Saturday, July 13, 2024
বাড়িউত্তরণ-২০২৩ত্রয়োদশ বর্ষ,অষ্টম সংখ্যা, জুলাই-২০২৩জিয়া-ই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড

জিয়া-ই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড

মাস্টারমাইন্ডের ক্ষমতা দখলের আকাক্সক্ষা ও পরিকল্পনা অনুসারে একটি কিলার গ্রুপ হত্যাকাণ্ডের কাজটি বাস্তবায়ন করে থাকে।
বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সেখানেও একই পদ্ধতির প্রতিফলন দেখা যায়।

সাদিকুর রহমান পরাগ: অনেক সম্ভাবনা নিয়ে ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা আঁতুড়ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল যখন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থ’পতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে একটি বয়ান প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল যে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তারা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছিল। এ বয়ানটি দীর্ঘদিন চললেও এখন আর চলছে না। কারণ, কালপরিক্রমায় এটি প্রমাণিত যে এ বয়ানটি একটি মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, কেন এ ধরনের একটি বয়ানের প্রয়োজন পড়েছিল? উত্তরটিও খুব সহজ। বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে মূল খুনি চক্র নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে এ প্রচারণাটি চালিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না। এটি ছিল একটি সুগভীর রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশÑ একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের রাজনৈতিক চক্রান্তের মাস্টারমাইন্ড থাকে, নেপথ্যের কুশীলব থাকে, বিদেশি শক্তির যোগসাজশ থাকে আর থাকে বাস্তবায়নকারী ঘাতক দল। তাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কারণ জানতে হলে আমাদের জানতে হবে সেই চক্রান্তের স্বরূপ।
আমরা জানি, যে কোনো হত্যাকাণ্ডের একটি মোটিভ থাকে- কেন, কী উদ্দেশ্যে। বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডও তার বাইরে নয়। তাই বঙ্গবন্ধুকে কারা হত্যা করল, কেন করল, কারা প্রকাশ্যে ছিল, কারা নেপথ্যে ছিল, কারা সুবিধাভোগী ছিল- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও অত্যন্ত জরুরি। এই হত্যাকাণ্ড ছিল বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত। তাদের সেই অশুভযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়াটা ছিল তাদের প্রধান কাজ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তাদের সেই চক্রান্ত প্রাথমিকভাবে সফল হয়েছিল এবং একটি দীর্ঘসময় ধরে এদেশ পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, পরবর্তীতে সেই চক্রান্তকে রুখে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। সেই গৌরবোজ্জ্বল লড়াই-সংগ্রামের কথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। তবে আজকের লেখার প্রসঙ্গ সেটি নয়।
আমরা জানি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার রায় হয়েছে। তাই মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আসুন সংক্ষেপে সেই মামলার ধারাক্রম সম্পর্কে একটু জেনে নিই-

* ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়।
* ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
* ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত চার-দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই মামলার অবশিষ্ট কার্যক্রম একেবারেই স্থবির হয়ে পড়ে।
* ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মামলার কার্যক্রম আবার জোরদার হয়।
* ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বরে সুপ্রিমকোর্ট বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। আপিল শেষে আপিলকারী পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করে আদালত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
* ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ছয়জন আসামি এখনও বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বিদেশের মাটিতে মারা গেছে।

জিয়া কি বঙ্গবন্ধু-হত্যায় জড়িত?
মামলার রায়ে খুনিদের নাম উল্লেখ করা আছে। তাহলে এই হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের নাম কীভাবে আসে? কেন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর খুনি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়? কেন বলা হয় জিয়াউর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড?
আওয়ামী লীগের এই দাবি কি নিছক রাজনৈতিক? না-কি এর কোনো সত্যতা আছে? জিয়া কি বঙ্গবন্ধু-হত্যায় জড়িত ছিলেন- আজকের এ লেখায় আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব। তবে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা আমাদের জন্য জরুরি-

* বঙ্গবন্ধুর হত্যার বেনিফিশিয়ারি কে?
* বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সুরক্ষা প্রদান করেছিল কে?
* বিচারের পথকে রুদ্ধ করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল কে?
* বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছিল কে?
* বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে কারা বাধাগ্রস্ত করেছিল?

