Saturday, July 13, 2024
বাড়িউত্তরণ প্রতিবেদনতত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কেউ কিছু বলেনি

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কেউ কিছু বলেনি

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন কোন বিবেচনায় দেওয়া হবে তা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাই আমরা বিবেচনায় দেখব, বিবেচনা করব। প্রতি ছয় মাস পরপর আমি কিন্তু সার্ভে করি।

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ওয়াশিংটন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভানের সঙ্গে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমার কথা হয়েছে। আমি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছি। আমি তাদের এটাও বলেছি যে, একসময় আমাদের দেশে ছিল গভর্মেন্ট বাই দি আর্মি, অব দি আর্মি ফর দি জেনারেল। আর গভর্মেন্ট বাই দি পিপল, অব দি পিপল, ফর দি পিপল- এটা তো আমরা এস্টাবলিশ করেছি। অর্থাৎ ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখা গণতন্ত্রকে আওয়ামী লীগই জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। আজকে আমাকে তো অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন শেখাতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে তার সাম্প্রতিক সফরকালে কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ তোলেননি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
গত ৬ অক্টোবর গণভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ-কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। দিল্লিতে জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সেলফি এবং পরে ওয়াশিংটনে তার সঙ্গে আবারও সাক্ষাতে আলোচনার প্রসঙ্গ ধরে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, এবারের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কথায় তিনি আর কোনো বার্তা পেয়েছেন কি না? উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কিছু লোক নির্বাচন নিয়ে ‘একটু বেশি কথা’ বলে, সে-কারণে বিদেশিরাও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য হলো সেটাই, যারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে, জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনা করেছে, সেই সময় নির্বাচনের সুষ্ঠতা নিয়ে তাদের (বিদেশিদের) উদ্বেগ দেখি নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমেরিকা হঠাৎ এবং অন্যান্য দেশ আমাদের দেশের নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ কি না প্রশ্ন তোলে, আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, যখন মিলিটারি ডিকটেটর ছিল, যখন আমরা সংগ্রাম করেছি, জনগণের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে ফিরয়ে দেওয়ার জন্য। আমরা সংগ্রাম করেছি ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের জন্য। আমরা সেøাগান দিয়েছি ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেই জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া, এটা তো আওয়ামী লীগই করেছে। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ জোট, তারা এক হয়ে আন্দোলন করে, এজন্য আমাদের বহু রক্ত দিতে হয়েছে। আমি সে-কথাটা বলেছি তাদেরকে (যুক্তরাষ্ট্রে)। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার একই বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা বাস্তব অবস্থাটা বোঝে কি না আমি জানি না; কিন্তু তাদের একই কথা, মানে ভাঙা রেকর্ড বাজিয়েই যাচ্ছে। সেটা আমি স্পষ্ট বলে আসছি। কেন, ভোটের জন্য তো আমরা সংগ্রাম করলাম, রক্ত দিলাম, আমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার অর্জন করে দিয়েছি। আমাকে ভোট শেখাতে হবে না।’ যারা ভোট চুরি করেছে তাদের কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা শুনতে হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া সবই তো ভোট চোর।’
বিএনপির আন্দোলন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা তো বারবার তারিখ দিয়েই যাচ্ছে। এই তারিখে ফেলে দেবে, ওই তারিখে ফেলে দেবে। তারা আন্দোলন করুক। তবে জনগণের জানমালের যদি কোনো ক্ষতি করা হয়, সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
