Saturday, July 13, 2024
বাড়িআইন-আদালতদুর্নীতি মামলায় টুকু ও আমানের সাজা বহাল

দুর্নীতি মামলায় টুকু ও আমানের সাজা বহাল

উত্তরণ প্রতিবেদন : দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা অবৈধ সম্পদের মামলায় বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানের ১৩ বছর ও তার স্ত্রী সাবেরা আমানের তিন বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। দুদকের দায়ের করা অবৈধ সম্পদের অপর মামলায় বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ৯ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, রাজনীতিবিদরা জনগণ ও দেশের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করার লক্ষ্যে রাজনীতিতে জড়িত হন। কারণ রাজনীতি হচ্ছে জনগণ ও দেশের কল্যাণে এক ধরনের মহান ত্যাগ ও নিষ্ঠার কাজ। ফলে রাজনীতিবিদরা জনগণের সম্পদের রক্ষক হবেন, তারা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না। আদালত বলেন, বৈধ ব্যবসা এবং অন্যান্য পেশার আশ্রয় নিয়ে অর্থ-সম্পত্তি অর্জনের অনেক উপায় রয়েছে।
তবে অর্থ উপার্জনের জন্য রাজনীতি কোনো পেশার আওতায় আসতে পারে না। গত ৩০ মে রায়ের বিরুদ্ধে আমান দম্পতি ও ইকবাল হাসানের আপিল খারিজ করে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। তথ্যমতে, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় দুদকের দায়ের করা সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় আমান উল্লাহ আমানকে ১৩ বছর ও তার স্ত্রী সাবেরাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। অপর এক মামলায় বিচারিক আদালত ইকবাল হাসানকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। পৃথক ওই রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করেছিলেন। ওই সময় তারা জেলও খাটেন। গত ১৭ মে সম্পদের মামলায় সাজার বিরুদ্ধে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর আপিলের রায়ের জন্য ৩০ মে দিন ধার্য করা হয়। অন্যদিকে গত ১৪ মে দুর্নীতির মামলায় বিএনপির নেতা আমান উল্লাহ আমান ও তার স্ত্রী সাবেরা আমানের খালাসের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্যও এ দিনটি ধার্য করা হয়।
হাইকোর্টে আমান দম্পতির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী নাজমুল হুদা। ইকবাল হাসানের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. সাইফুল্লাহ মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন। দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।
বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে : জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার আদালতে রায়ের মূল অংশ পড়ে শোনান। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, দুর্নীতি সব বয়সি এবং বর্ণের মানুষকে প্রভাবিত করে। দুর্নীতি দরিদ্র ও দুর্বল গোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। এ কারণে দেশের জনগণ, বিশেষ করে দায়িত্বশীল স্টেকহোল্ডারদের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত; যে তারা কেবল দুর্নীতির শিকারই নন, এর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূল খেলোয়াড়ও। আদালত রায়ে আরও বলেন, যদি বিশ্বে পরিবর্তন আনতে চান এবং বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে চান তাহলে এর বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনার জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি হিসাব দেওয়ার দায়িত্ব থাকতে হবে। আইনের বিধান অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ছেলেবেলা ও বাল্যকাল থেকেই শিশুদের সততা ও অসততার মধ্যে পার্থক্য করতে শেখানো উচিত বলে মন্তব্য করেন আদালত।
পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, দুর্নীতিবাজরা তাদের সমালোচকদের চুপ করতে এবং চুরি করা সম্পদ লুকানোর জন্য একে অপরকে সাহায্য করে। তাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার সময় এসেছে। আদালত বলেন, বিশ্ব ও বাংলাদেশের পরিবর্তনের অপেক্ষায় নাগরিকরা বসে থাকতে পারে না। আমাদের প্রত্যেককে সেই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশি ছাড়া কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। বিশ্বে ও বাংলাদেশে দুর্নীতির অবসান ঘটানো লক্ষ্য হওয়া উচিত উল্লেখ করে আদালত বলেন, একটি বৈশ্বিক আন্দোলন হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হলো বিশ্বে এবং বাংলাদেশে দুর্নীতির অবসান ঘটানো। তা যেখানেই হোক বা যে রূপেই হোক না কেন। আমরা জানি যে সফল হওয়ার একমাত্র উপায় হলো নাগরিকদের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সম্পৃক্ত করা। আমরা সমাজ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের উপশম প্রতিরোধ এবং মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : ৪ কোটি ৯৬ লাখ ১১ হাজার ৯১৬ টাকার সম্পত্তির হিসাব ও আয়ের উৎস গোপন করার অভিযোগে দুদকের উপ-পরিচালক (বর্তমানে পরিচালক) গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী ২০০৭ সালের মার্চে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। দুদকের উপ-পরিচালক এসএমএম আখতার হামিদ ভূঁঞা ওই বছরের ২৮ জুন মহানগর হাকিম আদালতে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন। মামলার বিবরণে আরও জানা যায়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বিচারিক আদালত এ মামলার রায়ে টুকুকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে টুকু আপিল করলে ২০১১ সালের ১৫ জুন তাকে খালাস দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করলে ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি খালাসের রায় বাতিল করে পুনঃশুনানির আদেশ দেন আপিল বিভাগ। সে অনুযায়ী হাইকোর্টে শুনানি হয়।
আমান উল্লাহ আমান ও স্ত্রী সাবেরা আমান : সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আমান দম্পতির বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৬ মার্চ রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা করে দুদক। ওই বছরের ২১ জুন বিশেষ জজ আদালতের রায়ে আমানকে ১৩ বছরের ও সাবেরাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট সেই আপিল মঞ্জুর করে তাদের খালাস দেন। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করলে ২০১৪ সালের ২৬ মে আপিল বিভাগ সে রায় বাতিল করে হাইকোর্টকে মামলাটির আপিল পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী হাইকোর্টে শুনানি শেষে ৩০ মে রায় দিলেন।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য