উপরের এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে কিন্তু জিয়াউর রহমানের নামটা চলে আসে। বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার বিভিন্ন জবানবন্দি, নথি, তথ্য-উপাত্তে দেখা যায় যে খুনি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে জিয়া সেটি আগে থেকেই জানতেন, ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনাকে প্রতিহত না করে বরং উৎসাহিত করেছেন, বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচারের পথকে রুদ্ধ করতে এবং খুনিদের সুরক্ষা দিতে আইন প্রণয়ন করেছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন এবং ক্ষমতা দখলের অশুভ ছক বাস্তবায়িত হওয়ায় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলও করেছেন।

বঙ্গবন্ধু-হত্যার বেনিফিশিয়ারি
বঙ্গবন্ধু-হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি ছিলেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে জিয়াউর রহমান তার অবৈধ ক্ষমতা দখলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তীতে নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এবার দেখে নিই কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল জিয়ার সেই অশুভ নীলনকশা-

* বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়ার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন এবং ২০ আগস্ট সামরিক আইন জারি করেন।
* খুনি মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করেন।
* জিয়া সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পর জিয়ার সম্মতিতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ- ৫০/১৯৭৫ জারি করেন।
* জিয়া সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর তথাকথিত বিপথগামী সেনাসদস্যদের বিচারের আওতায় না এনে দায়মুক্তি দেওয়ায় ৩ নভেম্বর কারাগারে সংঘটিত হয় নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। এ সময় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান-কে কারাগারে হত্যা করা হয়।
* ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক-হত্যার মাধ্যমে ক্যান্টনমেন্টে সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ১৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা দেন।
* ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল অস্ত্রের মাধ্যমে বিচারপতি আবু সাদাত মো. সায়েমকে হটিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।
* অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণকে বৈধতা দিতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০ মে নজীরবিহীন এক ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের আয়োজন করেন। ভোটার উপস্থিতির হার ২ শতাংশের নিচে থাকলেও দেখানো হয় ৮৮ শতাংশ। প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৯৮ শতাংশই দেখানো হয় জিয়ার পক্ষে।
* ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় প্রহসনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অধ্যাদেশ, ১৯৭৮ অনুযায়ী কোনো সরকারি চাকরিজীবী ও সরকারি বেতন গ্রহীতার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও আইন ভঙ্গ করে জিয়া একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনাবাহিনীর স্টাফ প্রধানের পদে থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হন।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সুরক্ষা প্রদান ও পুরস্কৃত করা, বিচারকার্য ব্যাহত ও বাধা প্রদান করা
বঙ্গবন্ধু-হত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার নীলনকশা বাস্তবায়নে অবদান রাখায় খুনিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও তার কোনো রাখঢাক ছিল না। তাই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর জিয়া খুনিদের সুরক্ষা দিতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন, ঘাতকদের বিচার না করে পুরস্কৃত করেন, বঙ্গবন্ধু-হত্যার তদন্তে বাধা প্রদান করেন।

* জিয়া সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পর জিয়ার সম্মতি নিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সুরক্ষা দিতে দায়মুক্তি দিয়ে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ- ৫০/১৯৭৫ জারি করেন। এখানেই শেষ নয়। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে এই অধ্যাদেশ সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ আইনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক আইনের আওতায় জারি করা সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে বৈধতা দেওয়া হয়।
* মানবতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এ অধ্যাদেশটির দুটি ভাগের প্রথম ভাগে বলা হয়েছিল : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। আর দ্বিতীয় ভাগে বলা হয়েছিল : রাষ্ট্রপতি উল্লেখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো।
* বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাজ্যে একটি অনুসন্ধান কমিশন গঠিত হয়েছিল। ১৯৮১ সালে সেই কমিশনের সদস্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি জেফরি টমাস ও তার সহকারীকে বাংলাদেশে আসতে বাধা দেন জিয়াউর রহমান।
* জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ১২ ঘাতককে বিদেশস্থ বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি প্রদান করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করেন-

ক্র. ঘাতকের নাম ও প্রাপ্ত পুরস্কার
১. লে. কর্নেল শরিফুল হক (ডালিম), চীনে প্রথম সচিব
২. লে. কর্নেল আজিজ পাশা, আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব
৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব
৪. মেজর বজলুল হুদা, পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব
৫. মেজর শাহরিয়ার রশিদ, ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব
৬. মেজর রাশেদ চৌধুরী, সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব
৭. মেজর নূর চৌধুরী, ইরানে দ্বিতীয় সচিব
৮. মেজর শরিফুল হোসেন, কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব
৯. কর্নেল কিসমত হাশেম, আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব
১০. লে. খায়রুজ্জামান, মিশরে তৃতীয় সচিব
১১. লে. নাজমুল হোসেন, কানাডায় তৃতীয় সচিব
১২. লে. আবদুল মাজেদ, সেনেগালে তৃতীয় সচিব

