Sunday, July 3, 2022
বাড়িSliderদেশপ্রেমে উদ্ভাসিত বাঙালি জাতি

দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত বাঙালি জাতি

রায়হান কবির: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বাঙালির জাতীয় জীবনে আবেগ সঞ্চারি একটি ঐতিহাসিক ঘটনাÑ বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের বহ্নিশিখায় উদ্ভাসিত মহৎ-অভিযাত্রার শুভক্ষণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতা-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসÑ আন্দোলন-সংগ্রাম ত্যাগ-তিতীক্ষা আত্মনিবেদন ও জাগরণের ইতিহাসÑ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আত্মত্যাগ ও গণবীরত্বের ইতিহাস। বীরত্বগাঁথা গৌরবোজ্জ্বল এই ইতিহাস বাঙালি জাতির এগিয়ে চলার পাথেয়Ñ সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অবিনাশী শক্তিÑ বাঙালির বিশ্বজয়ের অদম্য সাহস ও স্বপ্নের স্পন্দন। আর এই স্বপ্ন-জাগরণের অন্তর্নিহিত শক্তি ও চিরঞ্জীব অনুপ্রেরণার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার ও আদর্শকে ধারণ করেই উদযাপিত হয়েছে স্বাধীনতা-সংগ্রামের বিনির্মাতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষী ‘মুজিববর্ষ’ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে অনুরণিত হয়েছে বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুদৃঢ় প্রত্যয়।

বর্ণাঢ্য ‘ক্ষণ গণনা’র মধ্য দিয়ে মুজিববর্ষ কর্মসূচির শুভ সূচনা
২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে উৎসবমুখর পরিবেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মুজিববর্ষের জমকালো ও বর্ণাঢ্য ‘ক্ষণ গণনা’র উদ্বোধন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণ গণনার ঘড়িও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপের মাধ্যমে প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে ক্ষণ গণনার উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত ক্ষণ গণনার ঘড়িও একসঙ্গে চালু হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, দৌহিত্র প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়-সহ তাদের পরিবারের সদস্য, সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, ২ হাজারেরও বেশি দেশি-বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথি এবং ১০ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত দর্শকের উপস্থিতিতে ১০ জানুয়ারি বিকালে স্মরণ করা হয় ১৯৭২ সালের সে-মুহূর্তটি, যেদিন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনন্দ।

১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন
২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপনের প্রস্তুতি থাকলেও নভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারি রূপ নেওয়ায় আয়োজনের পরিসর সীমিত করে আনা হয়। নানা আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতায় স্বাধীনতার মহান স্থপতিকে জানানো হয় শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার স্পর্শময় শ্রদ্ধাঞ্জলি। সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরস্থ ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে এবং টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টুঙ্গিপাড়ায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নিবেদিত হয় স্বাধীনতার মহান স্থপতির প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাবে জনসমাগম এড়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত মুজিববর্ষের মূল অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। টেলিভিশনে ভাষণ প্রচার ও অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় মুজিববর্ষের বছরব্যাপী আয়োজনের। মুক্তির মহানায়ক শিরোনামের দুই ঘণ্টা ব্যাপ্তির অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর জন্মক্ষণ রাত ৮টায়। রাত ১০টা পর্যন্ত চলমান অনুষ্ঠানটি একযোগে উপভোগ করে সারাদেশের মানুষ। মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় সাজানো অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত হয় জাতির পিতার জীবনাদর্শ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অধ্যায়। রাত ৮টায় বঙ্গবন্ধুর জন্মক্ষণে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ থেকে আতশবাজির মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর মুজিববর্ষের উদ্বোধনী আয়োজনে দর্শকরা দেখেন জাতীয় প্যারেড স্কয়ার থেকে ধারণকৃত বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নমগেয়েল ওয়াংচুক, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভা-ারি, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওথাইমিনের ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয় অনুষ্ঠানে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মক্ষণ রাত ৮টায় ঢাকাসহ সারাদেশে একযোগে আতশবাজি প্রদর্শন এবং ফানুস ওড়ানো হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে বর্ণাঢ্য লেজার শো’র মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারসহ নানা অনুষ্ঠান প্রদর্শন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি সকল টেলিভিশনে মুজিববর্ষের এসব অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এছাড়াও দেশের সর্বত্র এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি উদযাপিত হয়।

বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনে নিয়েছে তোমার ত্যাগের মহিমায়
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী-মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেনÑ পিতা, তোমার কাছে আমাদের অঙ্গীকার, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়বই। আর সেদিন বেশি দূরে নয়। আজ জেগে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষ সত্যের অন্বেষণে। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, তোমার (বঙ্গবন্ধু) জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনে নিয়েছে তোমার ত্যাগের মহিমায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে আরও বলেন, আজ ১৭ মার্চ। ১৯২০ সালের আজকের দিনে এই বাংলায় জন্ম নিয়েছিলেন এক মহাপুরুষ। তিনি আমার পিতা, শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ নামের এই দেশটি তিনি উপহার দিয়েছেন। দিয়েছেন বাঙালিকে একটি জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়ের মর্যাদা। তাই তো তিনি আমাদের জাতির পিতা। তিনি বলেন, দুঃখী মানুষকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে নিজের জীবনের সব সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন আজীবন। বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে ব্যথিত করত। অধিকারহারা দুঃখী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে তিনি দ্বিধা করেননি। এই বঙ্গভূমির বঙ্গ-সন্তানদের একান্ত আপনজন হয়ে উঠেছিলেনÑ তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার ভাষণে বলেন, রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন নীতি ও আদর্শের প্রতীক। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’সহ তার ওপর লিখিত গ্রন্থ অধ্যয়ন করে নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামীতে জাতি গঠনে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করাই হোক মুজিববর্ষে সকলের অঙ্গীকার।
১০ দিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠানমালা
বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের মারাত্মক আঘাতের কারণে ২০২০ সালে মুজিববর্ষের বড় আয়োজনের প্রস্তুতি থাকলেও অসংখ্য কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে করোনার বিস্তার হ্রাস পাওয়ায় ২০২১ সালের ১৭ থেকে ২৬ মার্চ মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক ক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’র উদ্যোগে ১০ দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয় ১০ দিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানমালা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সীমিত পরিসরে আয়োজিত হলেও, আনন্দ-উৎসবে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে গোটাদেশে, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা এমপি।
জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চ ঢাকার প্যারেড গ্রাউন্ডে শুরু হয় ১০ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান। প্রতিদিন আলাদা আলাদা থিমের ওপর আলোচনা পর্ব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল এবং অন্যান্য বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। স্মরণ করা হয় স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল মনোমুগ্ধকর। এসব অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী ৫টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সশরীরে যোগ দেন। তারা হচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের ভিডিও বার্তা অথবা শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করে শোনানো হয়েছে। অনেক নেতা লিখিত অভিনন্দন বার্তাও পাঠিয়েছেন। এছাড়াও ১০ দিনের এ অনুষ্ঠানমালায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা প্রেরণ করেনÑ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চুং সেয় কিউন, ভ্যাটিকানের পোপ দ্বিতীয় ফ্রান্সিস, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভ, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসেফ আল ওথাইমিন, ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অড্রে আজুলে, ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, ফ্রান্সের সিনেটর জাকুলিন ডেরোমেডিসহ অনেকেই।
রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ১০ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ও জমকালো অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক্ষার প্রহরের আজ অবসান হতে চলেছে। আজ এমন এক সময়ে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি, যখন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মর্যাদাশীল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা যিনি লড়াই করে একটি দেশ স্বাধীন করেছেন। তার (বঙ্গবন্ধু) নেতৃত্বেই বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলেছেন। শক্ত ভিত রচনা করেছেন উন্নয়নের।

