Saturday, July 13, 2024

গণভবন যেন এক গেরস্তের আঙিনা

বৈশ্বিক খাদ্য সংকট বিরাজমান। মোকাবিলা করতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। শহর-গ্রাম কোথাও এক ইঞ্চি জমি অনাবাদি রাখা যাবে না। প্রতিটি বাড়িকে একটি খামারের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

রাজিয়া সুলতানা: ছায়া সুনিবিড় বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও একেবারে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। গ্রামের মাটির ঘ্রাণ এখনও তার সারাদেহে মিশে আছে। হয়তো এখনও তিনি মনের অজান্তে ক্যানভাস খুঁজে চোখ স্থির করে ফেলেন টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির পাশে সবুজ আবাদি ধানি ফসলের দিগন্ত জোড়া মাঠে। কিংবা চোখের সামনে ভেসে ওঠে মধুমতির শাখা নদী বাইগারের স্বচ্ছ টলটলে পানিতে বিপুল সোনালি-রুপালি মাছের সমারোহ। ঘরের উঠানে হাঁস-মুরগির নিরবচ্ছিন্ন ছুটে বেড়ানো; গোয়াল ঘরে দুধেল গাই-গরুর ছবি। পাকা ধানের গোলা। হয়তো মনে পড়ে সেগুন বাগিচার বাসায় পিতার প্লট ভাগাভাগি দেওয়া বাগানে ফুল-ফল গাছের আবাদ নিয়ে ভাইবোনদের তুমুল প্রতিযোগিতা। জন্ম থেকেই দেশের মাটি-প্রকৃতি, কৃষির সঙ্গে মিশে আছে তার মান-প্রাণ। গণভবনে কঠিন-কঠোর নিয়মী জীবনের ফাঁক গলিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফসলি উঠোন তারই নিবিড় ভালোলাগা-ভালোবাসার দৃষ্টান্ত।
শেরে বাংলা নগরে গণভবন; জাতীয় সংসদ ভবন থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা পথ। সংসদ প্লাজার লেকসড়কের একেবারে ক্রসিং ঘেঁষে অবস্থিত। পূর্বে এর আয়তন ছিল প্রায় ২২ একর। মূল ভবনের আয়তন ১৫ একর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান আবাস ভবন কাম অফিস। সেই গণভবনের দক্ষিণ আঙিনায় তিনি সযত্নে গড়ে তুলেছেন সবুজশোভিত ফসলি উদ্যান। যেখানে কৃষিজ ফল-সবজির ডালে ডালে সোনালি রোদ আলো ঝলমল করে। আছে ধান, পিঁয়াজ ও টমেটোর আবাদ। আছে ফুলকপি-বাঁধাকপি গাদা গাদা, মাচায় লাউ-শিমের ডগায় নাচছে ফড়িং-প্রজাপতির দল। লনের ধারে নারিকেল-বরই-আমগাছের সারি। অদূরে লেকে রুই-চিতল-কাতলের জলকেলি। খামারে হাঁস-মুরগি-গরুর কলরব। গণভবনে এই বিস্ময় জাগানিয়া বিরল চিত্রপটের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি গণভবনের সিমেন্ট-ইটের অট্টালিকায় সরকার পরিচালনায় যত ব্যস্ত, ঠিক সেভাবে অবসরের প্রতিক্ষণ নিজেই কখনও পুরোদস্তুর কৃষিবিদ কিংবা বড়শি হাতে পাকা মাছ শিকারি। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া গণভবন কৃষিবান্ধব প্রধানমন্ত্রী সাজিয়েছেন মনের সুধা-নির্যাস-মাধুরী মিশিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে অফিস করার সময় তিনিও জমি আবাদ করেছিলেন, লেকে মাছের জন্য খাবার ছিটিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা ভাগ্যবান; তিনি আজ সেখানেই গড়ে তুলেছেন পিতার স্বপ্নের ফসলি জমি, খামার আর দেশজ মাছের দৃশ্যমান সাম্রাজ্য।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন গণভবনে অফিস করতেন; তখন এখানে ছিল দুটি গোলাপ বাগান, দুটি বারোয়ারী ফুলের বাগান, একটি বিশাল ফলজ বাগান এবং সুবিস্তীর্ণ লন। লনেই বঙ্গবন্ধু সময় পেলে পায়চারি করতেন। চাষ করতেন নানা জাতের ধান। লাগিয়েছিলেন আনারস। উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মনোরম লেক, যার পশ্চিম দিকে ছিল শান বাঁধানো ঘাট। এই লেকে বঙ্গবন্ধু মাছ চাষ করতেন। আর ওই ঘাটে বসেই মাছদের খাবার দিতেন। হাঁস পালতেন। মাঝে-মাঝে গণভবনে তার সঙ্গী হতো শেখ রাসেল। জাতির পিতার সেই পথ ধরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই গণভবনকে সাজিয়েছেন। করেছেন মাছের চাষ। সাথে আরও যুক্ত করেছেন শস্য, গবাদি পশু, মৌমাছি ও মুক্তার চাষ। