Friday, February 23, 2024

চলচ্চিত্র এবং শেখ হাসিনা

মাসুদ পথিক: চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলতে হলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষে যে কোনো উদ্যোগকে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’
শিশুদের বিনোদনের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রধান শহরগুলোতে শিশুদের বিনোদনের জন্য কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। তাই আপনাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাদের বিনোদন ও মানসিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে।’
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে হারানো দর্শকদের সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা শুধু ব্যবসার দিকটা না দেখে রাষ্ট্র ও সমাজ উপকৃত হয়- এ ধরনের চলচ্চিত্রের দিকে দৃষ্টি দিন।’
সমাজ সংস্কারমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যও আহ্বান জানান তিনি। জাতি গঠনে চলচ্চিত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের এ শিল্পের কথা মাথায় রাখতে হবে আমাদের সবার। চলচ্চিত্রকে আরও গতিশীল ও সময় উপযোগী করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এজন্য সরকার ৩ এপ্রিলকে “জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস” ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র বিভাগ চালু করেছে।’
এফডিসির উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বলে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডিজিটাল ও বিশ্ব দরবারে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে আরও যা যা দরকার সরকার তাই দেবে।’
চলচ্চিত্রকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার উল্লেখ করে সুস্থ ও সৃজনশীল ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে নির্মিত চলচ্চিত্রকে অবশ্যই সৃজনশীল ও শোভন হতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, চলচ্চিত্র একটি সৃজনশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যম। জনসাধারণের ওপর যার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। শিক্ষার প্রসার, মেধার চর্চা, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, জাতি গঠন এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণেও চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হাতিয়ার। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীল ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ আপনাদের অনুসরণ করে। সুতরাং, সমাজের অন্য মানুষের চেয়ে আপনাদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। তিনি বলেন, একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য, সংলাপ, গল্প এবং নির্মাণকৌশল এমন হতে হবে যে, তা যেন পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে দেখতে পারে।
সম্প্রতি বেশ কিছু চলচ্চিত্র দেশে ও বিদেশে সাফল্য অর্জন করায় নির্মাতা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীদের কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, এমন স্বীকৃতি তাদের পথচলায় অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং সৃজনশীল, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক চলচ্চিত্রকারদের এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
আরও বলেন, মানিকগঞ্জের হিরালাল সেন ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন করেন। তবে বিভিন্ন কারণে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। বিশেষ করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং মানসম্মত স্টুডিও না থাকায় আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ পিছিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি অনুধাবন করে এবং চলচ্চিত্রের শক্তির কথা ভেবে পাকিস্তান আমলে ঢাকায় এফডিসি প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধু যখন শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তখন চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিল উত্থাপন করেন এবং ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল এই বিল প্রাদেশিক পরিষদে অনুমোদিত হয়। একইদিনে বিলটি আইনে পরিণত হয় এবং এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পরপরই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিপণনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এরপর আমাদের চলচ্চিত্রকারদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিগত ছয় যুগেরও বেশি সময় ধরে এদেশে অনেক জননন্দিত ও রুচিশীল ছবি নির্মিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে জাতির অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। প্রগতির পথকে রুদ্ধ করা হয়।
ফলে চলচ্চিত্রও আর সকল কিছুর মতো থমকে দাঁড়ায়। এখনও আবার চলচ্চিত্রের হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে নানামুখী উদ্যোগ।
