Friday, February 23, 2024
বাড়িউত্তরণ-২০২২দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, মার্চ-২০২২ঢাকায় পাকবাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ

ঢাকায় পাকবাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ

ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন

বঙ্গবন্ধুর ’৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’ আহ্বানে সারাদেশে একদিকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি চলতে থাকে, অন্যদিকে জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকের ভান করেন। ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার শেষ চেষ্টা চালায়। অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাঙালিকে দমনের চেষ্টা হিসেবে ৩ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত অস্ত্র ও রসদ বোঝাই এমবি সোয়াত জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। ৭ মার্চ টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর নিযুক্ত হলে এই তৎপরতা দ্রুতগতি লাভ করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসারদের বদলি করে বিভিন্ন সেনানিবাস, পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। ১৪-২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার ভান করে অভিযানের প্রস্তুতি প্রত্যক্ষ করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এ সময় গণহত্যার দলিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত হয়। ১৯ মার্চ থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসারদের নিরস্ত্র করার জন্য ব্যক্তিগত অস্ত্রও জমা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওইদিনই প্রেসিডেন্ট ঢাকা সেনানিবাসের সামরিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেন।
পাকিস্তান বাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং ৫৭ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খান ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অপারেশন সার্চলাইট নামে সামরিক অভিযানের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। ১৭ মার্চ চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খানের নির্দেশে জেনারেল রাজা পরদিন ঢাকা সেনানিবাসে জিওসি অফিসে অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় গণহত্যার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে। ঢাকা শহরের পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সব পুলিশের নিয়ন্ত্রণ, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রেডিও, টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ, স্টেট ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার, ঢাকা শহরের যাতায়াত ও শহর নিয়ন্ত্রণ করার কথা এতে বলা হয়। এতে রাজারবাগ নিরস্ত্রীকরণ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের উল্লেখ ছিল। ঢাকার বাইরে এ অপারেশনের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। সার্বিকভাবে এ পরিকল্পনার তত্ত্বাবধান করেন গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান।
অপারেশন সার্চলাইট অভিযান শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল ২৬ মার্চ রাত ১টা। কিন্তু, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার বৈঠকে কোনো ইতিবাচক ফল না পেয়ে সবাইকে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য তৈরি হওয়ার আহ্বান জানান। সে রাতেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী বাঙালি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং এ.এ.কে নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক মন্তব্য করেছেন যে, বাঙালি বিদ্রোহীদের প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টির আগেই পাকিস্তান বাহিনী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পৌঁছার লক্ষ্যে অভিযান এগিয়ে ২৫ মার্চ রাত ১১.৩০ মিনিটে শুরু হয়। অবশ্য ৫ আগস্ট প্রকাশিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চ ভোরে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল।