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’-এর আওতায় যা যা করা সম্ভব, তার সবটাই করেছেন কৃষিবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। প্রকৃত মাটি-গণমানুষের কন্যা শেখ হাসিনা একাধারে একজন দক্ষ রাজনীতিক, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক; আর এত কিছুর মধ্যে তার কৃষকসত্তা নতুন এক বিস্ময়ের নাম। তিনি নিজের বোধ-বিবেচনা এবং তাগিদ থেকেই গণভবনের পতিত জমি আবাদের আওতায় এনেছেন। রাসায়নিক সারের যুগেও গণভবনে সকল ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে জৈব সারের ব্যবহার করা হয়। আর এ জৈব সার তৈরি করা হয় গণভবনের গরুর খামারের গোবর থেকে। এখানেও ফাঁদ, নেট ব্যবহার করা হয়েছে কীটপতঙ্গ দমনের জন্য। কাকতাড়ুয়া বানানো হয়েছে ক্ষতিকারক পাখির আক্রমণ থেকে পাকা ফসলকে রক্ষার জন্য। আবার পোকাভক্ষক পাখি কাকতাড়ুয়ার ডালে বসে পোকায় আক্রান্ত মাঠের ফসল থেকে পোকার লার্ভা ভক্ষণ করে। এ যেন এক পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মব্যস্ত দিন শুরু হয় সেই ফজরের নামাজের জায়নামাজ থেকে, ফুসরত নেই গভীর রাত অবধি। এর মধ্যেই সময় বের করে ফল-ফসল আর খামার পরিচর্যা ও প্রাণিকূলের দেখভাল করেন তিনি। খামারে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশজ সব প্রযুক্তি। ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করছেন। আবাদ-নিড়ানি-জৈব সার প্রয়োগ করে গণভবনকে এক গেরস্ত বাড়িতে রূপান্তর করেছেন তিনি। তার এ প্রকল্প নিছক শখের কৃষি বললে ভুল হবে। আবাদি এক একেকটি প্লট যেন একেকটি গবেষণা প্রকল্প। প্রতিটি প্লটকে আলাদা করে বুঝাতে নেইম প্লেটে নাম লিখা হয়েছে। চাষ হচ্ছে ধান, তিল, সরিষার। হচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, চিচিঙা, বেগুন, ডাটা, ব্রোকলি, পেঁয়াজ, হলুদ, মরিচ, তেজপাতা, লালশাক, পালংশাক, ধনেপাতা, টমেটো, লাউ, সিম, কচুসহ বিভিন্ন সবজির। বাদ পড়েনি আলু ক্ষেতের আগাছা বথুয়া শাকও। পুষ্টিগণ বিচারে প্রধানমন্ত্রী একে আখ্যা দিয়েছেন গরিবের মাংস হিসেবে। ধানের মধ্যে রয়েছে- বাঁশফুল ধান, পোলাও চালের ধান, লাল চালের ধান ইত্যাদি। রয়েছে আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, আতা, বরই, ড্রাগন, স্ট্রবেরি, নারিকেল গাছও। শোভার্বধনকারী গাছের মধ্যে রয়েছে- গোলাপ, গাঁদা, সূর্যমুখী, কৃষ্ণচূড়া, হেজপ্লান্টসহ নানা ধরনের ফুল। একেক প্লটে শোভা পাচ্ছে একেক ধরনের ফসল। জমি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে প্লটের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো হয়েছে পেঁপে গাছ। লতানো গাছগুলো চাষ করা হয়েছে মাচায়। আর মাচার নিচে শোভা পাচ্ছে ধনেপাতার মতো ছোট ছোট গাছ। এ এক আধুনিক কৃষির মহাসম্মিলন।
গণভবনে পরিকল্পিতভাবে সরিষা ফুল থেকে খাঁটি মধু আহরণেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মৌসুমে সরিষার হলুদ গালিচায় খেলা করছে মৌমাছি আর প্রজাপতি। এডালে ওডালে ঘুরে বেড়িয়ে মধু আহরণ করে ফিরে যাচ্ছে বাক্সে রাখা মৌচাকে। মৌমাছিরা যাতে পানি খেতে পারে তারও ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সরিষা ক্ষেত থেকে একদিকে যেমন পাচ্ছেন সরিষা; অন্যদিকে মধু। আবার সরিষা থেকে সরিষার তেল।
