Friday, February 23, 2024
বাড়িএকাদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-২০২০জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে

র. আ. ম. উ বা য় দু ল মো ক তা দি র চৌ ধু রী:  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায় যে কোনো মহামানবের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ বা সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পাওয়া যে কোনো মানুষের জন্য শ্লাঘা ও সৌভাগ্যের বিষয়। আমার জীবনেও এমন সুযোগ ও সৌভাগ্য এসেছিল অনেকটা আকস্মিকভাবেই। তারপর বহুবার, বহুভাবে তার সান্নিধ্যে পৌঁছেছি নানা কারণে, নানা অজুহাতে। সে-কথাই আজ সবিস্তারে আলোচনা করতে যাচ্ছি।
বঙ্গবন্ধুর খুবই নিকট সান্নিধ্যে পৌঁছার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার কোনো শেষ না থাকলেও বাঙালি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (Founding Father) পিতার সান্নিধ্যে আসার যে সুযোগ আমি পেয়েছি, তারপর চাওয়া-পাওয়ার আর কোনো কথা নেই। তৃপ্ত আমার জীবন, তৃপ্ত আমার আছে বেঁচে থাকা। আমৃত্যু তার সস্নেহ সান্নিধ্য আর অকৃত্রিম ভালোবাসা স্মরণে নিয়ে বেঁচে থাকার যে তৃপ্তি, তা আমার আছে এবং থাকবে। এই বেঁচে থাকা শুধুই ব্যক্তি মানুষের সান্নিধ্যের স্মৃতি এমনটি নয়। ব্যক্তি মুজিব যেমনই আমার জীবনে এক গভীর ছায়া ফেলেছেন তার স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে, তেমনি তার জীবন দর্শন আমিসহ লাখো কোটি তরুণ যুবার জীবন পথের পাথেয় হয়ে আছে এবং থাকবে।
আমি প্রথম তার খুবই কাছে আসি পুরানা পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিসে। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর কামাল ভাইয়ের (শেখ কামাল) সাথে উক্ত অফিসে গিয়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও পার্টি অফিসে ছিলেন। কামাল ভাই আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “আব্বা, ও কিন্তু বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে।” জানি না কী কারণে (সম্ভবত আগামীর বন্ধুর দিনগুলোর কথা বিবেচনায়) বঙ্গবন্ধু বললেন, “তবে ওর রাজনীতিতে না আসাই তো ভালো ছিল।” ঐ সাক্ষাতের সময় শেখ ফজলুল হক মনি, ওবায়দুর রহমান এবং তোফায়েল আহমদও উপস্থিত ছিলেন। বলাবাহুল্য যে, মনি ভাইয়ের ‘বাংলার বাণী’ সাপ্তাহিকের অফিসও আওয়ামী লীগের অফিসে ছিল। বঙ্গবন্ধুর এ-কথায় অনেকটা দমে গেলেও কামাল ভাইয়ের সোৎসাহ প্রেরণায় কাজ করে গেছি অবিশ্রান্ত।
বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম সাক্ষাতের বেশ কিছুদিন পর আমার বন্ধু, ক্লাসমেট এবং ছাত্র সংসদের নাট্য সম্পাদক সৈয়দ নুরুল ইসলাম-সহ একদিন সন্ধ্যায় আমি ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর রোডের বাসভবনে গিয়েছিলাম শেখ কামালের সন্ধানে। কামাল ভাইকে সেদিন আমরা পাইনি। ববং পেয়ে যাই বঙ্গবন্ধুকে। আমাদের ঐ বাড়িতে দেখে (আমরা দুজনই উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র) তিনি আমাদের কাছে ডেকে নিলেন। খাচ্ছিলেন সরিষার তেলে মাখা মুড়ি। সঙ্গে আরও দু-তিনজন ভদ্রলোক ছিলেন। তার ডাকে আমরা কাছে ভিড়ি এবং মুড়ি খাওয়াতে অংশ নেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এখানে কী করছো?” আমার তো মুখে রা নেই। বন্ধু নুরু বলল, “আমরা কামাল ভাইয়ের খোঁজে এসেছি।” তিনি অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, “তোমরা মুজিবুর রহমানের কাছে নয়, কামালের কাছে এসেছো?” আমরা হ্যাঁ বললাম। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কোথায় থাকো?” আমরা বললাম যে “আমরা ঢাকা কলেজ হোস্টেলে থাকি।” তিনি জানতে চাইলেন, “এখান থেকে যাবে কীভাবে।” উত্তরে আমরা বললাম, “শুক্রাবাদ থেকে বাসে উঠে চলে যাব।” কিন্তু তিনি অভিভাবক। সন্ধ্যায় ছোট ছোট দুটি বাচ্চা ছেলেকে (তার দৃষ্টিতে) এভাবে ছেড়ে দেবেন কীভাবে? নিকটে থাকা এক ভদ্রলোককে ডেকে বললেন, ‘‘Khasru, take the little boys and drop them at Dacca (Dhaka) College.’’ ভদ্রলোক নারায়ণগঞ্জের অধিবাসী ছিলেন এবং পাটের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফেরার পথে তিনি আমাদের ঢাকা কলেজ গেটে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। যখনই ঐদিনের কথা ভাবি ততই চোখ দুটি অশ্রুতে সিক্ত হয়ে ওঠে। স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসার সেই কথা কি কখনও ভুলবার? তারপর কতবার তার কাছে গিয়েছি; কিন্তু সেদিনকার কথা কি ভোলা যায়?
তারপর যতবারই তার কাছে গিয়েছি, ততবারই ঐদিনের কথাটি মনে এসেছে বারবার। এসব কথা নিয়েই আমার আজকের গাঁথা তৈরি করতে চাই।
১৯৭০-এর কথা। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে শহীদ স্বপন চৌধুরী (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক, আমি ঐ কমিটির সহ-সম্পাদক) উত্থাপিত ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে’ নিয়ে দীর্ঘ তর্কবিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হয় যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলতে হবে। ছুটে গেলাম বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। রাত্রি তখন দুটো বাজে। ছাত্র নেতৃবৃন্দের বাইরে তার নিকট অবস্থান করছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। সারাদিন পরিশ্রমের পরও তিনি রাত জেগে আমাদের সাক্ষাৎ দিলেন। ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন। আমি দেখলাম যে পরবর্তীতে কাজী আরেফ আহমেদসহ অনেকেই এবং বর্তমান সময়ে অনেকে বলতে চেষ্টা করেন যে, সেদিন ভোটাভুটি হয়েছিল। কথাটি সত্য নয়। ভোটাভুটি হয়নি। তবে স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে দল ভারী ছিল এ-কথা সত্য। সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীসহ চার-পাঁচজন ৬-দফার বাইরে কোনো কথাই শুনতে রাজি নন। অন্য আরও কয়েকজন ছিলেন যারা স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও প্রস্তাব গ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন, আমিও তাদের মধ্যে একজন (যদিও অনেকেই আমাকে নূরে আলম সিদ্দিকী সাহেবের লোক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন, যা আদৌ সত্য নয়)।
সেই রাত্রিতে শেষ পর্যন্ত তিনি ধৈর্য ধরে বিভিন্ন পক্ষের (তিনটি পক্ষ। স্বাধীনতার প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে এবং স্বাধীনতার পক্ষে, তার প্রস্তাব গ্রহণের বিপক্ষে) কথা শুনলেন। বঙ্গবন্ধু অতঃপর তার কথা বললেন। স্বাধীনতার বিকল্প কিছু নেই। এজন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে (৬-দফা না হলে ১-দফা) জনমত তৈরির কথা বলে দিক-নির্দেশনা দিলেন। আরও বললেন, এভাবে প্রস্তাব নেওয়া যাবে না। কেননা প্রস্তাব নেওয়ার সময় যেমন হয়নি তেমনি কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে প্রকাশ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা নিরাপদ নয়। সুতরাং ধৈর্য ধরে এগুতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমাদের এই বৈঠক চলেছিল ফজরের আজান পর্যন্ত। ফজরের আজানের পর আমরা সেখান থেকে চলে আসি। ছাত্রলীগ অফিসের নিচে অনেকক্ষণ। সে অন্য কথা, অন্য কোনোখানে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার পর কার কী মন্তব্য আর ভূমিকা ছিল সে অনেক কথা।