পাকিস্তানি সৈন্যরা ১১.৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে ফার্মগেটে মিছিলরত বাঙালিদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা ঘটায়। এরপর পরিকল্পনা মোতাবেক একযোগে পিলখানা, রাজারবাগে আক্রমণ চালায়। রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে।
২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগত পাকিস্তান পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে থেকে অভিযান প্রত্যক্ষ করেন। পরদিন ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে ভুট্টো সেনাবাহিনীর আগের রাতের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন, ‘আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে পাকিস্তানকে রক্ষা করা গেছে।’ ইয়াহিয়া খানসহ সামরিক কর্মকর্তাদের সবাই অভিযানের প্রশংসা করেন। এমনকি ৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকার যে ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করে, তাতে ২৫ মার্চ সামরিক অভিযানকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় ২৫ মার্চ রাতের অভিযানে প্রকৃত হতাহতের হিসাব পাওয়া যায় না। বিদেশি সাংবাদিকদের ২৫ মার্চ অভিযানের পরপর দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। দেশি সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানা যায় না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে থাকা তিন বিদেশি সাংবাদিক আর্নল্ড জেটলিন, মিশেল লরেন্ট, সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন থেকে সে রাতের ভয়াবহ নৃশংসতা কিছুটা জানা যায়। সাইমন ‘ডেটলাইন ঢাকা’ শিরোনামে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৩১ মার্চ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তাতে তৎকালীন ইকবাল হলের ২০০ ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ১২ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়। পুরান ঢাকায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ৭০০ লোককে। দেশ-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে ওই রাতে শুধু ঢাকায় ৭ হাজার বাঙালি নিহত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল আক্রমণ করা হয় গভীর রাতে। প্রথমে পাকিস্তানি বা তৎকালীন ইকবাল হলে (জহুরুল হক হল) আক্রমণ চালায়। এ হলটি ছিল অসহযোগ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। বেশিরভাগ ছাত্রনেতা এখানে থাকতেন। ছাত্ররা তাদের সাধারণ অস্ত্র নিয়ে প্রতিহত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। পাকসেনারা কক্ষে ঢুকে গুলি করে অনেক ঘুমন্ত ছাত্রকে হত্যা করে। একইভাবে জগন্নাথ হলেও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। শত শত ছাত্রের লাশ সেদিন জগন্নাথ হলের সিঁড়িতে, বারান্দায় ও রাস্তায় স্তূপ হয়ে পড়েছিল। ছাত্রদের হত্যার পর মাঠে গণকবর দেয়। ছাত্রী হল রোকেয়া হলে পাকসেনারা চালায় নির্মম পাশবিক নির্যাতন। স্টাফ কোয়ার্টারে ঢুকে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করে। ঢাকা হল (শহীদুল্লাহ হল), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। রোকেয়া হলে ৪৬ জনকে হত্যা করে। ২৫-২৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকসহ ৩০০ ছাত্র, কর্মচারী নিহত হন। জহুরুল হক হল সংলগ্ন রেলওয়ে বস্তিতে সেনাবাহিনী আগুন দিলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। ২৫ মার্চ রাতে একইভাবে গণহত্যা চলেছিল পুরান ঢাকায়, কচুক্ষেত, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে, রায়েরবাজার, গণকটুলী, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান প্রভৃতি স্থানে। এ আক্রমণে পাকবাহিনীর সাথে অংশ নিয়েছিল পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী বিহারিরা। অন্যদিকে ২৫-২৭ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় ঢাকা আক্রমণ ছাড়াও রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট, খুলনা, যশোর, পাবনা, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন পুলিশ ব্যারাক, থানা আক্রমণ করে পুলিশ হত্যা করে এ স্থানগুলোও তাদের নিজেদের দখলে নেয়। পুলিশ ও ইপিআর স্থাপনায় শুরুতেই পাকবাহিনী পরিকল্পনা মোতাবেক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