গণভবনের খামারে রয়েছে গরু, দেশি হাঁস-মুরগি, তিতির, চীনা হাঁস, রাজহাঁস ইত্যাদি। রয়েছে কবুতর, ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পাখি। লেকপুকুরে চাষ করছেন রুই, কাতল, তেলাপিয়া, চিতল ইত্যাদি। পানিতে হাঁসগুলো নিজ মনে সাঁতার কাটছে। কৃষির মানসকন্যা নিজ হাতে এদের খাবার দিচ্ছেন। বড়শি দিয়ে নিজে ধরছেন লেকের মাছ। সাথে কখনও কখনও সাথী হিসেবে ছোটবোন শেখ রেহানাকে রাখছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহাযজ্ঞ হতে পারে জনগণের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। এ-জন্যই বাংলাদেশের কৃষি সেক্টরে জয় জয়কার অব্যাহত রয়েছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কৃষি উৎপাদনের মন্ত্র শিখেছেন; তাই তিনি বাতলে দিচ্ছেন বাম্পার উৎপাদনের মসৃণ পথ। বৃক্ষপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী হিজল গাছকে নিয়ে এসেছেন গণভবনের পুকুর পাড়ে। গোলাপি রঙের পল্লবিত হিজল ফুল তাকে নিয়ে যায় হারানো দিনে। রাত বাড়ার সাথে সাথে ফুটতে থাকা হিজল ফুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে চারদিক ভরে ওঠে। রাত পেরুতেই পানির ওপর ফুলগুলো ঝরে পড়ে আর পানির ওপর এক গোলাপি বিছানা তৈরি করে। এই রূপেই মুগ্ধ হয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন-

“পিছল পথে কুড়িয়ে পেলাম হিজল ফুলের মালা।
কি করি এ মালা নিয়ে বল চিকন কালা।”

প্রকৃতিপ্রেমী প্রধানমন্ত্রীও হিজলফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে এই গাছকে গণভবনে আপন করে নিয়েছেন। বাদ দেননি তমালকেও।
একটু ফিরে যেতে চাই ২০১৯, ২০২০ সালে; দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেটের কারণে ধাই ধাই করে পিঁয়াজের মূল্য ২৫০ টাকার বেশি দরে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই থেকে পিঁয়াজের আবাদের প্রতি নজর রেখেছেন তিনি। জনদরদি প্রধানমন্ত্রী কৃষক ভাইদের পিঁয়াজ চাষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গণভবনে চাষ শুরু করেন। তা প্রতিবছরই অব্যাহত থাকছে। এই পিঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের অনুপ্রাণিত করেছেন। পিঁয়াজের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। উল্লেখ্য, গণভবনে উৎপাদিত কৃষিজপণ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের জন্য কিছুটা রেখে গণভবনের কর্মচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। এ বছর প্রায় ১০০ মণ পিঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে গণভবনে নির্দিষ্ট প্লটে।
একজন সরকারপ্রধান হিসেবে বারবারই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ^জনের স্বীকৃতি পেয়েছেন। কৃষিবান্ধব প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৯ সালে ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য পেয়েছেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা হতে ‘সেরেস পদক’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের জন্য পেয়েছেন ‘সাউথ এশিয়া’ ও ’এশিয়া প্যাসিফিক ম্যানহাটন অ্যাওয়ার্ড’।
বৈশ্বিক খাদ্য সংকট বিরাজমান। মোকাবিলা করতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। শহর-গ্রাম কোথাও এক ইঞ্চি জমি অনাবাদি রাখা যাবে না। প্রতিটি বাড়িকে একটি খামারের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তারই বাস্তব পদক্ষেপ গণভবনে ফসলের সমারোহ। ইচ্ছা থাকলে, দেশ ও দেশের মাটি-মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থাকলে সবই সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করার পরও কৃষি কাজে মনোনিবেশ করছেন। গণভবনের যে জায়গাটা শুধু হ্যালিপ্যাডের জন্য ব্যবহার করা হতো, সেই জায়গাকে প্লটে প্লটে