Saturday, July 13, 2024
বাড়িচতুর্দশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-২০২৩গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও বৃহৎ উল্লম্ফন

গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও বৃহৎ উল্লম্ফন

শেখ হাসিনা বলেছেন, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। অথচ বিএনপি-জামাত জোট না পেরেছে ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে, না পেরেছে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে। আসন্ন নির্বাচনে ভাত ও ভোটের অধিকার সমুন্নত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

নূহ-উল-আলম লেনিন: গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের দেশে একটা একপেশে ও বিভ্রান্তকর ধারণা প্রচলিত আছে। নির্ধারিত মেয়াদে জাতীয় সংসদ, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা বিভিন্ন স্তরের সরকার পরিচালনা হচ্ছে গণতন্ত্রের সারকথা। চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং পছন্দের স্বাধীনতাকে আমরা গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে মনে করি।
আমাদের সংবিধান যেমন উল্লিখিত অধিকারগুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে, তেমনি আমাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞাকে কেবল এই কয়টি অধিকারের ওপর সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ শীর্ষক ১১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।… এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।”
আমাদের সংবিধান প্রণেতাগণ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, মানবসত্তার মর্যাদা এবং প্রশাসন পরিচালনায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকাকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে সংবিধানে লিপিবদ্ধ করেছেন।
কেবল ভোট দিলেই যে মৌলিক মানবাধিকার ও মানবসত্তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, এ-কথা সম্ভবত ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগের ১৫ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলতে কী বুঝানো হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’ শীর্ষক এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “১৫। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :

(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন, অবকাশের অধিকার এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃ-পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।”

সংবিধান থেকে এ-রকম আরও অনুচ্ছেদ ও বিধিবিধান উদ্ধৃত করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা উদ্ধৃতি বাড়াতে চাই না। কেবল ভোট বা নির্বাচনই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার গত তিন মেয়াদে সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ যেভাবে বাস্তবায়িত করেছেন, তা এখন বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত। গত ১৫ বছরে সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়িত করার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে গরিব মেহনতি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা বিএনপি আমলে ৪১.৫ শতাংশ থেকে সর্বশেষ ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে ‘মঙ্গা’ শব্দটি উবে গেছে। শিক্ষার হার ৭৩.৯৫ পৌঁছেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত অতি দরিদ্র ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩২টি পরিবারের মাথা গুঁজবার ঠাঁই হয়েছে। লাখ লাখ গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, স্কুল ও কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা এবং সর্বশেষ পেনশন স্কিম চালু প্রভৃতির ভেতর দিয়ে মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি ‘মানবসত্তার’ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছি।

এক কথায় আমাদের জীবদ্দশায় যা দেখিনি, গত ১৫ বিশেষত পাঁচ বছরে তা দেখতে পাচ্ছি। আমরা পদ্মা নদীতে এমন সেতু দেখিনি। ঢাকায় আমরা মেট্রোরেল কল্পনাও করিনি। আমরা গত শত শত বছরেও নদীর তলদেশে টানেল দেখিনি। এখন দেখতে পাচ্ছি। ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে একটা গ্রেট লিফ ফরোয়ার্ড হয়ে গেছে। এটাই গণতন্ত্রের শক্তি।

মৌলিক অধিকার প্রসঙ্গে সংবিধানে বর্ণিত, অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে ‘উৎপাদন শক্তির ক্রমবর্র্ধমান বিকাশে’ আমাদের অর্জন বাংলাদেশকে হতদরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছে। উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। সর্বশেষ পাঁচ বছরে আমরা নিজস্ব অর্থে সম্পন্ন করেছি পদ্মা সেতু, (সড়ক ও ট্রেন), ঢাকায় চালু হয়েছে মেট্রোরেল, কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, দোহাজারি-কক্সবাজার রেলপথ, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,৫৬২ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, হাজার হাজার সড়কপথ, ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদি যোগাযোগ-ব্যবস্থায় এনেছে মৌলিক পরিবর্তন। এ পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৫,৬৪৮ মেগাওয়াট। এক কথায় আমাদের জীবদ্দশায় যা দেখিনি, গত ১৫ বিশেষত পাঁচ বছরে তা দেখতে পাচ্ছি। আমরা পদ্মা নদীতে এমন সেতু দেখিনি। ঢাকায় আমরা মেট্রোরেল কল্পনাও করিনি। আমরা গত শত শত বছরেও নদীর তলদেশে টানেল দেখিনি। এখন দেখতে পাচ্ছি। ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে একটা গ্রেট লিফ ফরোয়ার্ড হয়ে গেছে। এটাই গণতন্ত্রের শক্তি। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া, তাদের সমর্থন এবং সম্মতি ছাড়া আমাদের এই বৃহৎ উল্লম্ফন সম্ভব হতো না। এটাই প্রকৃত জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ।
এ-রকম দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যেতে পারে। আমাদের মোদ্দাকথা হলো, যে কাজগুলো জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার করেছে, সেসব কাজ আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারই অংশ। এসব কাজে জনগণের অংশগ্রহণ যেমন ছিল তেমনি প্রশাসনের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব ছিল বলেই বাংলাদেশ বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। অথচ বিএনপি-জামাত জোট না পেরেছে ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে, না পেরেছে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে। আসন্ন নির্বাচনে ভাত ও ভোটের অধিকার সমুন্নত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য