Saturday, July 13, 2024
বাড়িউত্তরণ ডেস্কড. ইউনূসের সেই তেভাগা খামার এখন ধু-ধু মাঠ

ড. ইউনূসের সেই তেভাগা খামার এখন ধু-ধু মাঠ

কিন্তু সেই খামার হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। শুধু মাঠটি পড়ে আছে নদীর তীর ঘেঁষা বালুচরের মতো। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, মাঠ নয়, যেন ধু-ধু মরুভূমি।

উত্তরণ ডেস্ক: ডোবার চারপাশে ঝোপঝাড়, পাশে টিনের বাউন্ডারি। বাউন্ডারিতে সীমানা নির্ধারণ করে ভেতরে বানানো হয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সের পাশেই সুবিশাল বালুর মাঠ। মাঠে দিনভর চলে খেলাধুলা। দৃশ্যপটে মাঠটি গ্রামীণ জনপদের সাধারণ খেলার মাঠ মনে হলেও, এ চিত্র চট্টগ্রাম নগরীর ২০ কিলোমিটার দূরত্বে হাটহাজারীর জোবরা গ্রামের ‘তেভাগা খামারের’। প্রায় ৫০ বছর আগে গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে গবেষণার জন্য এ খামারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সেই খামার হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। শুধু মাঠটি পড়ে আছে নদীর তীর ঘেঁষা বালুচরের মতো। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, মাঠ নয়, যেন ধু-ধু মরুভূমি।
জোবরা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ড. ইউনূসের জন্ম জোবরা গ্রামে নয়, তিনি জোবরার পাশের গ্রাম বাথুয়ার ছেলে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে জোবরা গ্রামেই বেড়ে ওঠেন তিনি। এমনকি বিভিন্ন প্রকল্প এবং সামাজিক কাজকর্ম সবকিছুর শুরুই জোবরা গ্রাম থেকে। তাই ইউনূসের বাড়ি জোবরা গ্রামে- এমনটাই মনে করেন অনেকে।
সামাজিক কাজ পরিচালনার জন্য এই জোবরা গ্রামে ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নবযুগ ক্লাব। এরপর ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের পর নবযুগ ক্লাবের পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয় নবযুগ তেভাগা খামার, যা পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের তেভাগা খামার প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭৬ সালে এরই ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এসবের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের উন্নতি ঘটানো।
জোবরা গ্রামের মানুষের আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের নামে একের পর এক প্রকল্প এলেও বাস্তবিক অর্থে সেখানকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে আক্ষেপ স্থানীয়দের। বরং ঋণের কঠিন শর্ত, চক্রবৃদ্ধির সুদ-আসলের খেলাসহ নানা চাপে অনিশ্চয়তায় ভরে ওঠে অনেকের জীবন। অথচ গরিবের ভাগ্য উন্নয়নের নামে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসেন ড. ইউনূস। আর জোবরার বাসিন্দারা ডুবে আছেন ঘোর অন্ধকারে। একের পর এক ঋণে জড়িয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রির পর অনেকেই ছেড়েছেন এলাকা। আবার অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পৃথিবী থেকেই চিরবিদায় নিয়েছেন বলে জানালেন এখানকার সাধারণ মানুষ এবং জনপ্রতিনিধিরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মইনুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘তেভাগা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে ফতেহপুরের গরিব মানুষের অর্থ সম্পত্তি, ভিটেবাড়ি, রক্ত চুষে খেয়েছে। এসব প্রকল্পের সুদের টাকা শোধ করতে অনেককেই ঘরবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। অনেকে গ্রামছাড়া হয়েছেন। এই গ্রামটা গরিব থেকে আরও গরিব হয়েছে। সামাজিক কিংবা আর্থিক উন্নয়ন হয়নি।’
ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন কালবেলাকে বলেন, ‘উনি (ড. ইউনূস) যেভাবে মানুষের কাছ থেকে সুদ নেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এক ডিজিটে সুদ হতে হবে। উনি নেন দুই ডিজিটে, ১৩ শতাংশ হারে। আর যদি এটাকে কিস্তি আকারে হিসাব করেন তাহলে ৪২ পার্সেন্টে গিয়ে দাঁড়ায়। কোন আইনে উনি এত সুদ নেন? বাংলাদেশের আইন উনি মানেন না।’
এই জোবরা গ্রামের অবস্থান নগরের অদূরে হাটহাজারী উপজেলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেটের উত্তরে। গত মঙ্গলবার সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ইটের গাঁথুনিতে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। সড়কের কোথাও পিচঢালা আবার কোথাও আছে শুধু ইটের গাঁথুনি। প্রায় ৮ ফুট প্রস্থের ওই সংকীর্ণ সড়কটিতে একটি সিএনজি অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একসঙ্গে চলার জো নেই। দুপাশে কিছু দূর পরপর দেখা গেছে বেশ কিছু চাষের জমি এবং জলাশয়। সড়কটির পাশেই গড়ে তোলা হয়েছিল ড. ইউনূসের তেভাগা খামার। খামারের সেই মাঠে ফুটবল খেলায় মেতে উঠেছে শিশু-কিশোররা। মাঠ সংলগ্ন একটি হোটেল এবং ৪টি দোকান দেখা গেছে। মাঠের পাশেই রয়েছে ছোট্ট একটি স্কুল। স্কুলটির ছোট একটি কক্ষে এখন খামারের কার্যক্রম পরিচালনা হয়। তবে সরেজমিন গিয়ে কক্ষটি তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে।
কক্ষের ঘুণেধরা দরজার নিচের অংশে ভেঙে পড়েছে। দেয়াল থেকে খসে পড়ছে রং আর আস্তরণ। কার্যালয়ে ঢোকার পথে গজিয়েছে ঘাস, বাসা বেঁধেছে মাকড়সা।
স্থানীয়রা জানান, একসময় ওই মাঠে বেশকিছু ঘর ছিল। যেখানে মজুত রাখা হতো বীজ, সারসহ নানা কৃষিপণ্য। সেগুলো কৃষক কিংবা তেভাগা খামারিদের সরবরাহ করা হতো। স্থানীয় একটি খালে বাঁধ দিয়ে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হতো পানি। ঋণের মাধ্যমে এসব কার্যকলাপের বিপরীতে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের এক-তৃতীয়াংশ জমা দেওয়া হতো। অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্যর দুই ভাগ পাবে কৃষক এবং এক ভাগ খামার কর্তৃপক্ষ। তাই এ প্রকল্পটি তেভাগা খামার নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে তেভাগা খামার জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, নষ্ট হয়ে যায় ঘরগুলো। প্রায় ১০ বছর ধরে মাঠটি একেবারেই খালি পড়ে আছে। বেদখল হয় গেছে এর বেশকিছু অংশ। মাঠের আশপাশে কয়েকটি দোকানও গড়ে উঠেছে। কোনো ভাড়া না দিয়ে যে যার মতো পরিচালনা করছে এসব দোকান। এ নিয়েও এলাকায় তৈরি হয়েছে নানা ক্ষোভ। বর্ষায় কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় মাঠ। যদিও বছর তিনেক আগে মাঠটি বালু ফেলে উঁচু করা হয়েছে। এটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে মৃত মানুষের জানাজা ও শিশুদের খেলার মাঠ হিসেবে। তেভাগা খামারের একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকলেও নামকাওয়াস্তে চলছে এর কার্যক্রম। সন্দ্বীপ বড়ুয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, ‘এ মাঠেই তেভাগা খামারটি ছিল। সেগুলোর এখন কিছুই নেই। এখন গ্রামে জানাজার মাঠ না থাকায় এটিকে জানাজা ও শিশুরা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করছে।’