ভাগ করে কৃষির আওতায় এনেছেন। জনসাধারণকে চাষাবাদে উৎসাহ প্রদানের পাশাপাশি খাদ্যোৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ এখানে দৃশ্যমান। তার এই কাজের সূতিকাগার তার পরিবার। জ্ঞানোদীপ্ত প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তার বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীর শাখা বাইগার নদীর পাড়ে। তাদের বাড়িটি এমনই গেরস্ত বাড়ি ছিল, যেখানে লবণ, চিনি দেয়াশলাই আর কেরাসিন ছাড়া আর কিছুই কিনতে হতো না। গ্রামের সহজ-সরল জীবনযাপন, টানাপোড়নের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। এরপরও ঢাকার সেগুন বাগিচার বাসায়ও পেয়েছেন কৃষি কাজের স্বাদ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেখানেও সন্তানদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করার জন্য বাড়ির মুক্ত আঙিনাকে ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে দিয়েছিলেন। ধানমন্ডির বাসায় উঠেও বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন গাছ লাগিয়েছিলেন। গরু পালতেন। মাছ চাষ করতেন। বিশেষ করে রঙিন তেলাপিয়া। শেখ রাসেল এই মাছ নিজ হাতে ধরতেন। এবং সবাইকে দিয়ে খেতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কৃষিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন এদেশের অর্থনীতির মূল ভিত কৃষি। তিনি খাদ্য সংকট ঘুচাতে ১৯৭৪ সালে ডাক দিয়েছিলেন সবুজ বিপ্লবের। আর এই সবুজ বিপ্লবকে সফল করতে বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেছিলেন- “… বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা হবে না।” মুদ্রার অপর পিঠের মতো সেই ভাবনার কথা বারবার বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের দাম। ব্যাপক ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে খাদ্য সরবরাহের। আবার কোভিড-১৯ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যদিও তা ২০২০ সালের মতো মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে করোনার অভিঘাতে সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যে ছেদ পড়েছিল; তা থেকে বিশ্ব পরিত্রাণ পায়নি। সচল হয়নি দেশে দেশে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। ক্ষমতার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক জোর দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে ২০০৯ সালে তিনি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সূচনা করে বাংলাদেশকে নবরূপে জাগিয়ে তোলেন। কারণ তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির পুরোভাগে ছিল কৃষি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, খাদ্য ঘাটতি মেটানো, পাটের উৎপাদন ও মূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি। তিনি কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে নিরন্তর কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু প্রথম শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে পয়সা দিয়েও যখন খাদ্যশস্য দেশে আনতে পারছিলেন না, তখন তিনি দেশজ কৃষিজ উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। দেশি-বিদেশি সমস্ত প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু দেশকে দুর্ভিক্ষাবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশকে নিয়ে মানুষ যখন নতুন করে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল নীতিভ্রষ্ট ঘাতক জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশকে হত্যার চক্রান্ত করে। পরের