Saturday, July 13, 2024

জেনোসাইডের স্বীকৃতি কবে মিলবে?

গ্রাম-গ্রামান্তরে গণকবর-বদ্ধভূমির ছড়াছড়ি। এর অধিকাংশই সংরক্ষিত নাই। অনেকের মনেই শঙ্কা, ৫২ বছর পর জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে কি না, এই বধ্যভূমি সংরক্ষিত হবে কি না, মানুষের জীবনে আবার একাত্তরের মূল্যবোধ ফিরে আসবে কি না?

মাহবুব জামান: জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছে। নৃশংস বর্বরতায় চালানো হয়েছে গণহত্যা- জেনোসাইড। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলেও আজও জেনোসাইডকারীদের বিচার হয়নি। এখনও মেলেনি জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
আমরা যারা ষাটের দশকের তরুণ- ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি, তাদের কাছে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস একটু অন্যরকমভাবে আসে।
বিজর দিবস মানেই একাত্তরে ফিরে যাই। চোখের সামনে ভেসে ওঠে গুঁড়িয়ে দেওয়া কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রথম শপথ নেওয়ার দৃশ্য। মনে পড়ে দৌড়ে চলে গেলাম রায়েরবাজার। বধ্যভূমি, ইটের ভাটা। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লাশ- এরা প্রায় সবাই ছিলেন আমাদের শিক্ষক অথবা প্রথিতযশা সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক। চেহারা দেখে কাউকে চিনতাম না। প্রায় সবগুলোতে পচন ধরে গেছে। ধরবে না কেন, আজ ১৭ তারিখ, তাঁদের আনা হয়েছে ১৩/১৪ তারিখ। তাছাড়া ইটের ভাটার ফাঁকে ফাঁকে পানিও জমে ছিল।
এরপরই ভেসে আসে সহযোদ্ধাদের মুখ। কুমিল্লার বেতিয়ারায় ৯ জন শহিদ হওয়ার দুদিন আগেও যাঁদের সাথে গল্প হয়েছে, আড্ডা হয়েছে, গান শুনেছি। মনে পড়ে যায়, আশফাকুস সামাদ ভাইয়ের কথা। পরিসংখ্যান বিভাগে আমার এক বছরের সিনিয়র। এখন শহিদ লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ, বীরউত্তম। কুড়িগ্রামের জয়মনিরহাটে সম্মুখযুদ্ধে শহিদ হন। ২০ নভেম্বর। তখন সেই জায়গার নাম সামাদনগর।
ভেসে আসে ’৭১-এর ৯ মাস। কখনও মনে হয় ৯ দিন, আবার কখনও মনে হয় ৯ বছর। এরই মধ্যে ৩০ লক্ষ শহিদ, ২ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রমহারা, ১ কোটি মানুষ শরণার্থী।
কাজেই বিজয়ের আনন্দ আমাদের ভাসিয়ে দেয় না। আমাদের কাছে বিজয় আনন্দের নয়- বেদনার। তবুও বেদীতে ফুল দেই, গান গাই মেশিনের মতো। তবে সব সময়ই মনে হয়, সব হারিয়ে অনেক কিছু পেয়েছি। আমরা একটা অনন্য প্রজন্ম। যাঁরা আজীবন বলতে পারব- দেশের ডাকে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছি- দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি।
ঠিক একই অবস্থা স্বাধীনতা দিবস নিয়ে। পৃথিবীর সর্বত্র স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস- সবাই উদযাপন করে আনন্দ-উৎসাহের সাথে।
আমাদের হয়েছে উল্টো- মনে পড়ে যায় আগের রাতের অপারেশন সার্চলাইটের বীভৎসতা। সারা ঢাকা শহর জ্বলছে, বোমা, ট্রেসার বুলেট আর ট্যাংকের ঘড়ঘড় শব্দে উবে গেল মধ্যরাতের নিস্তবদ্ধতা। হত্যাযজ্ঞ শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য প্রান্তেও। ঘরে বন্দি আমরা দুই দিন। কারফিউ চলছে। ২৭ ডিসেম্বর ৬ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল। সারাশহরের মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক থেকে সেদিক। শহর ছাড়ছে যে যেভাবে পারে। আমি আর আজাদ রওয়ানা দিলাম শহিদ মিনারের দিকে। নীলক্ষেত মার্কেটের দুই পাশে লাশের স্তূপ। ওরা রাতে বাইরেই ঘুমাত। সার্জেন্ট জহরুল হলের সামনে লাশের স্তূপ- সেখানেই চির শায়িত আমাদের হেললুর রহমান চিশতি, ঐ রাতেই পত্রিকা অফিস পুড়ে ছাই হয়েছে আমাদের বিভাগের স্বপন চৌধুরী, সলিমুল্লাহ হলে শহিদ হয়েছে অংক বিভাগের লুৎফুল আজিম, আর জগন্নাথ হল তো গণকবর। সবাইকে গর্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় জি সি দেব নাই, মেঘনাগুহ ঠাকুরতা নাই, নাই আমাদের পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান, হত্যা করেছে মধুর ক্যান্টিনের মধুদা’কে। পরে শুনেছি রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক আর পিলখানার ইপিআর-এর ওপর আক্রমণের কথা।
এই আমাদের রক্তাপ্লুত স্বাধীনতা দিবস। চেষ্টা করেও আনন্দ করা যায় না। বিজয় দিবসে অথবা স্বাধীনতা দিবসে। বুক ফেটে কান্না আসে। এটা কখনও দূর হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। মনে হয়েছিল আমাদের জীবনে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখতে পারব না। কিন্তু, দেরিতে হলেও কিছু শাস্তি হয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
এখন আমাদের মূল উদ্যোগ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়। এ নিয়ে অনেকে অনেকদিন যাবত সংগ্রাম করে আসছে। বিশেষত, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, প্রজন্ম ’৭১, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ বেশ কিছু সংগঠন, সংস্থা, ব্যক্তি নানাভাবে নানা কৌশলে এই স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বিশেষত, ইউরোপে বেশ কিছু সংগঠন দীর্ঘদিন যাবত সক্রিয় আছে।
