Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderচলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

স্বাধীনতা লাভের পর পাঁচ দশকের দীর্ঘ যাত্রায় ঘটনাটি অনেক শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়েছে বটে; কিন্তু সিনেমা অঙ্গনে আশানুরূপ কাজ এখনও হয়নি। বাঙালি জাতির মহান বীরত্বগাথা নিয়ে এখনও ঢের কাজ করার সুযোগ আছে।

মাসুদ পথিক: আমরা জানি শিল্পকলার সর্বকনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের যাত্রা ইতিহাসে নানা বিষয় নির্মিত হয়েছে। প্রেম-বিরহ, জীবনঘনিষ্ঠ, অতিপ্রাকৃত ভৌতিক, জাদু বাস্তবতাসহ নানা তত্ত্বের প্রকাশ বিধৃত হলেও মানুষই থেকেছে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে মানুষের ইতিহাস, বীরত্বে বহুকৌণিক আলোকধারায় নির্মাণ এখন হচ্ছে। হালে প্রযুক্তি দখল করে নিয়েছে সিনেমার বড় অংশ। কিন্তু এত কিছুর ভিড়েও যুদ্ধ-সংগ্রামের ইতিহাস যেন ভিজ্যুয়াল দালিলিক রূপ পেয়েছে সিনেমার কল্যাণে। হলিউড, বলিউড কিংবা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষের সংগ্রাম-রাষ্ট্র ও সমাজ বিপ্লব এবং মুক্তির যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র বেশ সমাদৃত হচ্ছে কয়েক দশক ধরে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও লেগেছে এর ছোঁয়া। ভারত উপমহাদেশে তো বটেই; পুরো পৃথিবীর একটি উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যা ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই ৯ মাস ছিল চূড়ান্ত মুহূর্ত, যা সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত হয়। তবে এর প্রেক্ষাপট ছিল দীর্ঘ। সেখানে সংগ্রাম-আন্দোলন, রক্তাক্ত রাজপথ, জেল-জুলুম, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনা সইতে হয়েছে বাঙালিকে। এই ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে বাংলার দামাল ছেলেরা। সে এক অনন্য ইতিহাস।
স্বাধীনতা লাভের পর পাঁচ দশকের দীর্ঘ যাত্রায় ঘটনাটি অনেক শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়েছে বটে; কিন্তু সিনেমা অঙ্গনে আশানুরূপ কাজ এখনও হয়নি। বাঙালি জাতির মহান বীরত্বগাথা নিয়ে এখনও ঢের কাজ করার সুযোগ আছে। যা থেকে শেখার আছে পৃথিবীর বহু নিপীড়িত-বঞ্চিত স্বাধীনতাকামী মানুষের। এছাড়া এটিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত করতেও সিনেমাটিক উদ্যোগ খুব একটা হয়নি। এই মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারপরও বেশ কিছু কাজ হয়েছে।
পৃথিবীর বড় বড় সব বিপ্লব, যুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে রচিত হয়েছে সাহিত্য। কবিদের কবিতায়, নাট্যকারের নাটকে, গল্পকারের গল্পে কিংবা ঔপন্যাসিকের উপন্যাসে গাথা হয়েছে বিপ্লব-সংগ্রামের নানামাত্রিক বয়ান। এসব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে অনেক বিখ্যাত সিনেমা। নির্মিত সব চলচ্চিত্রই যে মান বিচারে নিখুঁত হয়েছে, তা নয়। অনেক সিনেমা সাফল্য পায়নি। তবে সংখ্যায় কম হলেও কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সার্থক শিল্প হিসেবে, যা নির্মাণগুণে হয়েছে শিল্পিত, সার্থক এবং কালজয়ী। আবার অনেক চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতিরও অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবাদী চেতনা মুক্তির দর্শন দেখতে গেলে একটু পেছনে ফিরে আমরা দেখতে পাই সেই ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্রের সূচনার ১০ বছরের মধ্যেই আমাদের এই উপমহাদেশে প্রথম যে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, তা ছিল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। ১৯০৫-এর ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতার টাউন হলে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের একটি প্রতিবাদ সভা হয়েছিল, এ ছবিতে সেটি ক্যামেরাবদ্ধ করেন বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন। ‘বন্দে মাতরম’ গেয়ে শেষ করা ছবিটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশী সিনেমা’।
মূলত, ’৭১-এর ময়দানের যুদ্ধ শুরুর আগেই আমাদের চলচ্চিত্রে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমনটি আনোয়ার পাশা শুরু করেছিলেন তার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ দিয়ে। সময়টা ১৯৭০ সাল। এ সময় আমাদের প্রকৃত মুক্তির আকাক্সক্ষা আর সংগ্রামকে যে চলচ্চিত্রটি মূর্ত করে তোলে, তার নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের পটভূমিকায় ১৯৭০ সালে জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। এ ছবিতে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি ও মিছিল, শহিদ মিনার এবং ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি প্রথমবারের মতো ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে জহির রায়হান ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে একটি ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু সরকার তাকে নির্মাণের অনুমতি দেয়নি। জহির রায়হান ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর নির্মাতা। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার জন্য তৈরি করেন এ প্রামাণ্যচিত্রটি। এ প্রামাণ্যচিত্রে যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচানোর আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে। এ নির্মাতার ‘অ্যা স্টেট ইজ বর্ণ’ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বলা যায়, যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযুদ্ধকে ফিতায় বন্দী করাসহ যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জহির রায়হান ছিলেন সমসাময়িক অনেকের চেয়ে এগিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার দেড় মাসের মধ্যেই জহির রায়হান নিখোঁজ হন। পরবর্তীকালে আলমগীর কবির এই সিনেমাটির বাকি কাজ শেষ করেন।