২৫ মার্চ রাতে ও পরের কয়েকদিন তৎকালীন ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপলস, ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকার অফিসে আগুন দেওয়া হয়। এতে বহু পত্রিকাকর্মী আগুনে পুড়ে নিহত হন। ২৫ মার্চের গণহত্যা সম্পর্কে যাতে পত্রিকায় সংবাদ প্রচার করতে না পারে সেজন্য দেশি ও বিদেশি সাংবাদিকদের আগেই বন্দী করে রাখা হয় এবং ২৭ তারিখে বিদেশি সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।… অপারেশন সার্চলাইট অনুযায়ী ২৫ মার্চ রাত দেড়টায় (২৬ মার্চের প্রথম প্রহর) বঙ্গবন্ধুকে তার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসা থেকে পাকবাহিনী গ্রেফতার করে। যদিও তিনি গ্রেফতারের আগেই স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধের ন’মাস ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার, কল্যাণপুর বাস ডিপো, মিরপুরের শিয়ালবাড়ী, বাঙলা কলেজ, হরিরামপুর, চিড়িয়াখানা, নূরি মসজিদ, বধ্যভূমিতে হাজার হাজার লোককে এনে হত্যা করা হয়। রমনা পার্ক, মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, মিল ব্যারাক, সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ধলপুর, তেজগাঁও এমএমএ হোস্টেল, পুরান এয়ারপোর্ট সেনানিবাসের গুদাম ছিল নির্যাতন কেন্দ্র। নাখালপাড়ার এমএনএ হোস্টেলের প্রত্যেক কক্ষ নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হতো। এখানে নির্যাতন করা হয় সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা রুমী, আজাদসহ অনেককে, যারা আর ফিরে আসেননি। নির্যাতন কেন্দ্রে আটককৃতদের মধ্যে ২/১ জন ভাগ্যবান ছাড়া অধিকাংশকে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ঢাকায় গণহত্যার কন্ট্রোল রুম ছিল দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত নির্মাণাধীন সংসদ ভবনে সেনা কর্তৃপক্ষের দপ্তর। এই কন্ট্রোল রুমে প্রাপ্ত গোপন তারবার্তার রেকর্ডকৃত অংশ থেকে গণহত্যার জন্য দেওয়া নির্দেশে তাদের সাফল্য সম্পর্কে জানা যায়। ২৫-২৬ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধের ন’মাস বিশেষ করে ১০-১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩০-৬০টি স্পটে হামলা চালায় পাকিস্তান বাহিনী।
গণহত্যার জন্য মার্শাল হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় দ্বিতীয় ক্যাপিটালে (আগারগাঁও)। ঢাকায় গণহত্যায় নিয়োজিত পাকিস্তান বাহিনীর সদস্যদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সুসজ্জিত করা হয়।
“ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ” সংক্রান্ত প্রথম চারটি প্রতিবেদনে ঢাকার গণহত্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। প্রথম দলিলটি ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় ২৭ মার্চ প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘ঊসবৎমবহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয, ইধহমষধফবংয উবপষধৎবং ঋৎববফড়স-জধযসধহ’ং ঝঃবঢ় ঋড়ষষড়ংি অৎসু ঈৎধপশফড়হি-ঈরারষ ডধৎ ঊৎঁঢ়ঃং রহ ঊধংঃ চধশরংঃধহ-অধিসর খবধমঁব খবধফবৎং মড় ঁহফবৎমৎড়ঁহফ.’ এখানে ২৫-২৬ মার্চ ঢাকাসহ বাংলাদেশের পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, তার নেতৃবৃন্দসহ আত্মগোপনে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতা ঘোষণাকে এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার অভিযান, কারফিউ ঘোষণাসহ ১৬টি নির্দেশনার উল্লেখ আছে। প্রতিবেদনটি দাবি করে বিগত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১০,০০০ পাকসেনা অবতরণ করেছে। তাদের ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর পাঠানো হয়েছে। টাইমস একই দিন অনুরূপ মন্তব্য করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অবশ্য এ প্রতিবেদনে ইয়াহিয়া খানের বলমশধতা, বঙ্গবন্ধুর ওপর তার ক্ষোভ, বিশ্বের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার উল্লেখ আছে। পত্রিকাটি বাংলাদেশের অবস্থাদৃষ্টে একে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে। জাকার্তা টাইমস ২৯ মার্চ একটি প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পাশাপাশি টিক্কা খানের মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে এতে বলা হয়, লে. জেনারেল টিক্কা মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হন। এই খবরটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রও পরিবেশন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। যদিও