বঙ্গবন্ধুর সাথে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সেই বৈঠক নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক একটি বৈঠক। আমার সৌভাগ্য এমন একটি বৈঠকে বসে তার কথা শোনার, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, বৈঠকের একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে যা আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি গর্বভরে। স্বাধীনতার পূর্বে তার সাথে আমার দেখা হয়েছে কয়েকবার। সত্তরের নির্বাচন উপলক্ষে সংগঠনের কাজে অনেক সময়ই তার কাছে গিয়েছি। কখনও কথা হয়েছে। কখনও হয়নি। স্বাধীনতার পরও, পঁচাত্তরের আগ পর্যন্ত কয়েকবার তার সাথে আমার দেখা হয়েছে এবং কথা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর অনেকের মতো আমিও গিয়েছিলাম তাকে দেখতে ১১নং সড়কের বন্দিশালার সেই বাসভবনে। আমি যুদ্ধাহত এবং লাঠি ভর দিয়ে চলতে হয়। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে তিনি আমার চিকিৎসার খবর নিয়েছিলেন। আমি তখনকার পিজি হাসপাতালের কেবিনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি। সে-কথা তাকে বললাম। তারপর তিনি রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ করে সরকারের পুরো দায়িত্ব তথা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সকল দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে তুলে নেন।
এহেন জটিল এবং কুটিল সময়ের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দেশের পুনর্গঠনের মধ্যেও আমার মতো সাধারণ একজন কর্মীর কথা তিনি ভুলে যাননি। কয়েকদিন পরই স্বাস্থ্য দপ্তরের একজন কর্মকর্তা আমার সাথে দেখা করে আমার বিস্তারিত তথ্যাদি নিয়ে যান। এরপর তিনি একটি পাসপোর্টসহ আমার সাথে দেখা করে জানান যে, বঙ্গবন্ধু আমাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছেন। সে-মতে স্বাস্থ্য দপ্তর আমাকে ফ্রান্সে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমি যেন মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেই। কিন্তু চিকিৎসার জন্য আমার ফ্রান্সে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সে-কথা ভিন্ন।
ইতোমধ্যে আমার উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় পর্বের (তখন এইচএসসি পরীক্ষা দুই পর্বে হতো) পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ছাত্রলীগ ভাগ হয়ে গেছে। আমরা যারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সেøাগানের অতিবাম বক্তব্যে বিভ্রান্ত হইনি, তারা কট্টর ডানপন্থিদের সাথে নিয়ে (আমরা মধ্যপন্থার অনুসারী) মুজিববাদের সেøাগান দিয়ে ছাত্রলীগ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করি। (আজকের আওয়ামী লীগের সেরা সেরা ব্যক্তিগণের ও পদধারীদের অনেকেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সেøাগানে গা ভাসিয়ে জাসদ রাজনীতির ভিত্তি রচনায় সহযোগিতার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন)। আওয়ামী লীগের যুবলীগের যুব নেতাদের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ প্রমুখকে আমরা সাথে পেয়েছিলাম। ছাত্রদের মাঝে শেখ শহীদ আমাদের নেতৃত্বে আসলেন। এ-সময় কয়েকবারই বঙ্গবন্ধুর সাথে ৩২ নম্বরে, গণভবনে সাক্ষাৎ হয়েছে এককভাবে, বন্ধুদের সাথে নিয়েও। যতবার তার সাথে দেখা হয়েছে ততবারই নতুন করে ভালোবাসার আর স্নেহের পরশ নিয়ে ফিরেছি। ধন্য আমার জীবন যে ইতিহাসের মহানায়ক, একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে যেতে পেরেছিলাম।
১৯৭৩-এর দিকে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে ছাত্র-সমাজের পক্ষে বক্তব্য পেশের জন্য ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন সমন্বয়ে ‘ছাত্র সমাজের শিক্ষা কমিশন’ নাম দিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছিল। নূহ-উল-আলম লেনিন, আতিকুল ইসলাম আলমগীর, হরে কৃষ্ণ দেবনাথ, অজয় দাশগুপ্ত, রবিউল আলম চৌধুরী (মোকতাদির চৌধুরী) ও আনোয়ারুল হক সমন্বয়ে এই কমিটি হয়েছিল। লেনিন ভাই আহ্বায়ক ছিলেন। আমরা (কমিটির সদস্যবৃন্দ) বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম। শিক্ষা বিষয়ে তার ভাবনা-চিন্তার পরিচিত হয়েছিলাম। একটি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা-ব্যবস্থা ছিল তার