* বিদেশে থাকায় ভাগক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে জার্মানিতে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে ওএসডি করা হয়। এমনকি জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকন্যাদের দেশে আসতে দেননি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাসপোর্ট নবায়ন করার অপরাধে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচু্যুত করা হয়। আর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট যাতে নবায়ন না করা হয়, সে-জন্য লন্ডন দূতাবাসকে অফিসিয়ালি নির্দেশ প্রদান করা হয়।

জিয়ার পথে খালেদা জিয়া
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানে এবং বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও তার স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। বঙ্গবন্ধু-হত্যার বেনিফিশিয়ারি জিয়া পরিবারের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণই স্বাভাবিক। এর অন্যথা হলে বরং সেটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হতো।

* খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের পদোন্নতি প্রদান করেন।
* ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার বিএনপি আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আওয়ামী লীগ একটি বিল জমা দিলেও বিএনপি সেদিন সেটি মোটেও বিবেচনায় নেয়নি। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ বলেছিলেন, ইনডেমনিটি আইনটি এতই জটিল যে তা প্রত্যাহার অযোগ্য।
* ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য একটি বেদনাবিধূর দিন। এ দিনটিকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। অথচ ১৯৯৩ সাল থেকে এই শোকাবহ দিনে বিএনপি খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করে আসছে। বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচারের পথকে রুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি জিয়া-পরিবার। এভাবে কেক কেটে মিথ্যা জন্মদিন উদযাপন করেও তারা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে।
* বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের সংসদ সদস্যও করেছেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে খুনি রশিদ এবং হুদাকে এমপি বানিয়ে সংসদকে কলঙ্কিত করেছিলেন খালেদা জিয়া।
* ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের বিল সংসদে আনা হয়। কিন্তু বিল উত্থাপনের সেই দিনে বিএনপি ইচ্ছেকৃতভাবে সংসদে অনুপস্থিত ছিল। এমনকি দায়রা জজ আদালতে বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন খালেদা জিয়া হরতাল আহ্বান করেন।
* ২০০১-এর অক্টোবরে বিএনপি-জামাত জোট সরকার গঠন করে উচ্চ আদালতে চলমান বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলায় জিয়ার সম্পৃক্ততা নিয়ে কে কী বলেছেন
বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলায় বিভিন্নজনের জবানবন্দিতে জিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। চলুন, এবার সেই প্রসঙ্গে জেনে আসি-

* বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার অন্যতম আসামি তাহের উদ্দিন ঠাকুর তার জবানবন্দিতে বলেন, “গত ১৪/৮/৭৫ তাং ১টার দিকে সচিবালয়ে পৌঁছি। খন্দকার মোশতাক বলেন যে, এই সপ্তাহে ব্রিগেডিয়ার জিয়া দুইবার এসেছিলেন। সে এবং তাহার লোকেরা তাড়াতাড়ি কিছু একটা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করায় খন্দকার মোশতাক জানায় যে, বলপূর্বক ক্ষমতা বদলাইতে চায়, প্রয়োজনবোধে যে কোনো কাজ করতে প্রস্তুত। খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান যে, তিনি তার মতামত দিয়েছেন, কারণ এছাড়া অন্য আর কিছু করার নাই। আমাকেও তাহাদের সঙ্গে থাকার জন্য বলেন।”
* বঙ্গবন্ধু-হত্যা মামলার রায়ে আপিল বিভাগ লিখেছেন : “রশীদ তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, তাহের ঠাকুর যখন খন্দকার মোশতাকের ভাষণ তৈরি করছিল তখন জিয়াও সেখানে উপস্থিত ছিল।”
* রায়ে আপিল বিভাগ জিয়ার সঙ্গে খুনিদের যোগসাজশের বিষয়টি উল্লেখ করে লিখেছেন : “রশীদের স্বীকারোক্তিও হাইকোর্ট বিভাগ পূর্ণাঙ্গভাবে লিপিবদ্ধ করেছে। সে (রশিদ) শেখ মুজিবের সরকারকে উৎখাত করার ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার যোগসাজশ এবং আলোচনার কথা উল্লেখ করেছে।”
* আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী কর্নেল (অব.) শাফায়াত জামিল বলেন, ১৫ আগস্ট সকাল অনুমান ৬টায় মেজর রশিদ তাকে বলে- “We have captured state power under Khandakar
Mustaque, Sheikh is killed, do not try to take any
action against us.” এ-কথা শুনে শাফায়াত জামিল হতচকিত হন। দ্রুত ইউনিফরম পরে হেড কোয়ার্টারের দিকে রওনা দেন। পথিমধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় যান এবং তাকে শেভরত অবস্থায় পান, বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে জিয়াউর রহমান তখন শাফায়াত জামিলকে বলেন, “So what president is killed..”
* ১৯৯৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের অন্যতম খুনি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান বলেন, “… এ ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয় এবং সে-মতে এপ্রিল মাসের এক রাতে তার বাসায় আমি যাই…, আলোচনা হয় এবং সাজেশন চাইলে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘তোমরা করতে পারলে কিছু করো।’ পরে আমি রশীদের বাসায় গিয়ে জিয়ার মতামত তাকে জানাই। রশীদ তখন বলেন, ‘এ বিষয় নিয়া তোমাকে চিন্তা করতে হবে না… আমি ফবধষ করব।’ রশীদ পরে জিয়া এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।”
* ফারুক তার জবানবন্দিতে আরও বলেছেন, “১৯৭৫ সালের ১৩ই আগস্ট সাবেক মন্ত্রী সাইফুর রহমানের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়া সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধান হবে এবং রশীদ ও ফারুককে মন্ত্রী করা হবে।”
* বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের অন্যতম খুনি রশীদের স্ত্রী জোবায়দা রশীদ তার জবানবন্দিতে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “একদিন রাতে ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে আমার স্বামীকে (রশীদ) জানায় যে, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে জিয়া আরও বলেন, এটি যদি সফল হয় তবে আমার কাছে এসো, আর যদি ব্যর্থ হয় তবে আমাকে জড়িত করো না।”

বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা নিয়ে আরও কিছু তথ্য
* বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসের কাছে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে খুনি ফারুক ও রশিদ বলেন, ‘একজন ৭৫ সালের মার্চ মাসে ও আরেকজন হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে অর্থাৎ ১৩ আগস্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ে আলোচনা করেন।’ জিয়াউর রহমান তাদের বলেন, ‘তিনি সিনিয়র, এই কাজে অংশ নিতে পারবেন না; কিন্তু জিয়াউর রহমান তাদের বাধা দেননি।’
* বিখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজ বলেন, ‘Ziaur Rahman
was passively involved in the assassination of
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman.’
* ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে ১৯৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ‘ইকোনোমিক অ্যান্ড পলিটিকেল উইকলি’ নামক সাময়িকীতে ‘অ্যান এনাটমি অব ক্যু’ শিরোনামে সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজ এবং কাই বার্ড-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয় : “… ৭৫ সালের ২০ মার্চ মেজর রশীদ তাদের পরিকল্পনা নিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রশীদ জানায় যে ইতোমধ্যে জুনিয়র অফিসাররা একটি পরিকল্পনা করেছে, তবে একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদানে তারা জিয়াউর রহমানকে চাইছেন। জিয়া আবার বলেন, তিনি এই কাজে অংশ নিতে পারেন না, তবে জুনিয়র অফিসাররা যদি পরিকল্পনা করে থাকে তাহলে তারা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারে।”
* একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয় : “… জুনিয়র অফিসাররা জিয়াউর রহমানের মৌন সম্মতি পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জিয়ার নিষ্ক্রিয় থাকা বা কৌশলগত সহায়তার আশ্বাস পেয়ে তারা ধরে নেয় এই অভ্যুত্থানে এগিয়ে গেলে জিয়ার পক্ষ থেকে কোনো বাধা আসবে না এবং অভ্যুত্থানের পর জিয়া তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। এই রকম এক প্রেক্ষাপট তৈরি করে এপ্রিলের পর থেকে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে।”
* ‘ইনসাইড র : দ্য স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’ একটি বহুল আলোচিত গ্রন্থ। ‘র’-এর সাবেক প্রধান অশোক রায়নার এ বইটি থেকে জানা যায় : “বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে জিয়াউর রহমানের বাড়ির ডাস্টবিন থেকে একটি ফেলে দেওয়া কাগজ উদ্ধার করা হয়। ফেলা দেয়া সেই কাগজটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একজন গুপ্তচর গৃহভৃত্যের মাধ্যমে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কাগজটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সম্ভাব্য ক্যু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘র’-এর তৎকালীন পরিচালক রামনাথ কাও বাংলাদেশে আসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করলেও বঙ্গবন্ধু সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে না-কি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার সন্তানের মতো।’ ফলে রামনাথ কাও হতাশ হয়ে দিল্লি ফিরে যান। সেই চিরকুটে জিয়াউর রহমান, মেজর রশিদ, মেজর ফারুক, জেনারেল ওসমানী এবং মেজর শাহরিয়ার-এর নাম ছিল।”
* ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ গ্রন্থে কর্নেল (অব.) শাফায়াত জামিল লিখেছেন : “ডেপুটি চিফ জিয়ার বাসভবন আমার বাসা ও বিগ্রেড হেড কোয়ার্টারের মাঝামাঝি। জিয়ার বাসার দিকেই পা চালালাম দ্রুত। কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর দরোজা খুললেন ডেপুটি চিফ স্বয়ং। অল্প আগে ঘুম থেকে ওঠা চেহারা। স্লিপিং ড্রেসের পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। একদিকের গালে শেভিং ক্রিম লাগানো, আরেক দিক পরিষ্কার। এতো সকালে আমাকে দেখে বিস্ময় আর প্রশ্ন মেশানো দৃষ্টি তার চোখে। খবরটা দিলাম তাকে। রশিদের আগমন আর চিফের সঙ্গে আমার কথোপকথনের কথাও জানালাম। মনে হলো জিয়া বিচলিত হলেন না। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘So what, President is dead? Vice-president is there. Get your troops ready.”
* ১৯৯৩ সালে ‘সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়’ পত্রিকায় অন্যতম আসামি কর্নেল রশীদ বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে জিয়ার জড়িত থাকার বিষয়ে বলেন, ‘জিয়া যদি না থাকত তবে কি তাকে হাওয়া থেকে ধরে এনে আর্মি চিফ অব স্টাফ করা হয়েছে?’
* বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু মোহাম্মদ সায়েম তার ‘অ্যাট বঙ্গভবন : লাস্ট ফেজ’ গ্রন্থে লিখেছেন : “জিয়া বঙ্গভবনে আসতেন মধ্যরাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা অস্ত্র উঁচিয়ে রাখতো। আমি প্রায়ই মনে করতাম, এটাই বোধহয় আমার শেষ রাত। সংবিধানের ৪টি মূল স্তম্ভ বাতিল সংক্রান্ত একটি সামরিক ফরমান আমার কাছে স্বাক্ষরের জন্য আসে। আমি ঐ ফরমানে স্বাক্ষর না করে, তা রেখে দেই। পরদিন রাত ১১টায় বুটের শব্দে আমার ঘুম ভাঙ্গে। সেনাপ্রধান জিয়া অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বঙ্গভবনের আমার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তাঁর বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, সাইন ইট। তাঁর একহাতে ছিল স্টিক, অন্যহাতে রিভলভার। আমি কাগজটা পড়লাম। আমার পদত্যাগপত্র। যাতে লেখা- ‘অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।’ আমি জিয়াউর রহমানের দিকে তাকালাম। ততক্ষণে আট-দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার পাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, ‘সাইন ইট।’ আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম।”