পরবর্তী সময়ে এই তথ্যটি সঠিক নয় বলে অন্যান্য উৎসে জানা যায়। এমনকি বিবিসি ৭ এপ্রিল টিক্কা খানের জীবিত থাকার তথ্য দেয়। একই পত্রিকায় ৩০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার নিশ্চিত করে। ইতোমধ্যে সব পত্রিকায়ই তাকে গ্রেফতারের সংবাদ পরিবেশন করে। এতদিন পাকিস্তান সরকার গ্রেফতারের খবর গোপন রাখলেও এখন তা প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করার খবরও পরিবেশিত হয়। ৩০ জনের বেশি সাংবাদিককে বহিষ্কারের সংবাদ এতে প্রকাশ করে। নিউইয়র্ক টাইমসের পরিচালক ঢাকায় টাইমসের প্রতিনিধি সিডনি শনবার্গসহ সব সাংবাদিকের বহিষ্কারের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পত্র দেন বলে এতে উল্লেখ আছে।
২৫ মার্চ পাকবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের পর বাঙালির প্রতিরোধ জানতে সিডনির এই প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে তৈরি বন্দুক, লাঠি ও বল্লমে সজ্জিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর বিপরীতে সুসজ্জিত পাকবাহিনী ব্যবহার করে বিমান, বোমা, ট্যাঙ্ক ও ভারী কামান। এ প্রতিবেদনে মার্চের শুরু থেকে বাঙালির বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র প্রস্তুতি, তা বিস্তারিত জানা যাবে। বাঙালি জাতি কেন বিদ্রোহ করল এরও বিবরণ বাদ যায়নি। সিডনি প্রতিবেদনটিকে স্পষ্টই বাঙালির দাবির প্রতি সমর্থন যেমন রয়েছে, তেমনি পাকবাহিনীর তৎপরতা যে বিশেষ কাজে দেবে না, তাতে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। তার ভাষায় “শেষ পর্যন্ত ভূ-প্রকৃতিই হয়তো নির্ধারক উপাদানে পরিণত হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনার মতো সেনাবাহিনী আরো কিছুকাল তাদের কব্জায় রাখতে পারলেও দেশের গভীর অভ্যন্তরে তাদের কার্যকরভাবে অনুপ্রবেশের ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।” আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তরে সরকারের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিরোধ চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু পশ্চিমা গণমাধ্যমেই নয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশটির জনপ্রিয় দৈনিক ইন্দোনেশিয়া অবজারভার ৩০ মার্চ ‘ঞঅঘকঝ, অজঞওখখঊজণ অঞঞঅঈক উঅঈঈঅ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ ফুটে উঠেছে। সাইমন ড্রিং ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ব্যাংকক থেকে যে প্রতিবেদনটি পাঠান তা ৩০ মার্চ প্রকাশিত হয়। এতে ২৫-২৬ মার্চ ঢাকার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। এখানেও ঢাকায় প্রায় ৭,০০০ লোক হত্যার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন প্রথম দুদিন চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোরসহ মোট হত্যার শিকার হন ১৫,০০০ বাঙালি। তবে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে বাঙালির কিছু প্রতিরোধের কথাও উল্লেখ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ জন ছাত্র, ৭ জন শিক্ষক হত্যার কথাও উল্লেখ করেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, ইত্তেফাক যেখানে আশ্রয়ের জন্য ৪০০ বাঙালি অবস্থান করছিল সেখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। দ্বিতীয় দিন কারফিউ শিথিল করলে ঢাকাবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দলে দলে গ্রামের দিকে ছুটে যায়, তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে তাদের দোসররা এসব ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নেয় বলে সাইমন ড্রিং উল্লেখ করেন। গার্ডিয়ান ৩১ মার্চ ‘উধপপধ’ং অৎসু ড়ভ উবধঃয’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। আইনের ছাত্র শামসুল আলম চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে ঢাকার ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে জানা যায়। লুইস হেরেন টাইমস (লন্ডন) পত্রিকায় ২ এপ্রিল যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, তাতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পাকবাহিনীর আক্রমণের বিষয় গুরুত্ব পায়। ওতে জগন্নাথ হল, রেসকোর্স ময়দান সংলগ্ন কালীবাড়ি, পুরান ঢাকার হিন্দু এলাকায় গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের বহিষ্কার করলেও কিছু কিছু বিদেশি যারা বিভিন্ন কাজে ঢাকায় ছিলেন। তাদের ভাষ্য থেকেও ঢাকার অবস্থা জানা যায়। এমনি একটি প্রতিবেদন ৪ এপ্রিল জাপানের গধরহরপযর উধরষু ঘবংি প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘উধপপধ রং ঈরঃু ড়ভ গধংং এৎধাবং’. ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার হারকিউলিস বিমানে ১০০ জন বিদেশি যাদের মধ্যে ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ড ও সুইডিশ নাগরিক ছিলেন তাদের কাছ থেকে সব নোটবুক, ফিল্ম ও অন্যান্য দলিলপত্র রেখে দেওয়া হয়। ব্রিটিশ গৃহবধূ প্রতিবেদককে জানান, তিনি বিমানবন্দরের দু’পাশে গণকবর দেখেছেন। তিনি রাস্তায় নারী, পুরুষ ও শিশুর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। গৃহবধূ একজন পাকিস্তানি বিমান কর্মকর্তার কাছে শিশু হত্যার কারণ জানতে চাইলে অফিসারটি তাকে ধমকে বলেÑ ‘নবঃঃবৎ ঃড় শরষষ ঃযবস নবপধঁংব ড়ঃযবৎরিংব ঃযবু রিষষ মৎড়ি ঁঢ় রহঃড় ধহঃর চধশরংঃধহর’। একজন কানাডিয়ান প্রতিবেদককে জানান, ঢাকা এখন কবরস্থান ছাড়া কিছু নয়।
টাইমের ৫ এপ্রিল প্রতিবেদনটি একটু ভিন্নধর্মী। এতে ২৫ মার্চ পাকবাহিনীর গণহত্যার শুরুতে বাঙালির ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে কিছু প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা, গ্রেফতার, গণহত্যার শুরুতে সাংবাদিকদের হোটেলে গৃহবন্দি করে রাখাÑ এসবের পাশাপাশি পাকিস্তানি পাবলিক রিলেশন অফিসার সিদ্দিক সালিকের ভূমিকা জানা যাবে। ভারতীয় সাংবাদিক নারায়ণ চৌধুরীর ১০ এপ্রিল অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- সম্পর্কে জানা যায়। সংক্ষিপ্ত এই প্রতিবেদনে বুদ্ধিজীবীদের নাম উল্লেখ না থাকলেও হত্যাযজ্ঞের একটি ধারণা পাওয়া যায়। প্রতিবেদক উবহহরং ঘববষফ অবশ্য ঢাকার গণহত্যা সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন টাইমস (লন্ডন) পত্রিকায় ১৩ এপ্রিল। এতে গণহত্যার শুরু থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তান থেকে ১০,০০০ সৈন্য বাংলাদেশে আসার তথ্য জানানো হয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৩০০-৫০০ লোকের হত্যার তথ্যটিও এতে উল্লেখ করেন। টাইমস চবঃবৎ ঐধুবষযঁৎংঃ-এর ‘ডরঃহবংং ঃড় ধ সধং ংধপৎব রহ ঊধংঃ চধশরংঃধহ’ শিরোনামে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তিনি ২৫ মার্চ থেকে তিন দিনের গণহত্যার বিবরণ এতে তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একজন ছাত্র যিনি গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জগন্নাথ ও ইকবাল হলের (জহুরুল হক হল) গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও কলাবাগান, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট এলাকার গণহত্যা সম্পর্কেও বিবরণ রয়েছে। এতে বলা হয়, জগন্নাথ হলে ২৫ মার্চ ৩৫ জন ঘুমন্ত ছাত্রকে হত্যা করা হয়। যেসব শিক্ষক ২৫-২৬ মার্চ শহিদ হন তাদের সম্পর্কেও এ প্রতিবেদন থেকে জানা যাবে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক কলিন স্মিথের প্রতিবেদন থেকে ঢাকার টেলিযোগাযোগ, বিমান যোগাযোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তার ভাষায়, প্রতিদিন করাচি থেকে ১৭৫ জনের একটি বিমান ঢাকা আসছে। তাদের প্রায় সবাই সেনাসদস্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকান কনসুলেট থেকে তিনি জেনেছেনÑ গণহত্যার প্রথম দিকে ৬,০০০ লোককে ঢাকায় হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে ছাত্র ৩০০-৫০০ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যাকা-, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সদর দপ্তরে হত্যাকা- সম্পর্কে বিস্তারিত এ প্রতিবেদনে আছে। ঢাকার জনজীবনের অচলাবস্থা, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল বন্ধ থাকার বিবরণও বাদ যায়নি। বিহারিদের গণহত্যায় প্রধান ভূমিকা পালনের কথাও উল্লেখ আছে।