শিক্ষাচিন্তা। তিনি তার শিক্ষাচিন্তায় শিশু-কিশোরদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে, বিশেষত তাদের জন্য সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষার আয়োজনের কথা বলেছিলেন। এজন্যই ড. কুদরাত-এ-খুদাকে তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশনের প্রধান করেছিলেন। গতানুগতিকার বাইরে গিয়ে তিনি শিক্ষা সচিব করেছিলেন কবীর চৌধুরীকে, যিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। যা হোক, বঙ্গবন্ধু আমাদের সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের শিক্ষা-ব্যবস্থা ও অন্যান্য আধুনিক শিক্ষানীতির কথা বলেছিলেন। আমাদের বলেছিলেন, আমরা যে কমিটির রিপোর্ট কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের নিকট জমা দেই। সে-মতে আমরা কাজ করেছিলাম। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে, শিশু-কিশোর ছাত্র-যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, দেশকে উন্নত করে গড়ে তোলার বিষয় কতটা ভাবতেন, তা আমরা জানতে পারি আমাদের সাথে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে। তার নির্দেশনায় আমরা একটি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা-ব্যবস্থার সুপারিশ সম্বলিত ‘ছাত্র সমাজের শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্ট কুদরাত-এ-খুদা কমিশনে জমা দিয়েছিলাম।
দেশ নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা আমরা দেখতে পাই ১৯৭৪-এ প্রদত্ত জাতিসংঘের বক্তৃতায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে তার ভাবনার কথা দেখতে পাই আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে তার বক্তৃতায়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির জন্য রাজনৈতিক প্লাটফরম বাকশাল গঠন হলে আমি বাজশালের অঙ্গসংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পাই। এ উপলক্ষে আমরা কয়েক দফা বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাই। জাতীয় ছাত্রলীগের সকল সদস্য বঙ্গবন্ধুর সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ করে এবং তার নিকট থেকে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা গ্রহণ করি। বঙ্গবন্ধুর বাইরে উপস্থিত ছিলেন বাকশালের মহাসচিব, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, বাকশাল সম্পাদক জিল্লুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মণি ও আবদুর রাজ্জাক। সেদিন বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট, তার রাজনৈতিক দর্শন এবং ছাত্র সমাজের করণীয় সম্পর্কে নীতিগত দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন। আনুষ্ঠানিক এই আলোচনার বাইরে তার শাহাদাতবরণের পূর্বে আর কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। কিন্তু কয়েকবারই সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল।
তবে বেরুবাড়ী নিয়ে যখন রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত করে তুলেছিল ডান আর বামেরা মিলে, তখন একদিন ইসমত কাদির গামা, মমতাজ হোসেন, সৈয়দ নুরুল ইসলাম আর আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে ৩২ নম্বরে গেলে হঠাৎ করেই আমরা এক বিরল সুযোগ পেয়ে যাই। ৩২ নম্বর বাড়ির ছাদের ওপর চেয়ারে পা তুলে বসে বঙ্গবন্ধু আমাদের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির তাৎপর্য সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি এ চুক্তি কেন করা হয়েছে এবং এ চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হতে পারে, তা সবিস্তারে বলেছিলেন। এ এক দুর্লভ সৌভাগ্য। তার বক্তব্যের সারবত্তা বুঝতে আমাদের হাসিনা-মোদি-চুক্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

লেখক : সংসদ সদস্য, সভাপতি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য