যে ভয়ানক, বীভৎস জেনোসাইড একাত্তরে হয়েছে, এর নজির খুবই বিরল। গ্রাম-গ্রামান্তরে গণকবর-বদ্ধভূমির ছড়াছড়ি। এর অধিকাংশই সংরক্ষিত নাই। অনেকের মনেই শঙ্কা, ৫২ বছর পর জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে কি না, এই বধ্যভূমি সংরক্ষিত হবে কি না, মানুষের জীবনে আবার একাত্তরের মূল্যবোধ ফিরে আসবে কি না?
এগুলো অবশ্যই হবে। জীবনে কিছু কিছু বিষয় আছে, যা কখনোই তামাদি হয় না- যুদ্ধাপরাধ, জেনোসাইড সে-রকমই একটি বিষয়।
এছাড়া সে-সময়ের বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা এখন আর নেই। চীন, মার্কিন-পাকিস্তানের সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এ মর্মে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে শুধু পিছিয়ে দেওয়া হয়, একে উল্টে দেওয়ার অপচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিয়ে, জিন্দাবাদের সেøাগান এনে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে আমাদের মাতৃভূমিকে আবার পাকিস্তান বানানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। ইতিহাস থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অপসারিত করার চেষ্টা নিয়েছিল।
কাজেই ২১ বছরে তারা ২১ বছর নয়, প্রায় ৫০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। আজ যা যা হচ্ছে, এগুলো হতে পারত সত্তর-আশির দশকে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ৪৩ বছর পর ইউনেস্কো বিশ্বদরবারে নিয়ে এসেছে।
আজ ৫২ বছর পর জেনোসাইডের বিস্তারিত গবেষণা নতুনভাবে শুরু হয়েছে। খুলনার ডুমুরিয়া থানার চুকনগরে ১৯৭১ সালের ২০ মে মাত্র ৫ ঘণ্টায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত মানুষ হত্যা করা হয়নি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের হলোকাস্টও এই বর্বরতার কাছে মøান হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাপী আজ আওয়াজ উঠেছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডের বিষয়ে জাতিসংঘের স্বীকৃতি চাই।
বিগত কয়েক বছরে জেনোসাইড ওয়াচ, লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর প্রিভেনশন অব জেনোসাইড, ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব সাইটস অব কনসেন্স এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জোনোসাইড স্কলারস জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জেনোসাইডের স্বীকৃতির জন্য। শুধু তাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও বিল উত্থাপন হয়েছে এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে- এখানে রিপাবলিকান পার্টি, ডেমোক্রেটিক পার্টি- দুই পক্ষের কংগ্রেস প্রতিনিধিই তা সাবমিট করেছে। কাজেই বিলম্বে হলেও দ্বিপক্ষীয় এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জাতিসংঘের মূল অধিবেশনে এ পর্যন্ত উত্থাপিত না হলেও, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে গত দুই বছর যাবত আলোচ্যসূচিতে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি, গত দুই বছরে সাইড ইভেন্ট হিসেবে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপন করার কথাও শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ তারাও বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। ৫২ বছর পর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ও দলিলপত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো ২১-৩১ মার্চ। যুক্তরাজ্য এবং কানাডার দূতাবাসের উদ্যোগে দুটি বড় উদ্যোগ সফল হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশন উপলক্ষ্যে গত বছর এবং এ-বছর দেশের বিভিন্ন শহরে এবং বিশ্বের বড় বড় শহরে মানববন্ধন ও প্রচার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আমরা একাত্তর ও প্রজন্ম ’৭১ যৌথভাবে ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছে গত ২২ মে। এই সম্মেলন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলে ছিলেন ডাচ্ পার্লামেন্টের সদস্য এবং যুক্তরাজ্য ও জার্মানির জেনোসাইড বিশেষজ্ঞগণ।
সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের জাতিসংঘের স্বীকৃতি এখন সময়ের ব্যাপার। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা যথাযথভাবে পালন করতে পারলে জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং এ-ধরনের একটা উদ্যোগের মাধ্যমে পৃথিবীজোড়া সহিংসতা ও যুদ্ধাপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিলম্বে হলেও সুবিচার হবেই। It is never too late…

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ডাকসু’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য