মাস্টারমাইন্ড
পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব রাজনৈতিক-হত্যাকাণ্ডে কোনো রাষ্ট্রের পটপরিবর্তন হয়েছে কিংবা ইতিহাসের বাকবদল ঘটেছে, দেখা যায় সেসব ঘটনার পেছনে একজন মাস্টারমাইন্ড থাকে, যেখানে মাস্টারমাইন্ড নিজেকে পর্দার আড়ালে রেখে সুকৌশলে ঘুঁটি নাড়ে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, জনমনে অসন্তোষ, বিশেষ বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে এবং হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তারপর মাস্টারমাইন্ডের ক্ষমতা দখলের আকাক্সক্ষা ও পরিকল্পনা অনুসারে একটি কিলার গ্রুপ হত্যাকাণ্ডের কাজটি বাস্তবায়ন করে থাকে।
বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সেখানেও একই পদ্ধতির প্রতিফলন দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে- কে সেই মাস্টারমাইন্ড? জিয়াউর রহমান?

* সেনা অভ্যন্তরে সুকৌশলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও বিভক্তি ঘটিয়েছেন।
* সেনা অভ্যন্তরে সেনাপরিষদ ও গণবাহিনীর মতো দুটো গোপন সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন।
* বঙ্গবন্ধুর খুনি বহিষ্কৃত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
* বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা হচ্ছে জেনেও নিশ্চুপ থাকেন এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
* বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান প্রথমে সেনাপ্রধান হন এবং তারপর ক্ষমতা দখল করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।
* বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সুরক্ষা দিতে জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলভুক্ত করেন।
* বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি প্রদান করেন।
* ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে কথিত ক্যু-এর নামে হাজার হাজার সেনাসদস্যকে হত্যা করেন।
* বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়ন চালান।

এসব কর্মকাণ্ড থেকেই কি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় না যে বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে জিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং সে-ই এ হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড?

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য