আপাত এ-রকম মনে হয়, ভীষণ ব্যস্ত সিনেমার পৃথিবীটা, নানা সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে যখন-তখন; সিনেমা, চলমান ছবি নিয়ে ভাবছে অনেকে, কাজ করছে আরও বেশি লোক, অনেক নতুন লোক। আমাদের, যাদের চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো-না-কোনো প্রকারে আগ্রহ আছে, তাদের সকলের মধ্যে এ-রকম বিষয়গত একটা বোধ কাজ করে হালে। বেশ কয়েক বছর, দশকও হতে পারে গোটা দুই, পরে প্রায় নিয়মিতই রাস্তার পাশের দেয়ালে নতুন ছবির পোস্টার পড়ছে প্রতি সপ্তাহে। পত্রিকার সংস্কৃতির পাতা খুললেই নতুন ছবির প্রিমিয়ার, নয় তো কাজ শুরু হওয়ার খবর চোখে পড়ছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে সিনেমা প্রযোজনায়। বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের ছবি স্থান করে নিচ্ছে, হঠাৎ পুরস্কার পাচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেশের ছবির ওপর নানারকম অনুষ্ঠান, নতুন তারকার মেলাÑ অভিনয় তারকা, গানের তারকা। সরকারি ফিল্ম ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ার রকমারি ব্যবস্থা হয়েছে। আবার নানা সংগঠনের উদ্যোগে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স, মেকিং কর্মশালা, নানা আকারের এবং ব্যাপ্তির চলচ্চিত্র উৎসব, নানা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিভিন্ন রকম অনানুষ্ঠানিক দেশি ও বিদেশি ছবির স্ক্রিনিং চলছে। চলমান ছবির আরও যে চলাচল, যেগুলো এ আলোচনা করার পূর্বে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরা যেতে পারে। চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিস নগরীতে অগাস্ট লুমিয়ের (১৮৬২-১৯৫৪) ও লুই লুমিয়ের (১৮৬৪-১৯৪৮) নামে দুই ভাই বায়োস্কোপের প্রথম সফল বাণিজ্যিক প্রদর্শনী করেন। এ ঘটনার মাত্র ছয় মাস পরই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের একজন প্রতিনিধি মুম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই উপমহাদেশে প্রথম বায়োস্কোপের প্রদর্শনী করেন। ওই বছরের শেষ দিকে কলকাতায় শুরু হয় বায়োস্কোপের প্রদর্শনী। ঢাকায় প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনের প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় সাপ্তাহিক ঢাকা প্রকাশ সূত্রে। ১৮৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল বায়োস্কোপ দেখানো হয় ঢাকার সদরঘাটস্থ পাটুয়াটুলীর ক্রাউন থিয়েটারে (এখন অবলুপ্ত)। কলকাতা থেকে আগত ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানি এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শিত ছোট ছোট ছবির মধ্যে ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, তিনশত ফুট উঁচু থেকে প্রিন্সেস ডায়ানার লাফ, রুশ সম্রাট জারের অভিষেক, পাগলা নাপিতের ক্ষৌর কর্ম, সিংহ ও মাহুতের খেলা, ইংল্যান্ডের তুষারপাতে ক্রীড়া, ফ্রান্সের রাস্তাঘাট ও পাতাল রেলপথ ইত্যাদি দৃশ্য। টিকিটের হার ছিল আটআনা থেকে তিন টাকা। পরে বাংলাদেশের আরও অনেক স্থানে যেমন মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামে, ভোলার এসডিও’র বাংলোতে, ঢাকার জগন্নাথ কলেজ মিলনায়তনে, ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে, ফরিদপুরের পালং-এ, ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক ও আহসান মঞ্জিলে বায়োস্কোপ দেখানো হয়। ঢাকায় নিয়মিতভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শন শুরু হয় ১৯১৩-১৪ সালের দিকে আরমানিটোলার পাটের গুদামে। পরে এখানে স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ স্থাপিত হয় ‘পিকচার হাউজ’ (পরবর্তীকালে শাবিস্তান) নামে। এটিই বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল। ১৯৯৪ সালে দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। বর্তমানে (২০১৯) টিভি, ডিভিডি, ইন্টারনেটের কারণে সিনেমা হলের দর্শক কমে গেছে, একই সঙ্গে হলের সংখ্যাও কমে প্রায় ১৫০-এ এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে অবিভক্ত বঙ্গ (১৯৪৭ পর্যন্ত) থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝায়।
পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও (তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ) ১৮৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। এই সূত্র ধরে এই অঞ্চলে ১৯০০-এর দশকে নির্বাক এবং ১৯৫০-এর দশকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০-এর দশকেই। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেই চলচ্চিত্রের প্রায় ৫০ বছরের মতো সময় লেগেছে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এ হিসাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড়ই বলা যায়, যদিও এশিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে তা অনেকটাই উপেক্ষিত।
বর্তমানে হল সংখ্যা আরও কমে গেছে। সময়ের এই সন্ধিক্ষণে প্রযুক্তির রূপান্তরে, বিশেষ করে ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যাপক উন্নতির সাথে সিনেমা শিল্পের পরিবর্তন ঘটে। এই হঠাৎ ঝাঁকুনি থেকে তাল সামলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সামনের দিকে হাঁটা শুরু করেছে শেখ হাসিনার অনুপ্রেরণা এবং ভূমিকায়। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোগের মনে সিনেমার জন্য অনুদান দেওয়া, প্রতিষ্ঠান গড়া, শিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতা এবং প্রতিটি উপজেলা সদরে একটি করে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।
অচিরেই এর সুফল আমরা পাব এবং নতুন ধারার সিনেমা তৈরি সহজলভ্য হবে। আন্তর্জাতিকভাবেও আমাদের মেধাবী তরুণরা স্বাধীন সিনেমা দিয়ে দেশের সুনাম বয়ে আনবে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য