ভাষা আন্দোলন জহির রায়হানের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’তে। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার সূত্রগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায় এই চলচ্চিত্রে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র না হলেও মুক্তির আকাক্সক্ষা যে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে প্রবল ছিল এবং সেই বিস্ফোরণ যে কোনো সময় ঘটতে পারে, সেটি আমজাদ হোসেনের লেখনী জহির রায়হান সেলুলয়েডের পর্দায় অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন। একটি পরিবারের গল্প দিয়ে শুরু হলেও তা সেখানে সীমবিদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে দেশ-জাতি, কালের বয়ান। কাহিনিটা মূলত প্রতীকী। সংসারের একগোছা চাবি একজনের কর্তৃত্বে থাকার মানে সব ক্ষমতা একজন হাতে রাখতে চাওয়া। চরম স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে স্বৈরাচারী আচরণের বহিঃপ্রকাশ, যা পাকিস্তানি শাসকদের আচরণের প্রতীকী রূপ। পাশাপাশি এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সুতীব্র আকাক্সক্ষা। বলা যায়, এটি এ নির্মাতার জীবনঘনিষ্ঠতায়, মহাকাব্যিক গভীরতায় সর্বোপরি বিষয়ের মহত্ত্বে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। একই পরিচালক তার ‘আর কতদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি শুরু করেন যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদী চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। কিন্তু এটি আলোর মুখ দেখেনি। প্রায় একই সময় আলমগীর কবির বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ডট্র্যাকে ওভারল্যাপ করে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স’। শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা নিয়ে ওই সময় নির্মিত বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ও বেশ আলোচিত ছিল। এরপর আমরা দেখতে পাই- মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে শুরুর দিকে নির্মাতাদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহে ভাটা।
মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হয় মাত্র ৪টি। এরপর ১৯৭৩ সালে ৪টি এবং ১৯৭৪ সালে দুটি। পরবর্তী সময়ে দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া ঢাকাই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে যেগুলো নির্মিত হয়েছে সেসবের মধ্যে মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর শিল্পমান নিয়ে রয়েছে প্রশ্নের অবকাশ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (জহির রায়হানের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন), হারুন অর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ ও হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ অনেকটা মানসম্মত। এর পরের ধাপে উল্লেখ করার মতো চলচ্চিত্র ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। দীর্ঘ ৯ মাসের এই রুদ্ধশ্বাস সংগ্রামের চিত্র কখনও যুদ্ধাকারে, কখনও গ্রামীণ পরিবেশে সেই সময়কার মানুষের জীবনযাপনের মাধ্যমে, আবার কখনও মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের পথচলার গল্প সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দী করেছেন এসব নির্মাতা।
বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে কিছু শিক্ষিত সচেতন সংস্কৃতিসেবী ও বুদ্ধিজীবী পূর্ববঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প স্থাপন ও নির্মাণের ব্যাপারে সচেতন হন। ১৯৫৬ সালে তৈরি হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। চলচ্চিত্র নির্মাণে জড়িত হন ভাষা-সংগ্রামী জহির রায়হান, পরিবেশনা ও প্রযোজনায় জড়িত হন আরেক ভাষা-সংগ্রামী মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, অভিনয়ে জড়িত হন ভাষা-সংগ্রামী জহরত আরা, অভিনয় ও সংগীতে জড়িত হন আলতাফ মাহমুদ।
১৯৭০ সালে নির্মিত ফখরুল আলম পরিচালিত ‘জয় বাংলা’ নামের ছবিটি পাকিস্তানি সেন্সর বোর্ড আটকে রাখে। ১৯৭২ সালে এটি মুক্তি পায়।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার ছবি তুলেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল উল্লা। হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার বাসায় পড়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিচুমানের ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে গণহত্যার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন।
মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর আবদুল জব্বার খানকে পরিচালক করে একটি চলচ্চিত্র বিভাগ খোলা হলেও মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম সিরিয়াস প্রচেষ্টা হয় বেসরকারি উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব দি ইনটেলিজেনশিয়া’ এবং ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী কলাকুশলী সহায়ক সমিতি’র যৌথ উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তায়। নভেম্বর মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৪টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। এগুলো হলো জহির রায়হান পরিচালিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘এ স্টেইট ইজ বর্ন’, আলমগীর কবির পরিচালিত ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ এবং বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’।
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গঠিত গেরিলা দলের পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান এবং দেশ স্বাধীন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘ওরা ১১ জন’। এই ১১ জনের ১০ জনই বাস্তবের মুক্তিযোদ্ধা; যারা পেশাদার শিল্পী ছিলেন না। এরা হলেন খসরু, মঞ্জু, হেলাল, ওলীন, আবু, আতা, নান্টু, বেবী, আলতাফ, মুরাদ ও ফিরোজ। ১১-দফার ছাত্র আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে মাথায় রেখে প্রতীকী অর্থে এ চলচ্চিত্রের নামকরণ করা হয় ‘ওরা ১১ জন’। চলচ্চিত্রের শুরুতে টাইটেলে ৬টি কামানের গোলার শব্দ শোনা যায়। নির্মাতার মতে, এ ৬টি শব্দ হচ্ছে ৬-দফা দাবির প্রতীকী শব্দ। এই চলচ্চিত্রে যে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ ব্যবহার করা হয়েছিল, সবই ছিল সত্যিকারের। ১১ আগস্ট ১৯৭২-এ মুক্তি পায় এ চলচ্চিত্রটি। ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ এবং ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যাঁরা’ গান ব্যবহার করা হয়।
১৯৭২ সালের ৮ নভেম্বর মুক্তি পায় সুভাষ দত্তের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। কুসুমপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ এবং প্রতিবাদে বাঙালিদের মুক্তি সংগ্রামকে কেন্দ্র করে এ চলচ্চিত্র নির্মিত। যুদ্ধশিশুর মতো বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ফুটে উঠেছে এ চলচ্চিত্রে। ছবিটির স্লোগান ছিল- ‘লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্যাদা দাও, নিষ্পাপ সন্তানদের বরণ কর…’।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক নানা চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়ে আসছে। এদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক চলচ্চিত্রগুলো। এ চলচ্চিত্রগুলোর অনেকগুলোতে সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা উঠে এসেছে। যেমন- চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২), ‘সংগ্রাম’ (১৯৭৩), ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩)।
সেই সঙ্গে কিছু চলচ্চিত্রে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধকে উপস্থাপন না করে পরোক্ষভাবে এর ভয়াবহতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপস্থাপন করা হয়েছে যুদ্ধের শিকার হওয়া শরণার্থী বা পালিয়ে বেড়ানো মানুষের জীবনাবেগকে। এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)। তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ পরিচালিত এক অবিস্মরণীয় ও আকর চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’ আগামী প্রজন্মের কাছে দলিল হয়ে থাকবে। হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৩), মোরশেদুল ইসলামের ‘খেলাঘর’ (২০০৬)।
এছাড়াও কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যুদ্ধ-পূর্বকালে ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এর প্রভাব ও রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতা নিয়ে। এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে- জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭১), খান আতাউর রহমানের ‘এখনো অনেক রাত’ (১৯৯৭), হারুন-উর-রশিদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬), নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪)। তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’ (১৯৯৫) একটি শিল্পোত্তীর্ণ অসাধারণ চলচ্চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিন ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরিতাপের বিষয় পৃষ্ঠপোষক না পেয়ে ৭২ মিনিটের এ ছবিটি অবশেষে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন তিনি। ১৯৭২ সালে আলমগীর কবির ‘ডায়েরিজ অব বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এমন অনেক কাজ আছে, তা উল্লেখ করতে গেলে পরিসর বড় হয়ে যাবে। তাদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। অন্য কোনো পরিসরে তাদের কথা উল্লেখের ইচ্ছে রইল। আমাদের জাতীয় জীবনের এই মহান ঘটনাকে নিয়ে অনেকে আরও নানা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন প্রয়াস অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য