে শ্রমিকদের ওপর দালাল ও পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে ছয়জন নিহত ও বহু আহত হয়।
এর প্রতিবাদে ৪ মে মঙ্গলবার হে মার্কেট স্কোয়ারে বিশাল প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশের এজেন্ট সমাবেশে বোমা নিক্ষেপ করে। লাঠি এবং গুলিও চালানো হয়। এতে চার শ্রমিকসহ বহু আহত হয়। সাত পুলিশও নিহত হন। এ ঘটনাই ইতিহাসে ‘হে মার্কেটের ঘটনা’ হিসেবে সুপরিচিত। এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনার ভেতর দিয়ে মে দিবসের আবির্ভাব ঘটে।
কয়েকদিনের মধ্যে পাঁচ শ্রমিক নেতা মাইকেল স্কোয়াব, জর্জ এঞ্জেল, অ্যাডলফ ফিসার, লুই লিংগে, সামুয়েল ফিলাডেন ও অস্কার নিবে-কে গ্রেফতার করা হয়। বিচারের দিনে শ্রমিক নেতা পার্সনস আত্মসমর্পণ করেন। তিনি ছিলেন জন্মগতভাবে আমেরিকান। বাকিরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের। বিচারে পার্সনস, স্পাইজ, ফিসার নিবে-কে ফাঁসি দেওয়া হয়। আগেই লিংগেকে জেলের ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যরা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করেন। এ বিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়।
১৯৮৮ সালে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’ শিকাগোর শ্রমিক ভাইদের স্মরণ, ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবি আদায় ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি প্রকাশের জন্য ১৮৯০ সালে ১ মে দিবস পালনের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৮৯ সালের ১৪ জুলাই, ফরাসি বিপ্লবের শততম বার্ষিকীতে ইউরোপ-আমেরিকার ২০টি দেশের শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে শ্রমিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ওই কংগ্রেসে ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’ গঠিত হয় এবং পরের বছর ১৮৯০ সালে মে দিবস পালনের ঘোষণা দেয়।
১ মে ১৮৯০ দিনটি ছুটির দিন ছিল না। পরিস্থিতি বিবেচনায় ধর্মঘট করে দিবসটি পালন করার পক্ষে ছিল না ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়ন ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা। ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির শ্রমিকরা ধর্মঘট করে দিবসটি পালনের পক্ষে অটল থাকে। এ-কারণে প্রস্তাবে বলা হয়, যে দেশে যে অবস্থা দাঁড়াবে, সেই অবস্থা অনুযায়ী প্রচার আন্দোলন, বিক্ষোভ প্রদর্শন প্রভৃতি সংগঠিত করতে হবে। এভাবে বিশ্বের দেশে দেশে প্রতি বছর মে দিবস পালিত হতে থাকে। তবে আমেরিকায়, যে দেশে মে’র রক্তক্ষয়ী মে দিবসের আবির্ভাব হয়েছে, সেই দেশ ও কানাডায় মে দিবস পালন করেন না। সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়।

ছয়
শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন মালিকদের সঙ্গে সংগ্রাম-সমঝোতা-সংগ্রাম করে অগ্রসর হয়েছে। তবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কেবল শ্রমিকদের অর্থনৈতিক-সামাজিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, না-কি তা শ্রমিক-শ্রেণির ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, ‘আঁতুড়ঘর’ হবে; তা নিয়ে বিতর্ক সব সময়ই ছিল। এভাবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ‘বিপ্লবী’ ও ‘সংস্কারবাদী’তে ভাগ হয়ে যায়।
বিংশ শতকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভেতর দিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বের বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লবী রাজনীতির ধারায় ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠতে থাকে। বিপ্লবী ধারায় উজ্জীবিত হয়ে শিক্ষিত তরুণ-যুবকরা এই আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনে প্রথম থেকে ঐক্যের ধারা প্রধান থাকলেও বিভক্তি ছিল, মালিকদের দালাল ইউনিয়ন ছিল। কিন্তু ক্রমেই রাজনৈতিক দলভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন দাঁড়াতে থাকে।
এদিকে বিংশ শতকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা যত বাড়তে থাকে, ততই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন আন্তর্জাতিক রূপ নিতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হলে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জীবনে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ভূমিকা স্বীকার করে নেওয়া হয়। ১৯১৯ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন-আইএলও’ প্রতিষ্ঠা পায়।
অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে এই সংগঠনের মর্যাদা ও প্রয়োজন এতটা ছিল যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লীগ অব নেশনস ভেঙে গেলেও এই সংগঠন সক্রিয় থাকে। পরে ‘ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশন-ইউএনও’ প্রতিষ্ঠিত হলে আইএলও ওই সংস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা সুরক্ষা ও উন্নত করার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক-সরকার-মালিক সম্পর্কে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এই সংগঠন ভূমিকা রেখে চলেছে।

সাত
স্বাধীনতার আগে-পরে আমাদের দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, মূলত রাজনৈতিক দল বা চিন্তাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন রয়েছে। স্বাধীনতার পর একদিকে ঘেরাও আন্দোলন আরেক দিকে লুটপাটের ট্রেড ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ক্ষুণ্ন করে।
কল-কারখানা বাঁচিয়ে রাখতে বঙ্গবন্ধু লালবাহিনী ও অতি বিপ্লবী বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘গরু খেয়ো না, গরুর দুধ খাও।’ পরে দেশ হত্যা-ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের আবর্তে নিপতিত হয়। সামরিক কর্তারা ক্ষমতা দখল করে ক্যান্টনমেন্টে বসে ওপর থেকে রাজনৈতিক দল করার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গসংগঠন হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলে।
ওই সংগঠনের কাজ হয় মালিক ও সরকারের দালালি তথা গুণ্ডামি করা এবং নানাভাবে লুটপাটে অংশ নেওয়া। সরকারি দলের সঙ্গে থাকলে ক্ষমতার জোরসহ কিছু নগদ পাওয়া যাবে বিবেচনায় শ্রমিকদের একটা অংশ এতে যোগ দেয়। যে সংগঠন আগের দিন দালালি-লুটপাট করে সেই সংগঠন ক্ষমতা হারালে একদিনে সংগ্রামী হয়ে ওঠে। এ-কারণেও শ্রমিক আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এভাবে শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠন একদিকে পড়ে রাজনৈতিক বিভক্তিতে আর অন্যদিকে হয়ে ওঠে কলুষিত ও অধঃপতিত। বিরল ব্যতিক্রম বাদে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে-সংগঠনে এ দুটি বিষয় সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। ফলে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর জমায়েত ক্ষমতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং দরকষাকষির ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
এবারের মে দিবস পালনের সময় এমনটা শুনতে পাওয়া গেছে, আন্দোলন ও দরকষাকষির চেয়ে বিদেশি মালিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর চাপ বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বেশি। এমনটাও শুনতে পাওয়া গেছে, অতীতের প্রচলিত ধারায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনকে অগ্রসর করা যাবে না।
এটা তো ঠিক যে, মে দিবসের প্রধান বিষয় হচ্ছে শ্রমিক ঐক্য ও সংহতি। সভা-সমাবেশ-মিছিল করে ন্যায্য পাওনা ও অধিকারের দাবি তুলে ধরা এবং তা আদায় করার জন্য সংগ্রামে শপথ নেওয়া এই দিবস পালনের প্রধান যৌক্তিকতা। মে দিবস পালনের পর এমনটা শোনা গেছে, গতবারের চেয়ে জমায়েত কম হয়েছে। তবে ঈদের কারণেও তা হতে পারে।
তবে মে দিবস পালন যে ক্রমে নিষ্প্রভ হচ্ছে, তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। অতীত দিনগুলোতে শ্রমিক ও শ্রমজীবীরা যে হারে মে দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিত, দিবসটি নিজেদের ঐক্য সুরক্ষা ও দাবি আদায়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করত, পালনের আগে রাজনৈতিক উদ্দীপনা অনুভব করত; এখন সেভাবে করে না। কেন এ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এবং কর্তব্য নির্ধারণ করা ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনগুলোর বিকল্প কিছু নেই।

আট
এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ আজ নানা সমস্যা-সংকটের মধ্যে রয়েছে। মে দিবস পালনের ভেতর দিয়ে শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতি নিয়ে জাতির সাফল্য ও অর্জনগুলো বিবেচনায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা সংকটের বিষয়গুলো বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