জি-২০ সম্মেলন থেকে ‘প্রধানমন্ত্রী খালি হাতে ফিরেছেন’ বিএনপির এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির এই অভিযোগের কোনো উত্তর দিতে চাই না। আমি শুধু দেশবাসীকে বলতে চা- বিএনপির নেতারা একটি মাইক হাতে কীভাবে মিথ্যা কথা বলে সেটা সবাই জেনে নেন। মিথ্যা বলাটা তাদের অভ্যাস আর সব কিছুকে খাটো করে দেখার চেষ্টা, এই বিষয়ে যেন দেশবাসী সচেতন থাকে।’ বিএনপি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তাদের জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে। আর টিকে আছে মিথ্যার ওপরে। তাদের শেকড় তো নেই।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী কথিত সুশীল সমাজের সমালোচনা করে বলেন, ‘কিছু স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেকে বললেন, মেগা প্রজেক্ট আমরা করেছি। কিন্তু দরিদ্রদের জন্য আমরা না-কি কিছু করিনি। এ-রকম বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তারা বাংলাদেশটাকে দেখেনি। তারা ঘরের ভেতরেই আছেন। আর শুধু টেলিভিশনটাই দেখেন। দিন দুনিয়া তাকিয়ে দেখে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব। ইলেকশনের পরে, যদি আসতে পারি আবার করব। তারপর দেখি কে সাহস পায় ক্ষমতায় আসতে। সব গুছিয়ে দেওয়ার পরে এখন ইলেকশনের কথা, ভোটের কথা, অর্থনীতির কথা। পাকা পাকা কথা শুনতে হয়। আমি তো শুনতে রাজি না। আজ বয়স ৭৭ বছর। ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে মিছিল করি। তাহলে আমার রাজনীতির বয়স কত? স্কুল-জীবন থেকে মিছিল করা শুরু করেছি। এ পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ শতভাগ দেই। কমিয়ে ২৮ ভাগে নিয়ে আসব? সবাই একটু টের পাক যে (বিএনপি সরকারের সময় বিদ্যুতের অবস্থা) কী ছিল। আমরা তো ভুলে যাই।
সবাই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও ভর্তুকির সুযোগটা অর্থশালী-বড়লোকরা নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে একটা সøট ঠিক করব। এখন থেকে কত পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে, তাদের জন্য এক দাম। আর তার থেকে যারা বেশি ব্যবহার করবে তাদের জন্য আলাদা দাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু নিজেরা পয়সা কামালে হবে না, যাদেরকে দিয়ে কাজ করাবেন তাদের (সাংবাদিকদের) ভালো-মন্দ তো দেখতে হবে। ওয়েজবোর্ড আমরা দিয়েছি, এটা কার্যকর করার দায়িত্ব মালিকদের। মালিকদের আবার কমিটি আছে, তারা আবার সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু মেসেজ দেওয়ার আমরা দেব। এখানে মালিকদের যা করার তা করা উচিত। তিনি বলেন, আমি ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে আজকের টেলিভিশন রেডিওসহ সব বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করে দেই। উন্মুক্ত করেছি বলেই শুধু সাংবাদিক না, শিল্পী, সাহিত্যিক, টেকনিশিয়ানসহ অনেকেই কাজের সুযোগ পেয়েছে। একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বেসরকারি চ্যানেল ও পত্রিকার মালিকদের মধ্যে অনেকে এখানে বসেও আছে, এটা তো তাদের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, এখানে যারা মালিক তাদেরকে আমি বলব, ওয়েজবোর্ড কার্যকর করে দিয়েন। সাংবাদিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের জন্য সার্ভিস দিয়ে থাকে, কাজ করে। তাদের ভালো-মন্দ দেখতে হবে।
নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসের অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা সংস্থার ওপর স্যাংশন দেবে, আবার তাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা চাইবে- এটা কেমন কথা! শেখ হাসিনা বলেন, আমেরিকায় যিনি আমাদের অ্যাম্বাসেডর আছেন, তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- আমেরিকা সরকার থেকে আমাদের অ্যাম্বাসেডরকে কি ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়। তিনি বললেন- শুধু আমাদের অ্যাম্বাসিতে তারা কিছু নিরাপত্তা দেয়। তখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন- আমরা তো আমেরিকা অ্যাম্বাসিতে নিরাপত্তার জন্য ১৫৮ জন পুলিশকে ডিপ্লয় করেছি এবং এখানে যে অ্যাম্বাসেডর আছে তার জন্য গানম্যান দেওয়া আছে সিভিল ড্রেসে। কাজেই এখানে তার নিরাপত্তার তো এমন কোনো ঘাটতি নেই।
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন কোন বিবেচনায় দেওয়া হবে তা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাই আমরা বিবেচনায় দেখব, বিবেচনা করব। প্রতি ছয় মাস পরপর আমি কিন্তু সার্ভে করি। কারও পজিশন খারাপ হলে সরাসরি মুখের ওপর বলে দিই। আমরা প্রপার সচেতন বলে নির্বাচনে জনগণের আস্থা পাই, ভোট পাই এবং নির্বাচনে জয়ী হই। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, যারা সংসদ সদস্য আছেন তারা কতটুকু জনগণের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের আস্থা, বিশ্বাস কতটুকু অর্জন করেছেন, আমরা সেটাকেই বিবেচনা নিই।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য