test
Monday, May 27, 2024
বাড়িSliderজ্বালানি সমস্যা সমাধানে আমাদের গ্যাস সম্পদ

জ্বালানি সমস্যা সমাধানে আমাদের গ্যাস সম্পদ

সম্পাদকের কথা: ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’-এ যে ৫টি অগ্রাধিকারের বিষয় ঠিক করা হয়েছিল, তার ৩ নম্বরটি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। অঙ্গীকার করা হয়েছিল, “৩.১ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত সার্বিক জ্বালানি নীতিমালা গ্রহণ করা হবে। তেল, গ্যাস, কয়লা, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও জৈবশক্তি, বায়ুশক্তি ও সৌরশক্তিসহ জ্বালানির প্রতিটি উৎসের অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।…”

ইশতেহারে আরও বলা হয়, “… আগামী তিন বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০০ মেগাওয়াটে, ২০১৩ সালের মধ্যে ৭০০০ মেগাওয়াটে এবং ২০২১ সালের মধ্যে ২০০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।”

জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার তার এই অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে জাতি উৎসব পালন করেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫.৫১৪ (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ৪৭ শতাংশ যেখানে বিদ্যুৎ সুবিধা পেত, ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে সেখানে বাংলাদেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা বিশাল অর্জন।

আমরা জানি, কী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের দেশকে লোডশেডিংয়ের দিকে যেতে হয়েছে। মনে রাখা দরকার, কোভিডের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোভিডের ধাক্কা সামাল দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোভিড যেতে-না-যেতে নেমে আসে বৈশ্বিক চরম অর্থনৈতিক দুর্যোগ। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বর্তমান সংকটে রূপান্তরিত করেছে। অনেকেই এর জন্য ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকেই এককভাবে দায়ী করছেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এর পেছনেও রয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদের ক্রনিক সংকট এবং কতিপয় শক্তিধর দেশের কারসাজি। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। আমাদের চির পরিচিত উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোই কেবল নয়, নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিধর দেশ চীনও এই সংকটের বাইরে না। এই সংকটের অভিপ্রকাশ ঘটেছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি, খাদ্য ও ভোগ্যবস্তুর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, মুদ্রাস্ফীতি, মূলধন সংকট, উৎপাদন হ্রাস, দারিদ্র্য হার বৃদ্ধি, ক্ষুধা ও খাদ্যাভাব বৃদ্ধি এবং এর ফলে কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক সংকট।

বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দেশ নয়। এই বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশকেও স্পর্শ না করে পারে না। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশ কোনো সংকটে নেই; যা আছে তা সাময়িক সমস্যা। বিবেচনায় রাখতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা গতি হারায়নি, মানুষ না খেয়ে মরছে না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল, এলএনজি প্রভৃতি জ্বালানি, যা আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে চালু রাখার জন্য অপরিহার্য, এসবের মূল্য বৃদ্ধির ফলে আমরা আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ ‘সংকট’ এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না রাখার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এ জন্যই আমাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

আমাদের বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস ও আমদানিকৃত এলএনজি-নির্ভর। এখানেই আমাদের সমস্যা সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে হবে। আমার মতে, আমাদের জ্বালানি খাতে কতগুলো জরুরি পদক্ষেপ দরকার। অতীতে যা-ই ঘটুক এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে অভ্যন্তরীণ উৎসের প্রতি। আমাদের গ্যাস সম্পদ যথাযথভাবে অনুসন্ধান, আহরণ ও তথাকথিত সিস্টেম লস কমাতে পারলে, আমরা বর্তমান জ্বালানি সংকট অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আমাদের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, “৩.২ তেল ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান আহরণের কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।” প্রকৃতপক্ষে এই একটি ক্ষেত্রে আমাদের কিছু লেকিং রয়ে গেছে। ফলে গত ১৪ বছরে আমাদের নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র ও তেলক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের প্রশ্নটি মীমাংসিত হয়েছে। এখন আমাদের গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বিদ্যমান ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র কূপে যে পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে, সেখান থেকে যুক্তিসংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে না। আমাদের বেশ কিছু গ্যাসক্ষেত্র আছে, যেখানে গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ অনেক কম। যেমন একটি গ্যাসক্ষেত্রের (বিবিয়ানা) রিজার্ভ ১২২৬.৭৯ বিসিএফ, সেখান থেকে দৈনিক উত্তোলন করা হচ্ছে ১২৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। পক্ষান্তরে, তিতাস গ্যাসফিল্ডের মজুদ যেখানে ১৪৩৬.৫৪ বিসিএফ, সেখানে উত্তোলন করা হচ্ছে মাত্র ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমএসসিএফডি গ্যাস। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের কথা বাদ দিলেও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ যথাযথভাবে নিরীক্ষণ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গ্যাস উত্তোলন করতে পারলে, বিশেষজ্ঞদের মতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করার প্রয়োজন হবে না। বেশ কিছু গ্যাসকূপ বালু ওঠার অজুহাতে বন্ধ রয়েছে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার আয়োজন করতে পারলেই ওইসব কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। বিবিয়ানায় তা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ওয়াকিবহাল মহল এটাও বলেন, গ্যাস খাতে যে পরিমাণ সিস্টেম লস তথা চুরি হচ্ছে, কঠোর হস্তে তা দমন করতে পারলে গ্যাস খাতে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হবে। সকল অবৈধ সংযোগ ছিন্ন করতে হবে। ডিপিডিসি মিটার বসিয়ে ইতোমধ্যে অবৈধ সুযোগ বন্ধ যেমন করেছে। তেমনি বিদ্যুতের যথাযথ মূল্য আদায়ের যে নজির স্থাপন করেছে, গ্যাস কোম্পানিগুলোও উৎপাদন ও বিতরণ কেন্দ্রে মিটার স্থাপন এবং ভোক্তা পর্যায়ে ডিপিডিসির মতো মিটার স্থাপন করলে, গ্যাস সংযোগ প্রদানে চুরি বন্ধ এবং বিপুল অর্থের সাশ্রয় করতে পারবে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, জ্বালানি খাতে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। আর এ জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের মাটির নিচে ও সমুদ্রের তলদেশে যে গ্যাস-তেল রয়েছে, তা আবিষ্কার ও আহরণের ওপর জরুরিভিত্তিতে নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে জ্বালানি সংকট রাতারাতি কাটবে না। শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে না পারলে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে প্রকৃত ‘সংকট’ দেখা দেবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য