Monday, April 15, 2024

জিয়াউর রহমান একজন খুনি

উত্তরণ প্রতিবেদন :

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খুনিদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেন? জেনারেল জিয়া একজন খুনি। তার স্ত্রী (খালেদা জিয়া), ছেলেও (তারেক রহমান) তা-ই। তারা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে, বিরোধী দলে থাকতেও অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়ে শত শত মানুষকে বীভৎস কায়দায় হত্যা করেছে। এতিমের টাকা আত্মসাৎ করার দায়ে দÐিত হয়ে যিনি এখন কারাগারে, তাদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেন? চিকিৎসা নিয়ে এত কথা কেন?
গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর খামারবাড়ী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। আলোচনা সভার শুরুতেই ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকাÐের শিকার চার জাতীয় নেতার স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতের আঁধারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিচক্র নির্মমভাবে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করে।
জেলহত্যা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের জেলহত্যাকাÐের নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারী ও মদতদাতাদেরও বিচার হবে। তিনি বলেন, এ রহস্য উদঘাটন হবে এবং ষড়যন্ত্রকারীরাও ধরা পড়বে। বঙ্গবন্ধুর খুনি, ৩ নভেম্বর জেলহত্যাকাÐ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় আমরা কার্যকর করেছি। এদের যারা দোসর বা ষড়যন্ত্রকারী, তাদের বিচার হয়তো আমরা আজ করে যেতে পারলাম না, আমরা করার চেষ্টা করব বা আগামী দিনে যারা আসবে তারা করবে। কারণ ইতিহাস কোনোদিন মুছে ফেলা যায় না। তখন এই ষড়যন্ত্রকারীরাও একসময় ধরা পড়বে। তাদের সে-রহস্য উদঘাটন অবশ্যই হবে। কেউ না কেউ এটা করবে, এটা আসবে, এটা হবেই। কারণ ইতিহাস কাউকে কোনোদিন ক্ষমা করে না।
সারাদেশে চলমান সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি, দেব না। দেশের মানুষ যেন সুন্দর ও উন্নত জীবন পায়, সে-জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যারা যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশকে স্বাধীন করেছেন, তাদের স্বপ্ন কখনও ব্যর্থ হতে পারে না। ভবিষ্যতেও হবে না। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দোসর ও মদতদাতাদের বাংলার মাটিতে স্থান হবে না। আর যেন খুনিদের দোসররা কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে, এ-বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে, সেভাবেই দেশের মানুষকে চিন্তা করতে হবে। শহিদ জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগার হচ্ছে একটি সুরক্ষিত জায়গায়। সেই কারাগারে বন্দিদের হত্যা করার মতো জঘন্য ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। খুনি খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্ত্র নিয়ে ঢোকা যায় না। কিন্তু তারা অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিল। প্রথমে জেল কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়। তখন বঙ্গভবন থেকে বলা হয়েছিল, আলোচনা করতে যাচ্ছে। যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই ঢুকতে দেওয়া হোক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুনি মোশতাকের পতন যখনই অনিবার্য হয়ে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একটি প্লেনে করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে খুনিদের ব্যাংককে নিয়ে যায়। সেখানে বসে তাদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তাদের ভিসার ব্যবস্থা করে কোন দেশে যাবে, সেটাও ঠিক করে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেটাও কিন্তু ইতিহাসে আছে। একদিন তাদেরও বিচার হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিহ্নিত রাজাকার, আলবদর প্রধানদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে লাখো শহিদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন এই খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি পদচ্যুত খায়রুজ্জামানকে এনে পদোন্নতি দিয়ে ফরেন সার্ভিসে চাকরি দিয়েছিলেন। বিদেশে থাকা অবস্থায় মৃত খুনি পাশাকেও পদোন্নতি দিয়ে তার অবসরের সব সুযোগ-সুবিধাও দিয়েছিলেন তিনি। এ-ধরনের জঘন্য অন্যায়-অবিচারও তিনি করে গেছেন।
তিনি বলেন, ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরও তারা (বিএনপি-জামাত) থেমে থাকেনি। অসহযোগ আন্দোলনের নামে গুলশানের অফিস থেকে নির্দেশ দিয়ে সারাদেশে অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছেন খালেদা জিয়া। জীবন্ত মানুষকে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। বাস, ট্রাক, ট্রেন, লঞ্চসহ সর্বত্রই নাশকতা চালিয়েছে। খালেদা জিয়ার ডাকা সেই অসহযোগ, হরতাল ও অবরোধ এখনও কিন্তু বহাল রয়েছে। তাদের এত অন্যায়, জীবন্ত শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা আল্লাহও সহ্য করেন নি।
বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমতার পাঁচ বছরের দুঃশাসন এবং পরবর্তী সময়ে অগ্নিসন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যেভাবে আমাদের দেশের মানুষকে হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ারা একইভাবে দেশের মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করেছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করেছে, সারাদেশে একই সঙ্গে ৬৩ জেলার ৫০০ স্থানে বোমা হামলা করেছে। নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে ছয় বছরের শিশুসহ অসংখ্য নারীকে গণধর্ষণ করেছে। ক্ষমতায় থাকতে হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি।
বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, একটি দলের (বিএনপি) নেত্রী যিনি এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে দÐিত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বিএনপিতে কোনো নেতা পেল না, যাকে (তারেক রহমান) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হলো, সেও দুর্নীতির মামলায় দÐিত পলাতক আসামি! বিএনপি একজন ভালো লোককে পেল না দলের দায়িত্ব দিতে। তাই যারা এখন বিএনপি করেন, এত মায়াকান্না করেন, আসলে তাদের মেরুদÐ ও আত্মসম্মানবোধ আছে কি না সন্দেহ হয়।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে যারা দল গঠন করে, সেই সামরিক স্বৈরাচারের হাতে গড়া দল ক্ষমতায় গিয়ে শুধু নিজেদের ভাগ্য গড়েছে। নিজেরা বিলাসব্যসনে মত্ত থেকেছে, দেশ ও জনগণের কোনো উন্নতি তারা করেনি। এরা ক্ষমতায় থেকে নিজেদের আখের গুছিয়েছে আর দেশের মানুষকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। ঋণখেলাপি, নির্বাচনের নামে প্রহসনসহ যত অপকর্ম, তা খুনি জিয়াসহ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরশাসকরা করে গেছে। অবৈধ ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে তারা একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিল।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের সঙ্গে বেইমান-মুনাফেক খুনি মোশতাকের সঙ্গে জিয়াও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের সঙ্গে জড়িত ছিল বলেই খুনি মোশতাক জিয়াকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিল। মোশতাকের পতনের পর জেনারেল জিয়া একাধারে সামরিক শাসক এবং রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে হটিয়ে অবৈধভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। এই জিয়াই ক্ষমতায় এসে সংসদে ইনডেমনিটিকে আইনে পরিণত করেছিল।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামাতের জারিজুরি সবাই জেনে গেছে। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামাত মাত্র ২৯টি সিট পেয়েছিল। বিএনপি নেত্রীর নামে আরও অনেক দুর্নীতির মামলা রয়েছে। তিনি আদালতে যান না। কারণ উনি (খালেদা জিয়া) ভালো করেই জানেন, আদালতে গেলে তার দুর্নীতির প্রমাণ হয়ে যাবে। কারণ তাদের দুর্নীতি আমরা নই, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই খুঁজে বের করেছে। তার পুত্রের পাচারকৃত কিছু অর্থ আমরা ফেরতও এনেছি। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বিএনপি নেতাসহ কিছু মানুষের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, খালেদা জিয়া সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমানও সেনাপ্রধান ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া তাকে সিএমএইচে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে দেননি। আমরা যে পদোন্নতি দিয়েছিলাম, সেটিও কেড়ে নিয়েছিলেন। ক্যানসারে আক্রান্ত সাবেক এই সেনাপ্রধানকে স্ট্রেচারে করে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একজন সেনাপ্রধানের স্ত্রী হলেও আরেক সেনাপ্রধানকে চিকিৎসাও নিতে দেননি। এখন তার চিকিৎসা নিয়ে এত কথা কেন? কোন মুখে তারা কথা বলেন?
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরে বলেন, দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, এত দ্রæত দেশের উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব? জবাবে আমার একটাই বক্তব্যÑ যদি আন্তরিকতা থাকে, দেশ ও জনগণের প্রতি দরদ থাকে, কর্তব্যবোধ থাকে, তবেই অসাধ্যকে সাধন করা যায়। বাংলাদেশ সারাবিশ্বের সামনে এখন উন্নয়নের বিস্ময়। সেই মর্যাদা বাংলাদেশ পেয়েছে। এই মর্যাদা আমাদের ধরে রেখে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
স্মরণসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিমÐলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এমপি, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক আনিসুল হক, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হক চৌধুরী নওফেল এমপি, কেন্দ্রীয় সদস্য আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ এমপি, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

 

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য