Saturday, July 13, 2024
বাড়িচতুর্দশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-২০২৩চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যানের নাম হোক ‘জয় বাংলা’ উদ্যান

চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যানের নাম হোক ‘জয় বাংলা’ উদ্যান

আ. ফ. ম. মোদাচ্ছের আলী: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে জ্বলে উঠেছিল চট্টগ্রাম। সোয়াত জাহাজে আনা গণহত্যার জন্য অস্ত্র খালাসে বাঙালি অফিসারকে বাধা দিয়েছিল চট্টগ্রামবাসী। এ বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কমান্ডার, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ-গবেষক সিরু বাঙালি লিখিত আলোচিত ‘সেনাপতির মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই’ বইটির নাম এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। প্রাসঙ্গিকভাবে এবার আরও একটু পেছনের ইতিহাসে ফিরে যাই। ১৯৯৩ সালের ১১ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার থেকে ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এর মূলধারা বিভাগে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙালি ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। এটি ১৪৫ কিস্তিতে শেষ হয় ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে। ১৯৯৬ সালে লেখাগুলো সংকলিত করে চট্টগ্রামের শৈলী প্রকাশন ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইটি প্রকাশ করে। সিরু বাঙালির লেখা ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এ প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিচারণে লেখা হয়Ñ ১৯৬৯ সালের শেষ দিক থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা ষোলশহর সিডিএ গোডাউনে (বর্তমানের শপিং কমপ্লেক্স) অবস্থান করেছেন। যার অন্যতম অফিসার ছিলেন মেজর জিয়া। ৮ম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া ২৫ মার্চ রাত ১১টায় মেজর জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তান নেভির একটি ট্রাকে একদল অবাঙালি পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর সাথে ‘এমভি সোয়াত জাহাজ’ থেকে অস্ত্র খালাসের তদারকির জন্য বন্দরে পাঠান। এ প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’ ৯ নম্বর গ্রন্থের ৪২ পৃষ্ঠায় মেজর জিয়াউর রহমানের বক্তব্য ছিলÑ “রাত প্রায় সাড়ে এগারোটায় জানজুয়া নিজে এসে তাকে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করে দেন। কিন্তু রাস্তায় ব্যারিকেড সরিয়ে দিতে তার দেরি হচ্ছিল। আগ্রাবাদে যখন একটি বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তার ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ে তখনই পেছন থেকে ছুটে আসে একটি ডজগাড়ি। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়ে আসেন মেজর জিয়ার কাছে। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যান রাস্তার ধারে। বলেন, পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছে। এখন কী করবেন? মাত্র আধামিনিট চিন্তা করে জিয়া বলে উঠলেন, উই রিভোল্ট?”(বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল, পৃষ্ঠা-১৩৬)
আমার প্রশ্ন বিপ্লব কোথায় হলো? কীভাবে হলো? এবার দেখা যাক, ৮ম বেঙ্গলের অন্যতম সিনিয়র বাঙালি অফিসার মেজর মীর শওকত আলীর বক্তব্য যা ছাপা হয়েছে ‘একাত্তরের রণাঙ্গন’ বইতে। বক্তব্যটি ছিলÑ “২৫শে মার্চ ’৭১ রাতে ঢাকার হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আমরা ভেবে দেখলাম যে, নতুন পাড়া ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত ট্যাংক ছিল। আমরা ছিলাম ষোলশহরে মাত্র দু-মাইল দূরত্বে। আমাদের হাতে কোনো ট্যাংক ছিল না। ৮ম বেঙ্গল পাকিস্তানে চলে যাবে। তাই ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল আগেই। আমাদের হাতে ছিল কিছু রাইফেল ও এলএমজি-জাতীয় অস্ত্র। আমি আর মেজর জিয়া আলাপ করে দেখলাম, আমরা যদি ষোলশহর বিল্ডিং-এর ভিতর থাকি, এই অবস্থায় যদি ট্যাংক আসে, ট্যাংক থেকে দু-তিনটি গোলা ছুড়লেই আমাদের অনেক সৈন্য মারা যাবে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ষোলশহর স্টেশন ত্যাগ করে আমরা কোথাও নিরাপদ স্থানে হেড কোয়ার্টার বেস বানাব। তাছাড়া আমাদের শপথ নেয়াও জরুরি। এরপর আমরা ভোররাত্রের দিকে কালুরঘাটের দিকে মার্চ করে চলে গেলাম।” পাঠক লক্ষ করুন, কোথায় বিপ্লব হলো? কে বিপ্লব করল? বিষয়টির অবতারণা এখন জরুরি। ইতিহাস বলে চট্টগ্রামের প্রথম প্রকাশ্যে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দানকারী সেনা অফিসারের নাম ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম। সিআরবি পাহাড়ের ওপর রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের পশ্চিম দিকে দোতলা একটি কাঠের বাংলোতে স্থাপিত হয়েছিল ক্যাপ্টেন রফিকের অস্থায়ী সদর দপ্তর। সেখানে ইপিআর বাহিনীর সেনারা মর্টার ও মেশিনগান নিয়ে পরিখা খনন করে পূর্ণ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ছিল। যার নেতৃত্বে ছিলেন ইপিআর বাহিনীর বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম।
চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যান ইতিহাস বিকৃতির একটি অংশ। মেজর জিয়া মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধীনে চাকরি করেছিলেন, কোনো ধরনের বিপ্লব তিনি করেননি বা পাকিস্তানি বাহিনীর অবাধ্য হননি।
যেহেতু এই অংশে আমাদের ৮ম বেঙ্গলের বীর সেনারা অনেকদিন ছিলেন, তাই এটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘জয় বাংলা’ উদ্যান ঘোষণা করা হোক। ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে নিষ্কৃতি পাক ইতিহাস সৃষ্টির চট্টগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায়, অথচ চট্টগ্রামের মেয়ররা এ-কাজটি করতে কেন পারছেন না বা পারলেন না, তা ভাবনার বিষয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে বিজয়ের মাসে নিবেদন, চট্টগ্রামে ইতিহাস বিকৃতির এই স্থানটির নাম অবিলম্বে পরিবর্তন করে ‘জয় বাংলা’ উদ্যান রাখা হোক।

লেখক : ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সদস্য সচিব মুক্তিযুদ্ধ একাডেমি ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম বিভাগ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য