এখনও ঋণ আতঙ্কে গ্রামের মানুষ
সময়টা ১৯৭৬ সাল। জোবরা গ্রামের ছোট্ট একটি কক্ষে কার্যক্রম শুরু করে একটি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা। পরে সেটি রূপ নেয় একটি সামাজিক উন্নয়ন ব্যাংক হিসেবে। ১৯৮৩ সালে এটি একটি বৈধ এবং স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ড. ইউনূসের হাত ধরে এভাবে যাত্রা শুরু করা সেই প্রতিষ্ঠানের নাম গ্রামীণ ব্যাংক। গ্রামীণ নারীদের জন্য বিশেষ ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঘরের কাছের কেন্দ্রেই কার্যক্রম পরিচালনাসহ ‘গ্রামীণ’ পরিবেশের নানা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে এর নাম গ্রামীণ ব্যাংক রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সময় যত গড়িয়েছে, গরিবের এ ব্যাংক ততই জড়িয়েছে নানা তর্ক-বিতর্কে।
শুরুর দিকে ঋণ পাওয়াদের এমনই একজন সুফিয়া। প্রথম ২০ টাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল তার হাতে। এরপর আরও ঋণ পাওয়ার আশায় সেই ঋণ পরিশোধ করেন তিনি। কিন্তু পরের দফায় তিনি আর ঋণ শোধ করতে পারেননি। ঋণের চাপ, অর্থকষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণা চেপে বসে সুফিয়ার ঘাড়ে। একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সুফিয়ার উত্তরসূরিরা এখনও রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
জোবরা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, নবযুগ ক্লাব ঘর থেকেই যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক। সেই শুরু থেকে এখনও ওই ক্লাবে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি কেন্দ্র পরিচালিত হয়। যেখানে গ্রাহকরা তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ, সঞ্চয় হিসাবে টাকা জমাদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করতে পারেন। নানা তর্ক-বিতর্কের পর থেকে ঋণের আতঙ্কে রয়েছে ওই গ্রামের সাধারণ মানুষ। তাদের ভাষ্য ‘গাড়ি (রিকশা) কেনার টাকা দিয়ে বাড়ি হারাতে হয় ব্যাংক লোনে। তাই ঋণ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভালো।’
ষাটোর্ধ্ব রিকশাচালক মো. ইসমাইল কালবেলাকে বলেন, ‘রিকশাটি ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছি। একটু কষ্ট হলেও ভালো আছি। অনেকেই গাড়ি (রিকশা) কেনার ফাঁদে ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভিটেবাড়ি বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ। অনেকেই আছেন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেনি।’