মার্চে পাকসেনাদের অপারেশনের সময় বিদেশি সাংবাদিকদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হলেও মে মাসে সীমিত আকারে সেনা প্রহরাধীনে সাংবাদিকদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। আমেরিকান সাংবাদিক ডান কগিন মে মাসে মটর সাইকেল, ট্রাক, বাস ও বাইসাইকেলে চড়ে যা দেখে যান তা মে মাসে তার ভাষায়Ñ “উধপপধ, পরঃু ড়ভ ঃযব ফবধফ”। তার মতে, ইতোমধ্যে ১০,০০০ লোক সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। গ্রামে পালিয়ে যাওয়ার সময় ফেরি, লঞ্চ, নৌকায়ও তারা আক্রান্ত হয়। সেনাবাহিনীর হাতে ১৮টি বাজারের মধ্যে ১৪টি ধ্বংস হয়। এ প্রতিবেদনেও পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, ছাত্র হত্যাকা-, ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষের হত্যার উল্লেখ করেন। হিন্দু অধ্যুষিত ঢাকার গণহত্যার খবর এখানে বিস্তারিত পাওয়া যায়। ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের ৮ মে প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের গণহত্যা সম্পর্কে মতামত জানা যায়। টিক্কা খানের মতে, ২৫ মার্চ মাত্র ১৫০ জন ছাত্র ঢাকায় মারা যায়। ২০,০০০ লোকের হত্যার খবরকে তিনি মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন। এই প্রতিবেদকসহ রয়টার, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, চায়না কমিউনিস্ট প্রেস এজেন্সির সাংবাদিকরা টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার নেন। ঢাকার জনজীবনের অস্বাভাবিক চিত্রও এ প্রতিবেদনে জানা যায়। প্রতিবেদক বলেন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল খুললেও ২০ ভাগের বেশি স্টাফ যোগ দেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকা-ের কথা অস্বীকার করে টিক্কা খান দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন। প্রতিবেদক টিক্কা খানের ভাষ্যকে সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন।
মে মাসে পাকিস্তান সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাধীনে ৬ জন বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকায় আনে। যদিও তাদের মধ্যে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের রোজেন ব্লুম শেষ পর্যন্ত ফাঁস করে দেন ঢাকার ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় ১০ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ডান কগিনের (টাইমস) মন্তব্য উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয় সারা ঢাকাকে দীর্ঘকালের জন্য পঙ্গু করে দিয়েছে। টিক্কা খান অবশ্য আশাবাদী, এই বিপর্যয় কাটাতে তাদের এক বছর সময় লাগবে। ঢাকার ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীর অভিযানকে টিক্কা খান বিহারিদের বাঁচাতে করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে ছাত্ররা পাল্টা গুলি চালালে সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (জহুরুল হক হল) পরিদর্শন করে রোজেন ব্লুমের ভাষ্যÑ জগন্নাথ হলের প্রাচীরে এখনও কামানের গোলার চিহ্ন রয়েছে। ভস্মীভূত কক্ষগুলো উন্মুক্ত আকাশের দিকে হাঁ করে আছে। ইকবাল হল (জহুরুল হক হল)-এর সব কটি ক্ষতচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু মোছা যায়নি। তার সারা দেহে শুধু বুলেট ও কামানের গোলার দাগ। টিক্কা খান গণহত্যার কথা অস্বীকার করলেও সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহাস্ট (ঐধুবষযঁৎংঃ) টাইমসের ২ জুনের প্রতিবেদনে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনার প্রধান ব্যক্তি জেনারেল টিক্কা খানের রেডিও মেসেজটি প্রকাশ করেন। ঢাকায় পাকবাহিনীর ২৫ মার্চ অপারেশনে টিক্কা খানের সঙ্গে অপারেশন অফিসারের কথাবার্তা এতে রেকর্ড করা হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে রাতে ৩০০ জনকে হত্যার খবর জানা যায়। এছাড়া রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ ঢাকার ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করা হলে তারা স্বদেশে গিয়ে ২৫, ২৬ মার্চ নিজের চোখে দেখা গণহত্যার প্রকৃত চিত্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। মে মাস থেকে পাক সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাধীনে সাংবাদিক আমদানি করলেও তারা দেশে ফিরে ঢাকাসহ সারাদেশের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরেন। এর ফলে বাংলাদেশে পাকসেনা ও তাদের দোসরদের গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ, মার্কিন ও ভারতীয় পত্র-পত্রিকা এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। [সংক্ষেপিত]

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

পূর্ববর্তী নিবন্ধবেড়েছে আবার দেশি চালের কদর
পরবর্তী নিবন্ধকবিতা
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য