প্রসংগত, শ্রমিক-মালিক এবং শ্রম ও মজুরির সম্পর্ক শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার পূর্বশর্ত। এসব শর্ত পূরণে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের আলোকে এবং আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমনীতি ও শ্রমিক কল্যাণে বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে চলেছে।
এতদসত্ত্বেও এটাই বাস্তব যে, কোভিড-দুর্যোগ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাণিজ্য যুদ্ধ বিশেষত খাদ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির ঢেউ বাংলাদেশকেও আঘাত করে চলেছে। এর মধ্যে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণেও দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। এতে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে শ্রমিক ও শ্রমজীবী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ।
বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বাড়াবেন না।’ দ্রব্যমূল্য যাতে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে এবং পণ্যে যেন ঘাটতি না হয়, সে-জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। মে দিবস জানান দিয়ে গেল, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চলমান প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
মে দিবস পালনের ভেতর দিয়ে আবারও দেখা গেল যে, দিবসটি জাতীয় ছুটির দিন থাকা সত্ত্বে অসংগঠিত খাতের শ্রমিকরা ছুটির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মজুরি, কাজের সময়, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা এবং ন্যূনতম অধিকার প্রাপ্তির দিক থেকে এরা অবহেলিত। বর্গাচাষি, গৃহকর্মী, নির্মাণ শ্রমিকসহ ২১টি খাত দেশে অসংগঠিত খাতের শ্রমিক সংখ্যা মোট শ্রমজীবীদের ৮৭ শতাংশ বলে ধরে নেওয়া হয়।
২০১৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অসংগঠিত শ্রমিকদের কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আনীত বিল’ বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল। বিলটি আইনি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। সর্বোপরি অসংগঠিত খাতের শ্রমিকরা শ্রম আইনের আওতায় পড়ে না। এদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নেই। নারী শ্রমিকরাও বৈষম্যসহ নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে। শিশুশ্রম বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা ব্যবহৃত হচ্ছে। ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা বিরাজমান।
এ বাস্তবতায় দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমঙ্গল প্রভৃতি ক্ষেত্রে সরকারকে যদি এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, তবে সংগঠিত-অসংগঠিত খাতের শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধি ও অধিকারকে সম্প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি রয়েছে। ইতোমধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আগামী বছর মে দিবস পালনের আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হবে। শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ আশা করবে, আগামী বছর মে দিবস পালনের আগে জাতীয় শিল্প বিকাশ ও জাতীয় অর্থনীতি সুদৃঢ় করার জন্য শ্রমিক-শ্রমজীবীদের জন্য দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হবে।

নয়
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হংবো বলেছেন, ‘যদি আমরা একটি নতুন, আরও স্থিতিশীল এবং ন্যায়সংগত বিশ্ব গঠন করতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই বর্তমানের চেয়ে ভিন্ন পথ বেছে নিতে হবে, যা সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেয়।’ তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘আমরা কীভাবে এটা নিশ্চিত করব?’
এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম ও সর্বাগ্রে আমাদের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা- দুটোই মানবকেন্দ্রিক হতে হবে, যাতে স্বাধীনতা ও মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগের ক্ষেত্র নিশ্চিত করা’ সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে নীতি ও কর্মপরিকল্পনা ক্রমেই আরও মানবকেন্দ্রিক হতে থাকুক- এটাই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির মাস মে মাসের একান্ত কামনা।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য