গল্প বিভ্রান্তি আর অসত্যের। সত্য আলোতে আসতে লেগেছে প্রায় ২১ বছর। ১৯৯৬ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। এসেই বঙ্গবন্ধুর মতো দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। কৃষি গবেষণা আর কৃষির বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন। কৃষি গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেন। দ্রুতই দেশ তার ফলাফল পেতে থাকে। জনসংখ্যার বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশের খাদ্য আমদানি নির্ভরতা কমে আসে। দেশ অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। কিন্তু কোভিড মহামারি যেতে না-যেতেই ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বিশ^ আবার অশান্ত হয়ে ওঠে। ফলে দাম বেড়ে যায় জ্বালানি তেল এবং সারের। এর সাথে সংশ্লিষ্ট খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য ঘাটতিও দেখা দেয়। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্যের দাম ২০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। মার্চ মাসে যুদ্ধের কারণে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালও খাদ্য সরবরাহের সংকট হবে একটি চলমান বৈশ্বিক ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) ৫.৯ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। দাম বেড়ে গিয়েছিল ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম ও ছোলার। যা মূল্যস্ফীতির বড় ভূমিকা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, সাধারণ মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬.১৭ শতাংশে উন্নীত হয়। সরকার স্থানীয় দামকে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।


খাদ্য সংকট নিরসনে ২০২০ সালের ২০ এপ্রিল সর্তক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে যেন দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়তে না হয়, তাই দেশের পতিত আবাদ জমির প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগাতে হবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে।’ তার সফল প্রতিফলন ঘটিয়েছেন গণভবনে সবুজ গালিচায় ফসলের উদ্যান গড়ে। এই উদ্যোগ তৃণমূলের মানুষের মধ্যেও আত্মোপলব্ধি সৃষ্টি করবে। সারাদিনের কর্মব্যস্ত সময়ের মধ্যেও গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে নিজের কৃষি উদ্যান করতে উদ্বুদ্ধ হবে। গ্রামের অনেক বাড়িতে ছোট-বড় আঙিনা রয়েছে। সেখানে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি লালন-পালন করা খুব কঠিন হয় না। অল্প জমি থেকে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় শাক-সবজির জোগান সম্ভব। সরকারি রাস্তা বা নদী-খালের ধারে, রেললাইনের পাশে কিছু না কিছু ফসল চাইলে ফলানো সম্ভব, যা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। সারা বছরই অব্যবহৃত আঙিনাকে খামারে রূপান্তরিত করে প্রয়োজনীয় পুষ্টির আংশিক জোগান সম্ভব। ফলে বাজারের ওপরও চাপ কমবে। খরচও বাঁচবে কিছুটা। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত সহজে ফসল ফলে না। সে-কারণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “আমার মাটি আছে, সোনার মাটি আছে…।” আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন সেই সোনার মাটিতে কীভাবে রত্ন ফলাতে হয়; কীভাবে এদেশকে ধন-ধান্যে, পুষ্প-পল্লবে চির সুন্দরের উন্নত সমৃদ্ধিশালী গৌরবের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে আপামর জনগণ।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য