ভাগ্য বদলের কমিটি নিজেই সমস্যায় জর্জরিত
১৯৭৬ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর শুরু হয় তেভাগা প্রকল্পের কার্যক্রম। শুরুতে স্থানীয় একটি খালে বাঁধ দিয়ে কৃষিজমিতে পানি এবং কৃষককে সার সরবরাহ, ফসল উৎপাদনে পরামর্শ দেওয়াসহ নানা উদ্যোগে শুরু হয় যাত্রা। কিন্তু দুর্ভিক্ষের পরে গরিবের ভাগ্য বদলের এ প্রকল্প এখন নিজেই সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন, কেউবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। বহুদিন ধরে বাস্তবিক অর্থে কমিটির কোনো কার্যক্রম নেই। নেই ধারাবাহিকতা। বর্তমান কমিটির মেয়াদ দুই বছর আগে শেষ হয়েছে। কমিটি পুনর্গঠন ছাড়াই নামমাত্র চলছে সংগঠনটি। শুধু খাল থেকে পানি সরবরাহ করাই তেভাগা খামার প্রকল্পের একমাত্র কাজ।
জোবরা গ্রামের নবযুগ তেভাগা খামার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফি কালবেলাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিচালনা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও দুই বছর আগে। তবু নানা কারণে নতুন কমিটি হয়নি। একসময় চাষাবাদ করার জন্য যা যা প্রয়োজন তা (সারসহ) এ খামারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো। শুরুর দিকে ড. ইউনূস স্থানীয় খালে একটি বাঁধ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে কৃষকরা পানি পেতেন। তখন আয়ের তিনভাগের একভাগ এ সমিতিকে প্রদান করত। অনেকে ধান (উৎপাদিত ফসল) দিতেন, অনেকেই সমপরিমাণ টাকা দিয়ে দিতেন। বর্তমানে নানা সমস্যার কারণে এসব বন্ধ হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন শুধুমাত্র খাল থেকে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই এখন এক কানি জমিতে পানি সরবরাহ বাবদে এক হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয় তেভাগা খামারকে।’
অতীতে রেকর্ড পরিমাণ চাষাবাদ করলেও বর্তমানে জোবরা গ্রামে প্রায় দুইশ কানির মতো জমি চাষাবাদ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

[দৈনিক কালবেলা]

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য