বর্ণিল আয়োজনে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন
একদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, অন্যদিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। দুইয়ে মিলে ২৬ মার্চ ২০২১ এক আবেগঘন ও আনন্দ উৎসবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করে বাংলাদেশ। সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গেই একযোগে উদযাপিত হয় জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, যার হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। ৩০ লাখ শহিদের রক্তস্নাত লাল-সবুজের পতাকা হাতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা। শ্রদ্ধাবনত জাতি ফুলে ফুলে ভরে দেয় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর মাজারের বেদিমূল। লাল-সবুজ পতাকা হাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে একই সেøাগানÑ ‘মুজিবের বাংলায়, স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গিদের ঠাঁই নাই’।
এই জোড়া উদযাপনে ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে ১০ দিনের বর্ণাঢ্য ও জমকালো অনুষ্ঠানমালার শেষ দিনে ঢাকায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের থিম ছিলÑ ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও বিশেষ অতিথি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মহামারির কারণে সীমিত উপস্থিতির এ অনুষ্ঠানে উন্মোচন করা হয় সুবর্ণজয়ন্তীর লোগো।
এ সম্পর্ক রক্তের, কেউ ভাঙতে পারবে না : মোদি
২৬ মার্চ ২০২১ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, এ সম্পর্ক রক্তের। এটা কেউ ভাঙতে পারবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামী আর ভারতীয় সেনাদের রক্ত একসঙ্গে রয়েছে। এটি এমন এক সম্পর্ক, যা কোনোভাবেই ভাঙবে না। কোনো কূটনীতির শিকার হবে না। তিনি বলেন, এ-বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর আর ভারতের ৭৫ বছর একসঙ্গেই এসেছে। এই দুই দেশের জন্য একবিংশ শতকের আগামী ২৫ বছর অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ এক। মনে রাখতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে যেখানে আমাদের সম্ভাবনাগুলো একই রকম, সেখানে সন্ত্রাসবাদের সংকটও একই রকম।

মহাবিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু
১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর এবং মুজিববর্ষ উপলক্ষে দুদিনব্যাপী উদযাপিত হয় জমকালো অনুষ্ঠানমালা। ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির যুগসন্ধিক্ষণে পালিত হয় মুজিববর্ষের সমাপনী কর্মসূচি। ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি অতিথি উপস্থিত থাকেন। ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দুদিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, আর তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হচ্ছে। বিজয়ের ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সুবর্ণ আলো দেখতে পাই। জাতির পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণে এটাই হোক সকলের চাওয়া-পাওয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সম্মাননীয় অতিথি ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধাস্মারক প্রদান করেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। অনুষ্ঠান শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
বিভিন্ন আঙ্গিকে মুজিববর্ষ
২০২০ সালের ১৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’র কর্মসূচি শুরু হয়। বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানমালা পরবর্তীতে করোনা বিস্তার হ্রাস পাওয়ার পর সুবিধাজনক সময়ে তথা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালার সাথে একযোগে উদযাপিত হয়। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগেও বছরব্যাপী নানা ধরনের কর্মসূচি উদযাপিত হয়। এছাড়াও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’র উদ্যোগে বছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি, চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতা, জাতির পিতার সংগ্রামমুখর কর্মময় জীবনের ওপর বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্য চিত্র এবং ভিডিও ডকুমেন্ট নির্মাণ ও প্রদর্শনসহ উপযোগী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। একই সাথে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী আয়োজন, প্রকাশনা ও সাহিত্য অনুষ্ঠান, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও অনুবাদ, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন, মিডিয়া, প্রচার ও ডকুমেন্টেশন এবং চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বিনামূল্যে ঘর প্রদানের জন্য বিশেষ গৃহায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। বগুড়া জেলার শেরপুরে ১০০ বিঘা বা ১,১৯,৪৩০.২৭৩ বর্গমিটার (১২,৮৫,৫৩৬.৭৬ ফুট) আকৃতির জমিতে ‘শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি ম্যুরাল তৈরি করা হয়। যা ২০২১ সালের ১৬ মার্চ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ‘বিশ্বের বৃহত্তম শস্যচিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠান আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৭৭টি দূতাবাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিদেশে আরও ৫টি বঙ্গবন্ধু চেয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে বঙ্গবন্ধু সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের মুজিব ফেলোশিপ অ্যান্ড ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম চালু করা হয়। পাশাপাশি মুজিববর্ষে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলার ইভেন্ট আয়োজন করে বাস্তবায়ন কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে মুজিববর্ষে সারাদেশে সরকারিভাবে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়।

লেখক : গবেষণা সহকারী, উত্তরণ

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য